ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন

পহেলা মে-মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালের এই দিনে শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজের অধিকারের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্প এলাকায় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। আন্দোলন চলাকালে শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে বিশাল শ্রমিক জমায়েতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ১১ শ্রমিক। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে ঐ শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।অধিকার আদায়ে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের স্মরণে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মে দিবস, শ্রমিক দিবস বা বিশ্ব শ্রমিক দিবস-যে নামেই ডাকা হোক না কেন, দিনটি বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান-সংহতি জানানোর দিন হিসেবেই পালিত হয়ে আসছে ১৯০৪ সাল থেকে। বাংলাদেশেও এই দিবসটি আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপন করা হয়। আমাদের দেশে ইতোমধ্যে কলকারখানা বা পোশাকশিল্পে কিছু দুর্ঘটনাঘটলেও, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিতে বাংলাদেশ এখন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে।আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানা নির্বিশেষে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন, নিরাপদ কর্মস্থল, শোভন কাজ ও শোভন মজুরি নিশ্চিত করা, রেশন প্রথা চালু, নারী শ্রমিকদের সমকাজে সমমজুরি, সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সুলভে বাসস্থান, কারখানাভিত্তিক হাসপাতাল এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা করে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি নিশ্চিত করে শ্রমিকদের সুবিধা দিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে মানুষের শ্রমের বিনিময়ে। এক্ষেত্রে এক পক্ষের দিকনির্দেশনায় অপর পক্ষের কায়িক শ্রমে গড়ে ওঠে শিল্প, উৎপাদিত হয় নানা সামগ্রী। শ্রমিক ছাড়া উৎপাদন হতে পারে না। আবার শ্রমিকের আয়-রোজগারেরও উৎস তাদের এই শ্রম। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়নের অন্তরালে থাকে শ্রমিক-মজুরদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ব্যথা-বেদনা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু করোনার কারণে বিশেষ অনেকটা অনাড়ম্বরভাবে পালিত হতে যাচ্ছে দিবসটি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলেছে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কর্মরত বিশে^র প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে জীবিকা হারানোর তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংখ্যা বিশে^র মোট শ্রমশক্তির অর্ধেক। জাতিসংঘের  এই সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চিত্র ওঠে এসেছে।

করেনাভাইরাস মহামারিতে বিশ^জুড়ে আক্রান্ত হয়েছে কোটি কোটি মানুষ। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বন্ধ রাখা হয়েছে বহু দেশের শিল্প কলকারখানা। ফলে চাকরির ওপর তৈরি হয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। আইএলও’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেই ঝুঁকির চিত্রই উঠে এসেছে। আইএলও বলেছে বিশে^র মোট ৩৩০ কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীরাই সবচেয়ে বেশি দুর্বল। তাদের শ্রমের সুরক্ষা নেই, ভালো চিকিৎকাসেবা পাওয়ার সুযোগ নেই, এমনকি বাড়িতে থেকেও কাজের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক সফলতা এখন সারা বিশ্বের কাছে বড় এক বিস্ময়। ক্ষুধা-দারিদ্র্য, খরা-বন্যা-দুর্যোগের দেশ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া দেশটির অর্থনীতিতে ভালো একটা প্রবৃদ্ধি হবে- এমনটা দু-তিন দশক আগেও ভাবনার মধ্যে আনা কঠিন ছিল। অথচ এক দশক ধরে সেই দেশেই কিনা ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, যা করোনার আগের বছর ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি করোনার মতো সংকটের মধ্যেও অন্য দেশগুলো যখন প্রবৃদ্ধি নিয়ে খাবি খাচ্ছিল, অনেক দেশের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে পড়েছিল, তখন বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৫ শতাংশেরও বেশি।

তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর প্রায় তিন দশক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে ছিল। গত দুই দশকে তা ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার কমে গত দুই দশকে অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার মাথাপিছু আয়ও দুই হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। মূলত নব্বইয়ের দশকে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার ফলে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। ওই সময় থেকে দেশে একটি পরিপক্ব উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে ওঠে, যা অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙা রাখার পাশাপাশি রপ্তানির পথও সুগম করে দেয়।

দেড় দশক আগে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের একটি প্রতিবেদন হইচই ফেলে দেয়। প্রতিবেদনটিতে ‘নেক্সট ইলেভেন’ (এন-১১) শীর্ষক তালিকা প্রকাশ করা হয়। এতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার বিচারে উন্নয়নশীল ১১টি দেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাতে বাংলাদেশের নাম স্থান পায়। অন্য দেশগুলো হলো মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম। ২০১৪ সালে ফরাসি আর্থিক ও বিমা প্রতিষ্ঠান কোফেস ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার (ব্রিকস) পাশাপাশি আরও ১০টি উদীয়মান অর্থনীতির তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায়ও বাংলাদেশের নাম আসে। ২০১৭ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ‘দেয়ার কুড বি এ নিউ এশিয়ান টাইগার, হেয়ারস হোয়াই’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে এশিয়ার ‘এমার্জিং টাইগার’ বা ‘উদীয়মান বাঘ’ হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করা হয়। এর আগে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের নামই বলা হতো। এসব দেশ ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ব্যাপক অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে।

বাংলাদেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম বলেন, সত্তরের দশকে দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। বাকি ৮৯ শতাংশই ছিল সরকারি খাতের। কিন্তু নব্বইয়ের শুরুতে সরকারের নীতি-সমর্থনের সুবাদে দেশে বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে ওঠে। ফলে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান বাড়তে থাকে। বেসরকারি খাতের অবদান বৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতিতে নতুন নতুন খাত চালু হয়। কর্মসংস্থানেও গতি বাড়ে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। সে জন্য দেশ পুনর্গঠনই তখন সরকারের পরিকল্পনায় প্রাধান্য পায়। পরিকল্পনা কমিশনের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রণীত হয় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৭)। সেই পরিকল্পনা দলিল ঘেঁটে দেখা গেছে, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল আড়াই শতাংশ। তখন অবশ্য জিডিপির আকার ছিল ৪ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়। ওই পাঁচ বছরে ৪১ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়।

পুরো সত্তরের দশকে গড়ে ৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়। আশির দশকেও এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। নব্বইয়ের দশকে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবৃদ্ধির চাকাও ঘুরতে শুরু করে। তবে ওই দশকে প্রবৃদ্ধি ৪-৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। মূলত ২০০০ সালের পর থেকেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ পেরিয়ে ৬ শতাংশের পথে হাটে। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় (৬.৪৬%)। ঠিক পাঁচ বছর পর তা ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। তিন বছরের মাথায় তা ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। তবে গত বছর করোনার কারণে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে আসে।

গত ৫০ বছরে জিডিপির আকারও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। তখন দেশে পণ্য উৎপাদন ও সেবায় এই পরিমাণ মূল্য সংযোজন হতো। সর্বশেষ গত অর্থবছরে স্থিরমূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়ায় ১১ লাখ ৬৩ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। এর মানে, ৫০ বছরের ব্যবধানে দেশের অর্থনীতির ক্ষমতা বেড়েছে ২৭১ গুণ। চলতি বাজারমূল্যের হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), যা এশীয় দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ। অর্থনৈতিক উন্নতির সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া গেছে দারিদ্র্য বিমোচনে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক গড় মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৫৮০ টাকা, যা তখনকার ৯৪ মার্কিন ডলারের সমান। মাথাপিছু আয় ৫০০ ডলার ছাড়াতে ৩১ বছর সময় লাগে। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ৫১০ ডলার হয়। এক হাজার ডলার পেরোতে স্বাধীনতার পর ৪০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫৪ ডলার হয়। পরের সাত বছরেই তা দ্বিগুণ হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৪ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৮৮ টাকা। স্বাধীনতার পর মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় ৩০১ গুণ। স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশে অর্থনীতির পট পরিবর্তনে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। এই পাঁচ দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের সফলতায় বড় অবদান রেখেছেন নারীরা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এসে এখন গর্ব করে বলা যায়, পাকিস্তানকে যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে, তার একটি হলো কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশ, যা পাকিস্তানে ২৩ শতাংশ। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে দেশে কর্মক্ষেত্রে নারী ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এই হার ১৯৮০ সালের দিকে ৮ শতাংশ ও ২০০০ সালে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠে। তবে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার ২০১০ সালে বেড়ে ৩৬ শতাংশ হয়। ২০১৩ সালে অবশ্য কিছু কমে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামে। বিবিএসের সর্বশেষ ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে নারী হিস্যা ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। ওই জরিপ অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির আকার ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে ৬ কোটি ৮ লাখ মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন। মোট শ্রমশক্তিতে ৪ কোটি ২২ লাখ পুরুষ আর নারী ১ কোটি ৮৭ লাখ।

স্বাধীন দেশের শ্রমবাজারে ধীরে ধীরে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। তবে শ্রমবাজারে নারীর একটা বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক বা নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। গত ৫০ বছরে নারীরা দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। তবে সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরা হলে নারীর অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী-পুরুষের অবদান বলা যায় সমান সমান। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৭ লাখ নারী

কৃষি, শিল্প ও সেবা-অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে কাজ করছেন। তবে উৎপাদনব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নারী কর্মীদের সিংহভাগই শ্রমজীবী। বাকিরা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা পেশায় যুক্ত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীসহ বিভিন্ন উচ্চপদেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। তবে শ্রমবাজারে নারীর একটা বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। যেমন কর্মজীবী নারীদের অর্ধেকের বেশি কৃষিকাজে সম্পৃক্ত। আরেকটি বড় অংশ পোশাকশিল্পে কাজ করে।

দেশে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলতে হলে প্রথমেই আসে পোশাক খাতের নাম। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয়। তৈরি পোশাকশিল্পের অভিযাত্রা ও বিকাশের ফলে কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনীতির চেহারা পাল্টাতে শুরু করে। বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পোশাক খাতের অবদান ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এখানে কাজ করে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। এই তথ্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি)। তৈরি পোশাক খাতে নারীর অংশগ্রহণের শুরুটা হয় সত্তরের দশকে। শুরুটা হয় রিয়াজ গার্মেন্টস দিয়ে। এটি দেশের পোশাকশিল্পের অগ্রপথিক। ১৯৭৩ সালে রিয়াজ উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে দেশের বাজারেই বিক্রি হতো এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক। প্রতিষ্ঠার ৫ বছর পর ১৯৭৮ সালে প্রথম তারা ফ্রান্সে ১০ হাজার শার্ট রপ্তানি করে। সেটিই দেশের প্রথম পোশাক রপ্তানি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক রিয়াজ উদ্দিন গোড়া থেকেই নারীদের নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু তখনকার সামাজিক অবস্থা ততটা অনুকূলে না থাকায় বিষয়টি অসম্ভব হয়ে পড়ে। সে জন্য রিয়াজ উদ্দিন নিজের মেয়েকেই পোশাক কারখানায় পোশাক তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন। এরপর থেকে নারীরা ধীরে ধীরে পোশাকশিল্পের কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই খাতে কাজ করা ৪০ লাখ শ্রমিকের ৫৯ দশমিক ১২ শতাংশ নারী।

গত ৫০ বছরে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। প্রচলিত ও অপ্রচলিত সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। নারীরা এখন ঘরে-বাইরে বেতনভুক্ত কাজ করতে আগ্রহী। ফলে নারীদের বেকারত্ব ও অর্ধবেকারত্বের হার কমে আসছে। উদ্যোক্তা হিসেবেও বড় একটা জায়গা করে নিয়েছেন নারীরা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নারীরা যে সব ধরনের কাজেই যুক্ত হতে পারেন, তা এখন প্রমাণিত। যদিও বিশেষ প্রশিক্ষণ বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি অনেক কম। সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের কারণে নারীরা উচ্চশিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন, এটাও একটা বাস্তবতা। দেশের অর্থনীতির গতিময়তা বজায় রাখতে হলে নারীদের কর্মসংস্থানের হার আরও বাড়াতে হবে। নারীদের একটি বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। তাঁদের শ্রমবাজারে আনতে হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে না পারলে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না।

করোনা মহামারির ১৪ মাসে চাকরিজীবীরাও সব ধরনের বিনিয়োগ ও খরচের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে সঞ্চয় শুরু করেছেন। বিদেশ থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়লেও সেই তুলনায় উত্তোলন হয়েছে কম। সব মিলিয়ে করোনাভাইরাসের মধ্যে ব্যাংকগুলোয় আমানতে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। এদিকে করোনাভাইরাসে ব্যবসায়ীরা গুটিয়ে গেলেও কম সুদের প্রণোদনা ঋণে যেন আবার প্রাণ ফিরে পান। পুরোনো ঋণ পরিশোধেই হোক বা চলতি মূলধনের জন্যই হোক, ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন। ফলে গত বছর মানে ২০২০ সালে ঋণ বিতরণ ভালো হয়েছে। ব্যাংকগুলোর জুলাই-জানুয়ারি সময়ের তথ্য পর্যালোচনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এরপরও ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশাল এই তারল্যের একটি বড় অংশ বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ বেড়ে গত জানুয়ারিতে ১২ লাখ ৮৬ হাজার ২০১ কোটি টাকায় উঠেছে। এত বিপুল আমানত আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০২০ সালের জুনের শেষে আমানত ছিল ১১ লাখ ৮০ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ২০২ কোটি টাকা। আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে আমানত বেড়েছিল ৭৩ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। তারও আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছিল ৪০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এতে দেখা যায়, করোনার মধ্যেই আমানত বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, করোনার মধ্যে প্রবাসী আয় অনেক বেশি এসেছে। এসব টাকার বড় অংশ ব্যাংকে আমানত হিসেবে জমা হয়েছে। আগে যাঁরা সঞ্চয় করেননি, তাঁরাও করোনাকালে সঞ্চয় করতে শুরু করেছেন। আসলে করোনা সবাইকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়ার কারণেই সঞ্চয়ের প্রবণতা ও পরিমাণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে সোনালীর। গত ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। এক বছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা। সোনালীর পেছনে রয়েছে অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক। করোনার মধ্যে আমানতে নতুন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এক বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে। মানুষ খরচ কমিয়ে সঞ্চয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ব্যাংকগুলো মোট ৯৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। ফলে সার্বিক ঋণের পরিমাণ গত জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনের শেষে ছিল ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা (এই ঋণ ননফান্ডেড দায়সহ, গত জানুয়ারিতে শুধু ঋণ ছিল ১১ লাখ ২১ হাজার ১২২ কোটি টাকা)। আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ বিতরণ হয়েছিল ৯৬ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। তার আগের ২০১৮-১৯ সালের একই সময়ে ঋণ বিতরণ হয়েছিল ৬৭ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা।

বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের করোনার প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করতে সরকার কম সুদের প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করে। ওই প্যাকেজের ঋণ বিতরণ এখনো চলছে। ইতোমধ্যে ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো বিতরণ হয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজের ফলে জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ঋণ বিতরণ আগের বছরের একই সময়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

অন্যদিকে, মহামারির মধ্যে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও ই-কর্মাসের লেনদেন বেড়েছে। স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে অনেকেই সশরীর বাজারে যাচ্ছে না। তাই ২০২০ সালে অনলাইনে নিত্যপণ্যের বেচাকেনা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। আর সামগ্রিকভাবে গত বছর এই খাতের ব্যবসা বেড়েছে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, যেখানে কোভিডের আগে ই-কমার্সের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২০-২৫ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি হওয়ার বদৌলতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ প্রায় ৫০ হাজার নতুন মানুষের কাজের সুযোগ হয়েছে। করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ যেন ঘরে বসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে, সে জন্য ই-ক্যাব নানা ব্যবস্থা নিচ্ছে। এখন ই-কমার্সের কার্যক্রম বড় ও মাঝারি শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে এই সেবা গ্রামাঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ই-কমার্সের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি প্রণয়নের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া ই-ক্যাবের সদস্যরা বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছেন। ইতোমধ্যে ১১২টি সদস্য প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে।

সব মিলিয়ে, নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক কৌশল এখন সুপ্রতিষ্ঠিত রোল মডেল। উগ্রবাদী শক্তিকে পরাস্ত করে স্বনির্ভর অর্থনীতির সব শাখা-প্রশাখাকে সচল রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রম বাজার, ব্যাংকের তারল্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ,

মাথাপিছু গড় আয়, শেয়ার বাজার সূচক, ই-কমার্স, শিল্প- কারখানার সচল রাখা, দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য সকল সূচক এখন ঈর্ষণীয় অবস্থানে পৌঁছে গেছে- যা স্বাধীন বাংলাদেশের সূবর্ণজয়ন্তীর ৫০ বছরের উদযাপনের বছরে সাধারণ মানুষের স্বস্তির সুবাতাস হিসেবে কাজ করছে। 

  প্রতিবেদক : এআইজি

  (প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ-১)

  বাংলাদেশ পুলিশ

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *