ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত

শেখ মুজিব বলেন-

পূর্বাণী হেটেল, মতিঝিল, ঢাকা, সোমবার, ১ মার্চ ১৯৭১

আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করিয়া বলেন, শুধু সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের সেন্টিমেন্টের জন্য পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখা হইয়াছে এবং আমরা উহা নীরবে সহ্য করিতে পারি না। ইহার দ্বারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রায় ব্যর্থ হইয়াছে। পরিষদ অধিবেশনের জন্য বাংলাদেশের সকল সদস্যই ঢাকায় ছিলেন। জনাব ভুট্টো এবং জনাব কাইয়ুম খানের দল ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানি সকল সদস্যই অধিবেশনে যোগ দিতে রাজি ছিলেন।

ঢাকার মতিঝিলস্থ পূর্বাণী হোটেলে সোমবার (১ মার্চ ১৯৭১) বিকালে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সংক্ষিপ্ত সভাশেষে আকস্মিকভাবে আহূত এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল মঙ্গলবার ২ মার্চ ঢাকায় এবং পরশুদিন বুধবার ৩ মার্চ সারাদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালনের আহ্বান জানান। সর্বাত্মক হরতাল পালনের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে আগামী ৭ মার্চ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হইবে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ওই জনসভায় তিনি পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করিবেন।

সূত্র : ইত্তেফাক, মঙ্গলবার, ১৭ ফাল্গুন ১৩৭৭, ২ মার্চ ১৯৭১

ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত কর-খাজনা বন্ধ : বঙ্গবন্ধু

পল্টন ময়দান, ঢাকা, বুধবার, ৩ মার্চ ১৯৭১

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রতিবাদে ঘোষিত কর্মসূচি পালনের দ্বিতীয় দিবসে বুধবার (৩ মার্চ ১৯৭১) অপরাহ্নে ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে উত্তাল, উদ্দাম, বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে ভাষণদানকালে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিগত দিনের ঘটনাবলির পটভূমি বিচার করিয়া তুমুল করতালির মধ্যে সামরিক সরকারকে অবিলম্বে গণপ্রতিনিধিদের হস্তে ক্ষমতা সমর্পণ করিয়া ব্যারাকে ফিরিয়া যাওয়ার আহ্বান জানাইয়া জলদগম্ভীরস্বরে ঘোষণা করেন, বাংলার গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা সমপর্ণ করিয়া ব্যারাকে ফিরিয়া না যাওয়া পর্যন্ত সরকারের সহিত স্বাধিকারকামী বাংলার মানুষ আর সহযোগিতা করিবে না, কোনও কর-খাজনাও দিবে না।

ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহতি সমাবেশে আগ্রহব্যাকুল অযুত শ্রোতৃম-লীকে সাক্ষী রাখিয়া আওয়ামী লীগ প্রধান সর্বাত্মক অহিংস অসযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়া সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রতি নির্দেশ দেন, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আপনারা অফিস-আদালতে যাওয়া বন্ধ রাখুন।

বেতার, টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকার প্রতি নির্দেশ দিয়া তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের আন্দোলনের খবরাখবর প্রকাশ প্রচারের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়, সে নির্দেশ আপনারা লঙ্ঘন করুন।’

ভুট্টোগংয়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক নিয়মে প্রণীত এক শাসনতন্ত্র যদি না চান, আপনার শাসনতন্ত্র আপনারা রচনা করুন, বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র আমরাই রচনা করিব।’ গণ-অধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জীবনের সর্বস্তরের মানুষের এই মহতি সমাবেশে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বক্তৃতা শুরু করিয়া এবারকার আন্দোলনের সূচনাপর্বে স্বাধিকারকামী ‘যে বীর বন্ধুরা আত্মাহুতি দিলেন’ তাহাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন প্রসঙ্গে ৭ কোটি বাঙালির বিক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বরকে নিজের কণ্ঠে তুলিয়া লইয়া জলদগম্ভীরস্বরে শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, ‘বালার মানুষ খাজনা দেয়, ট্যাক্স দেয় রাষ্ট্র চালানোর জন্য। গুলি খাওয়ার জন্য নয়। তাই, গরীব বাঙালির পয়সায় কেনা বুলেটের দ্বারা কাপুরুষের মতো গণহত্যার পরিবর্তে অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া নিন, বাংলার শাসনভার বাংলার নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে তুলিয়া দেন।’

পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শেখ সাহেবের এই সভাশেষে পল্টন ময়দান হইতে একটি গণমিছিলের নেতৃত্ব করার কথা ছিল। কিন্তু পরে এই কর্মসূচি পরিবর্তন করিয়া তিনি সমাবেশে ভাষণদান করেন এবং জনগণের আশু কর্তব্য নির্দেশ করেন।

মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত পল্টনের সেই বিশাল জনসমুদ্র আর বসন্তের বৈকালিক সূর্যকে সাক্ষী রাখিয়া শেখ মুজিব দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘প্রস্তুত- আমরা প্রস্তুত। দানবের সঙ্গে সংগ্রামের জন্য যে কোন পরিণতিকে মাথা পাতিয়া বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। তেইশ বছর ধরিয়া রক্ত দিয়া আসিয়াছি, প্রয়োজনবোধে বুকের রক্তের গঙ্গা বহাইয়া দিব। তবু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়াইয়াও বাংলার বীর শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করিব না।’

সূত্র : ইত্তেফাক, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফাল্গুন ১৩৭৭, ৪ মার্চ ১৯৭১

আহতদের পাশে বঙ্গবন্ধু

ঢাকা, বুধবার, ৩ মার্চ ১৯৭১

আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুধবার (৩ মার্চ ১৯৭১) রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্বাধিকার আন্দোলনের আহত বীর সৈনিকদের দেখিতে যান। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মহসীন, ড. কামাল হোসেন, ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান জনাব আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ শেখ সাহেবের সহিত ছিলেন।

আওয়ামী লীগ প্রধান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। শেখ সাহেব আহতগণকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এতদ্ব্যতীত তিনি হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসায় ও সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার এবং নার্সদের সহিত আহতদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করেন।

আহত ব্যক্তিগণ আওয়ামী লীগ প্রধান ও অন্যান্য নেতাকে তাহাদের আহত হওয়া সম্পর্কে অবহিত করেন। আওয়ামী লীগ প্রধান তাহাদিগকে সান্ত¡না দান করেন। তিনি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারবর্গদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

আওয়ামী লীগ প্রদান চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিদের পথ্য ক্রয় করিয়া দেওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার নেতৃবৃন্দের নিকট পাঁচ শত টাকা দান করেন।

সূত্র : ইত্তেফাক, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফাল্গুন ১৩৭৭, ৪ মার্চ ১৯৭১

জনগণকে অভিনন্দন জানালেন শেখ মুজিব

বেতন প্রদানের জন্যে দপ্তর এবং ব্যাংকসমূহকে নির্দেশ

ঢাকায় বৃহস্পতিবার, ১৯ ফাল্গুন ১৩৭৭, ৪ মার্চ ১৯৭১-এ প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর বিবৃতির ভাষ্য :

আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হরতালের আগামী দুই দিন আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত কাজ করার জন্যে সেইসব সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরকে আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে কর্মচারীদের এখনও বেতন দেওয়া হয় নি।

আজ রাতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই সময়সীমার মধ্যে ‘বাংলাদেশ’-এর সীমান্তের মধ্যে এবং বেতনের চেক প্রদানের জন্যে ব্যাংকগুলোও কাজ করবে।

শোষণ এবং ঔপনিবেশিক শাসন স্থায়ী করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর তাঁর আহ্বানে বিপুলভাবে সাড়াদানের জন্যে ‘বাংলাদেশ’-এর বীর জনতাকে শেখ সাহেব অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, জনগণকে মনে রাখতে হবে যে, চরম আত্মত্যাগ ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠী স্বাধীনতা অর্জন করে নি, এবং সেজন্যেই তাদের যে কোনো মূল্যে মুক্তি অর্জনের জন্যে তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্যে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

‘শোষণ ও ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আমাদের আহ্বানে বাংলাদেশের প্রতিটি নারী-পুরুষ ও শিশু যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছেন, তার জন্য আমি আমাদের বীর জনগণকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। বাংলাদেশর নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণ, যেমন শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্ররা তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে বুলেটের সামনে সে সাহস ও দৃঢ়সংকল্প নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে, বিশ্বের জনগণের তা জানা দরকার।

‘ক্রমাগত হরতালের ফলে জনগণকে যে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, তা সহ্য করার জন্যও আমি আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জনগণকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। তাদের অবশ্য এ কথা মনে রাখতে হবে যে, চরম আত্মত্যাগ ব্যতীত কোন জনগণই মুক্তি পায় নি। কাজেই জনগণকে যে কোন মূল্যে মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

অত্যাবশ্যকীয়

৫ ও ৬ মার্চ তারিখেও সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত হরতাল অব্যাহত থাকবে। তবে নি¤œলিখিত ক্ষেত্রে ছাড় দেবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে :

১. যে সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি অফিসে কর্মচারীদের এখনও বেতন দেওয়া হয় নি, সে সমস্ত অফিস কেবল কর্মচারীদের বেতন প্রদানের জন্য বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। বেতনের চেকের টাকা প্রদান এবং বাংলাদেশের মধ্যে নগদ অর্থ আদান-প্রদানের জন্য ব্যাংকগুলো উক্ত সময় (বেলা আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটা) খোলা থাকবে। বাংলাদেশে অনূর্ধ্ব দেড় হাজার টাকার চেক স্টেট ব্যাংক থেকে ভাঙানো যাবে, তবে স্টেট ব্যাংকের মারফত বা অন্য কোনভাবে বাংলাদেশের বাইরে কোনো টাকা পাঠানো যাবে না। রেশনের দোকান বা খাবার সরবরাহকারীদেরও তাদের ব্যবসার জন্য এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে।

২. নি¤œলিখিত অত্যাবশ্যকীয় সার্ভিসগুলোকে হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে :

ক. হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান, খ. এম্বুলেন্স গাড়ি, গ. চিকিৎসকদের গাড়ি, ঘ. সংবাদপত্র, ঙ. সংবাদপত্রের গাড়ি, চ. পানি সরবরাহ, ছ. গ্যাস সরবরাহ, জ. বিদ্যুৎ সরবরাহ, ঝ. স্থানীয় টেলিফোন এবং বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মধ্যে ট্রাঙ্কল টেলিফোন, ঞ. দমকল, ট. ঝাড়–দার ও ময়লাবাহী ট্রাক।

ভাষান্তর : কাজল বন্দোপাধ্যায়, অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিপত্র : দ্বিতীয় খ-, পৃষ্ঠা : ৬৮৫-৬৮৬, সম্পাদক- হাসান হাফিজুর রহমান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ঢাকার হাক্কানী পাবলিশার্স, প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ১৯৮২।

মুজিবের অস্বীকৃতি : মার্কিন সাহায্য চাই নি

ঢাকা, শুক্রবার ৫ মার্চ ১৯৭১

ঢাকা, শুক্রবার ৫ মার্চ ১৯৭১- এপিপি পরিবেশিত খবরে বলা হয় যে, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান শুক্রবার (৫ মার্চ ১৯৭১) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের উপর নিপীড়ন বন্ধ করার জন্য পাকিস্তান সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে তিনি আমেরিকা বা অন্য কোন রাষ্ট্রের নিকট অনুরোধ জানান নি। একটি বিদেশি সংবাদ সরবরাহ সংস্থার বরাত দিয়ে ভারতীয় বেতারে প্রচারিত একটি খবরের উপর মন্তব্য করতে বলা হলে তিনি এ কথা ঘোষণা করেন।

ভারতীয় বেতার কর্তৃক প্রচারিত অপর একটি খবরও আওয়ামী লীগ প্রদান অস্বীকার করেছেন। এ খবরটিতে বলা হয় যে, তিনি পিপলস পার্টি প্রধান জনাব ভুট্টোর সাথে ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। শেখ সাহেব এ দুটি সংবাদকেই দুরভিসন্ধিমূলক ও বানোয়াট বলে অভিহিত করেছেন। এ খবর দিয়েছে এপিপি।

সূত্র : দৈনিক পাকিস্তান, ঢাকা, শনিবার, ২১ ফাল্গুন, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ, ৬ মার্চ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ

মুজিবের নির্দেশ

ঢাকা, রবিবার, ৭ মার্চ ১৯৭১Ñ রমনা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান নি¤েœাক্ত নির্দেশ প্রদান করেন :

১.         খাজনা-ট্যাক্স দেয়া বন্ধ থাকিবে।

২.         বাংলাদেশের সেক্রেটারিয়েট, সরকারি, আধা-সরকারি অফিস, হাইকোর্ট  ও অন্যান্য কোর্টে হরতাল পালিত হইবে।

৩.         রেলওয়ে এবং পোর্টের কাজ চলিতে পারে। কিন্তু গণবিরোধী নির্যাতন চালাইবার জন্য রেলওয়ে ও পোর্টকে সৈন্য চলাচলের জন্য ব্যবহার করা হইলে রেলশ্রমিক ও পোর্টশ্রমিকরা সহযোগিতা দিবে না।

৪.         বেতার, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রসমূহে আমাদের পূর্ণ বিবৃতি প্রচারিত ও প্রকাশিত হইবে এবং গণ-আন্দোলন সম্পর্কীয় খবর ধামাপাচা দেওয়া যাইবে না অন্যথায়, এইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাঙালিরা সহযোগিতা করিবেন না।

৫.         শুধু স্থানীয় এবং আন্তঃজেলা ট্রাঙ্ক-টেলিফোন যোগাযোগ অব্যাহত থাকিবে।

৬.        সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকিবে।

৭.         স্টেট ব্যাংকের মাধ্যম বা অন্যভাবে কোন ব্যাংক পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থ প্রেরণ করিতে পারিবে না।

৮.         সকল ভবনে প্রত্যহ কালো পতাকা উত্তোলিত হইবে।

৯.         অন্যান্য ক্ষেত্রে হরতাল প্রত্যাহার করা হইয়াছে, তবে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে যে কোন সময় পূর্ণ বা আংশিক হরতাল ঘোষণা করা যাইবে।

১০.       ইউনিয়ন, মহল্লা, থানা, মহকুমা ও জেলা পর্যায়ে স্থানয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করিতে হইবে।

সূত্র : সংবাদ, ঢাকা, সোমবার, ২৩ ফাল্গুন ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ, ৮ মার্চ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ

কর্মচারীদের কাজ বর্জন

ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন কেন্দ্র বন্ধ

ঢাকা, রবিবার, ৭ মার্চ ১৯৭১

ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন কেন্দ্র বন্ধ হইয়া গিয়াছে। এই দুইটি প্রচার মাধ্যমে জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সংবাদ ও নেতৃবৃন্দের বক্তৃতা-বিবৃতির পূর্ণ বিবরণ যথাযথভাবে প্রচার করিতে না দেওয়ার প্রতিবাদে বাঙালি কর্মচারীরা রবিবার (৭ মার্চ ১৯৭১) কাজ বর্জন করিলে বিকাল সাড়ে ৪টা হইতে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে ও রাত সাড়ে ৮টা ইতে ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রে অনুষ্ঠান প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ হইয়া যায়।

রবিার (৭ মার্চ ১৯৭১) রাত ১২টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঢাকা বেতার কেন্দ্র সম্পূর্ণ নীরব থাকে। ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন কর্মচারীদের সহিত যোগাযোগ করিয়া জানা যায় যে, বাঙালির এই গণ-আন্দোলনের সংবাদ গায়েব ও বক্তৃতা-বিবৃতির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করিতে না দেওয়ার প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়া বাঙালি কর্মচারীরা কাজ ছাড়িয়া বাহির হইয়া আসিয়াছেন।

ঢাকা বেতার কেন্দ্র

রবিবার (৭ মার্চ ১৯৭১) অপরাহ্নে বেতার কর্মচারীগণ কাজ ছাড়িয়া বাহির হওয়ার ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, গত কয়েক দিন যাবৎ বাংলার স্বাধিকার পাগল মানুষের প্রচ- দাবির মুখে বেতার কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের রবিবারের (৭ মার্চ ১৯৭১) রমনা রেসকোর্সের জনসভা বেতারে প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়। উক্ত সিদ্ধান্তের কথা রবিবার (৭ মার্চ ১৯৭১) দুপুরে স্থানীয় সংবাদ পাঠের সময় হইতে বেতার মারফত ঘোষণা শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে বেলা ২টা ৩০ মিনিট হইতে বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটে রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবের উপস্থিতি পর্যন্ত বেতারে অনুষ্ঠান চালু রাখা হয়। ঐ সময় সভার কাজ শুরুর বিলম্ব কাটানোর জন্য বেতার হইতে শুধু দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশিত হইতে থাকে। হাজার হাজার শ্রোতা তখন আপন আপন রেডিও সেটের পাশে শেখ সাহেবের বক্তৃতা শোনার জন্য অপেক্ষা করিতে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রেসকোর্সে বক্তৃতা শুরু হইতে যাইবে ঠিক সেই মুহূর্তে সামরিক কর্তৃপক্ষের তরফ হইতে বেতারে শেখ মুজিবের ভাষণ রিলে না করার নির্দেশ আসে। ফলে, সেই মুহূর্তে তাড়াহুড়া করিয়া বেতারের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

রেসকোর্সের জনসভায় শেখ মুজিবের নিকট এই সংবাদ পৌঁছিলে তিনি ইহার প্রতিবাদে সকল বাঙালি কর্মচারীকে বেতার ও টিভি ছাড়িয়া চলিয়া আসিতে আহ্বান জাানান। কিছুক্ষণের মধ্যে সকল বেতার কর্মচারী শেখ সাহেবের আহ্বানে সাড়া দিয়া বাহির হইয়া চলিয়া আসেন। ফলে, রবিবার (৭ মার্চ ১৯৭১) অপরাহ্নে হইতে ঢাকা বেতার বন্ধ হইয়া যায়। তবে সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও খুলনা বেতার কেন্দ্র এখনও চালু রহিয়াছে বলিয়া সরকারি সূত্রে প্রকাশ।

টেলিভিশন

একই কারণে রবিবার (৭ মার্চ ১৯৭১) রাত সাড়ে ৮টা হইতে ঢাকা টেলিভিশনও বন্ধ হইয়া যায়। টেলিভিশন অবশ্য বন্ধ হওয়ার পূর্বেই শেখ মুজিবের সংবাদসমূহ প্রচার করা হয়। এই জন্য সংবাদ প্রচারের নির্ধারিত সময় সোয়া ৯টার স্থলে রবিবার (৭ মার্চ ১৯৭১) রাত সোয়া ৮টায় টেলিভিশনে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। টেলিভিশন কর্মচারীগণ জানান, বেতার কর্মচারীদের অনুসরণে তারাও শেখ মুজিবের আহ্বানে সাড়া দিয়াছেন।

সূত্র : সংবাদ, ঢাকা, সোমবার, ২৩ ফাল্গুন ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ, ৮ মার্চ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ।

গ্রন্থনা: মোঃ জহিরুল হক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *