ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শামস সাইদ

আন্তর্জাতিক মা দিবস। ১৯১৪ সাল থেকে প্রতি ইংরেজি মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিবসটি মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রতিটি মুহূর্ত মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিপূর্ণ ভালোবাসা প্রদর্শন। সব সময় মায়ের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা প্রতিটি সন্তানের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ, ‘মা’ পৃথিবীর সবচেয়ে আপন। সবকিছুর ঋণ পরিশোধ করা গেলেও মায়ের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কবির ভাষায়, ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু যেন ভাই, ইহার চেয়ে নাম যে মধুর, ত্রিভুবনে নাই।’

‘মা’ তাঁর সন্তানকে খুবই ভালোবাসেন। কারণ, সন্তান জন্মদানের সময় মায়েরা যে কষ্ট অনুভব করেন তা ‘মা’ ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারেন না। বাবা শুধু ভরণ-পোষণ দেয়। কিন্তু ‘মা’ সন্তানকে লালন-পালন করেন। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে- মা’য়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত। গণশিল্পী ফকির আলমগীরের ভাষায়, ‘মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোষ বানাইলেও শোধ হবে না।’

হিন্দু ধর্মে বলা হয়েছে- মা-বাবার সেবা করো। খ্রিষ্টান ধর্মে বলা হয়েছে- পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করার কথা। মোদ্দাকথা পৃথিবীর সকল ধর্মে মা-বাবার সঙ্গে কর্কশ ব্যবহার করাকে মহাপাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নেপোলিয়ান বলেছেন, ‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’

‘মা’ চান সন্তানের মঙ্গল। সন্তানের সাফল্য মায়ের সফলতা, সন্তানের ব্যর্থতা মায়ের হৃদয়কে ব্যথিত করে। বিশেষ করে যেসব মায়েদের সন্তান প্রতিবন্ধী। সেসব মায়েদের দুঃখের সীমা থাকে না। ‘মা’ সব সন্তানকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন। অনেক প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে যাদের অবস্থা গুরুতর। ‘মা’ তাদের পাশে বসে থাকেন। কারণ, মায়েরা প্রসব বেদনা সব সন্তানের বেলায় একই অনুভব করেন।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরানে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি মানুষকে কষ্টের মধ্যে সৃষ্টি করেছি।’ প্রতিবন্ধী সন্তানকে সকলে অবহেলা করলেও ‘মা’ কখনও অবহেলা করেন না। ‘মা’ স্বপ্ন দেখেন হয়তো সন্তানটির প্রতিবন্ধিতা কমবে। একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- অনেক নারী স্বামী ও ননদ কর্তৃক নির্যাতিত হওয়ার পরও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে বিচ্ছেদ করেন না। অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করেন। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মায়েদের অবস্থা আরোও করুণ। প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অনেক ‘মা’কে স্বামী  তালাক দিয়েছেন। ঘর থেকে সন্তানসহ বের করে দিয়েছেন। তবু ‘মা’ সন্তানকে নিজের বুকে আগলে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিবন্ধী সন্তান মায়েদের সমাজ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। মনে করে হয়তো মায়ের পাপের ফসল হিসেবে সন্তান প্রতিবন্ধী। যা ‘মা’কে খুব কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়।

কবি মায়ের কোলকে বিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করেছেন। ‘মা’ পারে একমাত্র সব সন্তানের মনে সাহস যোগাতে। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমার পালনকর্তা (কতিপয়) সিদ্ধান্ত দিয়েছেন (তা এই) যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচারণ করবে। যদি তাঁরা বৃদ্ধকালে পৌঁছে যায়, তা হলে (তাদের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে) তাদের তুমি উহ্ শব্দও বলবে না এবং তাদের ধমকও দেবে না। আর তাদের সঙ্গে তুমি সম্মানজনক কথা বলবে এবং তাদের জন্য দোয়ার মধ্য থেকে নম্রতার বাহু ঝুঁকিয়ে দাও। আর তাদের জন্য দোয়াস্বরূপ বলবে, হে আমার পালনকর্তা, তাদের দু’জনের ওপর ওইরূপ দয়া কর, যেরূপ তারা আমাকে ছোটবেলায় লালন-পালন করেছিলেন (সুরা বনি ইসরাইল, ২৩-২৪ আয়াত)।

হাদীস শরীফে রয়েছে, একবার এক সাহাবী হযরত রাসুলে কারীম (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন। হে আল্লাহর রাসুল! সবচেয়ে কার মর্যাদা বেশি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মায়ের। আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মায়ের। আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপরে কে? তোমার মায়ের। তারপরে কার মর্যাদা বেশি? এবার রাসুলুলাহ (সা.) বললেন, তোমার বাবার।

হযরত ইবনে মাসউদ বলেন, একবার আমি হজরত নবি করীমকে (সা.) জিজ্ঞেস করলাম, কোনো কাজটি আল্লাহ পাকের দরবারে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, সঠিক সময়ে নামায আদায় করা। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত)।

হযরত আবু উমামাহ (রা.) নামক এক সাহাবী বলেন, একজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.) সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অধিকার কী? রাসুল (সা.) বললেন, তাঁরা দু’জন তোমার জান্নাত অথবা তোমার জাহান্নাম (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)।

দুঃখের বিষয়, আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মায়েদের অবস্থা খুবই করুণ। ছেলে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বিলাস বহুল বাসায় বসবাস করে। মা পড়ে থাকে একা গ্রামে। থাকে না মায়ের সেবা করার মতো লোক। এমনকি অনেক মানুষ বৃদ্ধা মায়ের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। অথচ দীর্ঘ দুই থেকে আড়াই বছর মায়ের বুকের দুধ পান করাসহ লালন-পালন করেছেন সন্তানকে মা। এতে দেখা যাচ্ছে, সন্তান থাকার পরেও অনেক মায়েদের ভিক্ষার ঝুলি ঘাড়ে নিতে হচ্ছে। চিকিৎসার অভাবে মায়েদের কষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এর চেয়ে মায়ের কষ্ট কী আর হতে পারে? বাংলাদেশে শতকরা ২০ জন প্রবীণ হয় একাকী অথবা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে থাকেন। দরিদ্র প্রবীণদের সংখ্যা শতকরা ৩৭ জন। তাই বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও বাড়ছে।

বাংলাদেশে ২০১১ সালে পাস হওয়া পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনে সন্তানকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, মা-বাবা যেখানে থাকতে চাইবেন তাঁদের সেখানে থাকতে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে ভরনপোষণও দিতে হবে সন্তানকে। ভরণপোষণ না দিলে সন্তানকে দু’লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন মাসের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। মা দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত, আইন করে বাবা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ও দায়িত্ব পালন নয়। আমরা যেন মায়ের সুখের জন্য ত্যাগ করি জীবন। যাতে মায়েদের মুখে ফুটে ওঠে হাসি। প্রতিটি দিনের প্রতি মুহূর্ত মা দিবস হিসেবে গণ্য করি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *