ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন

২০২০-২১ অর্থ বছরের বাজেট- ‘মানবিক বাজেট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, এবারের বাজেটে মানুষকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। মানুষ না থাকলে বাজেট কার জন্য? বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে। ১১ জুন সোমবার জাতীয় সংসদে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্য উপস্থাপন করে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। নতুন অর্থবছরের বাজেট সবার জন্য উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সবসময় আমাদের বাজেটে অর্থনৈতিক উন্নয়নগুলোর কম্পোনেন্ট প্রাধিকার পায়। কিন্তু এবার আমরা তা করিনি। এবার মানুষকে প্রাধিকার দিয়েছি। এটা কেবল অর্থনৈতিক বাজেট নয়। এটা একদিকে অর্থনৈতিক বাজেট, পাশাপাশি মানবিক বাজেট’। বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-এর বিবেচনায় সম্পূরক বাজেটে রাজস্ব আয় ও ব্যয় কিছু সমন্বয় করা হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পুননির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা গেলেও তা হবে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ।

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে করোনা কবল থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের এক ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট বলে মন্তব্য করেছে অর্থনীতিবিদরা। অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সবদিক বিবেচনায় নিয়ে করোনার কবল থেকে ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের’ এক  ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট। এটি একটি জনবান্ধব ও জীবনঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যার মাধ্যমে দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎসাহ পাবেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এডিবির সাময়িকীর হিসাবে আশঙ্কা করা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে ১৪ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকার বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। করোনা সংকটের মধ্যেও সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষিত ‘আমার গ্রাম- আমার শহর’ বাস্তবায়ন এবং ‘সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা’ কাজে লাগানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মেগা প্রকল্পসহ এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিশীলতা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। সরকারের  অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে কয়েক মাস ধরে বিপর্যয়ের পরও আমাদের বাজেটের আকার কমেনি বরং বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১১ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিকক অগ্রগতির সুফল এ বাজেট। করোনা মোকাবেলার পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, মানুষ যেন কষ্ট না পায় সেদিকে লক্ষ রেখেই সব প্রতিকূলতাকে জয় করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়। এবারের বাজেট ভিন্ন বাস্তবতায়, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রণীত। এ বাজেট করোনার বিদ্যমান সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দেয়ার বাস্তবসম্মত প্রত্যাশার  দলিল। করোনাভাইরাসে সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে; সংকটকালীন ও সংকট-পরবর্তী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গতিপথ নির্ণয়ের লক্ষ্য সামনে রেখেই প্রণীত হয়েছে এবারের বাজেট, যা জীবন-জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা সরকারের সময়োচিত সাহসী চিন্তার ফসল। গতানুগতিক ধারার সঙ্গে ‘আউট অব বক্স’ চিন্তার সমন্বয়  করে সংকট জয়ের নবউদ্যোম সৃষ্টিতে এ বাজেট পেশ করা হয়েছে। ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’ শীর্ষক যুগোপযোগী ও জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রস্তাবের জন্য সরকার প্রশংসিতও হচ্ছে।

নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারীতে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনগর্ঠনের জন্য কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সৃষ্টিতে শিল্প খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। সে কারণে জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্প খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, যথাযথ প্রতিরক্ষণের মাধ্যমে বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদনক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও রফতানিমুখী শিল্পের বহুমুখী প্রসারের কৌশল অবলম্বনে শিল্প খাতের ১৩ টি উপখাতের জন্য শুল্ক কর হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়েছে। শতভাগ রফতানিমুখী গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পকে প্রণোদনা প্রদানের লক্ষ্যে ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ন্যায্য প্রস্তাবগুলোর আলোকে কতিপয় পণ্য আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প, পাদুকা শিল্প, ইলেক্ট্রনিক্স শিল্প, জাহাজ শিল্প, ডিটারজেন্ট শিল্প, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপার শিল্প, ইস্পাত শিল্প, প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্প, কাগজ উৎপাদন শিল্প, লুব ব্লেন্ডিং শিল্প, সিআর কয়েল শিল্প ও এলপিজি সিলিন্ডার ও অটো ট্যাংক শিল্প বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা সম্প্রসারণ ও যৌক্তিকীকরণের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। শিল্পখাতে কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি ছিল শিল্প উদ্যোক্তাদের। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে আগাম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ১০ মসে (জুলাই-এপ্রিল) বিভিন্ন খাতে ৮ কোটি ৪০ লাখ টনের বেশী পণ্য আমদানি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ আমদানির বিপরীতে ১৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা অগ্রিম কর (এটি) আদায় করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৯২ কোটি টাকা বাণিজ্যিক আমদানিতে ও বাকি ৫ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা বন্ড সুবিধায় আনা পণ্যের বিপরীতে আগাম কর হিসেবে আদায় হয়েছে।  সরকারের নিয়ম অনুযায়ী আগাম কর সমন্বয়ে ব্যবস্থা আছে। সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে আগাম কর ফেরত দেয়ার বিধান থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টাকা ফেরত পান না অভিযোগ উদ্যোক্তাদের।

করোনা তান্ডব শুরু হওয়ার পর মার্চের শেষ সপ্তাহে প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যাংকঋণ পরিশোধ নীতিতে শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকরা ঋণ পরিশোধ না করলেও খেলাপি করা যাবে না। তবে এ সময়ে  কোনো খেলাপি গ্রাহক ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করলেও তার ঋণমান উন্নত করা যাবে। জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে বিলম্বিত হওয়া ০৯ মাসের ঋণের কিস্তি পরিশোধের নীতিমালাও তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বলা হয়, এই নয় মাসে যে কয়টি ঋণের কিস্তি বিলম্বিত হবে, তা সমসংখ্যক বর্ধিত ঋণের কিস্তিতে পরিশোধ করার সুযোগ দিতে হবে। ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় বড় ধরণের উপকার পাবেন গ্রাহকরা। ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও নয় মাস ধরে তারা খেলাপি হওয়া থেকে বেঁচে যাবেন। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সম্পাদক রাহেল আহমেদ বলেন, ঋণ পরিশোধ না করলেও খেলাপি না করার নির্দেশনার মেয়াদ বাড়ানোর ফল ব্যাংকগুলোর জন্য নেতিবাচকই হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবসায়ী ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এ সুযোগ দিয়েছে। ব্যাংকার হিসেবে আমরাও ব্যবসায়ীদের বিপদের দিনে পাশে দাড়াতে চাই। আবার ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব আছে ব্যাংকের পাশে দাড়ানোর। পরস্পরের সহযোগীতা ও সহমর্মিতার  মাধ্যমেই দেশের অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে।

আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য উত্থাপিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণও। প্রস্তাবনা অনুযায়ী মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ১৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। সেক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ প্রস্তাবিত বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশে, যা একই সঙ্গে মোট জিডিপির ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী বলেন, নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সাধারণ ছুটি ঘোষণা, লকডাউন, শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমে দারিদ্র্য নিরাপত্তায় আমাদের অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার চলতি অর্থবছরে দরিদ্র কর্মজীবী মানুষের কষ্ট লাঘবে ৫০ লাখ জনকে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ অনুযায়ী ২ লাখ ৫৫ হাজার জন নতুন ভাতাভোগী যুক্ত করে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা ভোগীর সংখ্যা ১৮ লাখ জনে বৃদ্ধি করা হবে এবং এ বাবদ ২২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচণের কৌশল হিসেবে তৎকালীন ১৯টি থানায় ‘পল্লী’’ সমাজসেবা কার্যক্রম শুরু করেন। এ কার্যক্রমের সফলতার কারণে বর্তমানে দেশের সব জেলায় প্রত্যেক উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আশা করা যায়, এ প্রণোদনার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতিসঞ্চার করে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। করোনাজনিত আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করা এবং গ্রামে বসবাসরত দরিদ্র, দুস্থ ও অসহায় মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রমে জন্য ১০০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্রদানের ঘোষণা করেন।

এছাড়াও দরিদ্র মায়েদের জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা, কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা, ভিজিডি কার্যক্রম, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভাতা, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা উপবৃত্তি ও প্রশিক্ষণ, ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার সিরোসিস রোগীদের সহায়তা, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি ইত্যাদি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

প্রতিবেদক : পুলিশ সুপার

(অপস্ এন্ড ইন্টেলিজেন্স-২)

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *