ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ইরানী বিশ্বাস

কে? কে ওখানে?

প্রশ্ন করতেই ঝোপের মধ্যে মিলিয় গেল ছায়াশরীর।সাজ্জাদ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে।এই ঝড়-জলের রাতে কে ওখানে? আর কি-ই বা করছে?

সন্ধ্যা রাত থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওায়াও বইছে।অতি প্রয়োজনেও মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।আকাশ যেন নীচে নেমে এসেছে।

প্রত্যন্ত এলাকার নতুন একটি ডাক বাংলো। অচেনা জায়গা, তার ওপর এলাকাটা বড়ই অদ্ভুত।কাল ডিউটির সময় কেউ একজন বলেছিল, এই এলাকা নাকি জীন ভুতের খুব আনাগোনা। কথা শুনে মনে মনে হাসে সাজ্জাদ। ছোটবেলায় কতো শুনেছে জীন-ভুতের গল্প। এখন তো নিজেকেই জীন-ভুত মনে হয়। রাত আর দিন তো তার কাছে এক হয়ে গেছে।পুলিশের কি দিন-রাত আছে নাকি? ‘অলটাইম, অন ডিউটি’।

কাল রাতের বিষয়টি কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছে না সাজ্জাদ। তাই সকালে ঘুম ভাঙতেই পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ঝোপের কাছে। যা ভেবেছিল তাই। রাতের বৃষ্টিতে বাগানের মাটি নরম কাঁদায় পরিণত হয়েছে।মাটির ওপর সবুজ ঘাসে এখনো দাগ লেগে আছে। কেউ কিছু টেনে নিয়ে গেছে এখান থেকে।

রুমে ফিরে এসে স্বস্তি পায় না সাজ্জাদ। কি হতে পারে? এত ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কার এত জরুরি কাজ ছিল? অনেক প্রশ্নের জন্ম হয় তার মনে।

বাইরে গাড়ির হর্ণ বাজে। সাজ্জাদ তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে নেয়। সাথে থাকা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। পুলিশ ভ্যানে বসে আছে। পাশে আরো দুই তিনজন সহকর্মী বসে আছে। তবে মনের মধ্যে কাল রাতের বিষয়টি খোঁচাখুচি করতে থাকে।

ঢাকা থেকে এক ভিআইপি এসেছিলেন এই এলাকায়। সঙ্গে প্রটোকল পাহারায় নিয়োজিত সাজ্জাদকেও আসতে হয়েছিল।

শখ করে মা তাকে পুলিশ বানিয়েছে। এত মানুষের এত শখ, তার মায়ের অদ্ভুত শখ। ছেলে একজন পুলিশ হবে। কথাটা ভাবে আর হাসে। সেই যে বার প্রথম চাকরি থেকে বাড়িতে যাবে বলে জানিয়েছিল,

আজ কতোদিন পর ছেলে বাড়িতে আসবে।কচুর লতি ছাড়ানো ভীষণ কষ্টকর। অর্ধেক দৃষ্টি দিয়ে পরম যত্নে চিকন কালো কচুর লতি থেকে ছাল ছাড়াচ্ছেন মরিয়ম বেগম। ‘সাজ্জাদ এখনো পাল্টায়নি’ কথাটা ভাবতে ভাবতে একা মনে হেসে ওঠে সাজ্জাদের মা মরিয়ম বেগম।

ছেলে বাড়িতে আসলে বলবে, মা, আমার জন্য গোস্ত রান্না করবা না। বাগানের শাক, লতা-পাতা আর দেশি মাছ রান্না করবা।

গ্রামের মানুষ শখ করে পোল্ট্রির মাংস খায়। তাদের ধারণা এটা শহরের মানুষদের জন্য আলাদা করে পোষা মুরগি। সাজ্জাদ একদমই পছন্দ করে না। তাই আগে থেকে তার  এই সতর্কবার্তা।

কাক ডাকা ভোরে ঘরের দোর খুলে পেছনের বাগানে ঢুকেছে মরিয়ম বেগম। পেঁপে গাছে তিনটা পেঁপে হলুদ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। পেয়ারার মাথায় লাগানো ফুল কখন ঝরে পড়লো, কখন সেটা গাঢ় সবুজ থেকে হালকা সবুজ ধরেছে। কখন কলা গাছের ছড়া ঝুলে পড়েছে।প্রতিদিন বাগানে যায় আর এসব ফল-ফলাদির দেখ-ভাল করেন সাজ্জাদের মা।কতোদিন পর ছেলে বাড়ি আসবে।তার জন্য যত্নে করে বড় হতে দেয় বাগানের ফল।মুন্নি-মানিকও জানে, দাদি এগুলো ছোট চাচার জন্য আগলে রাখে।

সাজ্জাদ ছোটবেলা থেকে দুরন্ত। অন্যের বাগানে ঢুকে কলা, পেয়ারা, বরই, লেবু চুরি করতো।প্রতি সকালে নালিশ নিয়ে হাজির হতো পাড়ার মানুষ।মা এসব নালিশের জন্য তৈরিও থাকতেন।এই চঞ্চলতার জন্য সোহেল মাঝে মাঝে সাজ্জাদকে লাঠি দিয়ে পিটাতো।আর মা দূরে বসে বিলাপ করে কাঁদতো,

– মার, আরো জোরে জোরে মার।একেবারে শেষ করে দে।যাতে আর কোনোদিন অন্যের জিনিসের দিকে চোখ তুইলা না তাকায়।

সাজ্জাদ জানতো এটা মায়ের মনের কথা না।তাই কান্না থামিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে বসতো।মা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতো আর সাজ্জাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতো।ব্যথায় শিহরি উঠতো সাজ্জাদ, এটা দেখে মা আরো ফুপিয়ে কাঁদতো।

– দাদি, ছোড চাচা তো আইসা পড়ছে। জোরে চিৎকার দিয়ে সাজ্জাদের মাকে ডাকতে ডাকতে আসে মুন্নি।

মরিয়ম বেগম হাতে একটা কচুর লতি নিয়ে দৌড়ে যায়, যে পথ দিয়ে সাজ্জাদ আসছে সেদিকে।চোখের সামনে সাত রাজার ধন সাজ্জাদকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে কচুর লতি হাতে নিয়েই জড়িয়ে ধরে ছেলেকে।পরে যখন বুঝতে পারে তার হাতে কচুর লতি, তখন নিজের অসাবধানতা বুঝতে পেরে হাত থেকে ফেলে দেয়।

– কেমন আছো মা? সাজ্জাদের প্রশ্ন শুনে চোখ ছলছল নিয়ে হাসি মাখা মুখে উত্তর দেয়, – আমি ভালো আছি বাজান। তোর মুখখান অমন শুকাইছে ক্যান? মায়ের মমতার চশমা পরা চোখে ছেলের মুখ শুকনা লাগে, একথা বুঝতে পেরে হেসে ওঠে সাজ্জাদ। তারপর বলে,

– কি যে বলো না তুমি। পুলিশের চাকরি করলে মোটা হওয়া যায় না। ব্যায়াম করতে হয়। এই যে আমার শরীর দেখছো, এটাকে বলে ফিটেস্ট বডি।

– তাই বইলা প্যাটে একটু গোস্ত হইবো না? প্যাটে গোস্ত না হইলে ব্যাডা মানষেরে ভালো দেহায় না।

সাজ্জাদ বুঝতে পারে, মায়ের অভিযোগ-অনুযোগের কথা। তাই আর ও প্রসঙ্গে না এগিয়ে অন্য কথা বলতে শুরু করে।

চারপাশ থেকে গুঞ্জন ভেসে আসে কানে তাই মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখে মা-ছেলেকে ঘিরে বাড়ির অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সাজ্জাদ একটু লজ্জা পেয়ে যায়। এই বাড়িতেই সে হেসে-খেলে বড় হয়েছে। পাড়া প্রতিবেশির অভিযোগ কম ছিল না তার ওপর। তবে সেসব কথা কেউ মনে রাখেনি বলেই তাকে দেখতে ছুটে এসেছে।

একদিন শীতের ভোরে পাশের পাড়ার মজনু এসেছে সাজ্জাদের মায়ের কাছে। অভিযোগ গত রাতে তাদের গাছের ডাব চুরি হয়েছে। গাছের গোড়ায় সাজ্জাদের স্যান্ডেল পাওয়া গেছে। মজনুর কথা শুনে সাজ্জাদের মা জিজ্ঞেস করে,

– হ্যা রে মজনু দেখছোস আমাগো ওই কোনার গাছে অহনো দুই কানি ডাব ঝুলতাছে।নিজের গাছের ডাব থাকতে তোর গাছের ডাব খাইতে যাবে ক্যান?

– চাচি তাইলে, এই স্যান্ডেল পাইলাম গাছের গোড়ায়। তার কি কোন দাম নাই?

– মজনু, এই স্যান্ডেল কোম্পানি কি আমার সাজ্জাদের জন্যে খালি এক জোড়া স্যান্ডেল বানাইছিল?

মজনু বুঝতে পারে তার কথা টেকানো সম্ভব নয়। তাই অগত্যা বাড়ি ফিরে যায় হাতে করে আনা স্যান্ডেল নিয়ে।সেটার দিকে চোখ যেতেই মরিয়ম বেগম চেঁচিয়ে বলেন,

– তুই যে কইলি এইটা সাজ্জাদের স্যান্ডেল।হাতে কইরা আবার নিয়া যাইতাছোস ক্যান? রাইখা যা, আর স্যান্ডেলের দাম নিয়া যা।

কাপড়ের শেষ প্রান্তে বাধা ৫০ টাকার নোট খুলে মজনুর হাতে ধরিয়ে দেয়। মজনু কোনো কথা না বলে হাতের স্যান্ডেল রেখে চলে যায়। মা পরম যত্নে সেই স্যান্ডেলজোড়া তুলে রাখে সাজ্জাদের রুমের সামনে।

দুপুরে বাড়িতে আসতে না আসতেই কানে গেল সকালের ঘটনা।রাতের ঘটনা মনে পড়তেই লজ্জিত হয়।কিছু করার  ছিল না।গতকাল বিকালে লেপু এসে চুপি চুপি বলল,

– সাজ্জাদ যাবি আজ রাতে?

– কোথায়?

– মজনু মিয়ার পুকুর পাড়ে নারিকেল গাছে কচি কচি ডাব ধরেছে।

যদিও শীতকাল। তবু বন্ধুদের কথা শুনে লোভ হলো মনে। লেপু, হাসিব আর সাজ্জাদ মিলে যায় মজনুর বাড়িতে।কথা ছিল সাজ্জাদ দড়ি নিয়ে উঠবে গাছে।দড়ির অন্য প্রান্তে ধরে

থাকবে লেপু। আর মজনুর বাড়ির গেটে পাহারা দেবে হাচিব।সবই ঠিক ছিল, তবে সমস্যা হলো ডাবের ভারে লেপুর হাত থেকে দঁড়ি ছুটে যায়। আর ডাবের কানি পড়ে পুকুরের মধ্যে। বিকট শব্দ হতেই টর্চ হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসে মজনু।হাচিব আর লেপু সমূহ বিপদ বুঝতে পেরে পালিয়ে যায় শুকনা বিলের মধ্যে।তবে গাছ থেকে তরতর করে নেমে সাজ্জাদ ডুব দেয় পুকুরের মধ্যে।শীতের রাতে পুকুরের জল কেমন ঠান্ডা  হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মজনু টর্চ জালিয়ে খুঁজতে থাকে, কি পড়লো পুকুরে।ততক্ষণে পুকুরে পড়ে যাওয়া ডাবের কানিতে ভর দিয়ে কচুড়ির মধ্যে নাক উচিয়ে ভাসতে থাকে সাজ্জাদ। অনেকক্ষণ পর বিপদ কেটে যাওয়ার আঁচ টের পেয়ে ডাব নিয়ে দৌড়ে যায়। আগে থেকে প্ল্যান অনুযায়ী জমির মধ্যে অপেক্ষা করতে থাকে লেপু ও হাচিব।বন্ধুদের খোঁজে এগিয়ে যেতে যেতে অন্ধকারে অস্তিত্ব টের পায় একে অন্যের।এত কাণ্ড করতে গিয়ে সাজ্জাদের স্যান্ডেলটাই রয়ে যায় গাছের গোঁড়ায়। 

পুলিশ ছেলে বাড়ি ফিরেছে, মায়ের যেন খুশির শেষ নেই।আগে থেকে তুলে রাখা পুঁই শাক দিয়ে মুগ ডাল, দেশি লাল আলু দিয়ে কই মাছের ঝোল, কচুর লতি দিয়ে চিংড়ি মাছ, আর নিজের উঠানে বড় হওয়া লাল মুরগির কষা। ঘরের সামনে মাদুর পেতে খাচ্ছে সাজ্জাদ, পাশে বসেছে বড় ভাই সোহেল, সোহেলের মেয়ে মুন্নি আর ছেলে মানিক।সাজ্জাদের বোন সুফিয়া কলেজে।এবছর কলেজ ফাইনাল দেবে। জরুরি কাজ বলেই যেতে হয়েছে।সোহেলের বউ আজ আর খাবার পরিবেশনে আসেনি।সে জানে, ছোট ভাইজান এতদিন পর ঢাকা থেকে এসেছে।শাশুড়ি আম্মা নিজে হাতে পরিবেশন করবেন।

খেতে খেতে দুই ভাই কতো কথা বলে।এতদিন ঘটে যাওয়া গ্রামের ঘটনা।শরিকের সাথে জমি নিয়ে ঝামেলা।মাঠের ফসল আর সংসারে পাঠানো টাকার হিসাব দেয় সোহেল।এসব কথা শুনতে শুনতে উসখুস করতে থাকে মুন্নি।সে বলে,

– ছোড চাচা, তুমি কি সত্যি সত্যি সিনেমার পুলিশের চাকরি করো?

মুন্নির কথা শুনে হেসে ওঠে দুই ভাই।মেয়ের এমন বোকামো কথা শুনে অনেকটা লজ্জিত হয় সোহেল।তারপর মেয়েকে ধমক দিয়ে চুপ করায়।প্রতিবাদ করে সাজ্জাদ বলে,

– ভাইজান, ওকে ধমক দিচ্ছো কেন? আমি তো ওদের কাছে ছোট চাচা।আমার সাথে ওরা সাতার কাঁটতে শিখেছে।মাছ ধরতে গেলে খালুই নিয়ে বসে থেকেছে। গাছের পেয়ারা পাড়ার আবদার করেছে।সেই চাচা এখন পুলিশ। একটু তো অবাক হবেই।

ছেলের মুখ দেখে মা বুঝতে পারেন, আজ কতোদিন পর তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছে।মা যখন পাশে বসে খাওয়ায় তখন পেটে জায়গা থাকে না। তাছাড়া ভাইয়ের সাথে কথায় কথায় কখন যে বেশি ভাত খাওয়া হয়ে গেল, বুঝতেই পারেনি সাজ্জাদ।উঠে দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে বলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছে।কাচের গ্লাসে লেবু জল এগিয়ে দেয় মা। তারপর বলে,

– নে ধর, ঢকঢক করে খাইয়া ফেলা দেখবি প্যাটের ভাত সব হজম হইয়া যাইবো।

মায়ের কথামতো লেবুর জল খেয়ে ফেলে। একটু যেন অস্বস্তি কমেছে। সোহেলের বউ এতক্ষণে সামনে আসার সময় পেয়েছে। হাতে একবাটি ফিরনি নিয়ে আসে। দেবরের হাতে দিয়ে বলে,

– খেয়ে দেখো, তুমি যে টাকা পাঠাইছিল, ওই গরুর দুধ দিয়ে রান্না করেছি।

– ভাবি, এতকিছু একসাথে  দিলে আমার তো পেট ফেটে যাবে।

– শহরে যাইয়া তো ভদ্রলোক হইয়া গেছো।তাই খাওয়া কমে গেছে।

– না না ভাবি। পুলিশের চাকরি করলে অত খাওয়া যায় না। আসলে ট্রেনিংয়ের সময় পরিমান মতো খাওয়া দিতো, ওইটা অভ্যাস হয়ে গেছে।

– হু। আর জন্মের পর থেইকা গেরামের যে অভ্যাস ছিল ওইগুলা কি ট্রেনিংয়ের সময় মাস্টারগো হাতে দিয়া আইছো?

ভাবীর কথা শুনে সাজ্জাদ হো হো করে হেসে ওঠে। সাথে সোহেলের বউ রেবাও হাসে। তারপর দেবরের সাথে খুনসুটি করতে বলে,

– ছোট ভাই, এবার ঘরে একটা বউ আনো।

– সে কি কথা? এত কিছু থাকতে তুমি আমাকে বিয়ের কথা বলছো কেন?

– আজ কতোদিন পর বাড়িতে আসলা, হিসাব আছে? বিয়া করলে তাও আমাগো কথা বাদ দিলাম, বউয়ের টানে হইলেও ঘন ঘন আসবা।

– ভাবি তোমার যা কথা। তোমার কি ধারণা, বিয়ে করলে বউ তোমাদের কাছে রাখবো?

– তাও তো কথা।মলিন মুখে উত্তর দেয় রেবা।নিজের অপরিপক্ব কথার জন্য লজ্জিত হয়ে রেবা হাতের বাটি এগিয়ে দিয়ে বলে,

– এটা তো এখনো খাও নাই।

– সতি বলছি ভাবি, আমার পেটে কোনো জায়গা নাই।

মরিয়ম বেগম কাছে এসে দাঁড়াতেই বউমা’র কথা কানে যায়। তিনি তখন ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

-সাজ্জাদ, একটু মুখে দাও।মুন্নির মা কতো সোয়াদ কইরা রানছে।

অনিচ্ছাসত্ত্বে ও চামচে তুলে মুখে দেয়। মা, ভাবি তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। ফিরনির স্বাদে সাজ্জাদের মুখের রেখার পরিবর্তন হয়, তা দেখে দুজনেই খুশি হয়।

বাড়ি ফিরেছে সুফিয়া। কতোদিন পর ছোট ভাইজানকে দেখে খুশিতে চোখ চকচক করে ওঠে। হাতের জিনিসপত্র নিয়ে সাজ্জাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুফিয়া। তাকে দেখে সাজ্জাদ জিজ্ঞেস করে,

– সুফিয়া, কেমন হচ্ছে পড়ালেখা?

– ভালো। আপনে কেমন আছেন?

– ভালোই আছি।

– পুলিশের চাকরি অনেক কষ্টের তাই না ভাইজান?

ছোটবোনের কথা শুনে একটু অবাক হয়। মনের অজান্তে গলাটা ধরে আসে। তারপর নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করতে জবাব দেয়,

– তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস।

সাজ্জাদের কথার কোনো উত্তর দেয় না সুফিয়া। সে অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে নেয়।তারপর দুরে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখতে থাকে।তারপর বলে,

– বকুল বুবু গেরামে আইছে।আমার সাথে দেখা হইছিল।

বকুল নামটার সাথে জীবনের একটা পুরনো হিসাব জমা হয়ে আছে।পাশের পাড়ায় বকুলের বাড়ি।বাবা গ্রামের হাই স্কুলের শিক্ষক বলে তাদের পরিবার গ্রামের অন্য সকলের থেকে একটু স্বতন্ত্র। ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা এক সঙ্গে একই স্কুলের গন্ডিতে ছুটাছুটি করা। গ্রামের কোনো মেলা বা উৎসবে দেখা হওয়া। এভাবেই চোখে চোখ পড়তে কখন যেন প্রেম হয়ে গেল।ছোটবেলার প্রেম যতটা হালকা মনে করা হয়, ততটা নয়।পাড়া-প্রতিবেশির অভিযোগের মুখে সাজ্জাদকে জেলা শহরে পাঠানো হয়।

বাবা অকালে চলে গেলেন।সংসারের হাল বড় ভাইয়ের ওপর পড়লো।সাজ্জাদ, সুফিয়া পড়ালেখা করছে।সোহেলও তখন কলেজ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। মা মনে মনে প্রতীজ্ঞা করেন, যে ছেলেকে শাসন করতে গ্রামের মানুষ ছুটে আসে, সেই ছেলে একদিন অন্যায়ের শাসন করবে। মায়ের প্রতিজ্ঞাতে সাজ্জাদকে জেলা শহরে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করানো হয়।

সবে মাত্র অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য চেষ্টা চলছে। এমন এক দিনে জরুরি চিঠি লিখে বাড়িতে আনা হয় সাজ্জাদকে। বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ সাজ্জাদ বাড়িতে এসেছে। পরিবারের সবাই অবাক হলেও মনে মনে খুশি হয়েছে। তবে বাড়িতে আসার জন্য চিঠি লিখেছিল বকুল। তখন অনার্স দ্বিতীয়বর্ষে বকুল। সরকারি ব্যাংকে চাকরি করা ভালো ছেলে পেয়েছে, তাই পরিবার হাতছাড়া করতে রাজি নয়। এমন এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়ে বকুল সাজ্জাদকে জরুরি বাড়ি আসতে চিঠি লিখেছিল। সাজ্জাদ বাড়িতেও এসেছিল। বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ে ডালপালা ছড়িয়ে একটা আম গাছ বসেছিল। তার নীচে বসেই কথা হতো সাজ্জাদ আর বকুলের।

সেদিনও দুজনে সেখানে দেখা করতে যায়। সব কথা খুলে বলে বকুল। নীরবে কথা শুনছিল সাজ্জাদ। উত্তরের জন্য অধীর অপেক্ষায় বসে আছে বকুল। এ যেন আদালত প্রাঙ্গণে বিচারকের রায়ের অপেক্ষায় বসে আছে। বেশ খানিকক্ষণ চুপ থেকে সাজ্জাদ বকুলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকায়। অনেকটা ঘাবড়ে যায় বকুল, এমন আগুন দৃষ্টি এর আগে কখনো দেখেনি সাজ্জাদের চোখে। তাহলে কি বলবে সাজ্জাদ। ফিরিয়ে দেবে তার এতদিনের ভালোবাসা!

– তুমি বিয়ে করে সুখী হও।

বকুলের চোখ বেয়ে কোনো জল গড়িয়ে পড়লো না। স্তব্ধ হয়ে গেল নিমিষেই। তারপর গলার সুরে দৃঢ়তার আলতা মেখে লাল ছাপ ফেলে এগিয়ে গিয়ে বলল,

– তুমি কি সত্যি চাও, আমি সুখী হই। তাহলে এই কথা বলতে না।

সাজ্জাদের দৃষ্টি অন্যদিকে। কিছুতেই নিজের চোখ বকুলের চোখে রাখতে পারছে না। ভয় নাকি অস্তিত্ব সংকট নিজেকে বারংবার জিজ্ঞেস করেও উত্তর পায়নি। তবু বকুলের প্রশ্নের উত্তর তাকে দিতে হয়েছে।

– বকুল, আমি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। আমার মা আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন। আমি তার স্বপ্ন মুছে দিতে পারবো না।

– তোমার মায়ের স্বপ্ন আমি মুছে দিতে চাইনি। আমি সঙ্গে থেকে সেই স্বপ্ন স্পষ্ট করতে চাই। সঙ্গে নাও আমাকে। বকুলের এ কথার উত্তর তাৎক্ষণিক খুঁজে পায়না সাজ্জাদ। এখানে সেখানে মনের বাগানে ঘুরে বেড়ায়। এতদিন যে পথ ধরে দুজনে হেঁটেছে শান্ত, ভাবনাহীন। আজ সেখানে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে।

মধ্যবিত্ত মানুষ হয়, স্বপ্নরা কখনো মধ্যবিত্ত হয় না। তবে বিত্তহীন স্বপ্নগুলো মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর সমাজ, সম্মানের চাপে ফ্যাকাশে হয়ে ধুকে ধুকে মৃত্যু হয়। চাইলেই এরা স্বপ্নপূরণ করতে পারে না।

সাজ্জাদের সামনে বসেছিল একজন বকুল। আর তার মাথার মধ্যে বসেছিল পুলিশ হয়ে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার স্বপ্ন। বাবার অবর্তমানে ভাইয়ের পড়ালেখা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরার প্রতিদান দেওয়ার স্বপ্ন। ছোট বোনের আবদারগুলো পূরণ করে ভালো পাত্রস্থ করার স্বপ্ন। এতগুলো স্বপ্ন তাকে, বকুলের স্বপ্নের কাছে পৌঁছাতে দেয়নি।

বকুলের যেদিন বিয়ে হয়, সেদিন সাজ্জাদের প্রথম ট্রেনিং হয় সারদায়। ট্রেনিংয়ের প্রথমদিন ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। বকুলের কথা কি সে ভেবেছিল, নাকি বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। সেদিন রাতে কতোকিছু চিন্তা করেছিল। সবগুলো ছিল বকুলকে ঘিরে। মানুষের স্বপ্নগুলো জলেভাসা কচুরির মতো। একটা যখন জলের পাকে দূরে চলে যায়, তখন অন্য একটা ঠিক সেই জায়গায় এসে ঠিক পূরণ করে নেয়। বিয়ের পর কখনো দেখা হয়নি বকুলের সাথে। শুনেছে ব্যাংকে চাকরি করা সেই ছেলেটির সাথে শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়নি। তবে তারচেয়েও পয়সাওয়ালা বড় ব্যবসায়ীর সাথে বিয়ে হয়েছে। দীর্ঘ ট্রেনিংয়ের পর একবার বাড়িতে এসেছিল। তখন কথায় কথায় সুফিয়া বলেছিল, বকুলকে সাত ভরি হার দিয়েছে। অনেক দামি শাড়ি, স্যান্ডেল, ব্যাগ ব্যবহার করে বকুল। শুনে খুশিও হয়েছিল। তার সাথে বিয়ে হলে এত দামি গয়না, শাড়ি, স্যান্ডেল দিতে পারতো না। তারপরও কি বকুল সুখী হতো? তখন ছেলেমানুষ ছিল, প্রেমের অর্থই হয়তো বুঝতো না। নিজের মনে হাসে সাজ্জাদ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে।সুফিয়া কখন চলে গেছে টেরই পায়নি সাজ্জাদ।মা এসে ডাকছে,

– সাজ্জাদ এবার উঠে ঘরে যাও।বিছানায় একটু গড়াগড়ি দিলে ভালো লাগবে।

মায়ের কথায় মনে পড়লো, কতো দুপুর হয়েছে বিছানায় গড়াগড়ি দেওয়া হয় না।ইচ্ছে হলো একটু গড়িয়ে নিলে মন্দ হয় না।ওঠে দাঁড়াতেই দেখে কিছু মানুষ এসে হাজির। পাড়ার মহিলা, পুরুষ জড়ো হয়েছে।সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে থাকে।ভিড়ে জড়ো হওয়া অনেক চেনা-অচেনা মুখের মাঝে এই মাত্র যোগ হয়েছে একটি মুখ, একজোড়া চোখ।কবে কোথায় দেখা সেই চোখ।চমকে ওঠে সাজ্জাদ।

(চলবে)

  লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক,

  নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *