ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ মনিরুজ্জামান বিপিএম (বার)

যা বলছিলাম সেখানে আবার ফিরি। আমার বাসা রাজারবাগে। বিশেষ করে ছুটির দিনে দেখতাম মিশনে যেতে ইচ্ছুকদের দৌড়ঝাঁপ। কেউ ড্রাইভিং প্র্যাকটিস করছে, কেউবা পার্কিং, কেউ কেউ আবার গ্যালারিতে কয়েকজন মিলে বসে ঝালিয়ে নিচ্ছে নিজেদের ইংরেজি।

২০০৫ সালের মার্চ/এপ্রিলেই হবে যতদূর মনে পড়ে। আমাদের চাকরি তখন ৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, আমরা মিশনে পরীক্ষা দেবার উপযুক্ততা অর্জন করেছি। আমার সাথে ১৯৯৯ সালে ১৮ তম বিসিএসের মাধ্যমে যারা জয়েন করেছি তাদেরকে বোঝানো হচ্ছে। এপ্লাই করলাম, ভাই বেরাদারদের সাথে আলাপ আলোচনা শুরু করলাম। সমস্যা হল যাদেরকে সিরিয়াস বলে জানতাম তাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তাদের অনেকেই এমন একটা ভাব করতো যে, সে মিশনের জন্য এপ্লাই করেছে কিনা তাও তার মনে নেই। যারা একটু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং ছিল এমন যে, কাজ করতে করতে জান শেষ, মিশন নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আছে? পণ্ডিত শ্রেণির বন্ধুদের বক্তব্য ছিল এমন যে, মিশনের আবার প্রস্তুতি কি? স্টেজেই মেরে দিব। বুঝলাম যা করার নিজেকেই করতে হবে।

আগেই বলেছি আমি পায়ে হেঁটে, সাইকেলে চেপে, বাসে ঝুলে স্কুল কলেজ করা পাবলিক। বাবার অর্থের সংকট না হলেও বাহুল্য ছিল না সেই অর্থে। পড়াশুনার প্রয়োজনে হোস্টেলে মেসে থাকতে হয়েছে সেই কিশোরকাল থেকেই। যখনি কোন বিপদ আসে বা কোনো লক্ষ্য সামনে আসে আমি কখনোই ভেঙে পড়ি না বা নিরাশ হই না আল্লাহর রহমতে। আরো একটা নতুন লড়াই এর জন্য চোয়াল শক্ত হয়ে যায় ভিতর থেকেই। দুতিন মাস সময় আছে হাতে। আমি সবসময়ই বাস্তববাদী মানুষ। নিজের সীমাবদ্ধতা নিজেই বুঝতাম, স্কুল কলেজে ইংরেজিতে ভালো নম্বর পেয়েছি, Applied physics এর মতো কঠিন সাবজেক্ট অনার্স মাস্টার্স করেছি

কৃতিত্বের সাথেই। যেখানে একটা অক্ষরও বাংলায় পড়ার বা শেখার সুযোগ ছিল না। অসুবিধা হয়নি তাতে, তেমন কোনো জটিলতা ছাড়াই উতরে গেছি। কিন্তু এটুকু বুঝতাম বিভিন্ন একসেন্টের ইংরেজি শুনতে, বুঝতে আমার সীমাবদ্ধতা আছে, জড়তা আাছে ইংরেজি বলাতেও।

ক্লাস সেভেনের বিজ্ঞান বইতে পড়েছি বৈজ্ঞানিক পন্থায় প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এরপর সমস্যা এনালাইসিস, সমাধানের সম্ভাব্য পথ নির্ধারণ এবং Trial error পদ্ধতিতে সমাধানের চেষ্টা করা। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে বৈজ্ঞানিকপন্থাকেই বেছে নিলাম। প্রথমেই Listenning এ মনোযোগ দিলাম। হিসাব করে দেখলাম হাতে তখনো প্রায় দুই মাস সময় আছে। আমি তখন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করি। তখন ৩৬, মিন্টু রোডের ডিবি অফিসে প্রায় প্রতিদিনই রাত বারোটার মিটিং হত। আবার সকালে দশটা সাড়ে দশটার মধ্যে অফিসে আসতে হত। মাঝে মাঝেই রাতের বেলা উদ্ধার বা গ্রেফতারের অভিযান কিংবা নাইট রাউন্ড থাকতো। নাইট রাউন্ড মানে সহকারী পুলিশ সুপার পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তা একটি ডিভিশনের থানা, ফাঁড়ি, পেট্রোল বা মোবাইল পার্টি, থানা হাজত, সেন্ট্রি, অস্ত্রগার বিভিন্ন পুলিশ পোস্টে সরেজমিনে গিয়ে দেখবে সব ঠিক ঠাক আছে কিনা, কোথাও কোন গাফিলতি, অবহেলা বা অনিয়ম হচ্ছে কিনা। পরদিন কমিশনার মহোদয়কে কয়েক পাতার নাইট রাউন্ড রিপোর্ট জমা দিতে হত। উল্টা পাল্টা কিছু হলে কমিশনার মহোদয় বা তার পক্ষ থেকে অন্য কোনো কর্মকর্তা ডেকে পাঠাতেন। নবীন কর্মকর্তা হিসাবে আমরা বরাবরই সিনিয়রদের কাছ থেকে এ ধরনের কোনো ডাক না পাওয়ার চেষ্টা করতাম। নাইট রাউন্ড হলে লাভ ছিল এই যে, পরদিন সকালে আর অফিস যাওয়া লাগবে না কিন্তু লাঞ্চের পর ঠিকই কাজে যেতে হত। যাহোক যা বলছিলাম, তাতেই ফিরে আসি। ঠিক করলাম বিভিন্ন একসেন্ট শুনতে এবং ফ্রিকুয়েন্টলি স্পিকিং ক্যাপাবিলিটি বাড়াতে হবে। যা ভাবা তাই কাজ। অফিস, বাসায় বসে বিবিসি, সিএনএন শোনা শুরু করলাম। বিশেষ করে আইন শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো। নিয়মিত ইংরেজি পেপার পড়া শুরু করলাম। ১৫/২০ দিনের মধ্যেই ফলাফল পেতে শুরু করলাম। নিজেই বুঝতে পারলাম যে, আমার কান এখন অন্য যেকোনো সময়ের থেকে ইংরেজিতে পরিষ্কার। মফস্বলের স্কুলে কলেজে পড়ার কারণে আমাদের ভোকাবুলারি যাই থাক উচ্চারণে মারাত্মক সমস্যা ছিল, ইংরেজিতে কথা বলতে গেলেই অভ্যাসের কারণে শব্দের আগেই গ্রামার মাথায় ভীড় করতো। কাজেই সঠিক সময়ে সঠিক শব্দটি মুখ দিয়ে বের হতনা বা হলেও Tense, Counjunction বা গ্রামারের অন্য কোনো অংশের খপ্পরে পড়ে তার গতি শ্লথ হয়ে যেত। ফলশ্রুতিতে যাকে আমরা বলি fluency তা আর থাকতো না। Observer, Bangladesh daily Star পড়ে, BBC, CNN শুনে মোটামুটি একটা পর্যায়ে আসলেও Speaking এর দুর্বলতা রয়েই গেল চর্চার কারণে। পথ বের করলাম, পার্টনার হিসাবে বেছে নিলাম নিজেকে এবং স্ত্রীকে। নিজেকে এভাবে যে নিজেই নিজের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতাম, চা খেতে ইচ্ছে হলে ইংরেজিতেই ভাবতাম ও want to have some tea ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বউ বরাবরই লাজুক কিন্তু সারা জীবনের প্রত্যয়ী। আমার বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়েও সে আমাকে সহায়তা করেছে দারুণভাবে। কিছু করতে পারুক বা না পারুক পাশে থেকেছে। আমি যখন পাবলিক লাইব্রেরি বা সায়েন্স লাইব্রেরির ভিতরে বসে বই ঘাটতাম। সে তখন পত্রিকা নাড়াচড়া করে কাটিয়ে দিতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার স্ত্রী আমার সব কিছুরই পার্টনার। তাকে বললাম ইংরেজি বলতে পারিনা কি করবো বলো তো? সে হেসে বলল ইংরেজি জানা একটা মেম দেখে প্রেম করো, বললাম সে না হয় করলাম, কিন্তু আগেতো মেমেদের দেশে যেতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন তিনি নতুন মাস্টারনী হয়েছেন, ২২তম বিসিএস দিয়ে করটিয়া কলেজে যাওয়া আসা করেন। নতুন ছাত্র পেয়ে খুশিই হলেন। শুরু হল আমাদের দ্বৈত ইংরেজি চর্চা, ভাগ্যিস তখন আমার মেয়েটা ছোট্ট, হাসতে শিখলেও হাসাহাসি করতে শেখেনি। তার বেগুন দিয়ে দুর্দান্ত ইলিশ রান্নার তারিফ করতে গিয়ে যখল বলতাম Your Brinjalsmashcombination was অসাম, সেও ভুল ধরিয়ে দিত অসাম নয় অছম………..।

ইংরেজি বলা কতটা শিখতে পেরেছিলাম জানিনা তবে নিজেরাই হাসাহাসি করতাম নিজেদের ইংরেজি বিদ্যায় জাহির নিয়ে। আমাদের কা-কারখানা দেখে আমাদের বছর দুয়েক বয়সি মেয়ে হেসে গড়াগড়ি দিত না বুঝেই। ওকে বলতাম হাসছিস? জানিস মিশনে একবার গেলে তোর বাপ এখন সারা মাসে যা বেতন পায় তার চেয়ে বেশি বেতন পাবে একদিনে। ও আরো হাসত, বোধ করি বাবা মিশনে গিয়ে কাড়িকাড়ি ডলার কামাবে এই খুশিতেই।

এভাবেই নিজেই নিজেকে প্রস্তুত করলাম। গাড়ি চালাতে আমি জানতাম আগে থেকেই। প্রাকটিস বাড়িয়ে দিলাম। ডিবিতে চাকরি করি বলে আমরা দুজন করে ড্রাইভার পেতাম। কারণ ডিবির গাড়ি রাত দিন চলতো। দেখা গেল ওরা দুজনাই বাবু হয়ে বসে আছে সেকেন্ড সিটে গাড়ি চালাচ্ছি আমি একাই। আমার দিব্যি মনে আছে একটা ৮/৯ বছরের বাচ্চা অপহরণের ঘটনার রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব পেয়ে ঢাকা থেকে নওগাঁ যাই, দুপুর নাগাদ রওনা হয়ে সন্ধ্যা নাগাদ নওগাঁ পৌঁছাই। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হওয়ার আগেই আবার খবর পাই যে অপহরণকারীরা বাচ্চাটিকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ গিয়েছে কাঁঠালের ট্রাকে করে। উত্তর বঙ্গের রাস্তা তখন এখনকার চেয়ে অনেক খারাপ। ঝাঁকুনিতে সবার কোমর ভাঙার কায়দা হয়েছে। টিমমেটরা বললেন স্যার এখন রওনা করা ঠিক হবে না, কুয়াশা ইত্যাদি। ড্রাইভারও বেঁকে বসল। বাচ্চার বাবা আমাদের সাথেই ছিলেন। তিনি অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী। তার একমাত্র ছেলে অপহরণ হয়েছে। তার সে অসহায় দৃষ্টি সহ্য করা সম্ভবপর ছিল না। টিমমেটদেরকে বললাম তোমরা গাড়িতে ঘুমাও, আমি গাড়ি চালাবো। বাচ্চার বাবাকে সেকেন্ড সিটে বসিয়ে আমি নিজে ড্রাইভিং সিটে বসলাম জার্নি ফ্রম নওগাঁ টু নারায়ণগঞ্জ। নিরাপদেই ভোর ভোরে পৌঁছলাম নারায়ণগঞ্জ কোনো বিপত্তি ছাড়াই। সেদিনই নিজের ড্রাইভিং এর উপর কনফিডেন্স আসল। শীতের রাতের কুয়াশা, হাজার হাজার ট্রাক, নাইট কোচের সারি পেরিয়ে যখন এই শ্লান্ত-ক্লান্ত শরীর নিয়ে নওগাঁ থেকে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছেছি তখন ড্রাইভিং এ পাস করবো এ বিশ্বাস ছিল। শুটিং এর প্র্যাকটিসের তেমন সুযোগ নেই। তবে মিশনের পরীক্ষার আগে রাস্তা ঘাটে খেলনা রাইফেল নিয়ে বেলুন ফুটানোওয়ালাকে দেখলেই গাড়ি থামিয়ে প্র্যাকটিস সেরে নিতাম, কাজেই মোটামুটি কনফিডেন্স নিয়েই পরীক্ষা দিব এমন অবস্থা তৈরি হয়ে গেল।

অবশেষে এল সেই দিন। সম্ভবত ২০০৫ এর জুলাই/আগষ্ট হবে। সব মনে নেই। এটুকু মনে আছে যে, পরীক্ষার দিন বৃষ্টি ছিল, এমনকি শুটিং ও বৃষ্টির কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

পরীক্ষার হলে ঢুকলাম। প্রথমেই রিডিং Comprehension। সময় আধাঘণ্টা, দুপাতার একটা রিপোর্ট পড়ে ১০ টি প্রশ্নের উত্তর দিলাম। সময় থাকতেই পরীক্ষা শেষ করলাম তৃপ্তি নিয়ে, একেবারে ছক্কা। হাসিমুখে রাজারবাগ টেলিকম অডিটোরিয়ামের পরীক্ষা হল থেকে বের হলাম, ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই রেজাল্ট দিবে। ব্যাচমেটরা অনেকেই এসেছে পরীক্ষা দিতে। দলবেঁধে পাশের ক্যান্টিনে ঢুকে গুঁড়িগুঁড়ি সিঙ্গাড়া চা-টা খেলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম রেজাল্টের জন্য। আমি জানতাম যে আমি শতভাগ নাম্বার পাবো। আমার বউ তখন নায়েমের বেসিক ট্রেনিং এ। ঐ দিন ওরা শিক্ষা সফরে সিলেট বা কোথা থেকে যেন আসছিল। তার উত্তেজনাও টান টান। কারণ সে ছিল আমার মিশন প্রস্তুতির সত্যিকারের পার্টনার। রেজাল্ট পেলাম, যথারীতি পাশ। তাকে এবং মাকে জানালাম। মা তো এত কিছু বোঝে না খালি জানে মিশন মানেই যুদ্ধ, গোলাগুলি। মার এক কথা ভালোই চাকরি করছিস, বউও চাকরি করছে, কেবল একটা বাচ্চা আল্লায় দিছে, কি দরকার গোলাগুলির মধ্যে যাবার? বউ কিন্তু খুব খুশি। আমার জয় মানে তারও বিজয়। সেও আমার সহযোদ্ধা। এভাবে একে একে Listening test দিলাম, পাশ করলাম, তীব্র উত্তেজনা নিয়ে উনাকে জানালাম, তিনি তখনো পথে, তখন উল্লাসে তার সাথে যুক্ত হয়েছেন তার ব্যাচমেট কয়েকজন বন্ধু। সন্ধ্যার পর পরই Report writing পরীক্ষা হল। সকালে হল ছিল ভরা, পরীক্ষার্থী পাঁচ শতাধিক। Report writing এর আগেই ঝরে গেছে অর্ধেকের বেশি। Report writing এর রেজাল্ট শেষে দেখা গেল ইংরেজির ৩টি টেস্টেই কৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সত্তর বা তার কাছাকাছি। বাসায় আসলাম, যথারীতি গাড়ি চালিয়েই। ড্রাইভিং টেস্ট হবে, বিষয়বস্তু পার্কিং টেস্ট, ব্যাক গিয়ারে নির্দিষ্ট গতিতে গাড়ি চালানো এবং ব্যাক গিয়ারে এসে প্যারালাল পার্কিং। নির্ধারিত সময় ৩ মিনিট। যথেষ্ট কনফিডেন্ট ছিলাম। তারপরও সেদিন মধ্যরাত্রিতে বউকে পাশে বসিয়ে আরো একবার প্রাকটিস করলাম। ৩ মিনিটের টেস্ট ২ মিনিটের মধ্যে সফলভাবে সমাপ্ত করলাম। বউ বলল তুমি না পারলে কে পারবে? খালি তড়িঘড়ি করোনা। ৩ মিনিটের টেস্ট দু মিনিটে করার কি দরকার? তার পরামর্শ কাজে লেগেছিল। ধীরে সুস্থে ড্রাইভিং সব নিয়মনীতি মেনে সিট বেল্ট বেঁধে, মিরর ঠিক করে, গিয়ার, সিটের পজিশন সব দেখে শুনে ধীরে সুস্থে ড্রাইভিং পরীক্ষা দিলাম। গাড়িতেই পরীক্ষকদের একজন বসা থাকেন তিনি ছিলেন তুরস্কের একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসার। পরবর্তীতে তার সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব হয় কারণ পরবর্তীতে আমিও UN SAAT এর একজন সদস্য এমনকি দলনেতা হয়ে দুটি দেশের জন্য মিশন পরীক্ষা নেবার জন্য মনোনীত হই। সে গল্প বাকি থাক।

তার্কিস কলিগ আমার ড্রাইভিং দেখে মুগ্ধ হন, বলেন অসাম, আমি হেসে উঠি, মনে পড়ে যায় স্পিকিং প্যাকটিসের কথা। শেষ হয় ড্রাইভিং পর্ব। ড্রাইভিং এ পাশ মানেই মিশনের জন্য মোটামুটি মনোনীত। এরপর খালি বাকি থাকে শুটিং। ওতে পাশ করলে এক্সিকিউটিভ মিশন আর না করলেও নন এক্সিকিউটিভ মিশন। অর্থাৎ পাশ না করলেও মিশনে যাবার চান্স থেকেই যায় এবং ভালো মতোই থেকে যায়। কাজেই মোটামুটি নিশ্চিন্ত হই মিশনের জন্য মনোনীত হওয়ার। টিম লিডার যেহেতু ড্রাইভিং এ আমার সরাসরি পরীক্ষক ছিলেন এবং আমি ইংরেজি ৩টি টেস্টেই প্রায় শতভাগ মার্কস পেয়ে পাশ করেছিলাম কাজেই সাক্ষাৎকার পরীক্ষায় আমার কৃতকার্য না হওয়াটা মোটামুটি অসম্ভব। এমনিতেও সাক্ষাৎকারে খুব একটা কেউ ফেল করে না। মোটামুটি মিশনের জন্য মনোনীত হওয়ার অনুভূতি নিয়েই দ্বিতীয় দিন শেষ করলাম। এবার শেষ দিন শুটিং পরীক্ষা। বিভিন্ন দূরত্ব থেকে পিস্তলের ফায়ারিং দক্ষতার পরীক্ষা নেওয়া হয়। ১০ রাউন্ডের মধ্যে অন্তত ৮ রাউন্ড বোর অর্থাৎ টার্গেটের হার্টে না লাগাতে পারলে ফেল। তেজগাঁও পুরাতন বিমান বন্দরের এসএসএফের শুটিং রেঞ্জে শুটিং পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত। ঐ বারে মিশন পরীক্ষা পাশের হার খুব কম কিন্তু জাতিসংঘ থেকে একাধিক মিশনের জন্য বাংলাদেশ থেকে পিসকিপার প্রেরণের অনুরোধ আছে। এক্সিকিউটিভ এবং নন এক্সিকিউটিভ উভয় টাইপের মিশনের জন্যই রিকুইজিশন আছে। এক্সিকিউটিভ মিশন হচ্ছে যে সকল মিশনে CIVPOL রা সরাসরি পুলিশিং অর্থাৎ পেট্রোলিং, এরেস্ট, তদন্ত, সিকিউরিটি সবই করেন। আর নন এক্সিকিউটিভ মিশন অনেকটা এডভাইজরি টাইপের লোকাল পুলিশই সব করে। ইউএন পুলিশ তাদেরকে গাইড বা সুপারভাইজ করে। যে সময়ের কথা বলছি সেসময়ে কসোভো এবং সম্ভবত পূর্ব তিমুরে ছিল এক্সিকিউটিভ মিশন এবং সুদান, আইভরি কোস্টে ছিল নন এক্সিকিউটিভ মিশন।

বলে রাখার দরকার আমাদের মতো দেশের পুলিশ অফিসারদের জন্য মিশনের অন্যতম আকর্ষণ হল এম.এস.এ বা মিশন সাবমিসটেন্স এলাউন্স। যাকে চলতি ভাষায় সম্মানি বলে। জাতিসংঘের কর্তা ব্যক্তিরা মিশনের নিরাপত্তা, জীবন যাপনের রিস্ক, আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ আনুমানিক সকল বিষয় বিবেচনা করে প্রতিটি মিশনের জন্য আলাদা আলাদা এম এস এ বা সম্মানী নির্ধারণ করেন।

আমরা যখন পরীক্ষা দেই তখনকার হিসাবে এক্সিকিউটিভ মিশনের দেশগুলোতে এম এস এ তুলনামূলকভাবে নন এক্সিকিউটিভ মিশনগুলোর তুলনায় কম। কাজেই আমাদের মধ্যে বুদ্ধিমানরা ঠিক করল তারা ঠিক কাজটি করবে, বুদ্ধিমান হবে অর্থাৎ শুটিং এ ফেল করবে। কারণ এক্সিকিউটিভ মিশনের দেশে যেতে হলে শুটিং পাশ করতেই হবে আর নন এক্সিকিউটিভ দেশে শুটিং পাশ করা আবশ্যক নয়। কাজেই ৭০ জনের মধ্যে ৩০/৩৫ জনকে কসোভো যেতে হবে এক্সিকিউটিভ মিশনে। কসোভো মিশনে যাওয়ার দিন মাস দুয়েকের মধ্যেই। অর্থাৎ এখন শুটিং পাশ করা মানেই কসোভো মিশন নিশ্চিত। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলাম ভালোমতো শুটিং করে কসোভো মিশনে যাব নাকি ইচ্ছে করে ফেল করে বেশি টাকার নন এক্সিকিউটিভ মিশনের জন্য ওয়েট করবো। ঠিক বা ভুল যাই হোক সিদ্ধান্ত নিতে আমার বরাবরই সময় লাগে না। সিদ্ধান্ত নিলাম কপটতা করবো না, ঠিক মতো পরীক্ষা দিব, যা আছে কপালে। বউকে জিজ্ঞস করলাম সেও আমার সাথে একমত পোষণ করল। ঠান্ডা মাথায় ধীরে সুস্থে ফায়ার করলাম।

ফলাফল দশে দশ। মোটামুটিভাবে নিশ্চিত হলাম কসোভো মিশনে যাচ্ছি। তৎকালীন জাতিসংঘ মিশন নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এআইজি ইউএন ডেস্ক গ্রাউন্ডে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাদেরকে Congratulate করলেন কসোভো মিশনের জন্য। পরের দুয়েক দিনের মধ্যেই medical test এবং আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সমাপ্ত হল। আমরা এসপি হতে এসআই পদমর্যাদার ৩২ জন কর্মকর্তা কসোভো মিশনের জন্য মনোনীত হলাম। টিম লিডার ছিলেন ১৫ তম বিসিএসের মোস্তফা কামাল (বাপ্পী) স্যার। আমার ব্যাচের ৪ জন কর্মকর্তা মাসুদ করিম ভাই, ইমাম ভাই, আমি এবং সালমা প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ মিশনের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত হলাম। 

আমাদের নাম প্রস্তাব করে UN HQ’s এ পাঠানো হল। আমাদেরকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট করতে বলা হল। ভিসা, টিকেটসহ অন্যান্য সব কিছু জাতিসংঘের দায়িত্ব। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভিসা টিকেট সব পেলাম। যাত্রা নির্ধারিত হল ১০ অক্টোবর ২০০৫।

চূড়ান্ত মনোনয়ন, ভিসা,টিকেট হাতে পেলাম। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স অ্যাডিশনাল আইজি স্যার আমাদেরকে ব্রিফ করলেন। মাগরিবের একটু আগে ব্রিফিং শেষ হল। ব্রিফিং শেষে আমাদের প্রস্তুতি শুরু হল। ইউনিফর্ম, শীতের কাপড় কত কিছু। সব শেষ করে আমার সাদা Noah মাইক্রোতে উঠলাম বাসার উদ্দেশ্যে, গাড়িতে এসি ছিল না, একটা ফ্যান লাগানো ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও ভ্যাপসা গরম। জানালা খুলে দিলাম। সন্ধ্যা পেরিয়ে তখন রাতের প্রথম প্রহর। নগরীর সারি সারি অট্টালিকার ওপর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি শরতের মেঘের পাশে হাসছে একফালি চাঁদ। হঠাৎ আব্বার কথা ভীষণ মনে পড়ল। আহারে, আজ যদি আব্বা বেঁচে থাকতেন কতই না খুশি হতেন!! আব্বা মাঝে মাঝেই মাকে বলতেন আমার এ ছেলে একদিন বিশ^ জয় করবে। মানুষের জীবনের কত ইচ্ছাই না অপূর্ণ থেকে যায়! আহারে জীবন এত ছোট ক্যানো?

  লেখক : অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন)

  অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *