ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ফরিদা ইয়াসমিন

গ্রীষ্মের খর রৌদ্রে তপ্ত রাজপথ। সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই বিশাল অট্টালিকা ভেদ করে সূর্যটা যেন রাস্তার উপর এসে পড়েছে। লকডাউনের কবলে পড়ে ব্যস্ত নগরীতে সুনশান নিরবতা। গার্লস স্কুলটির সামনের ফুটপাতটি পাতি কাকের দখলে। স্কুলের দিকে এগিয়ে আসা রিকশার টুং টাং শব্দে কাকগুলো ফুটপাত ছেড়ে পাশের বিল্ডিং-এর ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। রিকশাওয়ালা মিরাজ আলি রিকশাটি একপাশে রেখে কিছুক্ষণ স্কুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। লোহার বিশাল গেটটি একপাশে খোলা রেখে ভেতরে টুলে বসে ২০ থেকে ২২ বছরের একটি ছেলে মোবাইলে কি যে দেখছে আর ক্ষণে ক্ষণে হাসছে। কিছুক্ষণ পর মিরাজ আলিকে দেখে ধমকে উঠে এই তুমি কি চাও? কয়েকদিন ধরে দেখছি  স্কুলের সামনে এসে ঘুরাঘুরি করছো। কি চাও? দেখতে পাচ্ছো না স্কুল বন্ধ।

হ্যাঁ বাবা, দেখতেই তো পাচ্ছি। স্কুল তো আজ দেড় বছরের বেশি হলো বন্ধ। তা এখানে যে সিকিউরিটি মাইনুল ভাই ছিল সে কোথায়? তাকে একটু দরকার ছিল।

বাবার শরীর ভালো না দেশে চলে গেছে।

ও, তুমি মাইনুল ভাই-এর ছেলে। আচ্ছা বাবা, আমি এই স্কুলের সামনে ঝাল মুড়ি, ফুচকা বিক্রি করতাম। বলতে পারো বাবা, স্কুল কবে খুলবে?

শফিক মোবাইল থেকে মুখ না তুলেই বলে যে, তার আমি কি জানি। যান টিভিতে খবর দেখেন গিয়ে।

কি বেয়াদব ছেলে রে বাবা। বাপের বয়সী একটা লোকের সঙ্গে কী ভাবে কথা বলে।

মিরাজ আলী আহত হয়। সে আজ প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এই স্কুলের সামনে ফুচকা বিক্রি করে আসছে। স্কুলের সিকিউরিটি গার্ড মাইনুলের সঙ্গে তার কত খাতির। যখন ক্লাস চলে মাইনুল একটু অবসর পায় গেইটের বাইরে এসে দাঁড়ায়, ঝাল মুড়ি খেতে খেতে কত গল্প করতো।

মিরাজ আলি স্কুলের সামনে ফুটপাতে বসে পড়ে। আজ রিকশা টানতেও ভালো লাগছে না। চোখ মুদে আসে। চোখের সামনে ভেসে উঠে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া গ্রামের বাড়ি। বাবার ঢাকা শহরে চলে আসা। বাবা মন্তাজ আলি এই স্কুলের সামনে ঝালমুড়ি বিক্রি করতো রাতে রিকশা চালাতো। গ্রামের স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়তো মিরাজ আলি। পাঁচটা ভাই-বোন রেখে অকালে বাপটা মরে যাওয়াতে তাকে সংসারের হাল ধরতে হলো। শীর্ণ দেহে রিকশা চালাতে না পেরে বাবার ঝালমুড়ির টুকরিটা নিয়ে এই স্কুলের সামনে এসে দাঁড়ালো। কিছুদিন পরে বস্তি ঘরের পাশে এক চাচীর কাছে ফুসকা ভেলপুরি বানানো শিখে নেয়। তারপর কতদিন পেরিয়ে গেছে। ছোট ছোট মেয়েরা তার বানানো ঝাল মুড়ি খেতে কতই না পছন্দ করতো। ক্লাস ওয়ানে পড়া মেয়েটি এখানেই স্কুল শেষ করে কলেজ যায়, ভার্সিটিতে যায়, ডাক্তার হয় ইঞ্জিনিয়ার হয়। তাদের অনেকের মেয়েও এই স্কুলে পড়ে। তারাও মিরাজ আলির ঝাল মুড়ি, ফুচকা খেতে পছন্দ করে।

এই তো বছর দুই আগে একদিন কি মজার ঘটনাই না ঘটল। মিরাজ আলি স্কুল গেটের সামনে তার খাবারের ভ্যানটি রেখে সব ঠিকঠাক করছিল। একটি দামি প্রাইভেট কার এসে থামল তার সামনে। গাড়ি থেকে নেমে এলো পরীর মতো সুন্দর একটি মেয়ে। শাড়ি পরা মেয়েটির সঙ্গে চার পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটি বাচ্চা মেয়ে। মেয়েটি তার সামনে এসেই, মামা কেমন আছেন? আমাকে চিনতে পারছেন?

মিরাজ আলি মাথা দুলিয়ে হাসে। চিনব না কেন মা, এই  স্কুলের ছাত্রী, তয় নামটা মনে করতে পারছি না।

মামা আমি সিমিন, আম্মু কিছুতেই আপনার ভেলপুরি ফুচকা খেতে দিত না। আপনি লুকিয়ে আমার ব্যাগে দিয়ে দিতেন। মিরাজ আলির মনে পড়ল, এই মেয়েটির আম্মা ডাক্তার। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে যেত আবার বিকেলে নিয়ে যেত। ছোট মেয়ে আর সবার মতো স্কুল ছুটি শেষে মিরাজের ভ্যানের সামনে দাঁড়াত। কিন্তু তার মা কিছুতে তাকে খেতে দিত না।

বেশ দাপুটে মহিলা। মেয়ে কান্নাকাটি করলে মিরাজকে কষে একটা ধমক দিত। এই তুমি কি ছাই পাস বিক্রি করো এখানে। প্রিন্সিপালকে বলে তোমাকে উঠিয়ে দিব। না সিমিন এসব খাওয়া যাবে না। এসব খেলে পেটে অসুখ হবে। এই বলে মেয়েটিকে টেনে গাড়িতে নিয়ে গেল। বাচ্চা মেয়েটির কান্না মিরাজ আলিকে অনেকক্ষন আপ্লুত করে রাখল। সে আজ ১৫-১৬ বছর হলো এই স্কুলের সামনে ঝাল মুড়ি, ফুচকা ভেল পুরি বিক্রি করে। সে মায়েরও মামা মেয়েরও মামা। কেউ তো কখনো এসে বলে নাই মামা আপনার ফুচকা খেয়ে আমার পেটে অসুখ হয়েছে। এই ডাক্তারনী মহিলা অন্য গার্জেনদের সামনে এমন অপমান করে গেল। মিরাজ আলির তখন যুবক বয়স। তার উপর ক্লাশ নাইন পাশ। ব্যবসার একটি বিষয় মিরাজ সেই ছোট বয়সেই শিখেছিল। তাকে সাস্থ্য সম্মত খাবার আর পরিষ্কার-পরিছন্ন থাকতে হবে। তবেই শহরের ছেলে-মেয়েরা তার খাবার খাবে। মিরাজ আলি পরিষ্কার জিন্সের প্যান্ট-গেঞ্জি পরে মাথায় একটা রঙিন হ্যাট লাগায়। আজ ডাক্তারের কথায় তার মনে আঘাত লাগল।

ম্যাডাম আমি আজ ১৫ বছর ধরে এই সব বিক্রি করি। আমার খাবার পরীক্ষা করে প্রিন্সিপাল আপা আমাকে পারমিশন দিছে। স্কুলের একটা সুনাম আছে। ম্যাডাম আপনি নিশ্চিন্তে নিয়ে যান। ছোট মেয়েটির মনে কষ্ট দিয়েন না। ওর পরানে চাইছে। আপনি একটা খেয়ে দেখেন। মিরাজ খুব যতœ করে দুটি ভেলপুরি বানায়। ফুলো ফুলো পুরির মধ্যে ছুরি দিয়ে একটু কেটে বিট লবণ আর মশলা মাখানো শসা টমেটোর পুর ভরে কাগজের ঠোংগায় এগিয়ে ধরে। পাশে দাঁড়ানো আরেক ছাত্রীর মা বলে, খেতে পারেন ভাবী, মিরাজের বানানো পুরি অনেক মজা। ভদ্রমহিলা ইতঃস্ত করে ঠোঙ্গাটি হাতে নিয়ে মেয়েকে দিয়ে বলে, এই একবার, আর কখনো চাইবে না। ভ্যানিটি ভ্যাগ খুলে টাকা বের করতে গেলে মিরাজ বলে, না ম্যাডাম, আজ টাকা লাগবে না। ভালো হলে কাল টাকা দিয়েন।

ডাক্তার মহিলা রক্তচক্ষু নিয়ে ওর দিয়ে তাকায়, এই তোমার জিনিস ফ্রি খাব নাকি? আবার এইসব আমার মেয়েকে খাওয়ানোর ধান্দা করতেছো। ১০০ টাকার একটি নোট এগিয়ে ধরে। মিরাজ কথা না বাড়িয়ে টাকাটি হাতে নিয়ে ভাংতি এগিয়ে দেয়।

কয়েকদিন মেয়েটিকে না দেখে মিরাজের খুব খারাপ লাগে, কিছু হলো না তো বাচ্চা মেয়েটির। দিনসাতেক পরে সিকিউরিটি মাইনুল ভাই একটি কাগজ দেয় হাতে। রোল টানা বাংলা খাতার কাগজ ছিঁড়ে লিখেছে পেন্সিল দিয়ে, মামা আমি সিমিন, আমার আম্মু ডাক্তার, আমাকে দুটো ভেলপুরি দেন। মাইনুল কাগজের টুকরোটি আর ১০ টাকা হাতে দিয়ে বলে সেই ডাক্তার আপার মেয়ে।

স্কুল শেষ হলে সিমিন ভ্যানের কাছে না এসে গাড়িতে গিয়ে উঠে। মিরাজ হাসে। নিমিষে কত কথা মনে পড়ে গেল।

তা মা কেমন আছেন, কোথায় আছেন এখন? মামা আমি বিদেশে থাকি কানাডা, ওখানে জব করি। অনেকদিন পর দেশে এসেছি। মামা আমার মেয়ে রায়া। ওকে আমার স্কুল দেখাতে নিয়ে এসেছি আর আপনার ফুচকা খেতে এসেছি।

সিমিন এই স্কুলে পড়াশোনা শেষ করেছে। তারপর আর তার সঙ্গে দেখা হয় নি। আজ কতোদিন পর কত দূর দেশ থেকে তাকে দেখতে এসেছে। মিরাজ আলির চোখে পানি এসে যায়।

আপনার মেয়েটি কি সুন্দর মামনি। ও কি ঝাল খেতে পারবে?

ও পারবে না মামা, আপনি আমাকে দিন। তার পর ওখানে দাঁড়িয়ে হুশ হাশ শব্দ করে ফুচকা খায়। ঠিক যেন ১০-১২ বছর আগের দুই বেনি করা সিমিন বান্ধবীদের সঙ্গে দাড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে। গাড়ি থেকে একটা প্যাকেট বের করে তার হাতে দেয়। একটা পাঞ্জাবী, বিদেশী সাবান-চকোলেট।

আজ এই লকডাউনের মধ্যে স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে কত কথা মনে পড়ছে মিরাজ আলির। তীব্র রোদে তার চোখ মুখ বেয়ে ঘাম ঝরছে। রাস্তার ওপাশে একজন দুজন নারী-পুরুষ জড় হতে থাকে। টিসিবির ট্রাক আসবে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে। সরকার স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য ভালো ব্যবস্থা করেছে। চাল-ডাল কেনা যাবে কম দামে। এই ভরসায় অল্প সময়ের মধ্যে লাইন বড় হতে থাকে। মিরাজ আলি আকাশে দিকে তাকায়। রোদে চোখ জ্বালা করে উঠে। সু-উচ্চ ফ্লাটবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট দুটি ছেলে-মেয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আহারে, বাচ্চারা কতদিন এভাবে বন্দি থাকবে- কে জানে!

চা-এর একটা ফ্লাক্স ও পলিথিনে কিছু বিস্কুট নিয়ে আলমগীর এসে দাঁড়ায় তার সামনে। আরে মিরাজ ভাই কেমন আছো?

এই তো আল্লাহ রাখছে। তা তুমি কেমন আছো? এই লকডাউনের মধ্যেও চা বিকাইতেছো? পুলিশে ধরে না?

কি করুম ভাই, ধরছিল দুইবার ফাইন করে ছাইড়া দিছে। আগের মতো বেচা-বিক্রি নাই। তোমার কি অবস্থা?

আর অবস্থা! বৌ মাইয়া সব দেশে পাঠাইয়া দিছি। সব ফালাইয়া এই শহরে আইসিলাম কত আশা নিয়া। করোনা সব শেষ কইরা দিল। এখন গ্যারেজের পাশে একটা ঘর লইয়া চারজন থাকি। রিকশা চালাই। শরীরে শক্তি নাইরে ভাই, রিকশাও টানতে পারি না কেমন হাফ লাগে। দেও দেখি এক কাপ চা।

আলমগীর প্লাস্টিকের কাপে এক কাপ চা ঢালে। দুটি বিস্কিট দেয়। খাও মিরাজ ভাই। কি দিন কি হইয়া গেল কবে যে স্কুল খুলবে।

আমিও সেটাই চিন্তা করি। আর কয়দিন এভাবে টিকা থাকতে পারব। তারপর দুজনে সেই রোদের মধ্যে বসেই কিছুক্ষণ গল্প করে। সংসারের গল্প। মিরাজের তিন মেয়ে। বড় মেয়েটির বিয়ে দিয়েছে। জামাই-এর গ্রামের বাজারে দুটি দোকান আছে। কিছু জমি জমাও আছে। ভালই আছে মেয়েটা। ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে বউকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।

আলমগীর বউ আর ছোট দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে বস্তিতে থাকে। বউ ছুটা বুয়ার কাজ করতো। করোনার জন্য বাসা-বাড়িতে কাজ বন্ধ। জমানো টাকা খেয়েও শেষ। মাঝে মধ্যে এখান থেকে ওখান থেকে কিছু সাহায্য পেয়েছে। তাতে আর কয়দিন চলে। আলমগীর দীর্ঘশ^াস ফেলে। এই গজব যে আর কতদিন চলবে! এরই মধ্যে টিসিবির ট্রাকটা এসে সামনে দাঁড়ায়। গাছের নিচে অপেক্ষমাণ নারী পুরুষ লাইনে এসে দাঁড়ায়। আলমগীর মিরাজ আলির কাছ থেকে বিদায় নেয়। ভাই যাই লাইনে দাঁড়াই, যদি কিছু চাল-ডাল আজকে পাওয়া যায়। তিন দিন এসে ফিরে গেছি। আজ না নিলে খাবার জুটবে না।

মধ্য বয়সী বোরখা পরা এক নারী একটা সয়াবিন তেলের বোতল আর একটা বাজারের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে আসে মিরাজের রিকশার দিকে। মাস্ক পরা থাকলেও কাছে আসলে মিরাজ আলি চিনতে পারে। এই স্কুলের ছাত্রী নিশি শশীর আম্মা। ওদের বাবাকেও দেখেছে সে। মেয়েদের বায়না মেটাতে প্রায়ই স্কুল থেকে নেওয়ার সময় মিরাজের বানানো ফুচকা খেয়েছে মেয়েদের সঙ্গে। ভালো ব্যবসায়ী। ঈদের সময় স্কুল বন্ধের আগে মিরাজকে বখশিসও দিয়েছে কতবার। মিরাজ কথা না বলে থাকতে পারে না। আপা, ভালো আছেন? আমি মিরাজ, স্কুল গেইটে ফুচকা বিক্রি করতাম। মামণিরা কেমন আছে? ভাইজান কেমন আছে?

হঠাৎ বাতাসে মাথা থেকে ওড়নাটা পড়ে যায়। ভদ্র মহিলা হতবিহ্বল হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। ও মিরাজ আলী! রোদে লাল হয়ে যাওয়া মুখটা একরাশ বেদনা এসে ভিড় করে। নিশি শশীর মা বলে ওদের বাবা তো নেই মিরাজ। গত বছর করোনায় ………………..।

আর বলতে পারে না। রিকশায় উঠে বসে। মিরাজ আলি কোনো কথা না বলে রিকশার হুটটি টেনে দেয়। তারপর আদ্র চোখে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে প্যাডেল ঘুরায়।

লেখক : বিশেষ পুলিশ সুপার (পাসপোর্ট)

স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *