ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ রবিউল ইসলাম পিপিএম-সেবা

মায়ানমার থেকে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত; বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফ থানাধীন ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এপিবিএন পুলিশ দায়িত্বরত। এফডিএমএন (Forcibly Displaced Myanmar Nationals) সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় প্রতিনিয়ত। বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে রোহিঙ্গা দুষ্কৃতকারীরা ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটাতে সবসময় তৎপর। তবে তাদের এই অপতৎপরতাকে রুখে দিতে সম্প্রতি চালু করা হয় শান্তিকামী এফডিএমএন সদস্য দ্বারা স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা।

গত ২২ অক্টোবর ২০২১ খ্রি. তারিখে ক্যাম্প-১৮ এর ‘জামেয়া দারুল উলুম নাদুয়াতুল ওলামা আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা’য় রোহিঙ্গা দুষ্কৃতকারীরা ছয় জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লাহ হত্যাকা- ও নারকীয় ছয় মার্ডারের পর এফডিএমএন সদস্যরা নিরাপত্তা প্রশ্নে দিশেহারা হয়ে পড়ে। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীকে প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে দুষ্কৃতকারী, চাঁদাবাজ, অপহরণকারী, মুক্তিপণ দাবিকারী, নারী নির্যাতনকারীদের নির্যাতন নিষ্পেষণ থেকে শান্তির বলয়ে নিয়ে আসা যায় তা আমার চেতনাকে বার বার নাড়া দিয়ে গেল। আমার মাথায় এলো ‘এফডিএমএন সদস্যদের দ্বারা স্বেচ্ছা পাহারার চিন্তা’।

গত ২৩ অক্টোবর ২০২১ খ্রি. তারিখে আমার দায়িত্বাধীন শফিউল্লাহকাটা ক্যাম্প-১৬ ও জামতলি ক্যাম্প-১৫ এর সব অফিসার ও মাঝিদের সঙ্গে স্বেচ্ছা পাহারা নিয়ে সভা করি। অতঃপর দুটি ক্যাম্পে স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালু করি। উল্লিখিত দুইটি পুলিশ ক্যাম্পের ১৪৭টি সাব-ব্লকে পাঁচ জন করে মোট ৭৩৫ জন স্বেচ্ছা পাহারা দিতে থাকে। ১৫ দিন পর এই স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থার ফলাফল মূল্যায়ন করে দেখা গেল দুষ্কৃতকারীদের অপরাধ সংঘটন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের সহজ বক্তব্য ছিল ‘তোমরা পাঁচ জন আজকে একটি সাব-ব্লকে পাহারা দিচ্ছ, ক্যাম্পের সাব-ব্লকের প্রায় ৫০০ জন মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারছে। আগামীকাল অন্য পাঁচ জন পাহারা দেবে, তোমরা শান্তিতে ঘুমাবে। এভাবে ১৫-২০ দিন পর তোমাদের পাহারা পড়বে’। তারা এটিকে অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন এবং তা বাস্তবায়নে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। শান্তিকামী এফডিএমএন (Forcibly Displaced Myanmar Nationals) সদস্যরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাহারা দিতে থাকল।

এর সুফল সম্পর্কে অধিনায়ক (পুলিশ সুপার) মহোদয়কে অবহিত করি। তিনি ৮ নভেম্বর ২০২১ খ্রি. তারিখ থেকে আমার চালু করা স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা অন্য আটটি এফডিএমএন ক্যাম্পে চালু করার জন্য ক্যাম্প কমান্ডারদের নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্যে, ৮ এপিবিএন এর আওতাধীন ১১টি এফডিএমএন ক্যাম্পে ৬৪টি ব্লকে ৭৭৩টি সাব-ব্লক রয়েছে। এক সাব-ব্লক থেকে অন্য সাব-ব্লকের গড় দূরত্ব ৫০-৬০ মিটার। মোট লোকসংখ্যা তিন লাখ ৬২ হাজার ২১৮ জন। প্রতিটি সাব-ব্লকে গড়ে বাস করে ৪৬৮.৫৮ জন। প্রতিটি সাব-ব্লকে গড়ে স্বেচ্ছা পাহারা সক্ষম পুরুষের সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০ জন। প্রতিরাতে একটি সাব-ব্লকে পাঁচ থেকে ১০ জন করে পাহারা দিচ্ছে। প্রত্যেকটি ক্যাম্পের এক্সিট এন্ট্রি পয়েন্টে পুলিশের সাথে ১৫ থেকে ২০ জন এফডিএমএন সদস্য স্বেচ্ছা পাহারা দেয়। এই হিসেবে প্রতি রাতে স্বেচ্ছা পাহারা দিচ্ছে তিন হাজার ৮৬৫ জন। ১৫ থেকে ২০ দিন পর একজন পাহারাদারের পাহারা পড়ে। অর্থাৎ এক রাত পাহারা দিলে ১৫ হাজার ২০ দিন শান্তিতে ঘুমানো যায়। প্রতিদিন ক্যাম্পের চীফ মাঝির (এফডিএমএন ক্যাম্পের প্রধান নেতা) মাধ্যমে নির্ধারিত ফরমে পাহারাদারদের তালিকা পুলিশ ক্যাম্পে পাঠানো হয়।

এ ব্যবস্থায় পুলিশ তিন স্তরে ক্যাম্পের পাহারা দায়িত্ব মনিটরিং করে। প্রথম স্তর-ক্যাম্পের নির্দিষ্ট ডিউটি পার্টি, দ্বিতীয় স্তর-ক্যাম্পের নিজস্ব তদারকি পার্টি, যা পুলিশ পরিদর্শক/এসআই এর নেতৃত্বে তদারকি হয়। তৃতীয় স্তর-এএসপি/এডিশনাল এসপির নেতৃত্বে সব ক্যাম্পে পাহারা দায়িত্ব তদারকি করা হয়। সার্বিক তদারকি অধিনায়ক মহোদয় করে থাকেন।

৮ এপিবিএন ১৭ জানুয়ারি ২০২১ খ্রি. তারিখে এফডিএমএন ক্যাম্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর আগ অর্থাৎ ২২ অক্টোবর ২০২১ খ্রি. তারিখ পর্যন্ত ০৯ মাসে বিভিন্ন মামলায় ২০৮ জন দুষ্কৃতকারী গ্রেফতার হয়। দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, ০৯ রাউন্ড গুলি, ৯৪টি দেশীয় অস্ত্র, চার লাখা ১৯ হাজার ৮৮৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১৮ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হয়। স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর পর থেকে অর্থাৎ ২৩ অক্টোবর ২০২১ খ্রি. তারিখ থেকে  ১০ মার্চ ২০২২ খ্রি. তারিখ পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে বিভিন্ন মামলায় ৫৬৫ দুষ্কৃতকারী গ্রেফতার হয়। ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৩৩ রাউন্ড গুলি, ৬৬টি দেশীয় অস্ত্র, আট লাখ ৫৩ হাজার ৮০৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও ৪৯ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার হয় এবং ক্যাম্প ইতিহাসে প্রথম ক্লুলেস মার্ডার ডিটেকশন হয়। স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর আগের এবং পরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বেচ্ছা পাহারা চালুর পর একই সময়ে দুষ্কৃতকারী গ্রেফতার বেড়েছে ছয় গুণ, আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার বেড়েছে ৯ গুণ, মাদক উদ্ধার বেড়েছে চার গুণ ও স্বর্ণ উদ্ধার বেড়েছে সাড়ে পাঁচ গুণ। এফডিএমএন সদস্যদের অভিমত যে, স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা চালুর পরে ক্যাম্পগুলোতে ৯০% অপরাধ কমে গেছে।

স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থার মাধ্যমে এফডিএমএন সদস্যরা নিজস্ব নিরাপত্তা ও শান্তির প্রশ্নে দায়িত্বশীল হয়েছে এবং তাদের মনস্তত্ত্বে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অপরদিকে জালের মতো বিস্তৃত স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থায় দুষ্কৃতকারীরা পুলিশি অভিযানে একের পর এক গ্রেফতার হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় জঙ্গিবাদ, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা- প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তি, বিভিন্ন সংস্থার কর্মকা- মনিটরিং সহজ হচ্ছে। ক্যাম্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুলিশ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্যাম্পে শান্তি, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে আস্থার সর্ম্পক তৈরি হয়েছে। বহুমাত্রিক সংগঠনের কর্মযজ্ঞের মধ্যে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এপিবিএন পুলিশ আরো কৌশলী, উদ্যমী ও দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়েছে। পাশাপাশি হোস্ট কমিউনিটির জন্য একটি নিশ্চিত নিরাপত্তা বলয় ও শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের পরিবেশ বিনির্মিত হয়েছে।

এ ধারা অব্যহত থাকলে ক্যাম্প এলাকায় কোন রোহিঙ্গা দুষ্কৃতকারীর মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা ক্ষীণ। উল্লেখ্যে, এ বিশাল স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা’র কারণে ক্যাম্প এলাকায় শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টির পথ সুগম হয়েছে। এর ইতিবাচক ফলাফল বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৮ এপিবিন এর চালু করা স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা ১৪ ও ১৬ এপিবিএন- এ ও চালু হয়েছে। এ পদ্ধতিটি শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় নয় সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল যেমন- চরাঞ্চল, হাওড় অঞ্চল, বনাঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল ও প্রতিটি জেলায় চালুকরণের মাধ্যমে চুরি, ডাকাতি, মাদক, ছিনতাইসহ নানাবিধ অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে মাইলফলক হবে বলে আমি মনে করি। এ প্রক্রিয়ায় পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে।

লেখক : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *