ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ শাহজাহান পিএইচডি

মাহবুব উদ্দীন আহমেদ, বীরবিক্রম যাকে সবাই চেনে এসপি মাহবুব নামে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর  স্নেহধন্য এ পুলিশ কর্মকর্তা মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি পুরুষ।

কেন তাঁকে নিয়ে লেখা? তিনি অন্যদের চেয়ে কেন স্বতন্ত্র? এ প্রশ্ন পাঠক মনে আসা অস্বাভাবিক নয়। তাই এর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা প্রয়োজন বোধ করছি।

সকলের জানা আছে যে, রাজারবাগের প্রতিরোধযুদ্ধের সংবাদ দেশের সকল পুলিশ ইউনিটে পৌঁছে যাওয়ার পর যে ক’জন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে শুধু বীরত্বপূর্ণ ভূমিকাই পালন করেননি একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, যোদ্ধা ও সশস্ত্রযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। আর যে বিশেষ কারণে তাঁকে ইতিহাসে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে তা হলো তিনি মুজিবনগরে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার প্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদানকারী দলের অধিনায়ক ছিলেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে গণহত্যা শুরু করলে মাহবুব উদ্দীন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ঝিনাইদহ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার গঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের কার্যক্রম শুরু হয় এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ক্রমে সাংগঠনিক রূপ নেয়। পরবর্তীতে সেক্টর গঠিত হয় এবং জনাব মাহবুব ৮ নং সেক্টরের একটি সাব-সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সাতক্ষীরার ভোমরা এবং কাকডাঙ্গা-বেলেডাঙ্গা -সোনাবাড়িয়ায় ভয়াবহ যুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দেন। ঐ যুদ্ধে তিনি আহত হন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত হন। জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহম্মদ এর নেতৃত্বাধীন সরকার জনাব মাহবুবকে কারাগারে প্রেরণ করে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়কগণ যথাক্রমে জেনারেল সফিউল্লাহ, মেজর জেনারেল আইন উদ্দীন, জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান, মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ও মেজর রফিক প্রমুখ যখন তাদের লিখিত আত্মজীবনীমূলক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে লিপিবদ্ধ করেন তখন এরূপ প্রশংসা অবশ্যই পুলিশ বাহিনীর জন্য যথেষ্ট গর্বের ও গৌরবের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে জনাব মাহবুবের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা, ত্যাগ, সাহস এবং যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং তা সঠিকভাবে প্রয়োগের দৃষ্টান্ত যে কোনো দেশের স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাকে চিরদিন উজ্জীবিত করবে। সঞ্জীবনী শক্তি জোগাবে।

সঙ্গত কারণে স্বাধীনতা ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে এ মহান বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত। সে বোধ থেকে এ লেখার সূত্রপাত। ব্যক্তিগত পর্যায়ে জনাব মাহবুব উদ্দীন আহমেদ বীরবিক্রমের সাথে আলাপ হয়েছে। তিনি তথ্য উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করেছেন। বিভিন্ন পুস্তকে তাঁর সম্পর্কে যে সকল তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রবন্ধটি সাজানো হয়েছে।

মেজর রফিকুল ইসলাম তাঁর দক্ষিণ পশ্চিম রণাঙ্গন ১৯৭১ বইতে লিখেছেন ২১-২৩ মার্চ ১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তানের সঠিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য মেহেরপুরের এসডিও জনাব তৌফিক এলাহী কয়েকজন অফিসারের সাথে  মিলিত হন। এদের মধ্যে ছিলেন, তদানীন্তন ঝিনেদার এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, নড়াইলের এসডিও শাহ মোহাম্মদ ফরিদ। আলোচনায় তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, একটি সামরিক সংঘর্ষ অবধারিত। বৈঠকে নিজ নিজ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

স.ম.বাবর আলী, স্বাধীনতার দুর্বার অভিযান শীর্ষক বইতে লিখেছেন ঝিনাইদহ মহকুমার পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব উদ্দীন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই যুদ্ধ ও সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধ পরিচালনায় অপরিসীম কৃতিত্বের জন্য ১০ এপ্রিল ১৯৭১ তাকে ক্যাপ্টেন পদে ভূষিত করা হয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরে অনুষ্ঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করেন। ঐ শপথ অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার নেতাকর্মী জনসাধারণ ও অনেক বিদেশি সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বে ঝিনাইদহ ৪০০ মুক্তিযোদ্ধার বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এ বাহিনী ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাংগায় অপরিসীম রণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। (ক্যাপ্টেন পদবি সংক্রান্তে জনাব মাহবুব অবশ্য বলেছেন যে, তাকে ও জনাব তৌফিক এলাহীকে দক্ষিণ পশ্চিম রণাঙ্গনের প্রধান সেনাপতি মেজর আবু ওসমান চৌধুরী কমান্ড স্ট্যাকচার সুসংহত করার জন্য ক্যাপ্টেনের র‌্যাংক ও ব্যাজ পরিয়ে দেন ২৮ মার্চ ১৯৭১। পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদেরকে ক্যাপ্টেন হিসেবে আদেশ জারি হয় ৭ এপ্রিল ১৯৭১)।

মো: আব্দুল হান্নান, স্বাধীনতাযুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ আক্রান্ত হওয়ার খবর ঝিনাইদহ পৌঁছালে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে এসডিপিও জনাব মাহবুব উদ্দীন আহমেদ মহকুমার ট্রেজারি থেকে সকল টাকা পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার সংগ্রহ করে সাথে নিয়ে যান। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে উল্লিখিত সম্পূর্ণ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার সরকারি কোষাগারে জমা দেন। সে সময় ঝিনাইদহ, চুয়াডাংগা ও মেহেরপুর এর ট্রেজারী ব্যাংক থেকে সংগৃহীত ৪ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা এবং ২৫ কেজি স্বর্ণ স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী জনাব এম মনসুর আলীর নিকট জমা দেন। একই সাথে ২০ লক্ষ টাকা জমা দেন সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সে কর্নেল মঞ্জুর এর নিকট। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে তাঁর জমা দেয়া টাকার রশিদ সুরক্ষিত আছে। ২৯ মার্চ ১৯৭১ এর রাতে ভারতীয় বর্ডার ফোর্সের তরফ থেকে জনাব মাহবুব দুটি এলএমজিসহ কয়েক বক্স  হাই এক্স প্লোসিভ এন্ড গ্রেনেড এর সর্ব প্রথম চালান বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর পক্ষে তিনিই গ্রহণ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করেন।

২৫ মার্চ ১৯৭১ কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনস্ পাকবাহিনী আক্রমণ করে নির্বিচারে বাঙালি পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে। ৩০ মার্চ ১৯৭১ ভোর ৫টায় কুষ্টিয়া শহরে পাক সৈন্যদের উপর আক্রমণ শুরু হয়। এ যুদ্ধে পুলিশসহ সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধাগণ অংশগ্রহণ করে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাগণ পাকিস্তানি সৈন্যদের হটিয়ে শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। এ যুদ্ধে  মাহবুব উদ্দীন আহমেদ প্রতিরোধ যুদ্ধে যে দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তাতে কুষ্টিয়া এলাকার মানুষের নিকট আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

মুক্তিযুদ্ধে জনাব মাহবুব উদ্দীন আহমেদ বীরবিক্রম এর ভূমিকা সম্পর্কে ঢাকা জেলা পুলিশ কর্তৃক প্রকাশিত গৌরবময় স্বাধীনতা শীর্ষকগ্রন্থে যে তথ্য পাওয়া যায় সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা প্রয়োজন। বর্ণিত গ্রন্থে জনাব মাহবুব বলেন, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া উন্মাতাল অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশের সে সময়ের আমি একজন চাক্ষুষ সাক্ষী, যুদ্ধে ঝিনাইদহ অঞ্চলের যুদ্ধের সংগঠক ও অধিনায়ক, স্বত:স্ফূর্তভাবে মনের তাগিদে যুদ্ধ শুরু করেছি, শেষও করেছি। যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে রণাঙ্গন থেকে সরাসরি ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করি ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭১।

জানুয়ারি ১৯৭১ থেকে ৭ মার্চ ৭১, সরকারি কর্মস্থলে উৎকর্ষতা সাধনের আশায় সাতকানিয়া পাহাড়ি এলাকায় সেটেলমেন্ট ট্রেনিং প্রশিক্ষণরত অবস্থান। সে অজপাড়াগাঁয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জনগণের দেশমাতৃকাকে স্বাধিকারের মালা দিয়ে বরণের প্রত্যয়ী সংগ্রাম দেখে জনগণের সাথে মিলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের অমোঘ ডাক শুনতে না পাওয়ার বেদনাকে বুকে নিয়ে পূর্বাপর চিন্তার মাথায় লাথি মেরে ৮ মার্চ ঢাকায় পুলিশ কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত হলাম। সেখানে ১৭ মার্চ পর্যন্ত অবস্থান করে সারাবাংলায় মুজিবের আঙুলি হেলনে বাঙালির শোনিত শ্রাবনে প্রলয়ংকরী পাকিস্তানবিরোধী অগ্নুদগার দেখলাম। জনগণের নিরঙ্কুশ ভোটে নির্বাচিত শেখ মুজিবের সরকার বাস্তবে (ডি-পেক্টো) দেশের অধিকর্তা, সরকার এর হর্তাকর্তা ও বিধাতা। তথাকথিত ইয়াহিয়ার অবৈধ আইনানুগ সরকার ক্যান্টনমেন্টে নির্বাসিত।

পুলিশ বাহিনী বাঙালি সংগ্রামের প্রতীক মুজিবের হুকুমে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করছে, বাঙালির স্বার্থে। অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনারা দফায় দফায় গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে- পাকিস্তানিদের প্রতি বাঙালি জনগণের ঘৃণা, দ্রোহ, সরকার গঠনে বাঙালি অধিকারের প্রতি পাকিস্তানি জেনারেলদের অনীহার ফলে আন্দোলনের অগ্নিতে ঘৃতাহুতি। সব মিলিয়ে পাকিস্তানিদের লেজেগোবরে অবস্থা। সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের জ্ঞান বুদ্ধি খাটিয়ে, ঝিনাইদহ ফিরে যাব। জনগণকে সংঘবদ্ধ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নেব। ১৭ মার্চ ১৯৭১ ঝিনাইদহ ফিরে এলাম।

ঝিনাইদহ ফিরে শুরু করলাম আনসার, মুজাহিদ ট্রেনিং এর নামে উৎসাহী যুবকদের ট্রেনিং। একই সাথে অন্যান্য বাঙালি অফিসার ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আপদকালীন অবস্থায় করণীয়, অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনাও অব্যাহত ছিল। সিদ্ধান্ত হলো- সবাই সবার সাথে যোগাযোগ রাখবো, জনগণের সাথে এবং জনগণের পাশে থাকবো।

চরম উত্তেজনা চারিদিকে। প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্পর্শকাতর রাজপথে বাঙালি মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলির খবর। সারা দেশের মতো ঝিনাইদহেও উত্তেজনা ছড়িয়ে ছিল। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ছিলেন উজ্জীবিত। অস্ত্রধারী বাঙালি পুলিশরা সেদিন সারাদেশে সাধারণ মানুষের একান্ত আপনজনে পরিণত হয়েছে। প্রাদেশিক সরকারের ৯৯ ভাগই বাঙালি পুলিশ হওয়ায় ঢাকার রাজপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতাকামীদের ওপর গুলি চালাতে হয় সেনাবাহিনীকেই। মূলত এ সময় পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের বাঙালি সদস্য গণজনতার কাতারে এসে দাঁড়ায়।

গার্ড অব অনার প্রদানের প্রেক্ষিত বর্ণনা করতে জনাব মাহবুব উদ্দীন আহমেদ বলেন, নিজের অজান্তেই কত বড় একটি কাজের সাক্ষী বা সাথী হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলাম, তা প্রণিধান করার বয়স হয়নি। উৎসাহ, উদ্দীপনা আর তারুণ্যের আতিশয্যে টালমাতাল প্রাণশক্তি অস্তিত্বে ও পরতে পরতে তখন চিৎকার করে বলছে, স্বাধীনতা! স্বাধীনতা! স্বাধীনতা! জয় বাংলা! জয় বাংলা! জয় বাংলা!

সেদিন গার্ড অব অনার দেওয়ার আনন্দ ও শিহরণে এতোই বিভোর ছিলাম যে, সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, মুভ ক্যামেরার ফ্লাশলাইট যে ক্ষণে ক্ষণে ছবি তুলছিল তা টেরও পাইনি। শুধু উপলব্ধি করেছি ফ্ল্যাশলাইটের চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানি। ঘটনার আকস্মিকতায় এত বিমূঢ় ছিলাম যে, ঐতিহাসিক সে ক’টি মুহূর্ত, সেকেন্ড, মিনিট আবর্তিত হচ্ছিল আমার অজান্তে আমার চেতনার গভীরে। গার্ড, পতাকা, মানুষ, স্বাধীনতা- এর বাইরে চারদিকে  ফটোগ্রাফির ফ্লাশ, মুভি ক্যামেরার শব্দ কিছুই মনে রেখাপাত করেনি।

ইলাষ্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া নামক কারেন্ট সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাঁর গার্ড অব অনারের ছবি দেখে তিনি অভিভূত হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায় সেদিনই প্রথম আমার মনে হল, আমি বিরাট গৌরবোজ্জ্বল এক অধ্যায়ের গৌরবদীপ্ত খেলোয়াড়। আনন্দে সেদিন বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি ফুলে উঠেছিল। ১৭৫৭ সালের জুলাই মাসে পলাশীর আম্রকাননে পলাশীর আমবাগানে সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালিরা দু’শো বছর পরাধীনতার নিগঢ়ে আবদ্ধ হয়েছিল। ঠিক দু’শো তের বছর নয় মাসের মাথায় সেই আমবাগানের মাত্র পঞ্চাশ মাইল পূর্ব-দক্ষিণে আরেক আমবাগানে আমরা স্বাধীনতার সূর্যকে জাগরূক করে ছিলাম। সে জাগরণের ক্ষণে নবোদিত সূর্যকে যাঁরা প্রথম দেখেছিলেন, আমিও তাঁদের একজন- এ শ্লাঘা চিরকাল আমৃত্যু আমাকে, আমার বংশধরদেরকে গৌরবদীপ্ত করবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আজকাল আমাকে ১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার প্রদানের ঘটনা শোনানোর অনুরোধ করেন সাথে সাথে একটি প্রশ্ন করেন,‘‘তখন আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?’’আসলে সে যৌবনে যে কাজটি করতে পেরেছিলাম তার জন্য অবশ্যই গৌরব অনুভব করি। ভাবি, সেদিন যদি পুলিশ কর্মকর্তা না হতাম এবং ঐ পবিত্র ভূখণ্ডে উপস্থিত না থাকতাম একজন যোদ্ধা হিসেবে তাহলে আমি এমনি গৌরবদীপ্ত ভাগ্যবান হতে পারতাম না। মাঝে মাঝে ভাবি যদি সেদিন আমরা কোনো কারণে পরাজিত হতাম তাহলে পাকিস্তান আর্মি হয়ত আমাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তিলে তিলে হত্যা করতো। কিন্তু এটাও ভাবি, আমি এক পরাধীন জাতি স্বপ্নময় জন্মক্ষণের একজন সাক্ষী, একজন কর্মী। সেদিন ঐ মমতাভরা সামরিক অভিবাদনের মধ্য দিয়ে সমগ্র লড়াকু বাঙালি জাতির স্বাধীন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার এক অনবদ্য সুযোগ পেয়েছিলাম। পৃথিবীর কাছে সে অভিবাদন ছিল লড়াকু বাঙালি একতাবদ্ধ যুদ্ধ ও লড়াকু সরকারের প্রতি সার্বিক আনুগত্যের প্রতীক। এ আনুগত্য আমাদের স্বাধীন ভূখন্ড, স্বাধীন জাতির পতাকা এবং সুরেলা জাতীয় সঙ্গীতের অবিস্মরণীয় এবং চিরস্থায়ী স্বাধীন সার্বভৌমত্বেও দৃপ্ত স্বত্তার অমোঘ ও অমোচনীয় স্বাক্ষর। এজন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশের প্রতি এবং জাতির প্রতি আমার দায়বদ্ধতা অবিচল, চিরন্তন ও অবিনশ্বর।

স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের এ ক্ষণে আগামী প্রজন্মের পুলিশ সদস্যদের অনুপ্রেরণার জন্য এবং  স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্মের প্রত্যক্ষ সাক্ষীর স্বীকৃতি প্রদানের জন্য  এ বীরের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। তাহলে কিছু হলেও তাঁর ঋণ শোধের এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আমরা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান মনে করতে পারবো।

জনাব মাহবুব উদ্দীন আহমেদ বীরবিক্রম আজো বেঁচে আছেন, ইতিহাসের এবং কালের সাক্ষী হিসেবে। আমরা তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করছি। বেঁচে থাকো, হে মহান বীরপুরুষ, তুমি-ই পুলিশ সদস্যদের অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।

  লেখক : পরিচালক (আরএন্ডপি), পুলিশ স্টাফ কলেজ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *