ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

শামীমা বেগম পিপিএম

জাতিসংঘের UNMISS মিশনের ডায়েরীর পাতা প্রতিদিনই নতুন নতুন কর্ম অভিজ্ঞতায় ভরপুর। ২০১০-১১ সালে সুদানের ড্যামাজিনে অবস্থানকালীন মিশনের দিনগুলো কাটে নতুন নতুন অভিজ্ঞতায়। এখানে জীবনের পাতায় সঞ্চিত হয় ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর সাথে দায়িত্ব পালনের স্মৃতিগুলো। এয়ার পেট্রোলিং এ আমরা বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে বেড়িয়েছি বিভিন্ন সময়। গনগনে সূর্যে প্রখরতায় শিশু এবং নারীদের জীবন সংগ্রাম অবর্ণনীয়। যে মানবাধিকারন আর সংবেদনশীলতার কথা ইউএন ম্যান্ডেট জুড়ে থাকে, বাস্তবে তার প্রয়োগ কখনো কখনো দুরূহ হয়ে পড়ে। প্রকৃতি ও বড্ড নিষ্ঠুর এখানে। এই আফ্রিকার দূর দূরান্তে গ্রাম গুলোতে ইউএন এর টহল দল যখন নামে একেকটি অঞ্চলে তখন এক আলোড়ন জাগে। ভোটার রেজিস্ট্রেশনের কাজ দেখতে ইউএন NIRED টীমের সঙ্গে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতাম আমরা। তেমনি কাজে, এক সকালে ওয়াদেল মাহি নামক গ্রামে গিয়েছিলাম।

তখন সকাল ১১ টা সুদানে। সকাল ১০-১১টা সুদানীজদের সকাল বেলার নাস্তার সময়। এ সময় এরা গোলাকৃতির বড় ডিশে খাবার সাজিয়ে সবাই এক সঙ্গে বসে খায়। ওখানকার স্কুলের কাছে বাজারে আমাদেরও এ রকম একটি নাস্তার টেবিলে যোগ দিতে হল। স্থানীয় ভাষায় এরা সকালের নাস্তাকে “ফাতুর” বলে। ফাতুর মানে সকাল বেলার নাস্তা। সুদানীজদের এই ফাতুর পরিবেশনা সত্যিই আকৃষ্ট করে। একটি বড় ডিশে সব খাবার নিয়ে পরিবার, প্রতিবেশী আর অতিথিদের নিয়ে একসাথে বসে। গাছের ছায়ায় কিংবা বাসায় বসে এক সাথে সকলের খাবার আয়োজনের কারণটাও অনেক সুন্দর ও অর্থবহ। সকালের নাস্তা এক সাথে একই ডিশ হতে গ্রহণের ফলে সবার মাঝে একাগ্রতা আর অংশিদারিত্বের বন্ধন বাড়ে। সবাই অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভাগাভাগি করে খাবার গ্রহণে নির্মল আনন্দ মেলে। সম্প্রীতি আর মিথস্ক্রিয়ার মেলবন্ধনে রচিত হয় মায়া আর ভালোবাসার এক অনন্য বন্ধন। ফাতুরের মেন্যু উপকরণ জুড়ে থাকে-পাউরুটি, লালমরিচের ভর্তা, বাদাম ভর্তা, ভেড়ার চর্বির স্যুপ আর স্থানীয় ছোলার তৈরি খাবার ফুল।

মিশনের জীবনের প্রতিটি দিনই নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় ভরপুর। প্রায় ৪০ টি দেশের শান্তিরক্ষীদের ভিন্ন ভিন্ন ভাষার আর বর্ণের এক মিলনমেলা UNMISS মিশন। আফ্রিকান, আরব, পাশ্চাত্য আর প্রাচ্যের সংস্কৃতি আর জীবনধারার ভিন্নতা ভাবনার নতুন দিগন্ত উম্মোচন করে। সবকিছু ছাপিয়ে তখন অনন্য এক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগে। তখন সবার উপরে মানুষ হিসাবে পরিচয়সত্তা  বড় হয়ে ওঠে। যেদিন হেলিকপ্টারে করে রেফারেন্ডাম ডিউটিতে ইউএন NIRED টীমের সাথে গেলাম সে দিন আরেক বিস্ময়ের দিন। জানুয়ারী এক উজ্জল সকালে আবারো ওয়াদুল মাহির সে ছোট গ্রামের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা। ইউএন হেলিকপ্টারে যখন চড়লাম তখন সত্যিই ভয় লাগছিল প্রচন্ড শব্দে। অবশ্য যখন জানালা দিয়ে নীচে তাকালাম জীবন আর প্রকৃতির মাঝে কখন যেন হারিয়ে গেলাম টের পাইনি। আমাদের হেলিকপ্টার ম্যাপরিডিং ভুল করে অন্য এক স্কুলে নামে; তখন জনৈক শিক্ষিকা ছুটে এল। সে এক দেখার মত দৃশ্য। যেন হ্যামিলনের বাশিওয়ালার মতো সব ছুটতে শুরু করলো আমাদের পিছু পিছু।

গ্রামে হেলিকপ্টারে পদার্পন আর আমাদের উপস্থিতি তখন তাদের কাছে ভিনগ্রহের বাসিন্দার মতোই। কিছু সময় ওখানে তাদের সাথে সময় কাটিয়ে আমরা সঠিক গ্রামের সন্ধানে আবারো হেলিকপ্টারে চড়ে বসলাম। এবার সেই ওয়াদুল মাহির ভোট সেন্টারের স্কুলে পৌঁছালাম। সেখানে হেলিকপ্টার থেকে নামার পরও একই দৃশ্য। পুরো গ্রামে সবাই যেন উৎসবে মেতেছে হেলিকপ্টার দেখার কৌতূহলে। বাচ্চারা তাদের ছোট ছোট ঝুরিতে বাদাম আর সবজির ভাজা বীজ নিয়ে ফেরি করছে। মহিলারা বেড়িয়ে এসেছে পর্দার আড়াল হতে। আমাদের সঙ্গে তাদের শুভেচ্ছা বিনিময় হলো। ভোট রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া যথাযথ চলছে। কিছুক্ষণ সেন্টারে অবস্থান করে আমরা আবার ফিরে এলাম নিজের গন্তব্য।

এভাবেই মিশনে এক একটি দিন কেটে যায়। অবসরে রান্না, গান, কবিতার আর গল্পের বই পড়ে এবং ছবি দেখে কাটে জীবন। মাঝে মাঝে অন্য দেশের কলিগদের দাওয়াত করে বাংলাদেশী রান্না করে মজার মজার খাবার পরিবেশন করি। রেখে আসা প্রিয় স্বজনের সুখ ছবি, নাড়ীর টান বড় বেশী টানে। তারপরও মানবতার বৃহত্তর ডাকে জাতিসংঘ মিশনে কাজের নিজেকে অংশগ্রহণ আত্মতৃপ্তি বাড়িয়ে দেয়। এরই মাঝে দেশে প্রিয়জনের খবর নেয়া, ইন্টারনেট এ পত্রিকা পড়া, গল্পের বই পড়া, গানশোনা, টিভিতে আরবীয় বিভিন্ন দেশের অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটে। সন্ধ্যায় ক্লান্ত দেহে রাতের খাবার তৈরী করে খাবার খেয়ে তার পর ঘুমের আয়োজন। উষ্ণ মরুর দেশে প্রতীক্ষা আরো এক আলোকিত ভোরের।

লেখক : অ্যাডিশনাল ডিআইজি, পিটিসি, টাঙ্গাইল।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *