ই-পেপার

মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

I must be cruel only to be Kind:

Thus bad begins, and worse remains behind.Ó

(William Shakespeare, `Hamlet`)

শক্তি প্রয়োগ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নিজেদের ও  জনগণের জান, মাল ও সম্পত্তি রক্ষার্থে আইনের বিধান মেনে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করার সময় শক্তি প্রয়োগের ধাপগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা আবশ্যক। কিন্তু এই শক্তি প্রয়োগের ধাপগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে অনেক সময়ই আইনের ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হয়, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

‘পুলিশকে মানুষের প্রথম ভরসাস্থল হিসেবে তৈরি করতে চাই। ড. বেনজীর আহমেদ, বিপিএম-বার

পুলিশ প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের ভরসার স্থল হতে হলে পুলিশ সদস্যদের জানতে হবে কোন পরিস্থিতিতে, কখন দুষ্কৃতকারীদের উপর কতটুকু বল প্রয়োগ করা যেতে পারে। নিম্নোক্ত আলোচনা এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুধাবন করে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণে ভূমিকা রাখবে।

শক্তি প্রয়োগ:

শক্তি প্রয়োগ বলতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নিজেদের ও  জনগণের জান, মাল ও সম্পত্তি রক্ষার্থে আইনের বিধান মেনে প্রয়োজনে সর্বনিম্ন শক্তি ব্যবহার করাকে বুঝায়।

Police use physical force to the extent necessary to secure observance of the law or to restore order only when the exercise of persuasion, advice and warning is found to be insufficient.’

— Sir Robert Peel, `Principles of Law Enforcement`

Graduation Use of Force (গ্র্যাজিউয়েশন ইউজ অফ ফোর্স):

উদ্দেশ্য:

জরুরি পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পুলিশ ও অবৈধ জনতার অনুপাত, উপায়, অধিযাচন এবং রাজনৈতিক ইচ্ছানুযায়ী বল প্রয়োগের উদ্দেশ্য হচ্ছে দলবদ্ধ জনতার রাগ প্রশমিত করা এবং নিবারক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের আক্রমণের মাত্রা হ্রাস বা প্রতিহত করা। এভাবে অভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনে জড়ো হওয়া অবৈধ জনতাকে সফল হতে না দেওয়া এবং তাদেরকে সর্বাবস্থায় নিরাপদ দূরত্বে রাখা।

নিম্নে প্রদর্শিত ছকের সব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, অবৈধ জনতাকে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা অনুযায়ী।

‘ইউজ অফ ফোর্সের’ ক্রমান্বয়ে পাঁচ ধাপ

স্তর-১ শারীরিক সংস্পর্শ ব্যতীত অবৈধ জনতাকে বাধা প্রদান

সংঘবদ্ধ জনতা পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে জড়ো হতে থাকলে সাধারণ ইউনিফর্মে পুলিশ সদস্যদের এমনভাবে নিয়োজিত করতে হবে, যাতে জনসাধারণ নিরাপদ বোধ করেন। সংঘবদ্ধ জনতা মিছিল, সমাবেশ বা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শন করার প্রবণতা দেখালে পুলিশ সদস্যরা নিরাপদে দৃশ্যমানভাবে নিয়োজিত হবেন। যাতে মিছিল, সমাবেশে অংশগ্রহণকারী জনতাকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে ও ছত্রভঙ্গ হওয়ার আহ্বান জানালে, তারা সহজতম পথে সেই স্থান ত্যাগ করে দূরীভূত হতে পারেন। এই স্তরে পুলিশের উপস্থিতিতে মিছিল সমাবেশ করা জনতা ও চারপাশে সাধারণ জনগণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং অবৈধ উদ্দেশ্য সাধনে জড়ো হওয়া জনতার উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মিছিল, সমাবেশে অংশগ্রহণকারী জনতার কোনো শারীরিক সংস্পর্শ হয় না এবং কোনো বিশেষ Crowd Control Techniques জনতার উপর প্রয়োগ করতে হয় না। পুলিশ কর্তৃক সংঘবদ্ধ জনতাকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে তারা যদি ছত্রভঙ্গ না হয়ে অধিক শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে, তবে পুলিশ সদস্যরা CrC Gear (ক্রাউড কন্ট্রোলের পরিচ্ছদ- Steel Helmet, Bullet Proof Jacket, Leg Guard, Gas Mask ইত্যাদি) পরিধান করবেন এবং জনতার গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখবেন।

স্তর- ২ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা: (পিআরবি, ১৯৪৩ বিধি ১৫২ (২)

এই পর্যায়ে জড়ো হওয়া জনতাকে পুলিশ কর্তৃক বে-আইনী ঘোষণা করা হলেও তারা ছত্রভঙ্গ না হওয়ার প্রবণতা দেখায়। অবৈধ জনতা পুলিশ সদস্যদের ক্লোজ কন্টাক্টে আসে বা আসার চেষ্টা করে- সংঘবদ্ধ জনতা নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণকারী পুলিশ সদস্যরা Drive Back Wave, Road Block, Offensive Jump কৌশল প্রয়োগ করার মাধ্যমে জনতার সঙ্গে নিজেদের নিরাপদ দূরত্ব সৃষ্টি করে শারীরিক ইনজুরির পরিমাণ কমিয়ে আনেন ও নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা অবৈধ জনতার দখলমুক্ত করে নিজেদের আওতায় নিয়ে আসেন। (পুলিশ আইন, ১৮৬১ ধারা ৩০, ৩০-ক; ফৌজদারি কার্যবিধি ধারা ১২৭, ১২৮; দ-বিধি, ১৮৬০ ধারা ১৪৩, ১৪৪, ১৪৫; পিআরবি ১৯৪৩ বিধি ১৪৩, ১৪৪)।

স্তর-৩ বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে অবৈধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা

সমঝোতার চেষ্টা ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করার পরও বে-আইনি সমাবেশের জনতা সংঘবদ্ধ থাকলে এবং ছত্রভঙ্গ হওয়ার প্রবণতা না দেখিয়ে কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিম্নোক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করলে-

ক)        সমাবেশ ও মিছিলের স্থান বা চলাচলের পথ আইনসঙ্গতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পরও যদি অনুমোদনহীন এলাকায় সমাবেশ বা মিছিল করে পথ অতিক্রম করে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জান, মাল অথবা সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

খ)        বেআইনি ঘোষিত সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার আহ্বান জানানোর পরও দূরীভূত না হলে।

গ)        কোনো অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধ বা নিবারণ করার জন্য।

ঘ)        কোনো এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে রোড ব্লক, চেক পয়েন্ট বা নিরাপত্তা বেষ্টনী গঠন করা হলে কেউ বা কিছুসংখ্যক জনতা যদি অবৈধভাবে সেখানে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করে।

ঙ)        কোনো গ্রেপ্তারকৃত বা আটক অপরাধীদের পলায়ন প্রতিরোধ বা তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য উচ্ছৃঙ্খল জনতা আক্রমণ করলে।

তবে Baton, Gas Spray/Smoke/Tear Gas, Water Cannon, Sound Hand Grenade, Losing Shape Kinetic Missile প্রভৃতি ও Charge কৌশল প্রয়োগ করে অবৈধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ বা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই পর্যায়ে অবৈধ জনতাকে সক্রিয়ভাবে বাধা দিতে হয় এবং তাদের পক্ষ থেকে চাপের সম্মুখীন হতে হয়। প্রয়োজনে Front, Lateral  ও  Ambush Arrest Technique অনুসরণ করে দলনেতা ও অন্যান্য গোলযোগে উস্কানীদাতা অবৈধ জনতাকে গ্রেপ্তার করতে হয়।

স্তর-৪ কম প্রাণঘাতী বা ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার

বিভিন্ন কৌশলে শক্তি প্রয়োগ করেও অবৈধ জনতা ছত্রভঙ্গ না হলে বরং আরও সংঘটিত হওয়ার প্রবণতা দেখিয়ে মারমুখী আচরণ করলে, ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটালে এবং পুলিশ ও সাধারণ জনগণকে আঘাত করে আহত করলে কমান্ডার তাঁর সদস্যদেরসহ আড় নিবেন। Water Cannon, APC ইত্যাদি Specific Skills ব্যবহার করবেন এবং পরিস্থিতি নিজেদের আওতায় নিয়ে আসবেন। প্রয়োজনে উপযুক্ত

কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে Shot Gun, Explosive Grenade, Individual Fire Arms অৎসং নির্দিষ্ট টার্গেটে ব্যবহারের মাধ্যমে উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করবেন। এই পর্যায়ে অবৈধ উচ্ছৃঙ্খল জনতার আক্রমণের কারণে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, শারীরিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় এবং কমান্ডার ও পুলিশ সদস্যদের এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সহনশীলতার পরিচয় দিতে হয়। কেউ আহত হলে কমান্ডার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য সব কৌশল বন্ধ রেখে এ্যাম্বুলেন্সে আহত সদস্যদের Medical Evacuation এর ব্যবস্থা করবেন। এই স্তরে আত্মরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করতে হয়। একদল জনতার উপর গুলিবর্ষণের নির্দেশকে একটি চরম ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং কেবল পুলিশ সদস্যদের বা ব্যক্তির আত্মরক্ষা বা সম্পত্তি রক্ষার অধিকার প্রয়োগের জন্য প্রযোজ্য হবে (পিআরবি, ১৯৪৩ বিধি ১৫৩(ক), (খ), (গ))। তবে পরিস্থিতিই যে ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগে বাধ্য করেছে, তাহা প্রমাণ করার দায়িত্ব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীর উপর বর্তায় (সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ ধারা ১০৫; পিআরবি, ১৯৪৩ বিধি ১৫৩(খ))। কাউকেও গ্রেপ্তার করার সময় যদি ব্যক্তি বল প্রয়োগের দ্বারা তাকে গ্রেপ্তারে বাধা দেয়, প্রতিরোধ করে তখন গ্রেপ্তার সফল করার জন্য গুলি চালানো যেতে পারে। তবে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ-যোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত নয় এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটানোর অধিকার দেওয়া হয়নি। (ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ ধারা ৪৬; পিআরবি, ১৯৪৩ বিধি ১৫৩(ঘ)।

তথ্যসূত্র:

* শক্তি প্রয়োগের পর করণীয়; পি.আর.বি. ১৫৬, ১৫৭

* শক্তি প্রয়োগের পর ফৌজদারিতে সোপর্দকরণের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ; ফৌ. কা. বি. ১৩২

* দ.বি. ৯৬-১০৬; পি.আর.বি. ১৫৩-১৫৬, ফৌ. কা. বি. ৪৬, ১২৭-১৩২, ১৪৪, ১৪৫

* “United Nations Standard Public Order Management And Basic Police Techniques ManualÓ Pages ৯-১৩

* Sir Robert Peel, `Principles of Law Enforcement`

* বেনজীর আহমেদ বিপিএম (বার), ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ ডিটেকটিভ এপ্রিল, ২০২০

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার (শাহমখদুম) বিভাগ

আরএমপি, রাজশাহী।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x