ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

নূরে আলম সিদ্দিকী শান্ত

গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করার মাধ্যমে নিপুণ শিল্পদক্ষতায় সাধারণ যন্ত্রপাতি দ্বারা যেসব সামগ্রী তৈরি করে তাকে লোকশিল্প বলে। সহজ কথায় লোকশিল্প হচ্ছে সাধারণ লোকের জন্য সাধারণ লোকের সৃষ্টিকর্ম। সাধারণ মানুষ জীবনের প্রয়োজনে যেসব কাজ করে থাকে, তার ভেতরের সৌন্দর্য এবং আনন্দটুকুই হচ্ছে লোকশিল্প। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি মাটির পাতিল বানানো হলে যখন এটিকে সুন্দর করে অঙ্কন বা রঙ করা হয় তখন তা হয়ে উঠে আদর্শ লোকশিল্প। লোকজ চারু ও কারুশিল্পকে সংক্ষেপে লোকশিল্প বলা হয়। চিত্র, ভাস্কর্য, স্থাপত্য হচ্ছে লোকশিল্পের প্রধান তিনটি শাখা। লোকশিল্প সৃষ্টিতে প্রকৃতি থেকে সহজলভ্য উপাদান বা বস্তুগুলো ব্যবহার করা হয়। যেমন মাটি, বেত, লোহা, তামা, কাসা, ধাতব দ্রব্য, পাট, সুতা, ঝিনুক, চামড়া ইত্যাদি। এসব উপাদান ব্যবহার করে শিল্প তৈরিতে অবদান রাখেন কামার, কুমোর, তাঁতি, কাসারু, পটুয়াসহ বিভিন্ন পেশাদার এবং ঘরের বধূ বা গৃহিণীর মতো অপেশাদার মানুষও। উপকরণ, ক্যানভাস ও রীতি অনুযায়ী লোকশিল্পকে অঙ্কন, সূচিকর্ম, বয়নশিল্প, আদর্শায়ন, ভাস্করণ, স্থাপত্যশিল্প এ ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়। ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব বা বিশেষ দিবসে রঙ তুলির ব্যবহারে সড়ক, মেঝে, দেয়াল, ঘরের খুঁটিতে আল্পনা আঁকা হয়। মাটির কলস, সরা, পিঁড়ি, পূজার দেবী, মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা অঙ্কনের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়। যাকে অংকন লোকশিল্প বলে। রঙিন বেতের তৈরি পাটি, পাতা বা সুতার তৈরি নকশী পাখা হচ্ছে বয়নশিল্প। গ্রাম বাংলার নারীদের সূচের ব্যবহারের মাধ্যমে রঙিন সুতায় দৃষ্টিনন্দন মাছ, পাতা, ফুল, পাহাড়-পর্বত, পশু-পাখির নকশায় তৈরি নকশিকাঁথাকে বলা হয় লোকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ সূচিশিল্প। মাটি-কাঠ-ধাতুর তৈরি পুতুল এবং খেলনা, দেবমূর্তি, নকশি পিঠা আদর্শায়নের অন্তর্ভুক্ত লোকশিল্প। এছাড়া কাঠের খোদাই শিল্প, পোড়ামাটির ফলকচিত্র, বাড়ি, দরজা, খাট, পালঙ্ক, দেশীয় বাদ্যযন্ত্রকে ভাস্করণ লোকশিল্প বলা হয়। আর আবহমান বাংলার চিরচেনা সংস্কৃতির ঘর-বাড়ি, দালানকোঠা, মসজিদ মন্দিরের অবকাঠামোগত গঠনকে বলা হয় লোকশিল্পের স্থাপত্যশিল্প। প্রাচীনকাল থেকে শিল্পমনা বাঙালির চর্চিত এই লোকশিল্প আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পরিচায়ক। বাংলার লোকশিল্পের রয়েছে বিশ্বব্যাপী গৌরবের ইতিহাস। যেমন আমাদের ঢাকাই মসলিন শাড়ি একসময় পুরো পৃথিবীর মানুষের হৃদয় কেড়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের জামদানি, গ্রামীণ নারীদের তৈরি নকশিকাঁথা, সিলেটের শীতলপাটি, খুলনার মাদুর, বাশ-বেত শিল্প এবং পোড়ামাটি দ্বারা তৈরি শিল্পেরও রয়েছে বেশ কদর। মৃৎশিল্পীদের তৈরি পোড়ামাটির হাঁড়ি, পাতিল, সানকি, কলস, ফুলদানি, পুতুল আমাদের লোকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৩ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনোস্কো জামদানিকে বাংলাদেশের অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ২০১৬ সালে ইউনেস্কো সিলেটের শীতল পাটিকে বিশ্বের নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের লোকশিল্প নিঃসন্দেহে বিশ^দরবারে পেয়েছে অনন্য এক মর্যাদা। মূর্তা গাছের বেতী দিয়ে তৈরি এই শীতলপাটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিদর্শন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সিলেট অঞ্চলের এই শীতল পাটির ঐতিহ্য শত বছরের পুরোনো। বৃহত্তর সিলেটের বালাগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের নিচু এলাকার এক শতাধিক গ্রামের প্রায় চার হাজার পরিবার শীতলপাটি বুননের সঙ্গে জড়িত। দক্ষ পাটিয়ালরা বুননের মাধ্যমে পাটিতে বিভিন্ন চিত্র যেমন জ্যামিতিক নকশা, ফুল, পাখি, লতা-পাতা, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি ফুটিয়ে তোলেন। জামদানি ২০১৬ সালে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। নারায়ণগঞ্জের তারাবো ইউনিয়নের ১৪ গ্রামের মানুষ এখনো জামদানি তৈরির সঙ্গে জড়িত। বয়নশিল্পীরা হস্তচালিত তাঁতে সুনিপুণ দক্ষতায় পান্না হাজার, বুটিদার, তেরছা, ডুরিয়া, পুইলতা, জুঁইবুটি, আঙুরলতা, জবাফুল, প্রজাপতিসহ নানা নকশা জামদানিতে ফুটিয়ে তুলেন। দৃষ্টিনন্দন ও টেকসই এ জামদানির বিদেশে রয়েছে বেশ কদর। বাংলাদেশের লোকশিল্পের সংরক্ষণ, বিকাশ ও সবার মাঝে লোকশিল্পের গৌরব তুলে ধরার প্রয়াসে ১৯৭৫ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফাউন্ডেশনটির লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে দেশের লোকশিল্পের নানা ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানে যুগের আধুনিকায়ন, শিল্প বিপ্লব এবং প্লাস্টিক পণ্যের রাজত্বে কারণের বাংলার লোকশিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। লোকশিল্প হচ্ছে যেকোনো জাতির জীবনধারার নির্দেশক। একটি জাতির আত্মপরিচয় জানতে লোকশিল্পের গুরুত্ব অপরিহার্য। তাই আমাদের দেশের লোকশিল্পের সংরক্ষণ এবং সম্প্রসারণ করা অতীব জরুরি। কালের বিবর্তনে সমৃদ্ধ এই শিল্প যেন হারিয়ে না যায়, তার দায়ভার গ্রহণ করা বাঙালি হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য।

লেখক : কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক ।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *