ই-পেপার

মোহাম্মদ সুলাইমান পিপিএম

সারা বিশ্বে কি হল আজ! প্রত্যেকটি দেশ একের পর এক বাইরের লোকজন তার দেশে প্রবেশ এবং নিজ দেশে হতে অন্যদেশে  ভ্রমণ নিষেধ করে দিচ্ছে। এলাকার পর এলাকা লকডাউনের মুখে পড়ছে। যে যেখানে গিয়েছিল সেখানে আটকা পড়েছে। যে বিমানগুলো সবসময় পাখির ন্যায় আকাশের বুকে দাপিয়ে বেড়াত বিশ্বের একমাথা হতে অন্য মাথা সে বিমানগুলোই আজ ঝড়ে আহত পাখির ন্যায় মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে আছে। ভারতের এক গার্মেন্টস কর্মী ১৪০ মাইল পথ পায়ে হেটে তার মায়ের নিকট পৌঁছোবার কিছুক্ষণ পূর্বেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে। বিশ্বে লকডাউন , শাট্ডাউন, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের মত নতুন নতুন টার্ম বা শব্দের সাথে মানুষকে পরিচিত হতে হচ্ছে। সন্তান তার বৃদ্ধ বাবা মাকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে। বহুদিন পর স্বামী বিদেশ থেকে আসছে শুনে যেখানে স্ত্রী ও সন্তানদের খুশি হওয়ার কথা উল্টো সেখানে তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। স্বামী তার স্ত্রীর মৃত লাশ এম্বুলেন্সে রেখে লাপাত্তা। হাসপাতালে মৃতদেহ পড়ে থাকছে, আত্মীয়-স্বজন তা গ্রহণ করা ও দাফন করা হতে বিরত থাকছে। যে পরিস্থিতিতে পুলিশ এবং ডাক্তারই একমাত্র ভরসা। কিসের এত ভয়। যে মানুষ একদিন ট্রয় নগরী জয় করেছিল, দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখী হয়েছে, ক্লোন করে হুবহু একইরকম প্রাণীর জন্ম দিতে সক্ষম তারাই আজ অসহায়। হ্যাঁ, এ এক অজানা শত্রুর ভয়। যে শত্রুকে সাধারণত নিজে আক্রান্ত হওয়ার আগে দেখা যায় না, জানা যায় না, তাই তার বিরুদ্ধে আক্রমণ রচনাও করা যায় না। তার আক্রমণ হতে বাঁচার একটাই পন্থা আছে, তাহলো ভয়ে ঘরে আবদ্ধ থাকা অথবা বাইরে গেলে পিপিই নামক কাপড়ের খোলসে নিজের শরীরকে লুকিয়ে রাখা অথবা মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস পরিধান করা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার নামক ডিসইনফেকটেন্ট দ্রব্য অথবা সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করা এবং চোখে সেফটি গ্লাস পরা। সেই শত্রুর নাম হচ্ছে নভেল করোনা ভাইরাস।  যে COVID-19 পেন্ডামিক নামক মহামারী দিয়ে সারা বিশ্বে ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। চীনের উহান শহরের একটি ছোট বন্য প্রাণীর বাজার হতে এর উৎপত্তি বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও ঐ বন্যপ্রাণীর মধ্যে বাদুর থেকে উৎপত্তি নিয়ে অনেকেরই সংশয় আছে তবে উহান শহরে যে ভাইরাসটির উৎপত্তি তা নিয়ে কারো কোন সংশয় নেই। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের ১৭ তারিখে চীনের হুবেই প্রদেশের ৫৫ বছরের এক ব্যক্তি প্রথম এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি চীনা ডাক্তারদের নজরে আসে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে।

এমনই এক পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের মার্চ মাসে জরুরী একটি সরকারী কাজে আমাকে যেতে হয় যুক্তরাষ্ট্রে। যাওয়ার আগে আমার মা আমাকে বলেছিল করোনা ভাইরাসের এমন পরিস্থিতিতে তুমি এখন যাবে কিনা একটু ভেবে দেখ। অবশ্য তখন বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত কোন রোগী চিহ্নিত হয় নাই। আর  যুক্তরাষ্ট্রের শুধু ক্যালিফোর্নিয়া শহরে মাত্র পাচঁজন ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত বলে চিহ্নিত হয়। তাই মাকে জানালাম আমি অল্প সময়ের জন্য একটি সরকারী কাজে সেখানে যাব, আশাকরি সমস্যা হবেনা। তাছাড়া ঐ অর্থ বছর পার হয়ে গেলে যে পণ্যটি পরিদর্শনের জন্য যাব তার জন্য সরকারী খরচ বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। আমার টিকেট কাটা হয়ে গেছে তখন মা মন একটু খারাপ করেই বলেন ঠিক আছে যাও তবে সর্তক থাকবে এবং তাড়াতাড়ি ফিরবে। কিন্তু মায়ের মন বলে কথা। সন্তানের যেকোন  বিপদে এই পৃথিবীতে সবার আগে একমাত্র মা-ই জানতে পারে আর কেউ নয়। এই কথাটি আমি যতবার কোন না কোন সমস্যায় পড়েছি ততবারই দেখেছি। প্রত্যেকবারই মা আগে আমাকে বলতে পেরেছেন। তবে আমার ধারণা ছিল যে দেশটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এত উন্নত এবং সারা বিশ্বে এত ক্ষমতাধর যে তারা করোনা পরিস্থিতিকে খুব সহজেই মোকাবেলা করতে পারবে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যে শহরে পাঁচজন রোগী করোনা চিহ্নিত সে শহরে তো আমি যাচ্ছি না। সুতরাং সমস্যা হবার কথা না।

সে অনুযায়ী মার্চে একেবারে প্রথম দিকে রওনা দিলাম। সেখানে গিয়ে তাড়াতাড়ি কাজকর্ম শেষ করলাম। ততদিনে চারদিকে পরিস্থিতি খুব খারাপ হতে শুরু করল। অথচ যখন যাচ্ছি তখন কিন্তু চীনের উহান শহরেই খুব খারাপ অবস্থা ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্র সতর্কতার জন্য শুধু চীনে বিগত চৌদ্দ দিনের মধ্যে ভ্রমণ হিস্ট্রি থাকলেই কেবল তারা দেশে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছিল। কিন্তু চীনে ভ্রমণকারীগণ ইউরোপ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকার কারণে তাদের এত বড় বিপদ হবে তা তারা বুঝতে পারেনি। আমিও ভাবতে পারিনি বিশ্বের এত ক্ষমতাধর দেশ যে কিনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এত উন্নত, যার ক্ষমতার এত অহংকার সে নিমিষেই এভাবে  নতজানু হয়ে পড়বে এই করোনার নিকট। কোথায় গেল এত ক্ষমতা? কোথায় গেল এত দম্ভ? কভিড-১৯ এর সামনে তাবৎ দুনিয়াই যে মুখ থুবড়ে পড়ল। যাই হোক তাড়াহুড়ো করে মার্চের মাঝামাঝি দিকে আমার কাজ শেষ করলাম। যদিও মার্চের শেষের দিকে আমার বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি এত খারাপ হতে শুরু করল যে আমি বিমানের টিকেট এগিয়ে এনে কিছুটা আগেই রওনা দিলাম। এয়ারপোর্টে গেলাম। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী তার নিজের গাড়িতে ড্রাইভ করে আমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যায়। সে ওখানে নিউইর্য়ক পুলিশে কর্মরত।

যথারীতি আমি এমিরেটসে EK202 বিমানে বোর্ডিং পাশ নিয়ে আমার নির্ধারিত সিটে গিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করে বসি। সীটে বসলাম। মনের মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করছে এই ভেবে যে এই দূর্যোগে কাটিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিকট ফিরে যাচ্ছি। দেশের মাটিতে ফিরতে পারছি। দেশের এ ক্রান্তিলগ্নে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারব। এই সংবাদটুকু ফোনে আমার মাকে এবং আমার স্ত্রীকে জানাই। আমার মা, স্ত্রী ও আমি তিনজনই এক অপরের সাথে বলি আল্লাহর রহমতে যেন ঠিকঠাক ভাবে বাংলাদেশে এসে পৌঁছাতে পারি। প্লেনের সীটে বসার পর অবশ্য আসতে না পারার আশংকাটা অনেকটাই কেটে গিয়েছিল এজন্য যে, বোর্ডিং পাশ যেহেতু পেয়েছি, প্লেনে উঠে বসতেও পেরেছি, তাই আর প্লেনের সিডিউল বাতিল হওয়ার কোন সুযোগ নাই। কিন্তু ভাগ্যে না

থাকলে ওখান থেকেও যে ছুটে যেতে পারে তার প্রমাণ আমি পেলাম হাতেনাতে। কিছুক্ষণ পর আচমকা কেবিন ক্রুর ডাক; মিঃ সুলাইমান! ইয়েস্! প্লিজ, কাম উইথ মি! আমি জিজ্ঞাসা করলাম, উইথ লাগেজ অর উইথাউট লাগেজ? উইথ লাগেজ। ভাবলাম সামনে অনেক সিট খালি। তাই হয়তবা সামাজিক দূরত্ব নামক নতুন শব্দের সাথে পরিচয়ের জন্য অন্যকোন সীটে বসাবে। যখন দেখলাম আমাকে নিয়ে তিনি প্লেনের গেইটের বাইরে তখন জিজ্ঞাসা করলাম, এনিথিং রং? তিনি জানালেন, ইউ ক্যান্ট গো উইথ আস, বিকজ ঢাকা ইজ শাটডাউন! হোয়াই ডিড নট ইউ ইনফরম মি আরলিয়ার? সরি উই কুড নো অনলি ওয়ান আয়ার এগো! প্লিজ, টেইক ইউর বোডিং লাগেজ অড সাইজ লাগেজ পয়েন্ট!

মাথায় আমার আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আমার স্ত্রীকে ফোন দিলাম। সবকিছু জানালাম। সে টিভি অন করল। এ বিষয়ে টিভিতে কিছুই নাই। তারও প্রায় একঘন্টা পরে টিভির স্ক্রলে আসে শুধু চারটি দেশ ব্যতীত সকল ফ্লাইট ঐদিন মধ্যরাত হতে বাংলাদেশে অবতরণ নিষেধ। আমার ঐ বন্ধুকে ফোনে জানালাম। দেশের বাড়ির এলাকার বড় ভাই যার বাসায় পূর্বে নিউইয়র্ক আসলে থাকতাম তাকে জানালাম। তার ছেলে এসে আমাকে আবার নিজ গাড়ি দিয়ে ড্রাইভ করে তাদের বাসায় নিয়ে যায়। পরের দিন আবার ঐ বন্ধু ও আমি মিলে ঐ চার দেশের বিমান যাদের বাংলাদেশে অবতরণের অনুমতি ছিল, তাদের বিমানের টিকেট খুঁজতে থাকলাম এবং ক্যাথপ্যাসিফিকের টিকেট কাটলাম। আবারও দূর্ভাগ্য, চেকইন করতে গেলাম। হাতে নোটিশ ধরিয়ে দিল ঐ দিনই মধ্যরাত হতে তাদের বিমানে ট্রানজিট প্যাসেঞ্জার নিষিদ্ধ। আবার বন্ধুর গাড়িতে করে ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলিয়ন, ব্রুকলিন, এলাকার বড় ভাইয়ের বাসায়।

বাসায় ঢুকে অনেকটাই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লাম। যুক্তরাষ্ট্রে তখন প্রতিদিনে প্রায় ৩০০০-৩৫০০ লোক মারা যাচ্ছে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে। আর নিউইয়র্ক ছিল বিশে^ সবচেয়ে হটস্পট সে শুধু নিউইয়র্কেই মারা যেত দিনে প্রায় ১০০০-১৫০০ লোক। মায়ের সাথে ও স্ত্রীর সাথে ফোনে কথা হল। তারা সাহস দিলেন। যার বাসায় থাকতে হল তারাও অনেক সাহস দিলেন। বললেন, পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে। তবে মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে সুস্থ্য

থাকতে হবে। আমিও মনে মনে তাই ভাবলাম এই অবস্থায় আমাকে মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে পারলে একদিন না একদিন দেশের মানুষের পাশে ফিরতে পারবই। তাই প্রতিদিন লেবু গরম পানিসহ টোটকা চিকিৎসার বিষয়গুলো অনুসরণ করতাম আর সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করতে লাগলাম তিনি যেন আমাকে সুস্থ রেখে কোন একদিন আমার মাতৃভূমি, মা, স্ত্রী সন্তানদের ও দেশের মানুষের নিকট ফিরিয়ে আনেন। সকল বিষয়ে অফিসে জানালাম। আমার স্যারগণও আমাকে অনেক সাহস দিলেন এবং বললেন যেকোন পরিস্থিতিতে তারা আমার পাশে আছেন।

তবে ভেবেছিলামাম ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্লেন অবতরণ নিষেধ থাকলেও ৩১ মাচের্র পর ফিরতে পারব সুস্থ থাকলে। কিন্তু কিসের ৩১ মার্চ তারপর আসল ৭ এপ্রিল, তারপর ১৫  এপ্রিল তারপর ৩০ এপ্রিল, তারপর ১৫ মে তারপর অনির্দিষ্ট। কোন সমস্যায় পড়লে সমাধান যদি খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে সমাধানটি যতই কঠিন হউক তাকে কঠিন মনে হয় না। কিন্তু সমাধানের কোনো পথ খুঁজে না পেলে তা মাথায় কি বোঝা তা ভুক্তভোগী ছাড়া কউ জানেনা। একের পর এক লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি মুর্হূত উৎকন্ঠা, কি করব? কি হবে? প্রতিটা মূহুর্ত যেন মনে হত কত বছর! সারা দিন কাটতো ফাঁসীর আসামীর ন্যায় ঘুমিয়ে, টিভির খবর দেখে, সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করে আর যার বাসায় থাকতাম তার সাথে গল্প করে। প্রতি ঘন্টা পর টিভির সামনে গিয়ে বসতাম বিশ্বের পরিস্থিতি একটু ভাল হয়েছে বলে যদি এই খবর শুনতে পাই। যদি ফ্লাইট চালু হয়েছে বলে খবর পাই। যদি লকডাউন উঠেছে বলে খবর পাই। যদি টিকা আবিস্কার হয়েছে বলে খবর পাই। কিংবা এমন কোন ঔষধ আছে যার দ্বারা করোনা দূর হয়। কিন্তু কোথায়! দিনের পর দিন লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধি। দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের দিনরাত ঘামঝরা পরিশ্রম, টিকা ও ঔষধ আবিস্কারের জন্য। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। বরং হাসপাতালে মৃত্যুর মিছিল। রোগীর কোন জায়গা হচ্ছে না। বাড়ীতে রোগীকে ঘরোয়া চিকিৎসা, বাড়িতেই মৃত্যু, বাড়িতেই ডেডবডি রেখে রুম লক করে দিয়ে যাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশের রুমে স্বামীর লাশ, আক্রান্ত স্ত্রী ও সন্তানগণ অন্যরুমে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। একদিনে এত মানুষের সৎকার সম্ভব নয় বলে গণকবর দেয়া হচ্ছে। এসব খবর ছাড়া আমরা কিছুই পাচ্ছিনা টিভিতে। আমার সাথে আরও কাকতালীয় ঘটনা, এবার যুক্তরাষ্ট্রে যাবার পর এক বড় ভাইয়ের বাবার কবর জিয়ারতে গিয়ে জানতে চাইলাম কবর কিভাবে, কত টাকা দিয়ে কিনেছে?

প্লেন থেকে নামিয়ে দেয়া, কবর সম্পর্কে জানতে চাওয়া, গণকবর ইত্যাদি সব মিলিয়ে মনে যতই সাহস আনতে চাই কোথায় যেন একটা ভয় কাজ করছেই। মনে মনে ভাবতাম, জানিনা জীবনে বেঁচে স্ত্রী সন্তানদের নিকট পৌঁছাতে পারব কিনা? আর যদি মারাও যাই তাহলে যেভাবে দাফন হচ্ছে, স্ত্রী সন্তান কোনদিন এদেশে আসতে পারলেও স্বামী বা বাবার কবরটাও বুঝি খুঁজে পাবে না। যে বাসায় থাকতাম সেখান থেকে দুইমাসে একবারের জন্যও নীচে নামি নি কারণ এপার্টমেন্টের বাড়ী,  লিফটে আসতে যদি লিফট থেকে আক্রান্ত হই! কারণ কত লোকইতো একই লিফট ব্যবহার করছে। বাসার পাশে একটি বড় শপিংমল ছিল। মঝে মধ্যে তাকিয়ে ভাবতাম আগে আসলে একদিন সুযোগ পেলেই ঐ শপিং মলটিতে কতো যেতাম! অথচ আমি দুইমাস এই শপিংমলের এত কাছে কিন্তু একবারের  জন্যও যেতে পারছি না। এই দুইমাস শারীরিকভাবে অসুস্থতায় না পড়লেও মানসিকভাবে কতবার যে আমি মৃত্যুর মুখে পড়েছি তা একমাত্র উপরাওয়ালাই জানেন। স্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলার সময় ভিডিওকলে তাকে বাহ্যিকভাবে অনেক শক্ত মনে হলেও আমি বুঝতাম যে এখনই ফোনটা রেখে সে কাঁদতে থাকবে। মায়ের সাথে ফোনে কথা বলার সময় প্রায়ই মা বলতেন টোটকা চিকিৎসার কথা, দোয়া পড়ার কথা। কিন্তু আমার টেনশনে তিনি কত দিন ঘুমান নি তার হিসাব নেই। ভাই বোন সবাই ফোন দিয়ে কাঁদত। তবে সবার দোয়া থাকার কারণে আল্লাহর অশেষ রহমতে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে আটকেপড়া বাংলাদেশীদের জন্যে একটি বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেন। অবশেষে ঐ ফ্লাইটেই ১৭ ই মে মাসে বাংলাদেশে পৌঁছাই।

এই অবরুদ্ধ দুই মাস ভিনদেশে থেকে বুঝতে পেরেছি মা এবং মাতৃভূমির উপরে কিছু নেই। সারাক্ষণ একটা উৎকন্ঠা কাজ করতো মনে, যে দেশকে এত ভালবাসি, যে সকল পুকুর, খাল, বিল ও গোমতি নদীর ধারে আমার শৈশব কেটেছে সেখানে কি আর ফিরতে পারবো না? আমার স্ত্রী পেশায় একজন ডাক্তার। সে যখন হাসপাতালে যেতো তখন আমার তিনটি ছেলে একা একা বাসায় থাকত। যাদের বয়স ১২ বছর, ৭বছর ও ৩ বছর । সবসময় উৎকন্ঠায় থাকতাম, আমার স্ত্রী যদি কোন কারণে করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে আমার এই অবুঝ শিশু সন্তানদের কী হবে! তবে এতটুকু ভেবে শান্তনা পাওয়ার চেষ্টা করতাম যে, সরকারি কাজে দেশের বাইরে এসে আটকা পড়েছি। যদি কোন কারণে এ দেশেই জীবনাবসান হয়, তাহলে দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছি বলে গর্ববোধ করব। আমার স্ত্রী যদি হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের সেবা দিয়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তবুও আমাদের সন্তানরা যদি বেঁচে থাকে তাহলে গর্ব করে বলতে পারবে, তাদের বাবা মা দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন।

লেখক : পুলিশ সুপার (অপারেশন্স)

এন্টি টেররিজম ইউনিট,

বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x