ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ মনিরুজ্জামান বিপিএম (বার), পিপিএম (বার)

ঠিক কবে থেকে ধরাধামে অশান্তি এসেছে তা আমার জানা নেই।অনেকেই বলে থাকেন বাবা আদমের নিষেধ না শুনে যখনি মা হাওয়া স্বর্গের উদ্যানে নিষিদ্ধ গন্ধক ফল খেয়েছিলেন তখন তারা স্বর্গ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মর্ত্যে প্রেরিত হয়েছিলেন। সেদিন থেকেই তাবৎ মানবজাতির জন্য স্বর্গ নিষিদ্ধ হল।আমাদের আদি ভাই হাবিল কাবিলের দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্বসূরি ভ্রাতৃঘাতী হয়েছিলেন সে ইতিহাসও আমাদের সকলের কম বেশি জানা।ঐতিহাসিকভাবেই মানবজাতি একটি অপরাধপ্রবণ এবং অকৃতজ্ঞ জাতি।মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব ইত্যকার যত কথাই আমরা বলি না কেন জগতের জ্ঞাত হেন কোনো অপরাধ নেই যা মানবজাতি করেনি।প্রাণিজগতে মনুষ্য প্রজাতির মতো বর্বর ও হিংস্র প্রজাতি খুব কমই আছে।কাকে কাকের মাংস না খেলেও মানুষ মানুষের মাংস, সম্পদ, সম্মান ও সম্ভ্রম কোনোটাকেই মানবজাতির অরুচি নেই।সভ্যতার শুরু থেকেই মানবজাতিকে পরিচালনার জন্য মানবজাতির মধ্যে অগ্রসর শ্রেণি বিভিন্ন মানবসৃষ্ট বিধি বিধান প্রণয়ন করেছে।যুগে যুগে নানা ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমেও আমাদের সৃষ্টিকর্তাও আসমানী কিতাবে মানবজাতির করণীয় বর্জনীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন।মানুষ তা সামান্যই কেয়ার করেছে।রাব্বুল আলামিন যুগে যুগে পথচ্যুত মানবজাতিকে পথে আনার জন্য নবী রসূল পয়গাম্বরদের প্রেরণ করেছেন প্রেরিত পুরুষ হিসাবে।সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মানবজাতি স্রষ্টার আদেশ নির্দেশ প্রতিপালন করেনি, ফলে যুগে যুগে দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে সংঘাত সংঘর্ষ লেগেই ছিল।কথায় কথায় যদিও আমরা বলি মগের মুল্লুক কিন্তু আসলে বিষয়টা হচ্ছে যার জোর আছে সেই মুল্লুক দখল করেছে, খালি মগরা নয়।আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর কর্তৃত্বও মানুষ যুগে যুগে অমান্য করেছে, অস্বীকার করেছে।শুধু অস্বীকৃতিতেই ক্ষান্ত হয়নি মহান স্রষ্টার অস্তিত্বকেও চ্যালেঞ্জ করেছে একমাত্র মানব সন্তানরাই।পরম করুণাময় মানবজাতির এই অস্বীকৃতি ও অকৃতজ্ঞতায় রাহমানুর রাহিম হয়েও সুস্থ হয়েছেন।পবিত্র কোরআন শরীফের একটি বিখ্যাত সূরা আর রহমানে বার বার করে বলেছেন, ‘‘ফাবি-আইয়্যি আলা-ই-রাব্বি কুমাতু-কাজ্জিবান’’।অতঃপর তুমি তোমার রবের আর কোন্ কোন্ নেয়ামতকে অস্বীকার করবে। করুণাময় রাগান্বিত হয়েছেন কিন্তু মানুষ অবাধ্যতা করেই গেছে।সৃষ্টিকর্তার বাণী, শিক্ষা, দীক্ষা, সংস্কৃতি, জীবন বোধ, পাপের বা পুণ্যের পুরস্কার কোনো কিছুতেই মানব জাতিকে পাপের পথ থেকে প্রতিহত করতে পারেনি। এজন্য যুগে যুগে, দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে, মানুষে মানুষে সংঘাত সংঘর্ষ লেগেই থেকেছে।

এ পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য ও কর্মযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য মানব জাতির প্রচেষ্টাও অন্তহীন। যুগে যুগে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা ধর্মের কথা বলে ভয়, লোভ দেখিয়েই মূলত মানুষকে অশান্তির পথ পরিহার করে শান্তির পথে আহ্বান করেছেন। সেই গুহা যুগ, প্রস্তর যুগ বা অগ্নিযুগ থেকে হালের জ্ঞান বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির যুগেও মানুষে মানুষে হানাহানি যেমন আছে তেমনি এর বিপরীতে রেষারেষি বা রক্তারক্তি বন্ধে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ নানা পথ ও মতের বিভাজনের মধ্যেও একমত হয়েছেন মানব জাতিরই বৃহত্তর স্বার্থে।

যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নানা সভ্যতার উন্মেষ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।পারস্য সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, মহেঞ্জোদারো হরপ্পা সভ্যতা, আরব সভ্যতা, গ্রিক সভ্যতার বর্ণনা ইতিহাসের পাতায় পাতায় স্ব-মহিমায় প্রচারিত হয়েছে যুগ থেকে যুগান্তরে।সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথেই শাসন, শোষণ এবং নেতৃত্বের ধারণা আস্তে আস্তে বিকশিত হয়েছে।গড়ে উঠেছে শাসক শ্রেণির এবং আবশ্যিকভাবেই বৃহদাংশ হয়েছে শোষিত।সৃষ্টির বিশেষ করে সভ্যতার শুরু থেকে তাই পৃথিবী শাসক এবং শোষিত এই দুই ভাগে বিভক্ত।মানবজাতির এই বিভক্তি এবং শাসন ও শোষণের চক্রে যুগে যুগে সীমারেখার মাধ্যমে হয়েছে জাতিতে জাতিতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে। নৃতাত্তত্ত্বক বিশ্লেষণ আমার কাম্য নয়।বিশ্ব শান্তি এবং বিশ্ব শান্তিরক্ষায় শান্তিরক্ষীর ভূমিকা আমার লেখার বিষয় বস্তু।অবধারিতভাবেই এসে গেল এ আলোচনা।

সভ্যতার শুরু হয় মানুষের মধ্যে।জাতি বা সম্প্রদায়ের ধারণাটি ছিল না, ছিল না আরো অনেক কিছুই।আদিযুগে প্রাকৃতিক নিয়মেই আর দশটা প্রাণীর মতোই আহার সামগ্রী প্রকৃতি থেকেই সংগ্রহ করতো মানুষ।যুগের বিবর্তনে মানুষের চাহিদা বাড়তে থাকে।এক পর্যায়ে সভ্যতার ধারণা জন্মায় মানব জাতির মধ্যে বিনিময় প্রথার উদ্ভব হয়।সেখান থেকেই সম্প্রদায়ভিত্তিক সভ্যতার ধারণা জন্মে।যাদের একদল হয়তো ফলমূলসহ উদ্ভিজ্জ খাদ্যের জোগান দিতো কেউবা জলজ খাবারের।সমাজ বিজ্ঞানী বা নৃতাত্তি¡করা বলে থাকেন বিনিময় প্রথা থেকেই পরবর্তীতে লেনদেন বা ব্যবসা বাণিজ্যের ধারণাটি জন্ম নেয় এবং মানুষ অর্থ বা লাভ লোকসান বুঝতে শিখে।যেদিন থেকে মানুষ লাভ লোকসান বুঝতে শিখে সেদিন থেকে মানুষের মধ্যে শ্রেণি চেতনার উদ্ভব হয়।বেশি শক্তিশালী বা সম্পদশালী মানুষ অপেক্ষাকৃত কম সম্পদশালী বা কম শক্তিশালী মানুষকে শোষণ করতে শুরু করে।আদি সমাজ ব্যবস্থায় এভাবে শোষক এবং শোষিত শ্রেণির উদ্ভব হয়। নিজস্ব বংশ বা কওমের ধারণা থেকে মানুষের নিজস্ব বলয় বা এক ধরনের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্ম হয়।বোধ করি কর্তৃত্ব পরায়ণতা মানুষের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য।তাই মানুষ সৃর্ষ্টির সেরা জীব হয়েই সন্তুষ্ট না থেকে মানবজাতির মধ্যেও তার বা তার নিজস্ব বলয়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত হতে শুরু করে।শুরু হতে সংঘাত করে সবাই বড় হতে চায়।নিজের বড়ত্ব প্রকাশের স্বার্থেই মানুষ বুদ্ধিমান হতে শুরু করে।নিজের শক্তির সাথে অন্যের শক্তি যোগ করার মাধ্যমে আরো শক্তিশালী হওয়ার ধারণা থেকেই শুরু হয় সন্ধি, ষড়যন্ত্র দল ভারী করা এবং দল ভাঙার ষড়যন্ত্র।নানা ট্রায়াল এবং এররের মাধ্যমে পরবর্তীতে এই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সাথে জড়িত হয় গায়ের রঙ, শারীরিক শক্তি, সম্পদের প্রাচুর্যতা, নিজস্ব ভৌগোলিক সুবিধা বা অসুবিধা ইত্যাদি।নদী অববাহিকা বা সমতল ভূমি অঞ্চলে ফল ফসল এবং প্রাণীজ উৎসের সরবরাহ বেশি থাকার কারণে সেসব অঞ্চলে বসবাস করা মানুষ অপেক্ষাকৃত অনুর্বর, পানিশূন্য অঞ্চলের অধিবাসীদের চেয়ে নিজেদেরকে কুলীন ভাবতে শুরু করে।অকুলীনরাও কুলীন হতে চায় এবং কৌলিন্যের সন্ধানে জীবিকার সরবরাহ বেশি এমন অঞ্চলে আসা শুরু করে।কুলীনরা তাদের ও তাদের গোষ্ঠী স্বার্থ বিবেচনায় মানুষের স্বাভাবিক স্থানান্তরকে বাধা দেয়।তখন থেকেই নদী পর্বত সাগর জলাশয় কেন্দ্রিক জাতিগত ভৌগোলিক সীমা রেখার উদ্ভব হয়।যুগে যুগে সত্যতাগুলো মূলত নদী তীরবর্তী অঞ্চলের গড়ে উঠেছে।কম সম্পদের বা প্রাচুর্যের মানুষের সম্পদশালী অঞ্চলে গমনের অদম্য স্পৃহা, সম্পদশালীদের বাধা দানের মধ্য থেকেই শক্তি প্রয়োগ এবং পরবর্তীতে যুদ্ধ বিগ্রহের ধারণা জন্ম দেয়।এভাবেই যুগে যুগে মানব সভ্যতার নামে মানব অসভ্যতা যুগে যুগে বিস্তৃত হয়েছে।

যুদ্ধে বিগ্রহে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে মানুষ ক্ষণে ক্ষণে থামবার পদ্ধতিও আবিষ্কার করতে পেরেছে এক সময়।সেখান থেকেই সন্ধির ধারণার সূত্রপাত।একসময় মানুষ ভেবে দেখেছে সব সময় যুদ্ধে নয় বরং কখনো কখনো আপসে বা সন্ধিতে সীমারেখা মেনে চলার মাধ্যমেই তারা বেশি লাভবান হচ্ছে।কখনো কখনো পর্যুদস্ত জাতি অনন্যোপায় হয়ে অযৌক্তিক আপোস নামাও মেনে নিয়েছে।এটি সেই প্রস্তর যুগে যেমন ছিল এখনো তেমনি আছে।বোধ করি এ ধারণা থেকেই  Contact law তে বিধিবদ্ধভাবে সম্পাদিত সকল চুক্তিই বৈধ বা আইনানুগ নয় যদি তা অযৌক্তিকভাবে সম্পাদিত হয়ে থাকে।বৃটিশ ‘ল’য়ের একজন ছাত্র হিসাবে আমি দেখে মুগ্ধ হয়েছি কি চমৎকার ও মানবিকভাবে আইনি বিধি বিধানগুলো সম্পাদিত হয়েছে। যাকগে সেদিকে না যাই।

আদিম যুগ বা মধ্য যুগ পেরিয়ে এই আধুনিক যুগে ফিরে আসি।একাবিংশ শতাব্দীতে এসে মানব সভ্যতা যখন সর্বাংশে পরিপূর্ণ হয়েছে তখনো আমরা এ ধরনের অনাচার বিশ^ব্যাপী প্রত্যক্ষ করেছি।কৃষি বিপ্লব, শিল্প বিপ্লবের এবং উন্নয়ন পথ পরিক্রমার নানা বিবর্তন শেষে এ শতাব্দীর সভ্য পৃথিবীতে বিশ্ববাসী এ আগ্রাসন ধারণা উদ্ভূত দুটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে। বিশ্বজুড়ে লক্ষ কোটি মানুষ মারা যায়, মানবতা ভূলুন্ঠিত হয়, বারুদের নিনাদে দূষিত হতে থাকে প্রাচ্য পাশ্চাত্যে, আর্য বা অনার্যদের বিশ্বজনীন জনপদ।মানবতা লুন্ঠিত হয়ে পৃথিবীতে নগ্ন নৃত্য হয় survival of the fittest বা শ্রেষ্ঠতররাই একমাত্র টিকে থাকবেন তত্ত্বের।

বিশ্ব সম্প্রদায় একমত হয় এভাবে চলতে পারে না। বিশেষ করে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার হওয়ার পর এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে তার ‘‘সফল’’প্রয়োগের পর বিশ্ববাসী চোখে দিবালোকের মতোই উদ্ভাসিত হতে থাকে যুদ্ধের ভয়াবহতা। আলোঝলমল তিলোত্তমা মহানগরী হিরোশিমা ও নাগাসাকি মুহূর্তে তামা হয়ে যায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে। তখন যারা ছিলেন শুধু তারাই নয় সেখানকার পরিবেশ এমনভাবে দূষিত হয়ে যায় যে, সে ভয়াবহতার অনেক পরেও সেসব অঞ্চলে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে থাকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের লংটার্ম ইমপ্যাক্ট হিসাবে। এতে এমনকি মহাপরাক্রমশালীদেরও টনক নড়ে কারণ এটম বোমা খালি তাদের একার নয় তা শত্রুপক্ষেরও করায়ত্ত হয়েছে ততদিনে। মানবতার বিশ্বজনীন আপিলে শত সহস্র বছরে যা হয়নি এবার তা হয়।বিশ্ববাসীর বিশেষ করে বিশ্বের মোড়লদের টনক নড়ে।তারা নড়েচড়ে বসেন, এক টেবিলে বসতে বাধ্য হন।এটম বোমার অণু বিশ্লেষণ তাদেরকে এক টেবিলে বসতে বাধ্য করে।তারা সিদ্ধান্ত নেয় আর না, এবার থামতে হবে।এরই প্রেক্ষিতে বিশ্ববাসীর আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক রূপে গড়ে ওঠে জাতিসংঘ বা ইউনাইটেড স্টেট্স।নির্ধারণ করা হয় এর কর্তৃত্ব, কার্যপরিধি ও পরিচালনার নীতিমালা।গঠিত হয় সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদসহ আরো অন্যান্য পরিষদ।

জাতিসংঘের নির্ধারিত কার্য পরিধির অন্যতম হিসাবে নির্ধারিত হয় যুদ্ধ বন্ধ করা, শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, খাদ্য ও কৃষির উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কৃতির লালন ও বিকাশ এবং কনফ্লিকট নিরসনে বিচার ব্যবস্থার।জাতিসংঘের সফল কার্যাদিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলসহ সমগ্র বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা জাতিসংঘের অন্যতম ম্যান্ডেট। এজন্যই জাতিসংঘের অন্যতম কার্যক্রম হচ্ছে ‘‘জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রম বা ইউ এন পিস কিপিং’’।সরল অর্থে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সংস্থা জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ পিস কিপিং।

মানুষ হয়ে জন্মেছি তাই সমগ্র মানবজাতি নিয়েই ভাবি।বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে যেমনটি তিনি বলেছেন, একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি, আবার একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালির সাথে সম্পৃক্ত তাই আমাকে ভাবায়।এই অক্ষয় ভালোবাসাই আমার জীবন ও কর্মকে প্রভাবিত করে।

নিজেকে এ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংগঠন ‘‘জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় কাজ পিস কিপিং এর একজন প্রত্যক্ষ কর্মী হওয়া, দু দুটি মিশনে সরাসরি পিস কিপার হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে পিস কিপিং করা এবং চার চারবার জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা পদক পাওয়া আমার অনার্য জীবনের এখনো পর্যন্ত অন্যতম সেরা অর্জন।এজন্য আমি মহামহিমের কাছে যার পর নাই কৃতজ্ঞ।

বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছেই একটি আতঙ্ক।

মাতৃভূমিতেও মৃতের সংখ্যা আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মানুষের জীবন সব সময় অনিশ্চিত। করোনা তা আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কার কখন ডাক আসে বলা যায় না। চেনা জানা অনেকে চলে গেছেন, যাচ্ছেন। আইসিইউতে, হাসপাতালে বা নিজ বাসভূমিতে অনেকেই মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।

বিভিন্ন সময়ে, বারে বারে বলেছি আমি খুব ক্ষুদ্র, অতি নগণ্য একজন মানুষ। গর্ব করার কোনো কিছু আমার নেই। তেমন কোনো শিক্ষা বা যোগ্যতাও আমার নেই। ছোট বেলা থেকেই নিরহংকার হওয়ার শিক্ষাটা বাবা মা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন পারিবারিকভাবেই। নিজেও যৎসামান্য চেষ্টা করি অহংকার বর্জনের। শরীরে যেহেতু মানুষের রক্ত প্রবাহ মান তাই আমি অহং ছাড়তে চাইলেও অহং আমাকে ছাড়ে না। আমি অহং না হলেও গর্ব করে বলি ‘‘আই এম অব পুলিশ অফিসার বাই চয়েজ এন্ড নট বাই চান্স।’’ আমার সেই অহং এর একটা বড় কারণ বিশ^ শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরাসরি সামান্য ভূমিকা রাখার চেষ্টা করা। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দু দুটি মহাদেশের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে রক্তস্নাত স্বাধীনতার ‘‘লাল সবুজ পতাকা এবং জাতিসংঘের আকাশী নীল পতাকা একসাথে ওড়াতে ভূমিকা রাখা।

অনেক আগেই ভাবনা ছিল জাতিসংঘ মিশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু একটা লিখবো।মানুষের চেতনায় প্রথমেই আসে পেট, তারপরে মননশীলতা বা সৃষ্টিশীলতা। মিশনের এক্সপেরিয়েন্স নয় মিশনে যাবার জন্য পরীক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করার সুবিধার্থে সহকর্মীদের জন্য লিখেছিলাম ” UNSAAT MANUAL ” নামের একটি গাইড বই। ২০১০ সালে প্রকাশিত এ বই আমাকে যথেষ্ট আর্থিক সংগতি দিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। ভেবেছিলাম আরো পরে লিখবো পুলিশিং এর এক্সপেরিয়েন্স বিশেষ করে শান্তিরক্ষী কার্যক্রমের দিনলিপি। কে কখন চলে যায় তার ঠিক আগেও ছিল না, এখনো নেই। একটা সিনেমা দেখেছিলাম, নাম মনে নেই। সিনেমাতে একটা গান ছিল ‘‘জীবনের গল্প বাকি আছে অল্প, যা কিছু বলার নাও বলে নাও, যা কিছু দেখার নাও দেখে নাও, পাবে না সময় আছে অল্প।’’ কেন জানি গানটা বার বার মনে পড়ছে। লেখা শুরু করলাম আজই, শেষ হবে কিনা বা হলেও প্রকাশিত হবে কিনা জানি না। তাই ভাবছি যা লিখবো সাথে সাথেই আমার ওয়ালে ছাপাবো। যাতে করে মরে গেলেও আমার আক্ষেপ না থাকে।

সুদান মিশনে আমার এক ইন্দোনেশীয় কলিগ ছিল। লেঃ কর্নেল বা এসপি পদমর্যাদার। আসল নাম মনে নেই, ডাক নাম বোকো। ভীষণ স্মার্ট, চটপটে সুদর্শন। সে ছিল মিশন হেড কোয়ার্টার্সের পিআরও। পাবলিক রিলেশনস অফিসার। আমি বরাবরই আনস্মার্ট এবং অসুন্দর হলেও কিভাবে যেন তার সাথে আমার অদ্ভুত একটা হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। সে ছিল একার্থে আমার এক ধরনের অন্ধ ভক্ত। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম What quality made you so extra ordinary   সে হাসতে হাসতে চিরায়ত ভঙ্গিতে আমাকে উত্তর দিয়েছিল ” I am a very ordinary man, Love and affections of good souls like you, made me extra ordinary” বলেই বিশ^জয়ীর মতো করে হাসতো। ‘‘এই দেখলা কি একটা বাণী ঝাড়লাম ` আমি বোকোর মত স্মার্ট নই, অনেক বোকা, তারপরও কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমাকে আপনারা কেউ কেউ ভালোবাসেন, আমার হাবিজাবি লেখাও মনোযোগ দিয়ে পড়েন। সে ভরসাতেই ভাবছি আমার এ নিবেদন আপনাদের কারো কারো ভালো লাগতেও পারে। লাগুক বা না লাগুক ভাবছি লিখবো।

কত ফুল ফোটে, কত পাখি গায়, সব ফুলের সৌন্দর্য বা গন্ধ কি আমরা উপভোগ করতে পারি না মুগ্ধ হই বা হতে পারি সব পাখির গান শুনে, পারি না। তার মানে কি এই যে, পাখি আর গান গাইবেনা? হয়তো বা হ্যাঁ, হয়তো না।

আমি বরাবরই আপন মনে পথ চলি, আমার সেই অর্থে কোনো গন্তব্যও নেই, আমার পথই আমার ঠিকানা। তাই ভাবছি জাতিসংঘ শান্তি মিশনের দু বছরের কিছু বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে চলবে আমার এ স্মৃতি কথা।

 লেখক : অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন)

 অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *