ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ মনিরুজ্জামান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

আমি নিতান্তই সাধারণ মানের একজন মানুষ, গর্ব করার মতো খুব একটা বেশি কিছু এ জীবনে নেই। তারপরও মাঝে মধ্যে একটু গর্ব করে বলি I am a police officer by choice and not by chance. দু দশকের কিছু বেশী সময়ের পুলিশিং ক্যারিয়ারে যে সব কারণে সত্যিকার অর্থে পুলিশিং নিয়ে টুকটাক গর্ব আসে; তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইউরোপ এবং আফ্রিকায় বিশ্বের দুপ্রান্তের দুটি ভিন্নতর পরিবেশে, দুই-দুটো মিশনে শান্তিরক্ষী হিসেবে দু বছরের কিছু বেশি সময়ের ওয়ার্কিং এক্সপেরিয়েন্স এবং United Nations selection Assistance Team বা সংক্ষেপে UN SATGএর সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালনের বিরল সুযোগ আমার হয়েছিল। আমার দ্বিতীয় মিশন ছিল United Nations Mission in sudan. সুদানে আমার এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিল ইন্দোনেশিয়ান একজন পুলিশ অফিসার নাম জেমসন বোকো। সে হাসতে হাসতে প্রায়শই একটি কথা বলতো  I ama very ordinary man, working experience as a peace keeper made me extra ordinary. বলেই হো হো করে হাসতো, বোকো। ওর হাসি দেখলেই বোঝা যেত এটি নিছক কথার কথা নয়, একান্তই ওর মনের কথা। শুধু বোকোরই নয় বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যেকোনো পুলিশ অফিসারের জন্যই মিশন যাত্রা নভোচারীদের মহাকাশ মাত্রার মতোই এডভেঞ্চাচারাস। পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স লিখিতভাবে আদেশ দিয়েছে মিশনের প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন মাসিক পত্রিকা, বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র ডিটেকটিভের জন্য লেখা দিতে। সেজন্যই আজকের এ প্রয়াস।

উনবিংশ শতাব্দীতে এসে মানব সভ্যতা যখন সর্বাংশে পরিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করে তখনো আমরা এক ধরনের অনাচার বিশ্বব্যাপী প্রত্যক্ষ করেছি। কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লবের এবং উন্নয়ন পথ পরিক্রমার নানা বিবর্তন শেষে এ শতাব্দীর সভ্য পৃথিবীতে বিশ্ববাসী দুটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে। বিশ্বজুড়ে লাখো কোটি মানুষ মারা যায়, মানবতা ভূলুণ্ঠিত হয়, বারুদের নিনাদে দূষিত হতে থাকে প্রাচ্য পাশ্চাত্যে, আর্য্য বা অনার্য্যদের জনপদ। মানবতা লুণ্ঠিত হয়, পৃথিবীতে পেশিশক্তি প্রদর্শনের  পৈশাচিক নগ্ননৃত্য হয়, উদ্ভব হয় survival of the fittest বা শ্রেষ্ঠতররাই একমাত্র টিকে থাকবেন, এ তত্ত্বের।

বিশ্বসম্প্রদায় একসময় একমত হয় এভাবে চলতে পারে না। বিশেষ করে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার হওয়ার পর এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে তার ‘সফল’ প্রয়োগের পর বিশ্ববাসীর চোখে দিবালোকের মতোই উদ্ভাসিত হতে থাকে যুদ্ধের ভয়াবহতা। আলো ঝলমল তিলোত্তমা মহানগরী হিরোশিমা ও নাগাসাকি মুহুর্তে তামা হয়ে যায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে। তখন যারা ছিলেন শুধু তারাই নয়, সেখানকার পরিবেশ এমনভাবে দূষিত হয়ে যায় যে, সে ভয়াবহতার অনেক পরেও সেসব অঞ্চলে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে থাকে তেজস্ক্রিয় বিকীরণের লংটার্ম ইমপ্যাক্ট হিসেবে। এতে এমনকি মহাপরাক্রমশালীদেরও টনক নড়ে। কারণ এটম বোমা খালি তাদের একার নয় তাদের শত্রুপক্ষেরও করায়ত্ব হয়েছে ততদিনে। মানবতার বিশ্বজনীন আপিলে শত-সহস্র বছরে যা হয়নি, এবার তা হয়। বিশ্ববাসীর বিশেষ করে বিশ্বের মোড়লদের টনক নড়ে। তারা নড়েচড়ে এক টেবিলে বসতে বাধ্য হন। এটম বোমার অণুবিশ্লেষণ তাদেরকে এক টেবিলে বসতে বাধ্য করে। তারা সিদ্ধান্ত নেন, আর না, এবার থামতে হবে। এরই প্রেক্ষিতে বিশ্ববাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক রূপে গড়ে ওঠে জাতিসংঘ বা ইউনাইটেড নেশনস, নির্ধারণ করা হয় এর কর্তৃত্ব, কার্যপরিধি ও পরিচালনার নীতিমালা। গঠিত হয় সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ সহ আরো অন্যান্য পরিষদ।

জাতিসংঘের নির্ধারিত কার্যপরিধির অন্যতম হিসেবে নির্ধারিত হয় যুদ্ধ বন্ধ করা, শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, খাদ্য ও কৃষির উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কৃতির লালন ও বিকাশ এবং কনফ্লিক্ট নিরসনে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তনের।জাতিসংঘের সব কাজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলসহ সারাবিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান ম্যান্ডেট। এজন্যই জাতিসংঘের অন্যতম কার্য্যক্রম হচ্ছে ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বা ইউ এন পিসকিপিং’।

মানুষ হয়ে জন্মেছি তাই সমগ্র মানবজাতি নিয়েই ভাবি। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে যেমনটি তিনি বলেছেন ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি, আবার একজন বাঙ্গালী হিসাবে যা কিছু বাঙ্গালীর সাথে সম্পর্কিত তাই আমাকে ভাবায়। এই অক্ষয় ভালবাসাই আমার জীবন ও কর্মকে প্রভাবিত করে’। নিজেকে এ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংঘঠন ‘‘জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় কাজ পিস কিপিং-এর একজন প্রত্যক্ষ কর্মী হওয়া, দু দুটি মিশনে সরাসরি পিস কিপার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে পিস কিপিং করা এবং চার-চারবার জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা পদক পাওয়া আমার অনার্য জীবনের এখনো পর্যন্ত অন্যতম সেরা অর্জন। এজন্য আমি মহামহিমের কাছে যারপরনাই কৃতজ্ঞ।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনকে পুলিশী ভাষায় সংক্ষেপে মিশন বলে। পুলিশের শান্তিরক্ষা মিশন মূলত দুই রকম। প্রথমটা হলো FPU বা Formed Police Unit এরা মূলত ব্যাটালিয়ন আকারে মিশনে যায় এবং দায়িত্বপালন করে। এখানে পুলিশ সুপার পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তা FPU কমান্ডার হিসেবে থাকেন এবং তার অধীনে ব্যাটালিয়ান ফর্মেশনে কনস্টেবল থেকে অ্যাডিশনাল এসপি পর্যন্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মকর্তা থাকেন। FPU তে গাড়ি ঘোড়া থেকে শুরু করে অস্ত্র, সরঞ্জাম এমনকি থালা বাসন সবই বাংলাদেশ সরকারের। এবং সরকার এজন্য নির্দিষ্ট হারে পুলিশ সদস্য এমনকি যন্ত্রপাতি সরঞ্জাম সব কিছুর জন্যই টাকা পায় ভাড়া হিসেবে। অফিসার ফোর্স বেতন পায় পদবী অনুসারে জাতিসংঘের নির্ধারিত হারে। তারা মিশন এরিয়াতে কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য পুলিশী কাজে নিয়োজিত থাকেন। এরা সাধারণত এক বছরের জন্য মনোনীত হন। এদের Selection সহ যাবতীয় প্রক্রিয়া জাতিসংঘের নির্দিষ্ট গাইড লাইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ পুলিশই করে থাকে। জাতিসংঘ পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করে।

দ্বিতীয় আরেক ধরনের মিশন হল CIVPOL বা UNPOL হিসাবে। জাতিসংঘ কোন একটি নির্দিষ্ট দেশে শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য সারা বিশ্বের পুলিশ কন্ট্রিবিউটিং কান্ট্রি থেকে পুলিশ অফিসার সিলেক্ট করে থাকে। স্থানীয় পুলিশের এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো হাত থাকেনা, তারা শুধু জাতিসংঘ সিলেকসন টিমের facilitator হিসেবে কাজ করে।

এখানে মূলত চার ধরনের টেস্ট হয়। ইংরেজি, অস্ত্র চালনা, গাড়ি চালনা, ও মৌখিক সাক্ষাৎকার। ইংরেজি টেস্টে মূলত তারা কমিউনিকেশন স্কিল অর্থাৎ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের একসেন্ট বোঝার, তাদেরকে বোঝানোর ক্যাপাসিটি এবং কোনো একটি বিষয় রিপোর্ট আকারে উপস্থাপনের পারদর্শিতা পরীক্ষা করা হয়। তিনটি পর্বে এ পরীক্ষা হয়। Reading, Listening এবং Report writing। প্রথমটা খুব সহজ। একটা written Script দিয়ে তা থেকে কয়েকটি question এর লিখিত উত্তর দিতে হয়, অনেকটা ইংরেজি প্যাসেজ-এর মতো। Listening & Report writing এর ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের ভিন্ন কিন্তু অ্যাকসেন্টে রেকর্ডকৃত সিডি শুনানো হয়। তা শুনে, বুঝে তাৎক্ষণিক নোট নিতে হয়। Listening এর ক্ষেত্রে একটি law and order related ঘটনার সিডি শুনে তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। প্রশ্নগুলো মূলত কোনো ব্যক্তির, দল, সংগঠন স্থানের নাম, সময়, তারিখ , বিভিন্ন বিবরণ, সংখ্যা সময়, সংঘটিত অপরাধের ধরণ, গৃহীত পুলিশী ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কিত হয়। Report writing অনেকটাই Listening অনুরূপ। পার্থক্য হলো Listening এ শুধু বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তার Report writing-এ সিডির কাহিনী শুনে ১৫ মিনিটের মধ্যে সব তথ্য-উপাত্ত, নাম, গৃহীত ব্যবস্থা বিবরণ এবং আনুষাঙ্গিক তথ্যাদির বিবরণ দিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে তা উপস্থাপন করতে হয়।

এখানে Selection প্রক্রিয়াটি নক আউট সিস্টেম হয়। অর্থাৎ বাদ মানে বাদ। প্রথমে সফল পরীক্ষার্থীকে একটি বড় হলে ঢুকানো হয়। পরীক্ষার্থী মূলত এসআই বা সার্জেন্ট থেকে ডিআইজি পর্যন্ত।

প্রথমেই হয় রিডিং টেস্ট। দ্রুততম সময়ে ফলাফল দিয়ে দেয়া হয়। যারা পাস করে, শুধু তারাই পরবর্তী টেস্টের জন্য ডাক পায়। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় লজ্জার বিষয় হল ভর্তি সিনিয়র-জুনিয়র কলিগদের মধ্যে থেকে বাদ পড়লে মিশনে যেতে না পারার দুঃখের চেয়ে কলিগদের কাছে ইজ্জত কা সাওয়ালই বড় হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু বিষয়টি হলো এমন যে, খুব অল্প সময়ের পরীক্ষা, ঠিকমতো শুনতে না পারলে, কনসেনট্রেট করতে না পারলে যেকোন ব্যক্তিই হিটে আউট হতে পারেন। এমনো দেখেছি যে, দুর্দান্ত ইংরেজি জানা, বলা সিনিয়র অফিসার এমনকি একাধিক মিশন করে আসা অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাও বাদ পড়েন ইংরেজি টেস্টে। এভাবে একে একে Listening & Report writing-এ যারা কৃতকার্য হয় তারা ড্রাইভিং-এর জন্য ডাক পান। ড্রাইভিং-এ উত্তীর্ণরা স্যুটিং টেস্টের ডাক পান। সব বিষয়ে কৃতকার্যদের মোখিক সাক্ষাৎকার এবং পরবর্তীতে মেডিক্যাল টেস্ট ও সার্ভিস রেকর্ড যাচাই-বাছাই করা হয়। সব বিষয়ে সাফল্যজনকভাবে উত্তীর্ণ হলে একজন কর্মকর্তা চূড়ান্তভাবে মিশনের জন্য মনোনীত হন।

(চলবে)

লেখক : অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন)

অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *