ই-পেপার

মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

পূর্বে প্রকাশের পর….

স্তর- ৫ দলগত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার (পিআরবি-১৫৩):

বে-আইনী সমাবেশের দলনেতা ও অন্যান্য সদস্যদের সাথে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য সমঝোতার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে এবং বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বরং নতুন শক্তি সঞ্চয় করে নিম্নোক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে:

৫.১ যাতে দেহের বা সম্পত্তি সম্পর্কিত ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় (১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ১০০, ১০৩ ধারা)। যথা:

ক)       এরূপ আক্রমণ যা এমন যুক্তিসঙ্গত আতঙ্ক সৃষ্টি করে যে প্রকারান্তরে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতই হইবে অনুরূপ আক্রমণের পরিণতি।

খ)        সাধারণ মানুষ বা পুলিশ সদস্যদের অপহরণ বা আটকের অভিপ্রায়ে আক্রমণ।

গ)        গুরুতর প্রকৃতির অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধ করার জন্য যার ফলশ্রুতিতে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

ঘ)        বাসগৃহ বা সম্পত্তি সংরক্ষণের স্থানরূপে ব্যবহৃত হয় এমন ইমারত, ভবনে অগ্নিসংযোগ করে ক্ষতিসাধন             করলে।

ঙ)        ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও তান্ডবলীলা চালিয়ে সাধারণ মানুষ ও পুলিশ সদস্যদের হতাহত করলে ও জানমালের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করলে।

৫.২ বে-আইনী জনসমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে ক্রাউড কন্ট্রোল টেকনিক অবলম্বন করে ব্যর্থ হলে যখন প্রাণ ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অর্থাৎ অন্য কোন উপায় না থাকে তখন Tactical Light Team দিয়ে প্রয়োজনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে Collective Fire Arms, High Powerful Weapons এর মতো ডেডলী ফোর্স ব্যবহার করিয়ে আক্রমণকারীকে গুরুতর আঘাত এমন কি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো যেতে পারে। দেহ বা সম্পত্তি সম্পর্কিত ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার যুক্তিযুক্ত আতঙ্ক সৃষ্টি হইবার সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ হয় এবং যতক্ষণ আতঙ্ক অব্যাহত থাকে ততক্ষণ বলবৎ থাকে। তবে কখনোই এই সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজনের অতিরিক্ত আরোপ করা যাবেনা এবং অবৈধ জনতা ছত্রভঙ্গ হওয়ার প্রবণতা দেখালেই শক্তি প্রয়োগের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। এই পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে প্যারা মিলিটারী ও অন্যান্য ফোর্সের সাহায্য গ্রহণ করতে হয়।

শক্তি প্রয়োগের মূলনীতিসমূহ / Basic Principles of Use of Force:

Proportionality/ সমানুপাতিকতা / সামঞ্জস্য বিধান:

*          শক্তি প্রয়োগের মাত্রা আইনসম্মত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ঝুঁকি বা বিপদের আশংকার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

*          পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনি¤œ শক্তি প্রয়োগ করা যাবে।

*    Legality / বৈধতা:

*          কেবলমাত্র আইনসম্মত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য শক্তি প্রয়োগ করা যাবে।

*          বেআইনি শক্তি প্রয়োগের জন্য কোন ব্যতিক্রম বা ওজর আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না।

Accountability / জবাবদিহিতা:

*          শক্তি প্রয়োগের সকল ঘটনা যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর রিপোর্ট করতে হবে এবং তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যাচাই করতে হবে।

*          উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হলে তাকে দায় দায়িত্ব বহন করতে হবে।

*          উর্ধ্বতনের অবৈধ আদেশকে শক্তি প্রয়োগের আইনসম্মত বৈধতা হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।

*          আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

Necessity/ প্রয়োজনীয়তা:

*          প্রথমে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

*          কেবলমাত্র জরুরি পরিস্থিতিতে সর্বনিম্ন শক্তি প্রয়োগ করা যাবে।

*          সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজনের অতিরিক্ত আরোপ করা যাবেনা এবং অবৈধ জনতা ছত্রভঙ্গ হওয়ার প্রবণতা দেখালেই শক্তি প্রয়োগের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে।

শক্তি প্রয়োগ কার্যক্রমের সময় লক্ষণীয় বিষয়সমূহ:

১. Negotiation (নেগোশিয়েশন):

আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য বে-আইনী সমাবেশের দলনেতাদের সাথে কমান্ডার প্রতিটি পর্যায়েই সমঝোতামূলক আলোচনা চালিয়ে যাবেন।

২. Intelligence Collection (ইন্টেলিজেন্স কালেকশন):

অবৈধ সংঘবদ্ধ জনতার উপর ফোর্স অ্যাপ্লাই করার পূর্বে কমান্ডার ছদ্মবেশে তাঁর নিজের কিছু লোককে জনতার সাথে মিশিয়ে বা সাধারণ এলাকাবাসীকে অবৈধ জনতার সাথে মিশিয়ে মিছিলকারীদের অভিপ্রায়, প্রস্তুতি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত করবেন। অন্যান্য গোয়েন্দা ও সাহায্যকারী সংস্থার সাথে সময়ে সময়ে যোগাযোগ রক্ষা করেও কমান্ডার তথ্য সংগ্রহ করবেন।

৩. Warnings (ওয়ার্নিং)/ সতর্কবাণী/ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ (১৯৪৩ সালের পিআরবি-১৫১। (৪), ১৫৩। (গ)(২) ১৫৪।(ক), ২৫২ বিধি):

শক্তি প্রয়োগের পূর্বে প্রতিটি ধাপেই কমান্ডার সংঘবদ্ধ জনতার উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করবেন এবং ছত্রভঙ্গ হওয়ার জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় দিবেন। ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর জন্য ওয়ার্নিং অবশ্যই পরিষ্কার কিন্তু সংক্ষিপ্ত ভাষায় দিতে হবে। এ ধরনের সতর্কবাণী এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, কারখানার মালিক, অধ্যক্ষ, অফিস প্রধান প্রভৃতি ব্যক্তির মাধ্যমেও প্রদান করা যায় এবং ইহা বারংবার উচ্চারণ করতে হবে। ফায়ার আর্মস দ্বারা ওয়ার্নিং শট পরিস্থিতি শান্ত না করে অনেক সময়ই জটিল করে তোলে বিধায় ইহা পরিহার করা উচিৎ (১৯৪৩ সালের পিআরবি ১৫৫(খ))। বিশেষ প্রয়োজনে ওয়ার্নিং শট কমান্ডারের নির্দেশনা সাপেক্ষে সাউন্ড হ্যান্ড গ্রেনেড বা অন্য কোন উপায়ে দেওয়া যেতে পারে।

৪. বল প্রয়োগের দর্শন:

পুলিশ অফিসার অবৈধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য সর্বাবস্থায় বুদ্ধি-বিবেচনা প্রসূত প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন শক্তি প্রয়োগ করবেন (১৯৪৩ সালের পিআরবি ১৫৪(গ) (ঘ), ১৫৫(গ) (ঘ))।

৫. Escalation (এসক্যালেশন) এবং De-escalation (ডি-এসক্যালেশন) of Force:

* অবৈধ জনতার আক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমাবনতিশীল হলে পুলিশ সদস্যরাও বল প্রয়োগের মাত্রা যুক্তিসঙ্গতভাবে বৃদ্ধি করবেন।

* অবৈধ জনতা আক্রমণের মাত্রা হ্রাস করলে বা ছত্রভঙ্গ হওয়ার প্রবণতা দেখালে দলনেতা পুলিশ অফিসারের দায়িত্ব হবে তাঁর টীমের সদস্যদেরসহ বল প্রয়োগের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া বা বন্ধ করা (১৯৪৩ সালের পিআরবি-১৫৫(ঘ))।

* প্রয়োজন অনুসারে যুক্তিসঙ্গত বল প্রয়োগের মাত্রা হ্রাস বা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে, সংশিষ্ট পুলিশ সদস্যদের উপর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দায়িত্ব বর্তাবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বল প্রয়োগ কেবলমাত্র তখনই করা যেতে পারে যখন যুক্তিযুক্তভাবে আইনসঙ্গত ক্ষেত্র তৈরি হয় (পরিস্থিতি অবহিতকরণ পূর্বক যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে) এবং কখনই প্রয়োজনাতিরিক্ত আরোপ করা যাবে না (ফৌজদারি কার্যবিধি ধারা-১৩০(২); ১৯৪৩ সালের পিআরবি-১৫৫(গ))।

ক্রাউড কন্ট্রোলে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক পুলিশ অফিসারের পূর্ব হতে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ ও কৌশল অবলম্বন করা আবশ্যক। অবিরাম শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং অত্যন্ত ধৈর্য্য ও সহনশীল থেকে অবৈধ জনতার আক্রমণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করতে হবে। কিছুতেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যাবে না।

তথ্যসূত্র:

* ফৌজদারী কার্যবিধি ধারা ৪৬, ১২৭-১৩২

* দন্ডবিধি ধারা ৯৬-১০৬, ১৪৪, ১৪৫

* পিআরবি বিধি ১৩৩-১৫৮

* পুলিশ আইন ৩০, ৩০-ক, ৩১

* DPKO Policy on Graduation Use of Force of Formed Police Units in United Nations Peacekeeping Operations

*    DPKO Directive on Detention, Searches and Use of Force for Members of Formed Police Units

*    United Nations Standard Public Order Management and Basic Police Techniques Manual Pages ৯-১৩

*    Sir Robert Peel, `Principles of Law Enforcement`

* ড. বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার), ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ ডিটেকটিভ এপ্রিল, ২০২০

লেখক : উপ পুলিশ কমিশনার, আরএমপি, রাজশাহী

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x