ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

তানভীর সালেহীন ইমন পিপিএম

মহান মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লার শহীদ পুলিশ সুপার মুন্সী কবির উদ্দিন আহমদ-এর স্ত্রী মাকছুদা কবিরের ভাষ্য-

আপনারা কুমিল্লায় কবে গেলেন?

সত্তর সালে, শেখ সাবের ইলেকশনের আগে। আমরা গেলাম তার পরপরই ইলেকশন হলো। বর্ডার ডিস্ট্রিক হিসেবে ইলেকশনে গোলমাল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এত সুন্দর ইলেকশন হয়েছে, খুব শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এজন্য ঢাকা থেকে বড় অফিসাররা এসপি সাহেবকে অভিনন্দন জানাইছে। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনের শেষ দিকে তিনি চুপচাপ থাকতেন, কিছু বলতেন না। আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম। বললাম, কী অইতেছে, কী করতাছ? তিনি বললেন, এভাবে না করলে তাদের তাড়ানো যাবে না। বললাম, তোমাদের কিছু নাই তো! তোমাদের কাছে খালি গুলি, কয়েকটা বন্দুক। আর তাদের তো ভারী অস্ত্র। মেশিন গান, বোম। তিনি বললেন, এভাবেই তাদের তাড়াতে হবে। নইলে তারা যাবে না।

২৬ মার্চ সকালে তিনি চলে গেলেন। ভালো ভাবেই গেলেন। তখন তো বুঝতে পারিনি এই যাওয়া শেষ যাওয়া। সারারাত গুলির শব্দে আমার শাশুড়ির ঘুম হয় নাই। আমি ডেকে বললাম, আম্মা আপনার ছেলে যাইতেছেগা। মা কান্নায় অস্থির। মায়ের মন তো, বুঝতে পারছে। জড়াইয়া ধরলো, বললো, বাবু আমি তোরে যাইতে দিমু না। তখন আমাদের সব কান্নাকাটি, যে আম্মা এরকম কানতাছে কেন? তারপর উনি এসে আমার হাতটা ধরলেন, আমি বুঝলাম না আমার হাত ধরছে কেন। চার দিকে সব ছেলেমেয়ে, সিপাই-টিপাই, ড্রাইভার। তারপর চলে গেলেন। ক্যাপ্টেন বোখারীর সঙ্গে। এরপর থেকে তো কোনো খবরই পাই না।

তিনি যেমন ধার্মিক, তেমন সৎ লোক ছিলেন। কোনো কথা আমাদের বলেন নাই। কিন্তু আমি তার চাল-চলনে, খাওয়া-দাওয়ায় বুঝতে পারছি কিছু একটা হইতেছে। ছেলেরা সব ছোট। আর্মিরা কয়েকবার গাড়ি নিতে আসছে, ড্রাইভার ছিল মমিন, সে ইউপির লোক, বলতো বাচ্চারা সব ছোট। জিজ্ঞেস করতো, বাচ্চারা কী করে, বড়টা কী করে, মেয়েটা কী করে? সে বলতো ছেলেরাও ছোট, মেয়েরাও ছোট। তারপর তারা গাড়ি নিয়ে চলে যেতো। আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে নাই। ভয় পাইতাম খুব। প্রায়ই ফোন আসতো, আমরা আসবো। বাচ্চাদের গার্ডিয়ান তো আমিই। আর তো কেউ নাই। সবারে একসঙ্গে বসিয়ে দু’আ-দরূদ পড়তাম।

এক মেজর আসছিল, সার্কিট হাউসে তারা ক্যাম্প করেছিল। একদিন সাহস করে তার কাছে গেলাম। তখন তো সাহস ছাড়া উপায় নাই। চারদিকে সব আর্মির মধ্যে ঢুকলাম। ছোট ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম। আর্মিরা তাকাইয়া তাকাইয়া আমাকে দেখল। বললাম, মেজর সাহেব কোথায়? ওখানে গেলাম। লোকটা ভদ্র। পাঠান। বললাম সব কাহিনী। বাংলায়ই বললাম। সে বললো, আমার তো করার কিছু নাই। যদি আপনি চলে যেতে চান তাহলে আমি সাহায্য করতে পারবো। বললাম, আমি তো ভয় পাই, ফোনটোন করে। কী ভাষায় কী বলে? বুঝলাম, বাংলায়ও বলে, উর্দুতেও বলে। আমি কিছু বুঝি, কিছু বুঝি না। মেজর সাহেব বললেন, আচ্ছা, আমি ব্যবস্থা করছি। আপনার বাসার সামনে গার্ড থাকবে। রাত্রের বেলায় গার্ড দেবে। তারপর আমাকে বললেন, কোন ড্রাইভার নিয়ে আপনার যাইতে চান। বললাম, আমাদের ডাইভার। আমাদের গাড়ি নিয়া গেছে। ড্রাইভার মমিন খুব ভালো ছিলো। গাড়ি দিলো। ঢাকায় আসার সময় দেখি ক্যান্টনমেন্টে আর্মি সব বসা। সবাই তাকাইয়া আছে, কার গাড়ি যায়, কোথায় যায়? মে মাসে যাচ্ছি সব মালপত্র নিয়া। ড্রাইভার সব বুঝাইয়া বললো। টাউন দারোগা আমাদের সঙ্গে ছিলো। ঢাকায় আইস্যা আমাকে নামাইয়া দিয়া গেল।

এভাবে মুক্তিযুদ্ধের বাকী সময় কাটাইলাম। ঢাকায় এর বাসায় তিন মাস, ওর বাসায় তিন মাস এভাবে নয় মাস কাটলো। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে আমরা চলে গেলাম মানিকগঞ্জের পিপুলিয়ায়। যেখানে আমি আর্মি-রাজাকারদের মধ্য দিয়ে গেলাম। আমার দুলা ভাই বলছে কী, রাজাকাররা বহুত খারাপ। তারা আমাদের সব বাক্স খুলে দেখতে চায়। দুলা ভাই বললো, বাচ্চা কাচ্চা সাথে, সঙ্গে কী আছে, কেন এখন বিরক্ত করতাছ? তারপর পিপুলিয়া গেলাম। সেখানে শুনলাম মুক্তির হাতে আর্মি বাড়ি খাইছে। খুব ক্ষ্যাপা। ওখানকার মানুষের নাম শুনলেই ক্ষেইপ্যা যায়। প্রতি রাতে অনেক ছেলে আসে। মাটিতে খড় বিছাইয়া শুইয়্যা থাকে। আর সবার ঘর থেকে খাবার দেয়।

ছোট ছোট ছেলেগুলি নিয়া সংগ্রাম করলাম। তোমরা কর দেশের জন্য সংগ্রাম, আমি করছি বাঁচার জন্য সংগ্রাম। এখন সবাই বড় হইয়া গেছে, চাকরি করে। আমার সঙ্গে বড়জনও আছে, ছোটটাও আছে।

আশঙ্কা হচ্ছিল ২৪ তারিখ ক্যান্টনমেন্ট থেকে আক্রমণ হবে। তখন তো আক্রমণ হয়নি। তখন এসপি সাহেবকে দেখে আপনার কি মনে হতো?

উনি তখন কন্ট্রোল রুমে ছিলো সার্কিট হাউজে, ডিসি সাহেবের সঙ্গে। আমি ফোন করে বললাম যে, চইল্যা আসো, রাত্রি বেলায় ৮-৯টা বাজে তখন। আমাকে অপরিচিত একজন লোক ফোন করলো, এসপি সাহেব কোথায়? আমি বললাম, তিনি তো সাহেবের কন্ট্রোলরুমে আছেন। তিনি বললেন, বাসায় চলে আসতে বলেন। এসপি সাহেবকে ফোনে বললাম। বললেন, দেখি। তারপর গুলির আওয়াজ শুরু হলো। হঠাৎ ফোন ডেড হয়ে গেলো। বিদ্যুৎও চলে গেল। তারপর তিনি বাসায় আসলেন। পুলিশ লাইনস্ আক্রমণ হয়েছে। অনেক পুলিশ মারছে। অনেক পুলিশ আমার বাসায় আসছে। হাতে বন্দুক, তাদের জায়গা দিলাম। প্রায় ২০-২৫ জন পুলিশ। তারা রাত্রে থাকলো। দেখি ভোরের দিকে আর কেউ নাই।

২৬ মার্চ ভোরে আর্মিরা আসলো। বাসায় আসলো ক্যাপ্টেন বোখারী। তার বডিগার্ড ও ড্রাইভার ছিলো গেটের বাইরে। এসপি সাহেব চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একটু এগিয়ে আবার ফিরে আসলেন। বললেন, আমি আসবো তো, মিটিং আছে একটা, তারপরই চইল্যা আসবো। তিনি জানতেন বোধ হয়।

খাওয়া-দাওয়া খুব কম করতো। আমাকে বলেছিল ডিমের কোর্মা পাক করে দেওয়ার জন্য। আমি আর করি নাই। ঐদিন কেন যে করলাম। তিনি খাইতে চাইছেন। তিনি একটা ডিম খাইলেন, আরেকটা ডিম রইলো, রাত্রে খাবে। রাত্রে তো আর খাওয়া হয় নাই।

২৬ মার্চ তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পর কোন খবর পেলেন?

তখন তো কারফিউ। কারও কাছে জিজ্ঞেস করার উপায় নাই। তখন চেনা মানুষ সব অচেনা হয়ে গেল। তারা আমার বাসার দিকে তাকাইতেছি না। যেন আমরা কত বড় অপরাধী।

২৬ মার্চ থেকে মে মাসে ঢাকায় চলে আসার আগ পর্যন্ত সময়টা কী রকম ছিল?

খাওয়ার মধ্যে ছিল ভাত, গরু ছিল, গরুর দুধ। বাচ্চারা কেউ খাইতে চাইতো না, খাওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। তারপরও জোর কইর‌্যা খাওয়াইতাম। আলু ভর্তা ছিল। সিপাহীদের বাজারে পাঠাইলে বাজারে যেত না। কী বাজার করবো? চারপাশে লাশ পড়ে আছে। ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের কয়েকজন ছিল। তারা কোথায় চলে গেল। একজন বয়স্ক সিপাই ছিল, নোয়াখালীর। বলতো, আম্মা আমার ভয় লাগে, বলে, সার্কিট হাউজ থেকে তারা দূরবীন দিয়া দেখে। মমিন ড্রাইভার ছিলো। ওর বউয়ের গায়ে গুলি লাগছিল।

মুক্তিযুদ্ধের পর আপনারা কীভাবে টিকে রইলেন?

খুব কষ্ট। এমন কষ্ট যে, মানুষকে বলা যায় না। এগুলো বলি না। খামাখা এগুলো বলে লাভ কি? বহুত কষ্ট করছি ছেলেদের নিয়া। বড়টা তো এসব চিন্তায় লেখাপড়া করতেই পারলো না। বিআরডিবিতে ছোটখাট একটা চাকরি করতো। কয়েক বছর পরে তা ছেড়ে দিলো। ছোটরা বুঝলো লেখাপড়া করতে অইবো, বাঁচতে অইবো। কষ্টে সৃষ্টে লেখাপড়া কইরা দাড়াইছে। পাকিস্তান আমলে সিস্টেম ছিল ফ্যামিলি পেনশন পাবে ৫ বছর। বাংলাদেশেও ৫ বছর পর পেনশন বন্ধ করে দেয়া হলো। তারপরও, পেনশন কী, সামান্য। পেনশন বন্ধ করে দেবার পর আরও কষ্ট করতে হলো। এই বাড়ির পেছনে টিনশেড বিল্ডিং বানিয়ে ওখানে থাকতাম। এই বাড়িটা সরকারি অফিসারের কাছে ভাড়া দিয়ে সেই ভাড়ায় চলতাম।

কুমিল্লায় যাওয়ার আগে, তিনি ঢাকা সিটি এসপি ছিলেন। বিহারী-বাঙালি সংঘর্ষ নিরসনে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ঐ সময় আমরা বদলী হয়ে কুমিল্লায় চলে যাই। আমি বলেছিলাম, বাঁচলাম। আবার যখন ফিরা আসলাম, তখন সবাই বলছে, আপনি বলছেন, বাঁচলাম। এমন বাঁচা বাঁচলেন, চিরতরে বাঁইচ্যা গেলেন।

কুমিল্লায় আমরা আরও একবার ছিলাম। তিনি জেলা এন্টি করাপশন অফিসার ছিলেন। তিনি ডিএসপি ছিলেন। আমরা যাওয়ার পর তো অবাক। এতো লোক আসছে। উনি ছোট চাকরি করতেন। কিন্তু সবাই ভয় পেতো। বলতাম, তুমি চাকরি করো ছোট, তোমাকে লোকে এত ভয় পায় কেন? বলতেন, আমার কাছে তো আসল রহস্য। সবাই খুব মান্য করতো। সৎ হওয়ার কারণে হিন্দু-মুসলমান, উকিল, সাধারণ মানুষ- সবাই শ্রদ্ধা করতো।

(সাক্ষাৎকার গ্রহণ-মামুন সিদ্দিকী)

তথ্যসূত্র-মামুন সিদ্দিকী, ১৯৭১, কুমিল্লা পুলিশ লাইনস্, ঢাকা, ইফাত প্রেস ২০১৭

লেখক : অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *