ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ইরানী বিশ্বাস

ডিউটি শেষ করে রুমে ফিরেছে সাজ্জাদ। সারাদিনের ধকল কাটিয়ে উঠতে ঠান্ডা জলে ভালো করে শাওয়ার নিয়েছে। তারপর লম্বা টাওয়াল পেঁচিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। মাথার চুল ভেজা। চেয়ার ছেড়ে ওঠে ফ্যানের সুইচ অন করে দেয় চুল শুকানোর জন্য। মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। সাজ্জাদের মনে সেই রাতের ঘটনা ঘুরছে ফ্যানে ঘুরতে থাকা তিন ব্লেডের মতো। নিজেকে বড্ড বেরসিক মনে হচ্ছে সাজ্জাদের। আচ্ছা পুলিশদের কি রহস্য, খুন, প্রশ্ন ছাড়া আর কিছু থাকতে নাই মাথায়। ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখটা বুঁজে এসেছিল। একটা টিকটিকি বিকট শব্দে ডেকে ওঠে। ঘুম ভেঙে চোখ খুলে তাকায় সামনে। দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ি জানান দিচ্ছে রাত গভীর হয়েছে। এখনো ডিনার করা হয়নি। হোম মেকার ইয়াসমিন কয়েকদিন ঠিক মতো কাজে আসছে না। বেশ নরম সুরে আর্জি জানিয়েছিল,

‘পোলার বাপ বাড়ি আহে না কয়দিন হইলো। তাকে খুঁজতে যামু স্যার’।

ইয়াসমিনের স্বামী নাকি আবার অপ্রকৃতস্থ। হো হো করে হেসে ওঠে সাজ্জাদ। তারপর চেয়ার ছেড়ে  ট্রাউজারটা হাত বাড়িয়ে নেয়। পরনের আধা ভেজা টাওয়াল মেলে দিতে বারান্দায় যায়। নিচে নিয়ন আলোয় রাস্তা দেখা যাচ্ছে। কিছু রিকশার টুংটাং শব্দ আর অস্পষ্ট পথচারির আলাপচারিতা শোনা যাচ্ছে। বেলকনির গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে এতক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল সাজ্জাদ। ফিরে এসে দীর্ঘশ^াস ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর টেবিলে রাখা জগের জল গ্লাসে ঢেলে খেয়ে নেয়। পেটে ক্ষিদে থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছে করছে না রান্না করে কিছু খেতে। তারচেয়ে কলা-মুড়ি-বিস্কুট খেয়ে নিলে মন্দ হয় না।

বেশ কিছুদিন পর আনোয়ার খান আবার গিয়েছে সোনারগাঁ। দোতলায় গজলের আসর চলছে। প্রতি সোমবার সেখানে হাজির হন তিনি। কোনো মিটিং বা পার্টি নয়, একদমই মনের আনন্দে। আনোয়ার খান ভীষণ গান পাগল। গজল তার প্রিয় বলে সপ্তাহে একটি দিন রাত ৭টার পর এখানে ছুটে আসেন। সেদিনও তিনি এসেছেন। গান শুরু হয়ে গিয়েছে। কিছু ¯œ্যাকসের সাথে অন্যান্য ড্রিংকস অর্ডার দিয়েছেন। মনের আনন্দে খাচ্ছেন আর গান উপভোগ করছেন। হঠাৎ মনে হলো কানের পাশ থেকে একটি ফিসফিস শব্দ ভেসে আসছে। ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলেন মাঝ বয়সি এক ভদ্রলোক মাথা ঝুঁকে আছেন। আনোয়ার খান তার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন,

‘এক্সকিউজ মি, আমি কি একটু বসতে পারি?’

‘সিওর’

‘থ্যাংকস’

‘ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, ইউ ক্যান টেক এ ড্রিংকস অর এজ ইউ লাইক’

‘ওহ সিওর, থ্যাংকস’

ছেলেটি ড্রিংকস-এর মুখ ওপেন করে খেতে শুরু করে। দুই চুমুক নিয়ে আনোয়ার খানের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘স্যার আমি জানি আপনার কথা। আপনি ভীষণ বড় মনের মানুষ’

‘থ্যাংকস’

‘আমাকে আপনি চিনবেন কিনা জানি না। আমি ফিল্ম মেকার সিকান্দার’

‘ও আই সি। ওয়ান্ডারফুল। নাইস টু মিট ইউ’

‘ও কথা বলে লজ্জা দিবেন না স্যার। আপনি কতো বড় মানুষ। স্যার একটা কথা বলতাম’

‘জী বলেন’

‘আপনি স্যার সূর্যকিরণ ছবিটা দেখেছেন? ওটা আমার বানানো।’

‘সত্যি বলতে কি, আমি আসলে বাংলাদেশের ছবির নাম জানি না। দেখা হয়না তেমন একটা’

‘এ ক্যামন কথা বললেন স্যার। আপনারা যদি না দেখেন তবে আমরা কাদের জন্য ছবি বানাবো। আপনারা ছবি দেখবেন, ইনভেস্ট করবেন, তবেই তো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি শক্তিশালী হবে’

‘অবশ্য ঠিক কথা। তবে আমার তো বেরসিক বিজনেস। এটা তো জানেন’

আনোয়ার খানের কথা শুনে হা হা হা করে হেসে ওঠে সিকান্দার। গজলের সুরের সাথে মিলিয়ে যায় তার হাসি। তবে আনোয়ার খান এই হাসিতে অংশ নিয়েছিল কি না তা বোঝা গেল না।

কথায় কথায় দুটি ড্রিংকস শেষ করে সিকান্দার। সঙ্গে ¯স্ন্যাকসও শেষ হয়। গজলের মূর্ছনা তখনো ঝংকার তোলে। আনোয়ার খান বিদায় নেবার আগে সিকান্দার তার অফিসে দেখা করতে যাবার অনুমতি নিয়ে নেয়।

পরদিন পড়ন্ত বেলায় আনোয়ার খান অফিসে বসে আছেন। সাধারণত তিনি আজকাল তেমন একটা অফিসের কাজ করেন না। তবে নিয়মিত অফিসে বসেন। দিন শেষে সন্ধ্যার একটু আগে একবার অফিস ঘুরে বেরিয়ে যান। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রিসিপশান রুমে একটি সুন্দরী মেয়ে ও একটি ছেলে বসে আছে। এ খবর আনোয়ার খানের কাছে পৌঁছে দেয় পিয়ন। খবর পেয়ে শীতঘরে প্রবেশ করে সিকান্দার ও তার সাথে থাকা মেয়েটি।

বড় টেবিল সামনে করে চেয়ারে বসে দুজন। অপর প্রান্তে আনোয়ার খান। রুমের কম আলোতেও চকচক করছে তাঁর চেহারা। দুধ সাদা গায়ের রং। মুখে বয়সের ভাজ পড়লেও বেশ মার্জিত। যে কোনো মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যাবে। সামনে থাকা ফাইলে মনোযোগ দিয়ে কি যেন পড়ছেন। তারপর সঠিক স্থানে হাতে ধরে থাকা কলমে সিগনেচার করেন। ফাইলটি বন্ধ করে এক পাশে সরিয়ে রেখে তাকায় সামনে। সিকান্দার বেশ উশখুশ করছিল এতক্ষণ। আনোয়ার খানের চোখে চোখ পড়তেই সিকান্দার উৎফুল্ল হয়ে পাশের মেয়েটিকে দেখিয়ে বলে, ‘স্যার ও হচ্ছে চিত্রনায়িকা মেরি। আমার সূর্যকিরণ সিনেমায় অভিনয় করেছে’

আনোয়ার খান চোখ দুটি সরু করে তাকায় মেরীর দিকে। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় বলেন,

‘নট ব্যাড’

‘সে আমি জানি স্যার। ওকে যে একবার দেখে তার ব্যাড বলার সুযোগই নেই’

‘হু বুঝলাম। তা কি খাবে? চা অর কফি?’

‘কফি’ মেয়েটির মুখ থেকে এতক্ষণ পরে শব্দ ঠিকরে পড়ে। আনোয়ার খান তার দিকে তাকিয়েই আছে। আবছা আলোতে মোটা মেকাপের মুখ খানি একেবারে অপসরি লাগছে।

ততক্ষণে কফি চলে এসেছে। সকলেই কফি মগে চুমুক দিচ্ছে। কেবল মেরী কফি মগে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে তাকায় আনোয়ার খানের দিকে।

মার্ডার কেসের তদন্ত চলছে। আনোয়ার খানের পরিবার থেকে যে মেয়েটির নামে অভিযোগ করেছে তাকে খুঁজছে পুলিশ। কেইস ফাইলে যে মেয়েটির নাম দেওয়া আছে তার নাম সিলভানা মেরী। তিনি একজন সিনেমার অভিনেত্রী। বেশ কিছুদিনের মধ্যে মিডিয়াতে বেশ নাম করেছে। অনেক সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হলেও সিনেমা মুক্তি পেয়েছে মাত্র একটা। এছাড়া স্ক্যান্ডাল রয়েছে বহু। আজ ৩ দিন হয়ে গেল এখনো এই কেইসের সুরাহা হলো না। এমনকি কোনো ক্লু পাওয়া যাচ্ছে না। ইনভেস্টিগেশনের স্বার্থে পুলিশ এবার আনোয়ার খানের পরিবারকে তলব করেছে।

প্রতিদিনের মতো ডিউটি টাইমে থানায় আসে সাজ্জাদ। একটু দূরে কালো সানগ্লাস পরা এক ভদ্র মহিলা বসে আছেন। তার সাথে এক ভদ্রলোক ও একটি মেয়ে বসে আছে। সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারে, কালো সানগ্লাস পরা ভদ্রমহিলা আনোয়ার খানের স্ত্রী। আর ছেলেটি তারই সুযোগ্য ছোট সন্তান। মেয়েটি সম্ভবত ভদ্রমহিলার সহযোগী আয়া। তবে মেয়েটিকে দেখলে আয়া বলে মনে হয় না। পোশাক ততোটা পরিশিালীত নয়। তবে চোখের চাহনিতে মনে হয় এক সময় খুব সম্ভ্রান্ত ছিলেন। সাজ্জাদ কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়া মেয়েটিকে খুব ভালো করে দেখে। কৌশল খুঁজতে থাকে, কি উপায়ে মেয়েটির সাথে কথা বলা যায়। এমন সময় ভেতর থেকে ডাক আসে ভদ্রমহিলার। তিনি একাই চলে যান ভেতরে। বাইরে তখনও বসে আসে মেয়েটি। সাজ্জাদ একটু এগিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটি একবার বিরক্ত নিয়ে সাজ্জাদের দিকে তাকায়। তারপর নিজের মতো মোবাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে থাকে।

‘আপনি কি ওনাদের সঙ্গে এসেছেন?’

সাজ্জাদের কথা শুনেও না শোনার ভান করে বসে থাকে মেয়েটি। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করাতে রাজ্যের অলসতা নিয়ে মেয়েটি উত্তর দেয়,

‘হু’

‘কি নাম আপনার?’

‘রিয়া’

‘আপনার ফেসবুক আছে?’

‘কেন? কি দরকার?’

‘না মানে ফ্রেন্ডরিকয়েস্ট পাঠাতাম’

রিয়াকে ফ্রেন্ডলিস্টে এ্যাড করে সাজ্জাদ। রিয়ার একাউন্টে ঢুকে সার্স করতে থাকে। ভালো করে দেখতে থাকে ফ্রেন্ডসলিস্ট। কারা আছে তার ফ্রেন্ডসলিস্টে। স্ট্যাটাস এর কমেন্টস কারা করে। কি ধরনের স্ট্যাটাস দেয়, এসব দেখতে থাকে। হঠাৎ সজীবের ডাকে চলে যায় সাজ্জাদ। তখনো বসে থাকে রিয়া।

সাজ্জাদ সজীবের সামনে যেতেই অট্টহাসিতে গড়িয়ে পড়ে সজীবসহ আরো দু’তিনজন। সাজ্জাদ অবশ্য এর অর্থ কিছুই বুঝতে পারে না। তারপর হাসতে হাসতে সজীব বলে,

‘তোর কি এতই ফেসবুক ফ্রেন্ড দরকার?’

‘মানে কি বলছিস তুই, কিছুই তো বুঝলাম না’

‘এত মানুষ থাকতে একটা অচেনা মানুষকে ফেসবুক ফ্রেন্ড বানাতে হলো?’

‘কারণ আছে। তুই এর অর্থ বুঝবি না’

‘সেই কারণটা কি? ভালো লেগেছে? তুই প্রস্তাব দিতে না পারলেও আমরা তোর হয়ে প্রস্তাব দেই’

সজীবের হেয়ালি এবং ঠাট্টা ভালো লাগছে না সাজ্জাদের। তাই সে ওদের কথায় মনোযোগ না দিয়ে আবার ফেসবুকে মনোযোগ দেয়। এতে আরো ক্ষেপে যায় সজীব। বারবার সাজ্জাদের কাছে গিয়ে বিরক্ত করার চেষ্টা করে।

এতক্ষণে আনোয়ার খানের স্ত্রী মুক্তা বেগমের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে। তিনি ফিরে এসে আগের জায়গায় বসেন। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে মুক্তা বেগমের হাতে দেয় রিয়া। পানি খাওয়ার ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে কতোটা তৃষ্ণার্ত তিনি। আবার অপেক্ষা করতে হচ্ছে ছোট ছেলের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হওয়া পর্যন্ত।

থানায় পুলিশ ভ্যান রেডি হচ্ছে। সকলের সঙ্গে সাজ্জাদকেও যেতে হবে। শহরের শেষ প্রান্তের এই থানায় সব সময় গণ্ডগোল লেগেই থাকে। আজ হয়তো কোথাও তেমনই গণ্ডগোল হয়েছে। তাই হয়তো পুলিশ প্রোটেকশন দরকার পড়েছে। সকলেই গাড়িতে ওঠে পড়েছে। সজীব অনেকবার বলেছে গাড়িতে উঠতে। কিন্তু সাজ্জাদের চোখ তখনও মোবাইলের স্ক্রিনে। সজীবতো রাগ করে একবার বলেই ফেলল,

‘আমরা চলে যাচ্ছি তুই থাক’

গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় সাজ্জাদ ওঠে যায় পুলিশ ভ্যানে। থানার রাস্তা পেরিয়ে খানিকটা দূরে যেতেই মোবাইলে একটি ম্যাসেজ আসে। শব্দ পেয়ে মোবাইল বের করে স্ক্রিনে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় সাজ্জাদ। অনাকাক্সিক্ষত ম্যাসেজটি তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ছোট্ট একটা বার্তা, তাতে লেখা রয়েছে,

 ‘আপনি কি চলে যাচ্ছেন?’

‘হ্যাঁ, বাইরে ডিউটি আছে। আপনি বাসায় গিয়ে এসএমএস দিয়েন’

‘ওকে’

কনফরমেশন ম্যাসেজ পেয়ে কিছুটা আস্বস্থ হয় সাজ্জাদ। মন থেকে কিছুতেই একটা বিষয় যাচ্ছে না। জিজ্ঞাসাবাদে কিছু পাওয়া গেল? নাকি শুধুই ঘটনার বিবরণ!

চিত্রনায়িকা মেরীর সাথে আনোয়ার খানের পরিচয় হওয়ার পর আজ আবার এসেছে। সঙ্গে আগের মতোই সিকান্দার এসেছে। তবে সিকান্দার একবারও বলেনি মেরী তার সাথে আসবে। তাতে কি, এসেছে যখন দেখা করতে তো দোষ নেই।

মেরীর চয়েসে খাবার আনানো হয়েছে। আর কফি তো আছেই। সিকান্দারের ইচ্ছা ছিল ছোট-খাটো একটা ড্রিংকস পার্টি করতে। কিন্তু আনোয়ার খান রাজি হলেন না। তিনি কখনো নিজের অফিসে ড্রিংকস বা রোমাঞ্চ কোনোটাই এ্যালাও করেন না।

কফি মগে চুমুক দিতে দিতে বার বার মেরীর চোখে চোখ রেখে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে সিকান্দার। তবে মেরীর কাছ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাচ্ছে না। অগত্যা সিকান্দার নিজেই শুরু করে আনোয়ার খানের উদ্দেশ্যে,

‘স্যার ওই দিন বলেছিলাম, একটা ফিল্ম করার কথা’

‘ভেরি গুড। গো এহেড’

‘থ্যাংক ইউ স্যার। স্যার হিরোইন মেরী থাকবে, তাই তো?’

‘আমি তো আসলে তার এ্যাক্টিং দেখিনি। কি করে বলবো। তাছাড়া তুমি হচ্ছো ডাইরেক্টর। তোমার কাকে নিলে সুবিধা হয়, চিন্তা করে দেখো’

‘কি যে বলেন স্যার। আমরা তো প্রডিউসারের চয়েসের উপরই কাস্টিং সিলেক্ট করি’

‘তাই? তাহলে প্রডিউসারকে জিজ্ঞেস করে নাও’

‘আপনি প্রডিউসার, আপনাকেই তো জিজ্ঞেস করছি’

‘আমি! না না আমি ফিল্ম লাইন বুঝি না। তাছাড়া এক দুই লাখ টাকা হলে ঠিক আছে আমি দিতাম। কিন্তু ফিল্মে তো মিনিমাম ৫০ লাখ প্লাস। অন্য কাউকে দেখো’

‘এ কি বলেন স্যার। আমি এত আশা করে এসেছি’

‘সিকান্দার, আমি অনেক কষ্ট করে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি। বুঝে-শুনে ইনভেস্ট না করলে কোনো ব্যবসাই লাভ করা যায় না। তাই বলছিলাম, আমি এই ব্যবসা বুঝি না। প্লিজ তুমি কষ্ট করে এসেছো, গাড়ি ভাড়াটা রাখো’

একটা খাম ধরিয়ে দেয় সিকান্দারের হাতে। গাড়ি ভাড়ার খাম পেয়ে তাৎক্ষণিক খুশি হলেও হতাশ হয়ে পড়ে মনে মনে।

রুম থেকে বেরিয়ে রেগে যায় মেরীর ওপর। যাবার আগে অনেক বুঝিয়ে নিয়ে গেছে। যে করে হোক মেরি আনোয়ার খানকে প্রডিউস করতে রাজি করাবে। অথচ মেরী আজ একটা কথাও বলেনি। মেরীর এমন অদ্ভুত ব্যবহারে রেগে যায় সিকান্দার। সিকান্দার যত রেগে যায়, মেরী তত শান্ত থাকে। মনে মনে সন্দেহ হয়,

‘মেরী কি তাহলে ডাইরেক্ট লাইন করেছে আনোয়ার খানের সঙ্গে?’

সন্দেহের তীর সঠিক জায়গায় ছুড়তে নিজেই প্রশ্ন করে মেরীকে,

‘তুমি আনোয়ার খানকে একবারও বললে না কেন?’

‘কি বলতাম? তুমি নিজেই তো শুনলে, তিনি রাজি নন। আমি বললেই কি তিনি রাজি হয়ে যেতেন?’

‘রাজি হওয়া না হওয়া পরের বিষয়। তোমাকে সব বুঝিয়ে নিয়ে গেলাম। যে করেই হোক তুমি রাজি করাবে। অথচ একবারও তাঁকে অনুরোধ করলে না!’

‘আচ্ছা বাদ দাও ওনার কথা। অন্য কাউকে রাজি করিয়ে সিনেমা করো’

‘বললেই হলো? একটা প্রডিউসার রাজি করানো কি মুখের কথা?

‘তুমি ঠিক পারবে দেখো চেষ্টা করে’

‘শোন, তোমাকে প্রথম আমি ক্যামেরার সামনে এনেছি। এত বড় রিক্স নিয়ে তোমাকে নায়িকা বানালাম’

‘রেগে যাচ্ছো কেন? আমি কি একবারও অস্বীকার করেছি সে কথা?’

‘ঠিক আছে, তাহলে তুমি একটা প্রডিউসার জোগাড় করে দাও’

‘এত টেনশান করো না। দেখবা একটা প্রডিউসার ঠিক পেয়ে যাবে’

সিকান্দার নিজের হাতটা মেরীর হাতের উপর রাখে। মেরী হাতটাকে শক্ত করে চাপ দেয়। তারপর দুজনেই হেসে ওঠে।

উবার থেমে যায় যথাস্থানে। দুজনেই নেমে যায়। তিন থেকে চার মিনিট হাঁটার পর ডানের গলি ধরে একটু ভেতরে গেলে মেরীর বাসা।

ক্লাশ নাইনে পড়ার সময় গ্রামের এক ছেলের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছিল মেরী। যৌবনে না বুঝে ভুল করা মেরী কয়েক মাস পরে শুধরে নিয়েছিল। ফিরে এসে কিছুদিন স্কুলে গিয়েছিল। তবে স্কুলে যাওয়া আসার পথে বখাটে ছেলেদের যন্ত্রণায় সে স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। এভাবে এক বছর ঘরে বসে থাকার পর একদিন ঢাকা চলে আসে। কয়েক বান্ধবী মিলে একটি বাসায় ভাড়া থাকতো। ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় এক এ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টরের সঙ্গে। তারই হাত ধরে মিডিয়া পাড়ায় আনাগোনা।

তারপর থেকে মিডিয়াতে মানুষ বদলের সাথে সাথে তার স্বপ্নেরও বদল হতে থাকে। একটি ড্রেসের মডেল হওয়ার সুবাদে ফ্রি ফটো সেশন হয়ে যায়। সেই ছবি ফেসবুকে ছেড়ে দেওয়ার কারণে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে অভিনয়, মডেলিংয়ের অফার আসতে থাকে।

অফার পাওয়া যত সহজ, কাজ পাওয়াটা তত সহজ নয়। এরপর থেকে মেরীর স্বপ্ন যেন কিছুতেই নাগালের মধ্যে আসতে চায় না। অনেকের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হতে হতে আশাহত হয়। শেষ পর্যন্ত সিকান্দারের সিনেমার নায়িকা হয়ে মেরীর স্বপ্নপূরণ হয়।

ডিউটি শেষে আবার গাড়িতে গিয়ে বসে সাজ্জাদ। পাশেই সজীব বসে আছে। সারাদিন রাস্তায় ডিউটি করা মানে যুদ্ধ করা। গাড়ির আওয়াজ। পাবলিক কথা শুনতে চায় না। যে যার সুবিধা মতো ছুটতে থাকে। পাবলিকের সুবিধায় বাঁধা দিলেই পুলিশ খারাপ।

থানার মধ্যে গাড়ি থেমেছে। সকলেই নেমে গেছে গাড়ি থেকে। সাজ্জাদের ইচ্ছা থানাতেই যখন আসা হয়েছে তখন জিজ্ঞাসাবাদের কথা জেনে গেলে হতো। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখা মিলল একজনের সঙ্গে। তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি উত্তর দিলেন,

‘জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছে। তবে কি কথা হয়েছে তা কাউকেই বলেনি। হয়তো কাল সকলকে ব্রিফিং দেওয়া হবে’

কথা শেষ করে চলে যায় লোকটি। সাজ্জাদও সামনে পা বাড়ায়। হঠাৎ মোবাইলে একটা ম্যাজেস আসার শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে যায়। ম্যাসেঞ্জার ওপেন করে দেখে রিয়া ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। লিখেছে,

‘আপনি কি ফ্রি?’

রিয়ার ম্যাসেজ পড়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করতে থাকে। কি লিখবে সে। যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পাওয়া যায়। অথবা যদি রিয়া তাকে কল দিতে চায়, তাহলে সে কি করবে? তবু ম্যাসেজ পাঠায়,

‘কোন আর্জেন্ট কথা?’

‘না এমনি’

‘তাহলে পরে’

‘কি করছেন?’

‘কিছু না। তুমি?’

‘তেমন কিছু না। গেস্ট এসেছে’

‘তাই? কে কে এসেছে?’

‘এখন বিজি। পরে বলছি’

ম্যাসেজ সেন্ড হতেই অফ লাইনে চলে যায় রিয়া। মনটা খারাপ হয়ে যায় সাজ্জাদের। তারপর আবার অপেক্ষা করতে থাকে, রিয়ার ফ্রি টাইমের জন্য।

সাজ্জাদ মোটেই রিয়ার জন্য উৎকণ্ঠায় নেই। বরং দ্বিগুণ উৎকণ্ঠা রিয়ার গতিবিধির খবর জানতে। বাসায় কে আসে, কখন আসে, ম্যাডাম কি করে। কার সাথে কথা বলে এসব জানতেই বেশি আগ্রহ সাজ্জাদের।

ডিউটি শেষে বাসায় যেতেই দেখে দরজার পাশে বসে আছে ইয়াসমিন। তাকে দেখেই ওঠে দাঁড়ায়। একটু অবাক হয়ে সাজ্জাদ প্রশ্ন করে,

‘তুমি এখানে কি করছো?’

‘স্যার আপনার লগে একটু দরকার আছিল। তাই বইসা আছি’

‘কি দরকার?’

‘আমার বেতন যদি দিতেন স্যার’

‘আজ মাসের ২৫ তারিখ’

‘স্যার আমার ভারি দরকার। দেন স্যার’

‘তুমি তো জানো, আমি বেতন পাই মাসের ৪ তারিখের পর। আর মাসের শেষ দিকে এসে হাত একদম খালি থাকে’

‘তবু স্যার আমার খুব দরকার’

‘আচ্ছা সে না হয় ম্যানেজ করে দিতে পারবো। তবে কি এত আর্জেন্ট?’

‘স্যার পোলার বাপে আইজ এক সপ্তা হইলো বাড়িতে আহে না। তারে খুঁইজা খুঁইজা পাইছি। তয় ট্যাকা না দিলে বাড়িতে আইবো না’

‘ইয়াসমিন আপা, তোমার স্বামী নেশা করে। এটা জেনেও তুমি তাকে টাকা দিবে?’

‘কি করুম কন, পোলা তো বাপরে ছাড়া থাকতে চায় না। খালি পোলার জইন্যে ওই ভাদাইম্যারে সংসারে জায়গা দেই’

চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে সাজ্জাদ। তার সাথে ইয়াসমিন আসে। ইউনিফর্ম খুলে চেয়ারে বসে। তারপর মানিব্যাগ খুলে কিছু টাকা পেয়েছে। সেটাই ইয়াসমিনের হাতে তুলে দিয়ে বলে,

‘আপা আমার কাছে আর নেই। তাছাড়া আরও এক সপ্তাহ আমার চলতে হবে’

‘ঠিক আছে স্যার। আমি তাইলে আসি। কাইল থেইকা কাজে আমুনে’

ইয়াসমিন চলে যায়। সাজ্জাদ বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার নেয়। তারপর বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেয়। আজ আর ডিনার করতে হবে না। আসার আগে খেয়ে এসেছে। মোবাইল বের করে ফেসবুকে যায়। দেখতে থাকে কোনো নতুন খবর আছে কি না। নিউজ পোর্টালগুলো ফেসবুকে নিউজ বুষ্ট করে। সেই খবরগুলো প্রতিদিন চোখ বুলায় সাজ্জাদ। হঠাৎ ম্যাসেজ আসার শব্দ হয়। মনে মনে ধরে নেয় হয়তো রিয়া ম্যাসেজ দিয়েছে। ম্যাসেঞ্জার ওপেন করতেই দেখে সত্যি রিয়ার ম্যাসেজ এসেছে। তাতে লেখা রয়েছে,

‘জেগে আছেন?’

রিয়ার ম্যাসেজ দেখে দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে তাকায় সাজ্জাদ। মাত্র ১০ টা বাজে। রিয়ার ম্যাসেজের উত্তর লিখে,

‘হু। তুমি কি করলে এতক্ষণ?’

‘বাসায় গেস্ট এসেছিল। পার্টি হয়েছে’

‘পার্টি! কিসের পার্টি?’

‘ম্যাডাম আর তার ফ্রেন্ডসরা’

(চলবে)

  লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক,   নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *