ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

এ কে এম মোশাররফ হোসেন মিয়াজী

বর্তমানে সড়কপথে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও দূরদূরান্তে যাত্রী পরিবহনের কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যক্তিগত বাহন হিসেবে মোটরসাইকেলের চাহিদা বেশি। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো বাংলাদেশেও সম্প্রতি মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাও দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করে থাকেন।

কিন্তু, মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ঝুঁকি কমাতে হলে ব্যক্তিগত ও সরকারি উভয় পক্ষে কতগুলো দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রথমত, মোটরসাইকেল চালকদেরই বুঝতে হবে যে, ট্রাফিক আইনের সব বিধান মেনে সতর্কতার সঙ্গে মোটরসাইকেল না চালালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই দুর্ঘটনার প্রথম শিকার নিজেকেই হতে হয়। তাতে এমনকি মৃত্যু ঘটতে পারে, সৌভাগ্যক্রমে তা না ঘটলেও অঙ্গহানির আশঙ্কা থাকে, যাতে সারা জীবনের জন্য কর্মক্ষমতা হারাতে হতে পারে। লাইসেন্সহীন ও ত্রুটিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। মোটরসাইকেলের চালক ও অন্য আরোহীকে অবশ্যই হেলমেট পরতে হবে; ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে সড়কে বেরোতে পারবেন না- এটা নিশ্চিত করা দরকার; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা। এজন্য বাইকারদের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান নিটোরে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়া প্রায় ৩৫ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। অতিরিক্ত গতির কারণে ৫১ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়। অমনোযোগী অবস্থায় চালাতে গিয়ে ৪০ শতাংশ এবং মুখোমুখি সংঘর্ষে ৪৯ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোটরসাইকেল দুঘটনার শিকার হয়ে থাকেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায় মোট সড়ক দূর্ঘটনার ২০-৩০ শতাংশ ঘটে থাকে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন উৎসব কিংবা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সে হার মাঝে মাঝে বেড়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ভিকটিম ভেহিক্যাল, তবে কিছু ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের কারণেও দূর্ঘটনা ঘটে থাকতে দেখা যায়।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাগুলো মূলত ঘটে বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা, বারবার লেন পরিবর্তন, ট্রাফিক আইন না মানা ও চলন্ত অবস্থায় মুঠোফোনে কথা বলার কারণে। এছাড়া যথাযথ প্রতিরক্ষামূলক পোশাক-পরিচ্ছদ না পরা ও দুর্ঘটনার কারণ। হেলমেট ব্যবহার না করা ও নিম্নমানের হেলমেটের কারণে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।

মোটরসাইকেল চালকের সঠিক আচার-আচরণ, সঠিক পোশাক পরিধান করা সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হবে। সড়কে মোটরসাইকেল চালকদের নিম্নরূপ আচরণ করা উচিতঃ

* ট্রাফিক আইন মান্য করা

* দায়িত্ববান হওয়া

* ভদ্রতা এবং সহানুভূতিশীলতা দেখানো

* সুবিবেচক ও সহানুভূতিশীল হওয়া

* ধৈর্যশীল হওয়া

ট্রাফিক নিয়ম-নীতি মান্য করা

১.             সড়ক ব্যবহারীদের নির্বিঘেœ ও নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রাফিক আইন প্রণয়ন করা হয়। একজন সাইকেল চালক, মোটরবাইক চালক, হালকা বা ভারী যানবাহন চালক এমনকি একজন পথিক প্রত্যেককেই ট্রাফিক আইন-বিধি বুঝতে হবে এবং রাস্তায় চলাচলের সময় সে গুলো মেনে চলতে হবে।

ভদ্রতা এবং সহানুভূতিশীলতা দেখানো

২.            সরুপথে চলাচলের সময় সামনে থেকে আগত গড়িগুলোকে লক্ষ্য করুন এবং প্রয়োজনে তাকে যাওয়ার সুযোগ করে দিন। পথিকের সুবিধা-অসুবিধা বিচার করে চলুন।

৩. সড়কে চলাচলের সময় একজন মোটরচালক হিসেবে আপনার উপর প্রবর্তিত সব ট্রাফিক নীতি মেনে চলতে হবে। আপনাকে রাস্তায় চলাচলকৃত অন্যান্য চালক বা পথচারীদের প্রতিও সহানুভূতিশীল থাকতে হবে এবং ভদ্রতা বজায় রাখতে হবে।

মোটরসাইকেল চালকের দায়িত্বগুলো

৪. একজন মোটরসাইকেল চালকের দায়িত্বগুলো নিম্নরূপ-

ক)           সঠিক সংকেত দানের মাধ্যমে কোন দিকে যেতে চান তা আগেই জানিয়ে দেয়া।

খ)            অন্যদের প্রদর্শিত সংকেতগুলো মেনে চলতে তৎপর থাকা।

গ)            সব ট্রাফিক বিধি-নিষেধ মেনে চলা।

ঘ)            ট্রাফিক আইন মেনে চলা।

ঙ)           মোটরসাইকেলটিকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে একই সঙ্গে রাস্তায় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

চ)            সর্বদা নিরাপদে চলা যাতে করে নিজে বা অন্যকোনো পথচারী যেন আহত না হয় এবং নিজের বা অন্যের গাড়ির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

ট্রাফিক লঙ্ঘনের ফলাফল

৫.            ট্রাফিক আইনের লঙ্ঘনকেই বলা হয় ট্রাফিক লঙ্ঘন। ট্রাফিক আইন-নীতি লঙ্ঘনের ফলে অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। এ জন্যই ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের জরিমানা করা হয়, যাতে করে অপরাধকারীরা পরবর্তীতে অন্যদের পথ চলতে অসুবিধা সৃষ্টি না। একজন ব্যক্তির ট্রাফিক লঙ্ঘনের মাত্রা বিবেচনা করে তাকে সেরূপ শাস্তি দান করা হয়। যদি এরূপ লঙ্ঘনের ফলে কারো মৃত্যু ঘটে, তবে তার শাস্তির মাত্রাও ততটা ভারী হয়।

ট্রাফিক দুর্ঘটনা একটি বিরূপ অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এর ফলে জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। মোটরচালিত যানবাহনগুলো এক্ষেত্রে বেশি বিপদজনক। সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে মোটরচালিত যানগুলো চালিত না করলে এটি একটি আত্মঘাতী যানে পরিণত হতে পারে। লরি বা আরও কিছু মোটরচালিত যানে চালক আটকা বা বদ্ধ স্থানে বসে গাড়ি চালিয়ে থাকে। ফলে দুর্ঘটনায় সে অপেক্ষাকৃত কম আঘাত প্রাপ্ত হয়। তবে মোটরবাইকে এরূপ আবদ্ধ পরিস্থিতি না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে সরাসরি চালক আঘাত প্রাপ্ত হয়। যে কারণে মোটরবাইক চালকেরা দুর্ঘটনায় পড়লে মারাত্মক আহত হয়ে থাকে।

মোটরচালকের প্রতিরক্ষামূলক পোশাক-পরিচ্ছদ

মোটরসাইকেল চালনা শুরু করার আগে নিম্নরূপ প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরিধান করে নিজেকে সুরক্ষিত করে নিতে হবে।

* হেলমেট

* গগলস্/ফেস শিল্ড

* জ্যাকেট এবং ট্রাউজার

* গ্লোভস

* জুতা

১. হেলমেট

যদিও বাজারে বিক্রি হওয়া সব হেলমেট বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান অনুযায়ী উৎপাদন ও আমদানি হওয়ার কথা। কিন্তু, বাজারে হেলমেটের বদলে বিক্রি হওয়া একাংশ মূলত প্লাস্টিকের বাটি।

প্রত্যেক চালক ও আরোহীরই মোটরবাইক চালানোর সময় সুরক্ষিত ভালো মানের হেলমেট পরিধান করা প্রয়োজন। এর ফলে চালকের নিরাপত্তা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়, যা সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০৬ সালের একটি গবেষণা বলছে, ভালো মানের একটি হেলমেট পরলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হওয়ার ঝুঁকি কমে ৭০ শতাংশ। আর মৃত্যুঝুঁকি কমে ৪০ শতাংশ। হেলমেটটি যথেষ্ট সুরক্ষিত এবং বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। সর্বদা ভালো মানের হেলমেট পরিধান করা উচিৎ। হেলমেটটি অবশ্যই মাথায় আরামদায়ক হতে হবে। হেলমেট মাথার আঘাত হ্রাস করে। হেলমেট যদি সঠিকভাবে পরিধান না করা হয়, তবে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে ব্যাহত হয়।

কোনো কারণে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে হেলমেটের গঠন দুর্বল হয়ে গেলে বা অন্য কোনো কারণে হেলমেটটি যদি পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে না পারে, তবে এটি বদলে নতুন একটি হেলমেট ব্যবহার করুন।

২. গগলস্/ফেস শিল্ড

ধুলাবালি বা বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে গগলস্ অথবা ফেস্ শিল্ড ব্যবহার করুন।

৩. জ্যাকেট এবং ট্রাউজার

* ঘর্ষণ রোধ করতে লম্বা হাতাওয়ালা জামা/জ্যাকেট এবং লম্বা প্যান্ট পরিধান করুন

* আপনাকে যাতে অন্যরা সহজে দেখতে পায় সেজন্য উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরিধান করুন।

* ট্রাউজার প্যান্টের নিচের দিকে বেশি ঢিলা হওয়া উচিৎ নয়। এর ফলে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা হয়।

৪. গ্লোভস

গাড়ির স্টিয়ারিং বা হাতল দৃঢ়ভাবে ধরে রাখার জন্য হাতে গ্লোভস ব্যবহার করুন। কখনো পড়ে গেলে হাতের গ্লোভস আঘাত হতে রক্ষা করে। আরামদায়ক গ্লোভস ব্যবহার করুন, যাতে করে নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত না হয়।

৫. জুতা

কখনো স্যান্ডেল বা স্লিপার পরবেন না। লেস যুক্ত জুতা পরবেন না। এর ফলে যেকোনো সময় লেস্ জড়িয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রাইডিং বুট পরে চলা সব থেকে উত্তম।

উঁচু হিলের জুতা পরে ড্রাইভিং কখনো আরামদায়ক হয় না। কোনো উঁচু হিলের কারণে প্যাডেল নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।

লেখক : এ আই জি (ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট)

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *