ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায় পরীক্ষায় অকৃতকার্য ছাত্রকে পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেয়ায় রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষকে টেনে-হিঁচড়ে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়; কিংবা বেগমগঞ্জের অসহায় নারীর বস্ত্র হরণের দৃশ্য ও তার আর্তনাদ কিংবা পছন্দমত প্রার্থীকে স্বামী ভোট দেওয়ায় স্ত্রীকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা; কিংবা ফেনীতে একজন জনপ্রতিনিধিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গাড়ীতে পুড়িয়ে হত্যাপূর্বক উল্লাস করা; মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করায় নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা; রাজধানীর সবচেয়ে পরিছন্ন জায়গায় ব্যস্ততম সড়কের পাশে ফুলবাগানের ঝোপের মধ্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রীটিকে মৃত্যুভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা; বিশ্বস্ত বন্ধু ভেবে বাসায় যাওয়ার পর মাস্টার মাইন্ড স্কুলের ছাত্রীকে ধর্ষণ পূর্বক হত্যা করার নৃশংসতা বা সহিংসতার দগদগে স্মৃতি মনে করলে আমাদের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। সাধারণত যে কোন নৃশংসতার ঘটনা দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট ও বিষাদের। এর মধ্যে দিয়ে একজন ব্যক্তি, তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন-গোষ্ঠী গভীর ক্ষত অনুভব করে, তাদের দৈনন্দিন রুটিনে আসে নেতিবাচক পরিবর্তন। সমাজ অনেক সময় তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। কেউ এগিয়ে আসে-কেউ পিছিয়ে যায়। আবার যারা এগিয়ে আসে অন্যের ফিসফিসানিতে অনেক সময় তারাও পিছিয়ে যায়। নিপীড়িত ব্যক্তি বা পরিবার তার অবস্থান, মর্যাদা, সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। আবার অনেকে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য চুপ করে থাকে; যাতে নতুন করে কোন সহিসংতার মুখোমুখি হতে না হয়।

নৃশংসতা এক ধরনের আক্রমণাত্মক ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ; যার ফলে ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত ও হেয়-প্রতিপন্ন হয়। যদি ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কোন কাজ করে যা অন্যের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে সেটাও এক ধরণের নৃশংসতা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজনের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয়া বা কোন কাজ করতে বাধ্য করাও নৃশংসতা। মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নৃশংসতা কতটুকু প্রভাব ফেলছে তা জানার বিষয়টিকে খুব কম গুরুত্বই দেয়া হচ্ছে আমাদের সমাজে। নৃশংসতার সঙ্গে ব্যক্তির স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য, অন্তরঙ্গতা, নির্ভরশীলতা ও বিশ্বস্ততাসহ শারীরিক আবেগীয়, ভাষাগত, অবহেলা, বঞ্চনা, শোষণ ও নিয়মনীতি অমান্য করার বিষয়কে এক ধরনের নির্যাতন হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, প্রাপ্তবয়স্ক কর্তৃক নির্যাতন, সেবাদানকারী কর্তৃক নির্যাতন, পিতা-মাতা কর্তৃক কিশোর-কিশোরীদের ওপর নির্যাতন, আবার বয়োজেষ্ঠ্যদের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতন উল্লেখযোগ্য। এ নির্যাতনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সকল ধরণের নৃশংসতার সঙ্গে মানুষের মনস্তত্ত্বের নেতিবাচক মনোভাবের অন্তরঙ্গ যোগসূত্র রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যক্তির ওপর নৃশংসতা তাদের নিকট-আত্মীয় ও পরিচিতজনদের মাধ্যমেই ঘটে থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্য হলো আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণগত ও আবেগপূর্ণ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। আমরা কি চিন্তা করি, কি অনুভব করি এবং জীবনকে সামলাতে কিরকম ব্যবহার করি এগুলোই আসলে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য। একজন মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ নিজের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে এবং কখনোই কিছু নেতিবাচক আবেগ যেমন অতিরিক্ত রাগ, ভয়, হিংসা, ক্রোধ,  অপরাধবোধ, উদ্বেগ বা অন্যের ক্ষতিকর মনোভাব দ্বারা আবিষ্ট হবেনা। জীবনে যখন যেরকম চাহিদা আসে তা সামলে নেওয়ার ক্ষমতা তারা রাখে। শারীরিক সুস্থতার মতোই যদি একজন মানুষ বিভিন্ন নেতিবাচক আবেগ যেমন উদ্বেগ বা ভীতি দ্বারা আবিষ্ট থাকে, তাহলে এই আবেগগুলো তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিতে পারে এবং সঠিক সময়ে সাহায্য না নিলে এগুলো কিন্তু পরবর্তীকালে বড় ধরণের মানসিক সংকট হয়ে দাঁড়াবে, যেমন depression, general anxiety disorder, panic disorder, obsessive-compulsive disorder, acute mania, phobia ইত্যাদি। আর মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটাপন্ন অবস্থার  জন্য ব্যক্তির সমাজ বা প্রাতিষ্ঠানিক নৃশংসতাই সবচেয়ে মূখ্য ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন গবেষণায় জানা যায়।

নৃশংসতার মনস্তত্ব:

মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক কিংবা মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি শব্দগুলো এসেছে ‘মন’ থেকেই। যেখানে মানুষকে নিয়ে কাজ সেখানেই আসে মনের সাইকোলজি তথা মানুষের মনস্তত্ব। সুখ-দুঃখের অনুভব সব মানুষেরই আছে। সবাই সম্মান চায়। ভুলের জন্য অনুশোচনা করে। অন্য কেউ তাকে কেয়ার করুক এবং তাকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করুক সবাই তা চায়। কেউ তাকে নিয়ে চরম সমালোচনা বা হেয়-প্রতিপন্ন না করুক এবং তার প্রতি মানবিক হোক সবাই তা চায়। এই ক্ষেত্রে মনস্তত্ত্ব সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে; সবাই সুবিচার চায়। কিন্তু সে যদি স্বেচ্ছায় অনুতপ্ত হয়ে ভুল বুঝে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং পরে যদি সামাজিক স্বীকৃতি না পায়, অন্যের রোষানলে পড়ে এবং সবাই তাকে হেয় করে তখন তার পূর্ববর্তীস্থানে ফেরত যাবার আশংকা বহুগুণে বেড়ে যায়। সে তখন জিদের চাপে আরো বড় ধরণের নৃশংসতাকারী হতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি, অবনতি, কিংবা ভারসাম্য শুধু শারীরিক সুস্থতার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং আমাদের সামাজিক, পরিবেশগত, আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য ইত্যাদির ওপরও মানসিক স্বাস্থ্য গভীরভাবে নির্ভরশীল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক স্বাস্থ্য বলতে একজন মানুষের ভেতর শুধু কোনো ধরনের মানসিক সমস্যা না থাকাকে বোঝায় না। বরং মানুষ হিসেবে নিজের সক্ষমতাকে অনুধাবন করার যোগ্যতা, আত্মনিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকা, দৈনন্দিন জীবনের পারিপার্শ্বিক চাপের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে চলা এবং সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখার সক্ষমতাকে মানসিক স্বাস্থ্য বলা হয়।

আবার এমন সমাজও আছে, যেখানে নৃশংসতাকে সাহস বলে, অত্যাচারকে পৌরুষ বলে প্রশংসিত করা হয়। এই সমাজের শিশু সোশ্যালাইজেশনের মাধ্যমে সমাজবিরোধী, সহিংস, অপরাধমূলক আচরণ শেখে। বাবা বাসার কাজের ছেলেটাকে নিয়মিতই গালি দেয় ও মেরে থাকে, বাসায় মাকেও সময়ে সময়ে বকে ও মারে, সবসময় পরিবারের সবাইকে তটস্থ রাখে। ছেলে বাবাকে শক্তিশালী মনে করে, সেও বাপকা ব্যাটা হতে চাইবে, সেও মারপিট শিখে নেবে। এ জন্যই নৃশংসতাকারী বাবা-মায়ের সন্তানদের মধ্যে সহিংসতার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। আবার কোনো এলাকায় সমাজের মধ্যে সহিংসতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকলে সেখানকার সোশ্যালাইজেশন তেমনই হবে। ফলে শিশুরা নৃশংসতাপ্রবণ হয়ে উঠবে।

কোনো একটি সহিংসতা সংঘটিত হওয়ার পর যদি নৃশংসতাকারী পুরষ্কৃত হয় কিংবা সুবিধা পায়, তবে তার আরো নৃশংসতা করার আশঙ্কা বাড়বে। এভাবে বারবার পুরষ্কৃত হওয়ায় ব্যক্তির মধ্যে নৃশংসতামূলক আচরণ করার প্রবণতা দেখা দেয়। একবার যদি দস্যুতা করে কেউ রেহাই পায়, তাহলে পরেরবার এই পথটিই বেছে নেবে। ধর্ষক আরো ধর্ষণ করবে, খুনি আরো খুন করবে। তাই কারো খারাপ কাজে পুরষ্কৃত হওয়ার জন্য নৃশংসতা বাড়বেই। কেউ হয়তো নৃশংসতা করে সুবিধা পেল, বড় নেতা হলো, সম্পদ পেল, প্রভাব-প্রতিপত্তি পেল; সমাজের অন্যরা তা দেখলো। সমাজের কেউ কেউ এমনটা করে নিজেও সুবিধা নিলো। অর্থ্যাৎ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা নৃশংস আচরণ শিখতে পারি। মনোবিজ্ঞানী Albert Bandura একে ‘Vicarious Learning’ বলে অভিহিত করেছেন।

আমাদের সমাজের মানুষগুলো অত্যন্ত রহস্যময়। অনেক মানুষ মাঝে মাঝে বা হঠ্যাৎ করে নূন্যতম মানবিকতার পরিবর্তে ভয়াবহ নৃশংসকারী হয়ে উঠেছে। নৃশংসতার বহুমাত্রিকতা, ধরণ, প্রকৃতি ও কারণগুলো সবাই কম-বেশি জানে। এখন অতিকাছের পরিচিত যাকে বিশ্বাস করা হয়েছিল এরকম মানুষগুলো দ্বারা এমন সব ভয়াবহ ঘটনা, নাশকতা, রাহাজানি ইত্যাদি সংঘটিত হচ্ছে তা অনেক সময় কল্পনায়ও আসে না। মানুষের সম্পর্কের মধ্যে যে আন্তরিকতা, আস্থা ও সম্মানের সম্পর্ক ছিল তার মধ্যে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। বিশেষ করে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পুলিশকে অনেক বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। যেমন- রাতের মধ্য প্রহরের পর একটা ফোন কলে একজন ভদ্র মহিলা বলে উঠে, ‘ম্যাডাম আপনাকে সাক্ষী রাখলাম-আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি’। তখন আধো ঘুম-আধো জাগরণে ভদ্র মহিলাকে জঘন্য কাজটি করা থেকে বিরত রাখতে কল ব্যাক করে তার মনের টানাপোড়েনগুলো শুনে কিছুটা শান্ত করা গিয়েছিল। এক্ষেত্রে তাকে তাৎক্ষণিক আত্মহত্যা থেকে রক্ষা করা গেলেও যে ব্যক্তিটি ঐ জঘন্য কাজটির সাময়িক প্রশমনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার মানসিক চাপ বা অবস্থাকে কেউ কি হিসেবে নিয়েছিল?! এজন্য যে চাপের বোঝা বহন করতে হয়েছিল তা প্রশমনের জায়গা কি কোথাও আছে? অথবা সেই ৫ মে, ২০১৩ এর হেফাজতের তান্ডব থেকে, কিংবা ১ জুলাই ২০১৬ হলি আর্টিসানের মতো নৃশংস ঘটনায় পুলিশ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে মানসিক উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বহন করেছিল তার দায় কে নেবে? অনেকের শরীরের অভ্যন্তরে দীর্ঘস্থায়ী বোমার স্প্লিটার এখনো ঘাপটি মেরে আছে, বোমার আঘাতে ও বিকট শব্দে শারীরিক বিকলাঙ্গতা বহন করছে এবং ঘটনার ভয়বহতার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে একটা সময় ট্রমা ও বিষন্নতায় ভুগছে তারজন্যও কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। বাবা-মার জঙ্গীবাদী আচরণের হাতিয়ার/শেল হিসেবে ব্যবহৃত সাত বৎসরের শিশুটিকে উদ্ধার করার পর পুলিশের গায়ে সে থু থু মেরে বলেছিল-‘পুলিশ নাজায়েজ ও ইসলামের শত্রু’। উক্ত পুলিশ তখন কোমল মনের পেশাদারী মানবিক পুলিশ হয়ে নিজে বোমার ঢাল হয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে নিরাপদে রেখেছিল। এই মানবিক পুলিশ অন্যের জীবন রক্ষা করছে অথচ নিজের জীবনের নিশ্চয়তা বা স্পর্শকাতরতা নিয়ে চিন্তিত নয়; এর জন্য তাকে ও পরিবারকে দায় বহন করতে হয় বিভিন্ন সময়। তাই নিজের শরীর ও মনের শক্তি জাগ্রত করে মোটামুটি সবাইকে নিজেকে balanced রাখতে হয়। আর কারো balanced এর সক্ষমতা না থাকলে নিজের বোঝা নিজেকেই টানতে হয়। ব্যক্তিগতভাবে কেউ মনোবিশ্লেষকের শরণাপন্ন হলেও মানসিক সাপোর্টের জন্য নেই তেমন কোন পেশাগত ব্যবস্থা।

(চলবে)

লেখক: উপ-পুলিশ কমিশনার

(প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড এন্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন)

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *