ই-পেপার

তানভীর সালেহীন ইমন পিপিএম

[চতুর্থ পর্ব]

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা পুলিশের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা ও আত্মত্যাগের সুমহান ইতিহাস অবিসংবাদিত ও সর্বজনবিদিত। গৌরবময় ইতিহাসের অগ্নিসাক্ষী রাজারবাগে অবস্থানরত কয়েকজন পুলিশ সদস্যের স্মৃতিকথার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হলো।

পুলিশের প্রথম প্রতিরোধযোদ্ধা কনস্টেবল মোঃ শাহজাহান মিয়ার ভাষ্য : আমি তখন রাজারবাগ ওয়ারলেস বেইজ স্টেশনের দায়িত্বে। তেজগাঁও পেট্রল থেকে ম্যাসেজ আসে, ‘Charlie-7 for base, about 37 truck loaded with Pak army proceedings towards Dhaka City’ আমি ম্যাসেজ পেয়ে সারা দেশে ম্যাসেজ দিই “Base for all stations of East Pakistan Police, We are already attacked by the Pak army, try to save yourself over’

এর মধ্যে হানাদাররা সব জায়গায় গোলাগুলি শুরু করে দেয়। রাজারবাগে আগুনের ফুলকি উড়তে লাগলো। আমি তখন চারতলার ছাদে। সারারাত যুদ্ধ হলো। ফজরের আজানের সময় আমরা পাঁচজন আর্মিকে পিটিয়ে মেরে ফেলি। আমরা সংখ্যায় একশ জনের মতো। কিছুক্ষণের মধ্যে হানাদাররা আমাদের ঘিরে ফেলে। আনুমানিক ভোর পাঁচটার দিকে আমিসহ আরও অনেকে ওদের হাতে বন্দি হই। বন্দি অবস্থায় ওরা আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। ২৮ মার্চ বেলা ৩.১৫ মিনিটের দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ সুপার ইএ চৌধুরীর জিম্মায় মুক্তি পাই। প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে ৩০ মার্চ গ্রামের বাড়ি রওনা দিই। ১০ এপ্রিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেশখলায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করি।

পুলিশের প্রথম প্রতিরোধযোদ্ধা কনস্টেবল জয়নাল আবেদীন মোল্লার ভাষ্য : ২৫ মার্চ ১৯৭১ আনুমানিক রাত ১১.০০টার পর থেকে শান্তিনগর, ফকিরাপুল, শাহজাহানপুর পাক সেনাদের গাড়ি ঘিরে ফেলে। আমি তখন ৪নং ব্যারাকে থাকি। নিচে গিয়ে দেখি ম্যাগজিন ভেঙে যে যার মতো রাইফেল ও ২০ থেকে ৩০ রাউন্ড করে গুলি নিয়ে যাচ্ছে আমিও ছাদে অবস্থান করে গুলি করা শুরু করি। পাকিস্তানি সেনারা আরআর, মর্টার, রকেট লাঞ্চার, ট্যাংক দিয়ে ফায়ার করে এবং ট্রেসার লাইটের মাধ্যমে আলোকিত করে সেল নিক্ষেপ করে, ফলে পিআরএফ ব্যারাকে আগুন ধরে যায়। ফোর্স চারদিকে ছোটাছুটি করে। হানাদাররা ট্যাংক বহর নিয়ে পুলিশ লাইনস্-এ ঢোকে এবং সাধারণ ফোর্সদের নির্যাতন করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আমি পুলিশ লাইনস্-এ থেকে বের হয়ে চলে যাই সেখান থেকে প্রথম চট্টগ্রাম এসে ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।

পুলিশের প্রথম প্রতিরোধযোদ্ধা কনস্টেবল মোঃ কাঞ্চন আলী মিয়ার ভাষ্য : ২৫ মার্চ ১৯৭১ বিকেল থেকে আমরা অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করি। আরআই মফিজ সাহেব অস্ত্রাগারের চাবি না দিয়ে আত্মগোপন করলে রাতে অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে ইচ্ছেমতো অস্ত্র, গুলি ও হেলমেট নিয়ে পুলিশ লাইনস্-এ চারদিকে ও ছাদে অবস্থান নিই। আমি ও আমার ব্যাচমেট আবুল কালাম আজাদ মাঠের পূর্বদিকে শহীদ মিনারের কাছে অ্যাম্বুস নিই। হানাদার বাহিনী ওয়ারল্যাস বিল্ডিং-এর সামনে পৌঁছামাত্র আমরা একযোগে গুলিবর্ষণ শুরু করি। এতে আগত পাকসেনা নিহত হয়। তারা প্রাথমিক অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হলেও পরবর্তীতে অবিরাম পুলিশ লাইনস্-এ উপর ভারী অস্ত্র ও কামানের গোলা নিক্ষেপ শুরু করে। এভাবে হানাদারদের সঙ্গে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট যুদ্ধ চলে। যখন আমরা বুঝতে পারি পাকবাহিনী রাজারবাগ ঘেরাও করে ফেলেছে তখন আমি ও আমার ব্যাচমেট আবুল কালাম আজাদ ক্রলিং করে মাঠের মধ্য দিয়ে পুলিশ লাইনস্-এ পেছনে আস্তাবলের পাশে পুকুরের পাড়ে অ্যাম্বুস নিই। দেখতে পাই পিআরএফ ব্যারাকে আগুন লেগে গেছে এবং পাকবাহিনী ট্যাংক বহরসহ পুলিশ লাইনস্-এ মধ্যে প্রবেশ করেছে। তখন আমরা এ্যম্বুস প্রত্যাহার করে চামেলীবাগ এলাকায় এক উকিলের বাড়ির রান্নাঘরে আশ্রয় নিই। মানুষের দেয়া পুরাতন প্যান্ট শার্ট পরিধান করে শান্তিনগর এলাকায় যাই। পরবর্তীতে পাঁয়ে হেঁটে রেললাইন দিয়ে ময়মনসিংহে ব্যাচমেটের বাড়িতে পৌঁছি। ১২ দিন পর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করি।

পুলিশের প্রথম প্রতিরোধযোদ্ধা কনস্টেবল মোঃ আবু শামা সামাদ এর ভাষ্য : ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্-এ অস্ত্রাগারে কর্মরত ছিলাম। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাজারবাগ ঘিরে গুলিবর্ষণ শুরু করলে অবিরাম গোলাগুলির মুখে স্বল্প গোলা বারুদ নিয়ে আমরা টিকতে পারছিলাম না। ট্যাংকবহরসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্যারেড গ্রাউন্ডে ঢুকে পড়ে। তখন আমাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্য চারতলার ব্যারাকের উপর থেকে গুলিবর্ষণ করছিলো। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্রেসার গানের সাহায্যে আলোকিত করে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে হত্যা করতে থাকে।

একসময় পুলিশের গুলি শেষ হয়ে যায়। পাঁচটি টিনশেড ব্যারাকে পাকিস্তানিরা আগুন ধরিয়ে দেয়। আধুনিক-উন্নত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রায় ৮০০ পাকিস্তানি সেনা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ –এ প্রবেশ করলো, তখন পুলিশ সদস্যদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকলো। একটি হলো আত্মসমর্পণ অন্যটি ওদের হাতে ধরা না পড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। সেদিন প্রায় ১৫০ জন পুলিশ সদস্য পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হন এবং অধিকাংশ পুলিশ সদস্য চামেলীবাগ এলাকা দিয়ে যার যার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান এরপর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

পুলিশের প্রথম প্রতিরোধযোদ্ধা কনস্টেবল বাবর আলী-এর ভাষ্য : ২৫ মার্চ ১৯৭১, রাত ৯.৩০ আমার ডিউটি ছিলো অস্ত্রাগারে। রাজারবাগে তখন অস্ত্রের মধ্যে ছিলো থ্রি নট থ্রি এবং মার্ক ফোর রাইফেল। পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে ফেলে যে যার মতো গুলি নিয়ে পুলিশ লাইনস্-এ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন। আমার কাছেও একটা মার্ক ফোর এবং ২০ রাউন্ড গুলি ছিলো। তখন কারো উপর কারো কোনো কমান্ড ছিলো না। রাত ৯.০০টার পরই ঢাকা শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অচল করে দেয়া হয়। রাত আনুমানিক ১১.৪০ মিনিটে পাকিস্তানি সেনারা পুলিশ হাসপাতালের দক্ষিণ দিক থেকে ভারী গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশ লাইনস্-এ বিভিন্ন জায়গা, চার তলার বিভিন্ন ফ্লোর ও ছাদে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা বিচ্ছিন্নভাবে ছিলেন এবং থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে ছাদের উপর ও প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে পাকিস্তানী সৈন্যদের লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি বর্ষণ শুরু করেন। পাকিস্তানি বাহিনী এ ধরনের প্রতিরোধের কথা ভাবতেও পারেনি। তাই পাল্টা আক্রমণে তারা থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু এর পরই ট্যাংক, মর্টার, ভারী মেশিনগান ইত্যাদি নিয়ে চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ লাইনস্-এ ওপর। রাত আনুমানিক ৩.৪৫ মিনিটের দিকে দখল নেয় রাজারবাগের। তখন আমার কাছে মাত্র এক রাউন্ড গুলি অবশিষ্ট ছিলো। আমি স্যানিটারি পাইপ বেয়ে চারতলার ছাদ থেকে নেমে তৎকালীন অফিসার্স কোয়ার্টার-এর পাশ দিয়ে চামেলীবাগ মসজিদে গিয়ে অবস্থান নিই। এরপর নিজ এলাকা টাঙ্গাইল গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।…………….. (চলবে)

তথ্যসূত্র :

মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ

লেখক : অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x