ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ মনিরুজ্জামান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে লিখতে বলা হয়েছে, আমি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। তবুও নিজের যৎসামান্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যদি বলি, তো আমি রেফার করতে চাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসারে যে কোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যা চিহ্নিতকরণ, এরপর আসে বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা, সমাধানের সম্ভাব্য পথ নির্বাচন, পরীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পুনঃ মূল্যায়ন এবং সর্বশেষ ধাপে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। শান্তিরক্ষা মিশনের পর্যায়গুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় তিনটি মূল বিষয় হলো  English Reading, Listening And Report Writing জন্য আমার কাছে সব চেয়ে ধন্ব্যন্তরি সমাধান মনে হয়েছে আইন শৃঙ্খলা বা অপরাধ বা পুলিশী অ্যাকশন সম্পর্কিত নিউজ পেপার, আর্টিকেল পড়া, টিভি নিউজ, বুলেটিন, ডকুমেন্টরি বা ফিল্ম দেখা। আমি অন্তত এ প্রক্রিয়ায় সুফল পেয়েছি একথা বলতে দ্বিধা নেই। এরপর যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তা হলো সবসমসয় মাথায় রাখা যে আমাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়টি সব সময় মাথায় রাখা। এজন্য বাজারে এভেইলেবল যে সব সহায়ক পুস্তক আছে সেগুলোতে চোখ ভুলানো, সিডি শুনে প্রাকটিস করা ইত্যাদি। অনেকে TOEFL বা GRE এর কথাও বলে থাকেন। আমার কাছে সেটি উপকারী মনে হলেও ততটা প্রাসঙ্গিক মনে হয় না। কারণ দুটোর প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোকাবুলারি বাড়ানো, ইংরেজি শোনা বলা বা লেখার জড়তা কমানোর জন্য প্রাকটিসের কোনো বিকল্প নেই। প্রাকটিস শুরু করার সময় নিজের ইংরেজি জ্ঞানগম্যি এবং এতদ্বিষয়ক অহংকে পরীক্ষা পর্য্যন্ত ছুটি দিয়ে নিজেকে সত্যিকারের একজন বিগিনার ভাবতে পারলেই সুবিধা হয়। বহু উদাহরণ আছে যে, একাধিক বার মিশনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা পরবর্তী SAT টেস্টে প্রথম দফাতেই, যাকে বলে হিটেই আউট হয়েছেন। ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স করা, বন্ধু বা পরিচিত মহলে চোস্ত ইংরেজির জন্য খ্যাতিমান নক্ষত্র ডাব্বা মেরেছেন ইংরেজি টেস্টের প্রথম ধাপেই। ইচ্ছাশক্তি একাগ্রতার কোন বিকল্প নেই। নিজেকে বিদ্যার জাহাজ, তালেবর না ভেবে মনোযোগী ছাত্র ভাবতে পারলেই ভালো যদিও তা বেশ কঠিন। একেবারেই যে কথায় কান দেয়া যাবে না তা হলো মিশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ‘আরে এটা কোনো ব্যাপার হলো, যাবা, পরীক্ষার হলে বসবা আর মিশনের টিকিট নিয়ে চলে আসবা’ জাতীয় কথাবার্তায়। আমার ধারণা এই সব কথা বলা লোকগুলো চায় অন্যরা অকৃতকার্য হোক এবং তারা যে ইতিমধ্যেই যোগ্য বিবেচিত হয়ে বিশেষ কিছু একটা হয়ে পড়েছেন সেটি প্রচারিত হোক। আমার বিবেচনায় নিজেকে একটু কম জ্ঞানী বা দুর্বল ভেবে শুরু করতে পারলেই ভালো।

বাজারে এতদ বিষয়ক কিছু বই পুস্তক বা সিডি/ডিভিডি পাওয়া যায়। একটু যাচাই-বাছাই করে মান সম্পন্ন ম্যাটেরিয়ালগুলো ফলো এবং প্রাকটিস করা যেতে পারে। খুব কঠিন কিছুঁ নয়, একটু মনোযোগী হওয়া দরকার। পরীক্ষার দিনটাতে একাগ্রতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কান দিয়ে শুনে মাথার মধ্যে গেঁথে নেয়া এবং কাগজের দিকে না তাকিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টস বিশেষ করে ১) যেকোনো নাম ২) স্থান, কাল, পাত্র ৩) ব্যবহৃত অস্ত্র, গাড়ি, সরঞ্জাম ৪) অন্য কোন টার্ম বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এগুলো নোট করার সক্ষমতা অর্জন করা খুবই প্রয়োজনীয়। প্রাকটিস এবং প্রাকটিসেই এটি সম্ভব। কোনো কারণে কোনো একটি তথ্য বা পয়েন্ট বুঝতে না পারলে পাজলড্  হওয়া একেবারেই যাবে না, বরং অপেক্ষা করতে হবে, বেশির ভাগ তথ্য বা ঘটনা অন্য কোনোভাবে পুনরুল্লেখ করা হতে পারে। শুনতে শুনতেই মস্তিস্কে ঘটনাটির প্লট এঁকে ফেলতে পারাটা খুবই উপকারী। আর এ সব কিছুই সম্ভব একাগ্রতা, তীব্র ইচ্ছাশক্তি এবং আন্তরিকতার মাধ্যমে।

একটা গল্প বলে শেষ করি। সুদান মিশনে আমাদের কর্তব্যস্থলে মাইকেল নামে একজন অবসর প্রাপ্ত আমেরিকান পুলিশ অফিসার ছিলেন। মাইকেল ছিলেন অতিশয় নাকউঁচা স্বভাবের। এশিয়ান এবং আফ্রিকানদেরকে একটু হেয়ভাবে দেখতে চাইতেন। তার একসেন্টও ছিল দুর্বোধ্য আমেরিকান স্টাইলের। তার হামবড়া স্বভাব এবং তার দুর্বোধ্য ইংরেজির কারণে টিমের অধিকাংশরাই তাকে এড়িয়ে চলতো। এতে তার কোনো ক্ষতি হয়নি বরং লাভ হয়েছিল। অফিসে এক রুমে দুতিনটি টেবিলে দুতিনজনকে বসতে হয় জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, তাছাড়া একটা গাড়ি দুতিনজনকে শেয়ারও করতে হয়। মাইকেলের স্বভাব ও ভাষার দুর্বোধ্যতার কারণে কেউই তার সঙ্গে গাড়ি এবং অফিস শেয়ার করতে চাইতো না। এতে মাইকেলের পোয়াবারো, সে একাই একটা গাড়ি এবং একটা অফিস রুম ব্যবহার করতো। আমি তখন Regional training chief, মাইকেল কাজ করতো training wing এ। আমি তাকে একদিন অপেক্ষাকৃত ভালো মুডে পেয়ে কফি খেতে খেতে বললাম ‘মাইকেল তোমার ইংরেজি তো হয় না’। সে আমার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো, এক ভেতোবাঙালি জন্মগতভাবে ইংরেজি ভাষাভাষীকে বলছে যে, তোমার ইংরেজি হয় না! এমন প্রতিক্রিয়া যে হবেই ও কথা আমি জানতাম, প্রস্তুতিও ছিল আমার। United Nations staff code and conduct এর সংশ্লিষ্ট রেফারেন্স উল্লেখ করে তাকে বোঝালাম যে, ভাষাগত দক্ষতা বলতে মিশনের অফিশিয়াল ল্যাংগুয়েজ বোঝার, বোঝানোর সক্ষমতা থাকতে হবে। তোমার কথা যেহেতু অনেকেই বুঝতে পারছে না, কাজেই তোমার উচিত ঠিকঠাকমত ইংরেজি বলা। সে অধিক শোকে পাথর। বাঙাল তাকে ইংরেজি শেখাচ্ছে!! আমি তাকে বললাম প্রথম প্রথম ভালো ইংরেজি বলতে কষ্ট হবে, ধীরে ধীরে বলো, থেমে থেমে পজ দিয়ে দিয়ে কথা বলো। সে শুরু করল। আমার সঙ্গে সকালে দেখা হলে থেমে থেমে বলতো গুড মনিং, মিস্টার মনির, হাউ আর ইউ? প্রত্যেকটা শব্দ আলাদা আলাদা করে জোর দিয়ে বলতো। সে একদিন আমাকে টিটকারি টাইপ করে বললো ভাগ্য ভাল যে, তুমি আমার সিলেক্টর ছিলেনা! বলেই তীর্যক হাসি হাসলো। কোন রকম পূর্ব পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি ছাড়াই মাইকেল কে বলে ফেললাম I am going to sit for the coming UN selector test. মাইকেল আমার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো কারণ তখনো পর্য্যন্ত ওর বা আমার জানামতে কোনো দ্বিতীয় বাঙালি UN selector ছিলনা। কথার কথা হিসেবে বলেই বিপাকে পড়লাম। সুদানে আমাদের কমান্ডার ছিলেন প্রয়াত এডিশনাল আইজিপি রওশন আরা স্যার। তিনি আমাকে অশেষ স্নেহ করতেন কোন এক বিচিত্র কারণে। তিনি প্রথমে বিস্মিত হলেও একটু বারই বললেন চেষ্টা করো, CV পাঠাও, আমি তোমার পরীক্ষার ব্যবস্থা করছি। তবে জিদের বশে করলেও দেশের মান ডুবাইও না। আমি পরবর্তী মাসখানেক সময়ে ঠান্ডা মাথায়, ভেবে-চিন্তে প্রস্তুতি নিয়ে UNMIS HQ এর Induction training wing এর ব্যবস্থাপনায় UNSAT Membership exam দিলাম এবং ইংরেজি, ড্রাইভিং ও অস্ত্র চালনাসহ সব বিষয়ে সর্বাধিক নম্বর পেয়ে UN SAAT Member হিসেবে নির্বাচিত হলাম। ইংরেজির তিনটি বিষয়ে আমার প্রাপ্ত নাম্বার ছিল 300 out of 300.  মাইকেল কে কফির অর্ডার দিয়ে সংবাদটি প্রথমে জানালাম। মাইকেল চোখে চোখ রেখে আমার শিখিয়ে দেয়া পদ্ধতিতেই আমাকে বললো ‘ÔAre you joking’? আমি ততোধিক শান্ত দৃষ্টিতে ওর চোখে চোখ রেখে ধীরে ধীরে বললাম Yes Dear, I am. ও চোখ নামাল, টেবিলে তখন আমি ধরে রেখেছি আমার UN SAT member হিসেবে পুলিশ কমিশনার প্রদত্ত Nomination letter. ও বললো Congratulations. আমি বললাম Thank you. dear. You are the man behind it. ও বুঝল কিনা জানি না। আমি যা বোঝাতে চাইলাম তা হলো যদি লক্ষ্য থাকে অটুট, জয় হবে হবেই নিশ্চয়ই। 

লেখক : অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন)

অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *