ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন

বাংলাদেশকে উন্নত দেশের মর্যাদায় উপনীত করতে ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়নে সরকার ২০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-এর জন্মশতবর্ষে ‘রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবে রূপায়ণ: বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১’ উপহার পেয়ে দেশবাসী আনন্দিত।

‘রূপকল্প ২০২১’ এর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব- এর স্বপ্নের উন্নয়নের পথে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই‘রূপকল্প ২০৪১’ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য- ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যর অবসান ও উচ্চ-মধ্য আয়ের সোপানে উত্তরণ, এদেশ হতে ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের অবলুপ্তিসহ উচ্চ- আয়ের উন্নত দেশের মর্যাদায় আসীন করা। বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চ-মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দিবে- “আমার গ্রাম প্রকৃতই হবে আমার শহর”।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার হতে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সকল মানদন্ড পূরণ করতে পেরেছে। ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের শ্রেণীভুক্ত হয়েছে এবং দশক ব্যাপী ৭ শতাংশ হারে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনও তা বাস্তবায়নের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। স্বপ্নের সেই দেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত সাম্য ও ন্যায়ের সমৃদ্ধ এক দেশ, যেখানে উন্নয়নের অংশীদার হবে সকলে। রূপকল্প ২০৪১ কে একটি উন্নয়ন কৌশলে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও কর্মসূচিসহ এই দলিলটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে “রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবে রূপায়ণ: বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১’। বস্তুত প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১ এর সাফল্যের ওপর গড়ে উঠেছে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১। এছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চ-মধ্যম ও উচ্চ-আয়ের দেশ যে-উন্নয়ন পথ পাড়ি দিয়েছে, তাদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সে পথে এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ এর মূল উপাদানসমূহ পরবর্তী দু’দশকে বাংলাদেশ দ্রুত গতির রূপান্তরধর্মী এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে। এই পরিবর্তন আসবে কৃষিতে, শিল্প ও বাণিজ্যে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যায়, পরিবহন ও যোগাযোগে, কর্মপদ্ধতি আর ব্যবসা পরিচালনায়। বাস্তবধর্মী এসব পরিবর্তনের সাথে আমাদের মানিয়ে চলতে হবে। ভারসাম্যমূলক দ্রুতগতির এ প্রবৃদ্ধির সুফল পাবে সকলে, বিশেষ করে দরিদ্র ও অরক্ষিত জনগোষ্ঠী। এই সুফল যথাযথভাবে বন্টনের উপর গুরুত্ব প্রদান করা হবে। এই সকল লক্ষ্য অর্জনে বলিষ্ঠভাবে কাজ করার পাশাপাশি প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন- ভূমি, পানি, বন, প্রাকৃতিক আবাস ও বায়ু ব্যবহারের সময় এগুলোর নির্বিচার ধ্বংসসাধন ও অবক্ষয় যেন এড়ানো যায় সরকার তা নিশ্চিত করবে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ এর ভিত্তিমূলে রয়েছে দুটি প্রধান অভীষ্ট: (ক) ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নতদেশ, যেখানে বর্তমান মূল্যে মাথাপিছু আয় হবে ১২,৫০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং যা হবে ডিজিটাল বিশ্বের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ, (খ) বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, যেখানে দারিদ্র্য হবে সুদূর অতীতের ঘটনা। দারিদ্র্য নির্মূল করার পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষা, উভাবনী জ্ঞান, অর্থনীতির বিকাশ ও উৎপাদিকা শক্তিবৃদ্ধি করে এমন একটি দ্রুতগতির অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রূপান্তর সাধন সম্ভব।

ঐতিহাসিকভাবে এটি স্পষ্ট যে, সমাজের দ্রুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে সর্বদাই শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। সুতরাং, বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বের ওপর প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এ জোর দেয়া হয়েছে। বাজার ব্যবস্থা সচল রাখার পিছনে সক্রিয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এখন নীতিপ্রণেতাগণ গভীরভাবে অনুধাবন করেন। ইতিহাস ও গবেষণালদ্ধ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। কেননা এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই সমাজের মূল অর্থনৈতিক কুশীলবেরা প্রয়োজনীয় প্রণোদনা পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে, এরাই প্রাকৃতিক ও মানব পুঁজিতে বিনিয়োগ প্রভাবিত করে, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির অগ্রগতি লালন করে, উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত প্রদান করে। রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে প্রণীত প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১-এর সুফলভোগী হবে জনগণ এবং এরাই হবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি। এ পরিকল্পনা চারটি প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হচ্ছে: (১) সুশাসন; (২) গণতন্ত্রায়ণ (৩) বিকেন্দ্রীকরণ এবং (৪) সক্ষমতা বৃদ্ধি। বস্তুত: এই চারটি ভিত্তির ওপর নির্ভর করবে উন্নত জাতি হিসেবে সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ।

চারটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, যেমন- সুশাসন, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর প্রতিষ্ঠিত এ পরিকল্পনার সুফল ভোগী হবে জনগণ এবং এরাই হবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকা শক্তি। সরকার এমন সময়ে এই দলিলটি প্রণয়ন করেছে যখন সমগ্র দেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন করছে। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে জাতি আজ তার সুরক্ষা ও সমৃদ্ধি অর্জনের পথের সন্ধান পেয়েছে। গত দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও আমাদের আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই। বিশ্ব এখন দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু দেশ আমাদের চেয়ে ভালো করছে। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষা ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিজ্ঞানের বিকল্প নেই। গত এক দশকে আমাদের সরকারও সরকারি সেবা প্রদানের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি প্রভৃতি খাতে সেবা প্রদানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের জীবনমানের ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে।

“রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবে রূপায়ণ: বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১” হলো বিশ্ব ব্যাংকের মানদন্ড অনুযায়ী বাংলাদেশকে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য সরকারের স্থির লক্ষ্য অভীষ্ট। অন্য অভীষ্টের মধ্যে রয়েছে ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নিরসন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে শূন্য দারিদ্র্যে নামিয়ে আনা। এই পরিকল্পনার কৌশলগত অভীষ্ট ও মাইলফলকগুলো হলো- রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন এবং কাঠামোগত রূপান্তর, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষি খাতে মৌলিক পরিবর্তন, ভবিষ্যতের সেবা খাত গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিকে প্রাথমিকভাবে শিল্প ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য সেতুবন্ধন রচনা, একটি উচ্চ আয়ের অর্থনীতিকে কৌশলের অপরিহার্য অংশ হবে নগরের বিস্তার, যা “আমার গ্রাম, আমার শহর” প্রত্যয় দ্বারা অনুপ্রাণিত, একটি অনুকূল পরিবেশের অপরিহার্য উপাদান হবে দক্ষ জ্বালানি ও অবকাঠামো, যা দ্রুত, দক্ষ ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে, জলবায়ু পরিবর্তনসহ আনুষঙ্গিক পরিবেশগত সমস্যা মোকাবেলায় একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ; একটি দক্ষতাভিত্তিক সমাজ বির্নিমাণে বাংলাদেশকে জ্ঞানভান্ডার দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। বর্তমান দূরদর্শী সরকারের ভিশন দলিলটির ১২টি অধ্যায় রয়েছে- যার মধ্যে উল্লেখ্য যোগ্য বিষয়গুলো হলো: সুশাসন, মানব উন্নয়ন, শিল্প ও বাণিজ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ। এর মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো আছে- যাতে প্রতি অর্থ বছরে অর্থনীতির সূচকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা বিস্তারিতভাবে দেয়া আছে। এই দলিলের আলোকে মন্ত্রণালয়/ বিভাগগুলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ এর মূল লক্ষ্য অংশগ্রহণমূলক সমৃদ্ধি, যা শাসন ব্যবস্থার কার্যকর প্রতিষ্ঠান, যেমন বিচার ব্যবস্থা, গণমুখী জনপ্রশাসন, দক্ষ ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দ্বারা পরিচালিত হবে। রূপকল্প ২০৪১ এর দ্বিতীয় স্তম্ভ গণতন্ত্রায়ণ। বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন পুরোপুরি বহুত্ববাদী গণতন্ত্র যেখানে সকল নীতি ও কৌশলে প্রতিফলিত হবে গুরুত্বপূর্ণ সব মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা। বিকেন্দ্রীকরণ হলো এর তৃতীয় স্তম্ভ। তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনিক, আর্থিক (রাজস্বসহ) ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকৃত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জন করা দুরূহ হবে। বিকেন্দ্রীভূত সরকার ও প্রশাসনের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিনির্মাণ হলো চতুর্থ স্তম্ভ। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য হলো রূপান্তরশীল অর্থনীতির সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গতি বিধান এবং এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগত সম্পর্ক, সম্পদ উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন পদ্ধতি।

প্রেক্ষিত পরিকল্পনার অভীষ্ট অর্জনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো ব্যাপক, ঝুঁকিও প্রচুর। কোন দীর্ঘ অভিযাত্রার মতো এই দীর্ঘময়াদি পরিকল্পনায় কিছু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের পথ-নকশা হলো প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১। এখন প্রয়োজন এই পথ-নকশা বাস্তবায়নে সকল বাধাবিঘ্ন মোকাবেলায় বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে অবিচলভাবে এগিয়ে চলা। এই পরিকল্পনার চুড়ান্ত লক্ষ্য উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল জনগণের মাঝে যথাযথভাবে বন্টনের জন্য দরকার পরস্পর নির্ভরশীল নীতিমালার মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং বিভিন্ন খাতের কর্মসূচির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা। সুতরাং, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিষয় ও খাতভিত্তিক কৌশলগুলো বলিষ্ঠ ও সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধশালী, উন্নত এবং দারিদ্র্যশূন্য দেশে রূপান্তরের নিমিত্ত প্রধান কাজ হবে সরকারের নেতৃত্বে নীতি প্রণেতা, বেসরকারি খাত, বিদ্যুৎ সমাজ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে অভিযোজনক্ষম একটি জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হবে সমগ্র সমাজভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, অভিযোজনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলা। উচ্চ প্রবৃদ্ধি, কর্মসুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাস এর মতো চূড়ান্ত ফলাফল অর্জনের মূলে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এর জন্য প্রয়োজন পরিবহন, বাণিজ্য ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। এছাড়াও, ফলপ্রসূ কর ব্যবস্থা ও সরকারি ব্যয় নীতি এবং সঞ্চয় আহরণের মাধ্যমে এসব খাতে বর্ধিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃষি থেকে শিল্পে অভিযাত্রা এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন যখন বাকঘুরাণো লগ্নে উপনীত হয় এবং শ্রম বাজার সংকুচিত হয়ে আসে, তখন বিশ্বায়নের ডিজিটাল যুগে কর্মসৃজনশীল রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের প্রয়োজন হয়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন হবে একবিংশ শতাব্দীতে পণ্য ও সেবার আন্তঃসীমান্ত আদান-প্রদানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বাণিজ্য ও শিল্প নীতিমালা।

কৃষি খাত অবদানের দিক থেকে হ্রাসমানহলেও, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি বিধানের জন্য আগামী দিনগুলোতেও কেন্দ্রীয় খাত হয়ে থাকবে। সুতরাং, উচ্চ উৎপাদনশীল আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন হবে আন্তঃখাত নীতিমালা সংস্কার। আধুনিক কৃষি হবে বহুমুখী এবং দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সহিষ্ণু। আগামী দু’দশকের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে উদ্ভাবনমুখী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নের নিমিত্ত মানব পুঁজিতে বিনিয়োগের কোন বিকল্প নেই। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ হলো আন্তঃখাত ও বহুমাত্রিক নীতিমালা এবং কর্মকৌশলের সমন্বয়ে প্রণীত একটি ২০ বছর মেয়াদি পথ-নকশা, যা বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হবার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।

২০২৪ সালের মধ্যে এলডিসি অবস্থান থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সময় প্রধান বাজারগুলোতে বড় ধরনের অগ্রাধিকার সুবিধা হারানোর কারণে আমাদের রপ্তানির ওপর চাপ পড়বে। ভবিষ্যৎ চিত্র প্রক্ষেপণের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত ও চীনের বাজারে সুবিধা হারানোর ফলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি বছরে ১১ শতাংশ হারে হ্রাস পেতে পারে, যার পরিমাণ প্রায় ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়াও, বিশ্ব  বাণিজ্যে সংস্থার বেশ কিছু ছাড় ২০২৪ সালের পরে আর পাওয়া যাবে না। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর আওতায় পড়বে না, যেখানে ইবিএ সুবিধায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত তিন বছরের প্রস্তুতিকালীন সময় পাওয়া যাবে। সুতারাং এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতি সামলে ওঠার জন্য আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে। এ এক অনন্য অনুকূল সময়, যখন শুধু অতীতের সাফল্য ও অর্জনের বিষয় ভাবনায় নেয়া নয়, বরং পরবর্তী ২০ বছর যে সমস্যা ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে তার সমাধান ও সদ্যবহারের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণেরও সময়। একবিংশ শতাব্দীর একটি অবিসংবাদী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেটি হলো পরিবর্তন। পরিবর্তনের গতি এখানে দ্রুত ও রূপান্তরধর্মী। বাণিজ্য ও শিল্পে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যায়, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এবং আমরা যেভাবে কাজ করি ও ব্যবসা চালাই এর সর্বত্র যে ব্যাপক রূপান্তর ঘটবে, পরবর্তী অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজকে সেই পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হবে। এছাড়া এতো দ্রুততার সাথে এই পরিবর্তন ঘটবে যে, সমাজ যদি রূপান্তরের এই অত্যাসন্ন প্লাবন মোকাবেলার প্রস্তুতি না নেয় তাহলে হয়তো আমরা আবার নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আবদ্ধ জলাশয়ে নিক্ষিপ্ত হবো। তাই একমাত্র সঠিক পন্থা হলো সামনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে জাতিকে এগিয়ে নেবার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নেওয়া এবং বলিষ্ঠতার সাথে সম্ভাব্য সুবিধাবলির সদ্যবহার নিশ্চিত করা যেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উচ্চ-আয় ও উন্নত জাতির সাথে বিশ্বসভায় তাদের ন্যায্য আসন পেতে পারে। এগুলো সবই হতে হবে মধ্য-শতাব্দী পেরুনোর আগেই, জলবায়ু সহিষ্ণু ও প্রতিবেশ-বান্ধব একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে। ২০২১-২০৪১ মেয়াদে আসন্ন পরবর্তী দুই দশকের জন্য প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়নের এটাই হলো অন্তর্নিহিত ও চূড়ান্ত লক্ষ্য। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ এ দুটি প্রধান স্বপ্ন প্রাধান্য পেয়েছে: ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত দেশ, যেখানে আজকের মূল্যে মাথাপিছু আয় হবে ১২,৫০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং যা হবে ডিজিটাল বিশ্বের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। এবং বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, যেখানে দারিদ্র হবে সুদূর অতীতের ঘটনা।

এতে অবাক হবার কিছু নেই যে, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞবৃন্দ বাংলাদেশকে আজ উন্নয়নের বরপুত্র হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরে। ১৯৭০ এর দশকে উন্নয়নের হতাশাপূর্ণ নিরীক্ষা ক্ষেত্র হিসেবে যে দেশটিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল তার এই অপ্রতিরোধ্য উত্থান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। এমডিজি অর্জনে, বিশেষ করে দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা, শিশু ও মাতৃত্বজনিত মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এর অসামান্য অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী অভিনন্দিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ আজ বিস্ময়কর উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সক্রিয় ও ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে মানব উন্নয়নের ফলে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন আরো গতিশীল ও দ্রুতগামী হয়ে উঠতে পারে। অর্থনীতি তাই এখন উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যাভিমুখী। সঙ্গতভাবেই সামনে নানা জটিল সমস্যা পথ রোধ করে দাঁড়াবে। তাই বলিষ্ঠ কৌশল ও অবিচলিত নীতি অঙ্গীকার হবে আমাদের পাথেয়।

বিশ্ব বণিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ এখন একটি গতিশীল প্রথম প্রজন্মের শিল্পোদ্যোক্তা জাতি, যা বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত কুশীলবদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্পের (আরএমজি) রপ্তানি সাফল্য একটি দৃষ্টান্তস্থাপন করেছে। আবার রপ্তানিকারকরা নতুন পণ্যসম্ভার নিয়ে নিত্য নতুন বাজারে ঢুকে পড়ছেন, যার মধ্যে রয়েছে সমুদ্রগামী জাহাজ, নিত্য ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্য, পাদুকা ও ঘরে ব্যবহার্য নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। এই অগ্রগতির ধারায় দেশ এখন ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ-আয় দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে সামনে এগিয়ে চলেছে। সমাজ ও অর্থনীতিতে ভবিষ্যৎ রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ তার জনমিতিক লভ্যাংশকে অপ্রতিরোধ্য মানব পুঁজিতে পরিণত করে এর বিশাল জনসম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এই অর্জন সম্ভব করতে পারে। বাংলাদেশকে তার ব-দ্বীপযুক্ত ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপে পরিবেশগত অবক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিনিয়ত যে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে এগোতে হয় তা সকলেই অবগত। সুতরাং সমগ্র উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত ও বাস্তুতন্ত্র ভারসাম্য বজায় রাখার অনুকূলে শক্তিশালী নীতি-নির্দেশনা অনুসৃত হবে। এরই ধারায় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ এর লক্ষ্য একটি সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা, যা প্রবৃদ্ধিবান্ধব আর্থিক প্রজ্ঞামন্ডিত একটিসুষ্ঠু সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে পরিপূর্ণভাবে প্রবৃদ্ধির সাথে প্রযুক্তিগত রূপান্তর, দারিদ্র্য নিরসন ও পরিবেশগত সুরক্ষার সামঞ্জস্য বিধান করবে।

রূপান্তরধর্মী এই পরিবর্তন বাস্তবে রূপায়ণ করা সম্ভব এমন একটি দ্রুত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবনমূলক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বিনির্মাণ ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের মুল ভিত্তি গড়ে উঠবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি শক্তিশালী কর্মসূচির ওপর, যাকে বেগবান করতে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ডিজিটাল প্রযুক্তি দ্বারা পরিপুষ্ট রপ্তানিমুখী ম্যানুফ্যাকচারিং প্রবৃদ্ধি এবং একই সাথে যা ভূমি, পানি, বন, প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য ও বায়ুর মতো মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার এমনভাবে করবে- যা সেগুলোর বিনাশ ও অবক্ষয় পরিহার নিশ্চিত করবে।

দেশকে নানাবিধ জটিল সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। রূপান্তর সংঘটিত হবে এমন একটি বিশ্বায়িত অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে, যেখানে আমূল ও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে, সৃষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন সুযোগ, সেই সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘর্ষ ও জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এখন একটি অত্যন্ত দ্রুতগামী প্রযুক্তিগত বিপ্লব বা ডিজিটাল যুগ চলমান, যা পরিণতিতে আমাদের বেঁচে থাকা জীবন ধারণ ও কাজের ধরনসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাথে মিথস্ক্রিয়ারধরনে পরিবর্তন আনবে। এই ইতিবাচক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু উন্নত অর্থনীতিতে উনবিংশ ও বিংশ শতকের পুরনো জাতীয়তাবাদী ধারার পুনরুত্থান ঘটছে এবং সেই সাথে বাড়ছে বৈশ্বিক সংঘর্ষের ঝুঁকি যা বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরবর্তী ২০ বছর বাংলাদেশে যে আর্থ-সামাজিক রূপান্তর ঘটতে যাচ্ছে তা বিগত ২০ বছরে লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে একেবারে ভিন্নতর ও মৌলিক। ইতিবাচক বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেগুলোর সম্ভাবনা আহরণ ও সদ্ব্যবহারসহ বৈরী উপাদান নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতে উচ্চতর হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে- যা অতীতে সম্ভব ছিল না। একটি শক্তিশালী ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি-সংগঠনের উপাদান হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ওপরের দিকে উঠে আসার আকাঙ্খা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, টেকসই উপায়ে অংশগ্রাহী সমৃদ্ধির সাথে একটি অর্ন্তভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের জন্য প্রয়োজন হবে আরো অর্থবহ উদ্ভাবনমূলক কৌশল, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সমতা ও জন অংশগ্রহণ। অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে ও দারিদ্র্যমুক্ত করে এর বিকাশসহ শোভন কর্মসংস্থানবাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অবারিত করার উপযোগী সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।

এই লক্ষ্যে দ্রুত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কর্মসূচি ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে উপযুক্তরূপে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। প্রত্যাশা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ-আয় দেশসমূহের কাতারে যুক্ত হবে, যখন দারিদ্র্য হবে অতীতের কাহিনী, সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিচর্যায় থাকবে সকলের প্রবেশাধিকার, থাকবে না বেকারত্ব ও ছদ্ম-বেকারত্ব, জনসংখ্যার শতভাগ হবে স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন এবং এদেরসবাই হবে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের (বিশেষ করে, শিক্ষা, শিল্প ও সেবা) সকল ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানের অধিকারী। এগুলোর সবকিছু অর্জিত হবে পরিবেশের কোন প্রকার ক্ষতিসাধন না করে, যা ভূমি, পানি ও বনসম্পদ সংরক্ষণসহ পরিচ্ছন্ন বায়ু, নিরাপদ পানি, সবুজ মাঠ ও জীববৈচিত্র্যে জনগণের অধিকার অবাধ করবে ।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে সরকার সুনীল অর্থনীতির উন্নয়ন কাজ শুরু করে। সমুদ্রবন্দর খাতের উন্নয়ন শুরু হয়েছে এবং পটুয়াখালীতে (পায়রা সমুদ্র বন্দর) একটি বন্দরের নির্মাণ কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে; আশা করা যায় ২০২১এর মাঝামাঝি এটি পুরোপুরিভাবে চালু করা যাবে। সামুদ্রিক মৎস্য খাতে বিশেষ করে টেকসই আহরণ ও সংরক্ষণের দিকগুলোতে অতিরিক্ত উন্নয়ন কাজও গ্রহণ করা হয়েছে। সমুদ্র তলদেশের মৎস্য মজুদের ওপর চাপ কমানো, সমুদ্রতলের জলজ সম্পদের ক্ষয় হ্রাস এবং মধ্যবর্তী পানির মৎস্য আহরণ সুবিধার জন্য বেশ কিছু সংখ্যক “বটম-ট্রল’-কে “মিডওয়াটার-ট্রল’-এ রূপান্তরিত করা হয়েছে। বছরের কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এখন হতে বেশ কয়েক বছর আগে থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মাছের, বিশেষ করে ইলিশ মাছের বাছাই ও প্রজনন সুবিধার জন্য মাছ ধরার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হচ্ছে। নিয়মিতভাবে মৎস্যমজুদ নিরূপণ কাজ পরিচালনার জন্য মৎস্য অধিদপ্তরে একটি জরিপ-জলযান ক্রয় করা হয়েছে। আশা করা যায়, অচিরেই মজুদ-নিরূপণ জরিপ কাজ শুরু হবে। বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর অধীনে তিমি, ডলফিন, সামুদ্রিক কচ্ছপ, হাঙ্গরসহ অপরাপর সামুদ্রিক প্রজাতির সুরক্ষা দানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৪ সালে “সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ (সমুদ্রের তলবিহীন অংশ) কে দেশের প্রথম সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে। প্রায় ৬৭২ বর্গমাইল বিস্তৃত (১,৭৩৮ বর্গকিলোমিটার) আয়তন ও ৯০০ এরও বেশি মিটার গভীরতাযুক্ত “সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে’র সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকায় অন্তর্ভুক্ত সাবমেরিন ক্যানিয়নের মাথায় গভীর জলরাশি এবং পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যাংগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন থেকে সমুদ্রতীর ছাড়িয়ে উপকূলীয় জলধারা। সেট ব্যাগনেটের মতো মাছ ধরার সরঞ্জামসহ ধ্বংসাত্মক মৎস্য আহরণ পদ্ধতির ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনাগত উদ্দেশ্যে মৎস্য আহরণের যানসমূহের সমুদ্রে চলাচল পরিবীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যায়ক্রমে এই যানগুলোতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ সংযোগসহ ‘ভেসেল ট্র্যাকিং ও মনিটরিং সিস্টেম’ (ভিটিএমএস) স্থাপন করা হবে।

পরিবেশ খাতে জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজনন ও সংরক্ষণ এবং ম্যাংগ্রোভ পুনরুদ্ধার ও পুনবর্ধনসহ নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণিজাতের আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন উপকূলীয় ইকো-পরিবেশে কয়েকটি “পরিবেশগতভাবে গুরুত্ব¡পূর্ণ এলাকা” বলবৎ করা হয়েছে। বেশ কয়েক দশক যাবৎ জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী অঞ্চলে সদ্য জেগে ওঠা জমিতে ম্যাংগ্রোভ বনায়নের কাজ অব্যাহত রয়েছে। উপকূলীয় ও সামুদ্রিক গবেষণার জন্য সম্প্রতি জাতীয় সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এনওআরআই) স্থাপন করা হয়েছে। সুনীল অর্থনীতির জন্য জ্ঞান ও কৌশল শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বও গড়ে তোলা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং সমুদ্রভিত্তিক সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নসহ ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য কর্মপন্থা নিরূপণকল্লে নিবিড়ভাবে কাজ করার লক্ষ্যে ২০১৭ এর জুনে ভারতের সাথে একটি সমঝোতা-স্মারকপত্র স্বাক্ষরিত হয়। সুনীল অর্থনীতির বিকাশ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতার জন্য চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আলোচনাও এগিয়ে চলেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ এবং এর যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সরকার সমন্বয় কমিটিও গঠন করে। সম্প্রতি বিদুৎ, জালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ওপর সমন্বয় সাধনের দায়িত্বে ন্যস্ত হয়। জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে একটি “সুনীল অর্থনীতি সেল” স্থাপিত হয়েছে।

এছাড়া, সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা উন্মোচনের পথে বিনিয়োগের অভাব; বেসরকারি খাতের ভূমিকায় অপর্যাপ্ততা; সামুদ্রিক সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ ও জ্ঞানের অভাব; সামুদ্রিক ও উপকূলীয় উন্নয়ন নীতি কাঠামোর অনুপস্থিতি; এবং মানব সম্পদের অভাব ইস্যুসমূহকে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ কৌশলে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মুজিব শতবর্ষের সূচনালগ্নে বাংলাদেশকে হবে স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে ক্ষিপ্রগতিতে পথচলা শুরু হোক।

প্রতিবেদক : এআইজি

(প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ-১)

বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *