ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আশরাফুল ইসলাম বিপিএম

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অর্থনৈতিক মুক্তির চিন্তা-চেতনা থেকেই তাঁর রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করেছেন। তাঁর সারাজীবনের রাজনৈতিক দর্শন এবং রাজনৈতিক দাবি/ দাওয়া বা আন্দোলনগুলো এবং তাঁর কর্মসূচির মূল তাগিদ ছিল বাংলার শোষিত আর বঞ্চিত মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং অর্থনৈতিক মুক্তি তথা জীবনমানের উন্নতি। তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল দর্শন মূলত পাকিস্তানের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য কী করে মোকাবিলা করা যায়, সেই চিন্তা থেকে। ১৯৫৪ সালের যে নির্বাচনে তিনি দুই অঞ্চলের মানুষের বৈষম্য দূর করার দাবি তীব্রভাবে তুলে ধরেছিলেন। ফলে ওই নির্বাচনে জিতে তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রে বেশি দিন টিকতে পারেনি। তাঁকে জেলে যেতে হয়। মুক্ত হয়েই দল গোছাতে সারা দেশ চষে বেড়ান। প্রদেশিক সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হয়ে ভালোভাবে বুঝতে পাড়ছিলেন যে বাঙালিদের শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন বলে তৎকালীন অর্থনীতিবিদরাও গবেষণা, লেখালেখি এবং বলতে শুরু করলো। তিনি বুঝলেন শিল্পে উন্নতির জন্য দরকার শক্তি আর সেই যুগেই তিনি ভাবলেন পারমাণবিক শক্তির কথা। পর্যায়ক্রমে শুরু হলো পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শিল্প, কল-কারখানা চালানো তথা দেশের উন্নতি করার কার্যক্রম। পর্যায়ক্রমে পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পের জন্য পূর্ব বাংলার স্থান নির্ধারণ ও পরীক্ষা চলতে থাকে। দেশে স্বাধীন হলো। প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যেগে গ্রহণ করলেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার প্রকল্পের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছিল। ১৯৭২-১৯৭৫ এর মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যেগ গ্রহণ করেন। তারই ফলে আজকের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্রমবিকাশ

সময় ক্রমধারা                       কার্যক্রম

স্থান নির্বাচন ১৯৬২-১৯৬৮- বারবার জরিপ ও সমীক্ষা করে সর্বশেষ পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার পদ্মা নদীর তীরবর্তী রূপপুর-কে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

প্রকল্প বাতিল ১৯৬৯-১৯৭০- শিল্প কারখানার জন্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ২০০ মেগা-ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাতিল করে দেয়।

পুনরায় চালু ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত- স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২০০ মেগা-ওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

ফিজিবিলিটি স্টাডি ১৯৭৭-১৯৮৬- তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মেসার্স সোফরাটম কর্তৃক পরিচালিত ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়।

ফিজিবিলিটি স্টাডি ১৯৮৭-১৯৮৮- জার্মানী ও সুইজারল্যান্ডের দুটি কোম্পানি কর্তৃক দ্বিতীয়বার ফিজিবিলিটি স্টাডি করে ৩০০-৫০০ মেগা-ওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করে।

অ্যাকশান প্লান্ট ১৯৯৭-২০০০  বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট-২০০০০ অনুমোদিত হয়।

নির্বাচনী ইশতেহার

২০০৮  আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার।

 কার্যক্রম শুরু ২০০৯   পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রাথমিক কার্যাবলী ও পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যক্রম শুর করা হয়।

সমঝোতা স্মারক

১৩ মে ২০০৯   বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশান ফেডারেশনের স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি কর্পোরেশন (রোসাটোম)-এর মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

Framework Agreement ২১ মে ২০১০   বাংলাদেশ সরকার এবং রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক Framework Agreement স্বাক্ষরিত হয়।

সংসদে প্রস্তাব

১০ নভেম্বর ২০১০        জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সিদ্ধন্ত প্রস্তাব গ্রহণ।

সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি

২০১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক মিঃ ইউকিআ আমানো বাংলাদেশ সফর করেন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে আইএইএ থেকে সব ধরণের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।

INIR ৯-১৫ নভেম্বর ২০১১         বাংলাদেশের পারমাণবিক অবকাঠামোর সার্বিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য IAEA Integrated Nuclear Infrastructure Review (INIR) mission পরিচালিত হয়।

চুক্তি স্বাক্ষর ২০১১         বাংলাদেশ এবং রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত আন্তরাষ্ট্রিয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

আইন পাশ ২০১২         Bangladesh Atomic Energy Regulatory Act-২০১২ পাশ করা হয়।

উদ্বোধন ২০১৩ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। 

আইন জারি ২০১৫       পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের Operating Organization প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বিধান সম্বলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আইন, ২০১৫ জারি করা হয়।

Licence প্রদান ২১ জুন ২০১৬   বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যৎ কেন্দ্রের Site Licence দেওয়া হয়।

কার্য সম্পাদন চুক্তি

২৬ জুলাই, ২০১৬        পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল পর্যায়ের কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে স্টেট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষর।

ব্যবহারের সহযোগিতা চুক্তি ২০১৭        পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার এবং গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপ (জিসিএনইপি), ভারতের পরমাণু শক্তি সংস্থা, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।

ইউনিট উদ্বোধন ৩০ নভেম্বর ২০১৭      রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নং ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন।

এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি বিভাগ, ডিএমপি, ঢাকা কর্তৃক রাশিয়ার ডেলিগেট তথা সব কূটনৈতিক’কে নিরাপত্তা দেওয়া যাচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সর্ববৃহৎ বিদেশী বিনিয়োগ নির্বিগ্নে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্টদূত ও কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করে যাচ্ছে, ফলে পূথিবীর অন্যান্য বিনিয়োগকারী দেশ বিশেষ করে চীন, জাপান, কোরিয়া, আমেরিকাসহ জাতিসংঘ সহযোগী দেশ ও সংস্থা এদেশে ব্যাপক বিনিয়োগ করে আসছে।

এ বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনায় রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আগমন এবং বাংলাদেশ থেকে রাশিয়া গমন সংক্রান্ত নাগরিকগণের নিরাপত্তায় ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি বিভাগ, ডিএমপি, ঢাকা  গত ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে প্রায় চারশত চল্লিশ টি পুলিশ এস্কর্ট দেয় এবং প্রায় নব্বইটি বিভিন্ন প্রকার অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে এ সব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত/হাইকমিশনার/কূটনৈতিকবৃন্দ এবং বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত থাকেন। তাদের এ সব অনুষ্ঠানে ডিপ্লোমেটিক পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তা দিয়ে থাকে এবং বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তাবায়িত (১) রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প (২) পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজে নিয়োজিত বিদেশী বিশেষজ্ঞদের যাতায়াতে নিরাপত্তা দেওয়া ও জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।  

বিশেষভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গত ০১-০১-২০২১ খ্রিঃ থেকে ১৩-০৭-২০২১ খ্রিঃ পর্যন্ত মোট ২৮ বার বাংলাদেশ হতে ২২৯৩ জন রাশিয়ান নাগরিক নিজ দেশে গমন এবং ২৮ (আঠাশ)  বার ২৫৯৬ জন রাশিয়ান নাগরিক নিজ দেশ থেকে বাংলাদেশে আগমন করেছেন। অর্থাৎ সর্বমোট ২২৯৩+২৫৯৬=৪৮৮৯ জন তাদের নিরাপত্তার জন্য ৫৬টি স্কর্টে (প্রতি স্কর্টে পাঁচ জন করে) মোট ২৮০ জন পুলিশ সদস্য এবং ৫৬টি যানবাহন তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল। আশা করা যায় আগামী ২০২৩ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন করা হবে।

[সূত্র : প্রথম আলো, ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি বিভাগের অফিস নথি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পত্রলিপি]

লেখক :  উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিপ্লোঃসিকিঃ)

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *