ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মো. রফিকুল ইসলাম

এমনিতে আমি একজন ঘরকুনো মানুষ তবে সুযোগ পেলে বিদেশ বিভূঁই বেড়ানোর একটু ঘোড়ারোগও আছে। যে চাকুরি করি এতে মন চাইলেই বেড়াতে যাওয়া সহজ কর্ম নয়। নানা অনুমতি অনুমোদন আদায়ে ধরনা দেওয়ার বিষয় থাকে। পকেটের অবস্থার কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু আবার এ চাকুরির সুবাদেই জাতিসংঘ মিশনে কাজ করার সময়ে পকেট একটু গরম থাকলে প্রায় বিনা বাঁধায় ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ানোও যায়। জাতিসংঘের সাইনবোর্ডের বদৌলতে তখন যেকোনো দেশের ভিসা পাওয়া সহজ হয়। আর তখন পকেটে তো গরম ডলার থাকেই। সুতরাং সুযোগ পেলে কোনো ছাড়াছাড়ি নেই।

১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধের পর পরই বসনিয়া মিশন থেকেই সুযোগ এলো কসোভো মিশনে নাম লেখানোর। সুতরাং বসনিয়া মিশন শেষ করে একদিন কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনাতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। একটু স্থিত হতেই মনে হল ওয়াইজ ম্যান অব দ্য ওল্ড সক্রেটিসের দেশের এত কাছে এসে না বেড়িয়ে গেলে হয়? তাই দ্রুতই গ্রিসের ভিসার জন্য আবেদন করলাম। কোনো ঝুট ঝামেলা ছাড়াই নির্দিষ্ট সময়ে ভিসাও মিলে গেলো। পরিকল্পনা করলাম পরবর্তী সিটিওতে(ছুটি) রওয়ানা করবো সক্রেটিসের জন্ম শহর এথেন্সের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সমস্যা হলো কোনো সঙ্গী সাথী জোটাতে পারলাম না। কিছুতেই কাউকে গাঁটের ডলার খরচ করে বেড়াতে যেতে রাজি করানো গেল না। অগত্যা একাই যাওয়া মনস্থির করলাম। কোথায় যাব, কিভাবে যাব কোনো যোগাযোগ ছাড়াই এর ওর কাছ থেকে সামান্য কিছু তথ্য যোগাড় করেই আল্লাহর নামে রওয়ানা করলাম। তখনতো আর আজকের মতো গুগল মামার কাছ থেকে এত এত তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিলো না। স্বদেশি সহকর্মীরা জাতিসংঘের গাড়িতে কসোভার রাজধানী প্রিস্টিনা থেকে উত্তর মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কোপিয়ের বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়ে গেলো। স্কোপিয়ে মিশন এলাকা হিসেবে গণ্য হওয়ায় জাতিসংঘের লোকজনের ভিসা ছাড়াই অবাধ চলাচল ছিলো। দুই রাজধানীর দূরত্ব কম তাই ইচ্ছেমতো আসা যাওয়া করা যায়। স্কোপিয়ে থেকে বেলা দুটো নাগাদ গ্রিসের সীমান্তবর্তী শহর থেসালোনিকির উদ্দেশ্যে মিনিবাসে করে রওয়ানা হলাম। প্রায় ২৫০ কিমি রাস্তা সময় লাগবে বড় জোড় তিন সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো। থেসালোনিকি গ্রিক মেসিডোনিয়ার (ইতিহাসে উল্লিখিত প্রকৃত মেসিডোনিয়া) প্রাক্তন রাজধানী, বর্তমানে এর প্রধান শহর। মেসিডোনিয়া হচ্ছে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বাবা রাজা ২য় ফিলিপের রাজ্য। আলেকজান্ডার জন্মেছিলেন এ রাজ্যেরই পেল্লা নামের এক শহরে। মিনিবাস কখনও পাহাড় ঘেরা বা কখনও সমতল সুন্দর রাস্তায় দক্ষিণ পূর্বমুখে ছুটে চললো। ইউরোপের গ্রীষ্মের মনোরম পরিবেশে বেশ ফুরফুরে লাগছিলো। কিন্তু একটা অজানা আতঙ্কও কাজ করছিলো কোথায় থাকবো, কি খাব তার নিশ্চিত ব্যবস্থা না থাকায়; তার ওপর আবার পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক রাত্রি হয়ে যাবে। কিছুদূর যাবার পর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো নতুন করে আরেক আপদ যোগ হলো। মিনিবাসের চাকা গেল ফুটো হয়ে। এতে বেশ কিছু মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে গেল চাকা মেরামত করতে। এখন নতুন চিন্তা যোগ হল কে জানে থেসালোনিকি থেকে এথেন্সের ট্রেন ধরতে পারবো কিনা। না ধরতে পারলে রাতে থেসালোনিকিতেইবা

কোথায় থাকবো ভাবছি আর খোদাকে ডাকছি যেন সময়মত পৌঁছাতে পারি। অবশেষে মোটামুটি আধা ঘণ্টামতো সময় হাতে থাকতেই বিকেল সাড়ে ছ’টা নাগাদ থেসালোনিকি ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। দ্রুত টিকিট কেটে স্টেশনের পাশেই এক রেস্তোরাঁ থেকে মোটামুটি পরিচিত বার্গার জাতীয় খাবার ও সোডা খেয়ে ডিনার সারলাম। কারণ ট্রেন সাতটা নাগাদ ছাড়লেও এথেন্স পৌঁছাতে পৌঁছাতে মধ্য যামিনী পেরিয়ে যাবে। তখন পেট পূজোর জন্য খাবার খুঁজবো নাকি মাথা গোঁজার জন্য হোটেল খুঁজবো?

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ ট্রেন এথেন্সের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। অন্ধকারে ট্রেন ছুটে চলেছে। প্রায় পাঁচশ’ কিলোমিটার রাস্তা। তবে ট্রেন বেশ বেগেই ছুটছে এবং বড় দু-একটা ছাড়া কোনো স্টেশন ধরছে না। সুতরাং আশা করা যায় নির্ধারিত সময়েই পৌঁছাতে পারবে। তবুও এথেন্সে কোথায় উঠবো এ চিন্তাটা কিছুতে দূর করতে পারছি না। চিন্তা করতে করতেই রাত বারোটা নাগাদ ট্রেন এথেন্সে লারিসা স্টেশনে থামলো। ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের বাইরে এসে হোটেল খুঁজতে কাউকে জিজ্ঞেস করতে হলো না। আশে পাশের মাঝারি বা নিম্ন মাঝারি মানের বেশ কয়েকটি হোটেলের নিওন সাইন চোখে পড়লো। হেঁটে কয়েক মিনিটের মধ্যে সবচেয়ে কাছের হোটেলে গেলাম। বুকিং না থাকায় ভাড়া চাইলো অনেক টাকা। আমার বাজেটের বাইরে। আমি একা মানুষ এত দামি হোটেলে থাকার কোনো মানে হয় না। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াবো শুধু রাতে এসে ঘুমাবো। তাই পাশের একটু দূরের সাইনবোর্ডের দিকে চললাম। হ্যাঁ সিট পাওয়া গেল। মোটামুটি সস্তা এবং বাইরে থেকে হোটেলটি খারাপ লাগছিলো না। সুতরাং চেক-ইন করে রুমে চলে গেলাম। কিন্তু রুমটা দেখে মনটা একটু খারাপই হয়ে গেলো। যেমনটা আশা করেছিলাম তেমন না। ইউরোপ মানের সঙ্গে কিছুটা বেমানান। কি আর করা যাবে! কাপড় বদলে দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়লাম।

গতরাতে ভালো ঘুম হয়নি। হোটেলের রুম নিয়ে মনে একটু খচখচানিতো ছিলই তদুপরি নতুন পরিবেশ ফলে ঘুমটা আধা খেঁচড়া হল। ঘুম থেকে ওঠে প্রথমেই মনে হল হোটেল পরিবর্তন করে ফেললে কেমন হয়? পরে আবার মনকে প্রবোধ দিলাম আমিতো আর হোটেলে ঘুমিয়ে থাকতে বা রুমে বসে টিভি দেখে ছুটি কাটাতে আসিনি। তাছাড়া মাত্রই তো তিন দিন। না, ভুল হল বরং তিন রাত। এখন হোটেল পরিবর্তন করতে যে সময়টুকু ব্যয় করবো সে সময়টুকু এথেন্সের রাস্তায় ঘুরলেও হয়ত নতুন কিছু দেখতে পারবো। তাই সব দ্বিধা কাটিয়ে ব্যাগট্যাগ রুমে রেখে বেড়াতে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে নিচে নামলাম। সকালের প্রাতঃরাশ সেরে হোটেলের লবিতে রাখা পর্যটনের নানা লিফলেট, ব্রোশিওর দেখে বুঝলাম আর কোথাও যাই বা না যাই এক্রোপলিসে যেতেই হবে। আগ্রার যেমন তাজমহল, নিউইয়র্কের যেমন স্ট্যাচু অব লিবার্টি এক্রোপলিসও তেমনি এথেন্সের সবচেয়ে বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক। এথেন্সে এসে এক্রোপলিস দেখতে না যাওয়া হবে আগ্রায় গিয়ে তাজমহল না দেখা নির্বোধের মতো। নিজেকে নির্বোধদের দলে দেখতে মন চায় না। অতএব এক্রোপলিস কি জিনিস দেখতেই হবে। হোটেলের অভ্যর্থনা ডেস্কের লোকজনের নিকট থেকে মোটামুটি পথের দিশা নিলাম। উচ্চতর গণিত ও বিজ্ঞানের নানা শাখায় ব্যবহৃত ধ্রুবক আলফা বিটা গামা থেটা পাই কাই ওমেগা ইত্যাদি বর্ণমালার দেশে এসে পড়েছি। আহা অক্ষরগুলো কি চেনা চেনাই না লাগছে। কিন্তু হায়! কিছুই তো বুঝি না। তবুও বাংলাদেশি ইংরেজি বিদ্যা সম্বল করে একাকী রাস্তায় নেমে পড়লাম। আশা গ্রিকরা ধ্রুবক ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিও নিশ্চয়ই বলে। ফরাসিদের মতো ইংরেজি জেনেও জাত্যাভিমানে মুখ বুঁজে থাকে না।

বিজ্ঞানের ধ্রুবক ভাষায় কথা বলা লোকজন যে ইংরেজিও ভালো বুঝে ও বলে তা রাস্তায় নেমেই টের পেলাম। নানাজনকে জিজ্ঞেস করে সহজেই বাসে করে এক্রোপলিসের কাছাকাছি স্টপেজে নেমে গেলাম। সেখান থেকে হেঁটে এক্রোপলিস গেটের মুখে। টিকিট কেটে এক্রোপলিসের পথে হাঁটা দিলাম। টিকেটের মূল্য কত ছিল তা আজ আর মনে নেই। তখনও ইউরোর আগ্রাসন শুরু হয়নি ফলে গ্রিক মুদ্রা ড্রাকমা বা ডলারে লেনদেন করা যেতো। এক্রোপলিসের অবস্থান একটা সমতল পাহাড় বা মালভূমির সর্বোচ্চ স্থানে। সেখানে পৌঁছাতে অনেকটা পথ প্রায় চক্রাকার চড়াই ডিঙ্গিয়ে যেতে হয়। আবার রাস্তার শেষ অংশের কোথাও কোথাও সিঁড়িও ভাঙতে হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক্রোপলিসের মূল আকর্ষণ পার্থেননের কাছে পৌঁছে গেলাম। তবে চড়াই পেরিয়ে ও সিঁড়ি ভেঙে একেবারে গলদঘর্ম হয়ে গেছি।

ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে সামনে তাকিয়ে দেখি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার নানা স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। চোখের ক্ষুধা না মিটলেও মনের ক্ষুধা মিটে গেল। কোনো নিভৃত জনপদের এক ভেতো বাঙালি আমি প্রাচীন সভ্যতার এক অপূর্ব নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সে এক অনির্বচনীয় অনুভূতি। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা আকারের ভাঙাচোরা পাথর। তবে পার্থেননের কিছু কলাম এখনও প্রায় অবিকল দাঁড়িয়ে আছে। আমার মতে যারা বেড়াতে আসেন মোটাদাগে তাদেরকে দু’টো ভাগে করা যায়। প্রথমভাগে যারা একটু ঘুরে ফিরে দেখেন, কয়েকটি ছবি তুলেন, স্যুভেনির কেনেন, ব্যস বেড়ানো শেষ। দ্বিতীয়ভাগে আছেন যারা যেখানে যান সেখানকার জন্ম, ইতিহাস ঐতিহ্যসহ নানা খুঁটিনাটি বিষয় জানতে আগ্রহী থাকেন। ছবি তোলা, স্যুভেনিরে তাদের আগ্রহ কম। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। কসোভো আসার মাসকয়েক আগে আমি তখন বসনিয়া হার্জেগোভিনা মিশনে মোসতার অঞ্চলে সিভিলিয়ান পুলিশে কাজ করি। আমার স্ত্রী কন্যাসহ বেড়াতে এসে আমার সাথে তখন অবস্থান করছে। এ সময় আমাদের বাংলাদেশ পুলিশ দলের প্রধান জনাব জহুরুল হক স্যার ভাবিসহ মোসতারে বেড়াতে এলেন। ভাবি গল্পচ্ছলে তখন জানিয়েছিলেন যে একবার ওনারা আমাদের আরেক সিনিয়র স্যারের সাথে কোথাও বেড়াতে গেছেন। সেই স্যার এমন সিরিয়াস ছিলেন যে তিনি নাকি বই বের করে কোথায় ক’টা খিলান আছে, কোন খিলানের গায়ে কি অঙ্কিত আছে তা মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছিলেন। এখানেও সেই স্যারের মতো কিছু দর্শনার্থী দেখলাম খুব মনোযোগ দিয়ে নানা পাথর দেখছেন। তবে তাদের সংখ্যা বেশ কম। কোনো জিনিস হাত দিয়ে স্পর্শ করে টানাটানি করার নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা হয়ত তেমন কায়দা করে উঠতে পারেনি। আমি কোনো মতেই দ্বিতীয় দলে নই। কিন্তু নিজেকে আবার প্রথম দলে ভাবতেও ভাল লাগে না। অনেকটা মাঝামাঝি। অল্প সময়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যত জায়গায় যাওয়া যায়! তাতে অন্তত বেশি জায়গায় বেড়ানো হয়েছে বলে মনকে সান্ত¡না দেওয়া যায় বা ভবিষ্যতে আমিও সেখানে গিয়েছিলাম বলে গল্প করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আবার জায়গাটা সম্পর্কে জানার কিঞ্চিৎ আগ্রহও আছে। এক্রোপলিস দর্শনার্থীদের বেশির ভাগই প্রথম দলের কেউ কেউ হয়ত আমার মতো। প্রচুর দর্শনার্থীর মধ্যে অধিকাংশই মার্কিনী। আমার মতো বাঙালি কাউকে নজরে পড়েছিল বলে মনে পড়ে না। হয়ত কেউ কেউ ছিলেন। তবে বেশ কিছু ভারতীয় ছিলো।

শব্দগতভাবে এক্রোপলিস অর্থ হলো উচ্চ স্থান। এজন্যই হয়তো গ্রিসের অন্য এলাকাতেও এক্রোপলিস আছে। তবে এথেন্সের এক্রোপলিসের সাথে জড়িয়ে আছে গ্রিসের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। এক্রোপলিসের মূল স্থাপনা পার্থেনন। পার্থেননের দক্ষিণ পশ্চিম পার্শ্বে নির্মিত হয়েছিল বিজয়ের দেবী নাইকির মন্দির ও উত্তর পাশে এথিনার ছেলে ইরেকথোনিয়াসের মন্দির। এছাড়া ঢোকার মুখে নির্মিত হয়েছিল প্রোপাইলিয়া নামের সুরম্য গেইট। এক্রোপলিসের নির্মাণ শুরু হয়েছিল এথেন্স নগর রাষ্ট্রের স্বর্ণযুগের শাসনকর্তা পেরিক্লিসের আমলে খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৭ অব্দে এবং শেষ হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪৩৮ অব্দে। এর স্থপতি ছিলেন ইকটিনোস ও ক্যালিক্রাটিস। সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ভাস্কর্য নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন থিওডিসিয়াস।

এক্রোপলিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পার্থেনন। পার্থেনন দেবী এথিনার মন্দির। এথিনা এথেন্সের দেবী। প্রাচীন গ্রিসের প্রত্যেক নগরের আলাদা আলাদা দেবী ছিল। এথেন্স নগরীর নাম এসেছে দেবী এথিনার নাম থেকে। অবশ্য ভিন্নমতও আছে। কেউ কেউ মনে করেন এথেন্স নগরীর নাম থেকেই দেবীর নাম হয়েছে এথিনা। গ্রিকদের প্রধান দেবতা জিউসের কন্যা দেবী এথিনা জ্ঞানের দেবী। তবে তাঁকে জলপাই (এক সময়ে গ্রীসের সবচেয়ে অর্থকরী ফসল) ও যুদ্ধ কৌশলের দেবী হিসেবেও মান্য করা হয়। আমার চোখের সামনে যে পার্থেননের ধ্বংসাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে সেটির আগে একই স্থলে ছিল দেবী এথিনার পুরাতন মন্দির বা পুরাতন পার্থেনন। পার্থেননসহ এক্রোপলিসের অন্যান্য পূর্বতন স্থাপনা খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৯-৮০ অব্দে পারস্য শত্রুদের আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে পেরিক্লিস এটা পুননির্মাণ করেন। এক্রোপলিসের দক্ষিণ ঢালে রয়েছে ডায়োনিসাস থিয়েটার। পাহাড়ের ঢালটি এম্ফিথিয়েটারের ধাপ হিসেবে কাজ করে থিয়েটারের পূর্ণাঙ্গতা দিয়েছে। ডায়োনিসাস থিয়েটারই হচ্ছে গ্রিসের সবচেয়ে পুরাতন থিয়েটার, হয়ত পৃথিবীরও। এটা নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দে। এখানেই অভিনীত হতো প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস ও ইউরিপিডিসের নাটক। সক্রেটিস মাঝে মাঝে এ থিয়েটারে নাটক দেখতে আসতেন।

গ্রিক তথা মানব সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দেবার মতো অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক্রোপলিস। এক্রোপলিসের দেবী এথিনার মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের জনক

ক্লিসথেনিস খ্রিস্টপূর্ব ৫০৮ অব্দে সর্বপ্রথম হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে ঘোষণা করেছিলেন ডেমোক্রেসি। গণতন্ত্র! গ্রিক ভাষায় ডিমোস অর্থ মানুষ বা জনগণ ও ক্রাটোস অর্থ শাসন। ডিমোক্রাসি হল জনগণের শাসন বা গণতন্ত্র। যদিও এক্রোপলিসের কয়েকশ মিটার দক্ষিণে পিনিক্স পাহাড়কে গণতন্ত্রের জন্মস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ পিনিক্স পাহাড়েই পৃথিবীর প্রথম সংসদ স্থাপিত হয়েছিল। তবে এ সংসদে জনগণের প্রতিনিধি নয় বরং সরাসরি জনগণ তথা সকল শ্রেণির

এথেন্সবাসী কোনো প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিতেন। এক্রোপলিসের সাথে জড়িয়ে আছে আধুনিক ম্যারাথন দৌড়ের সম্পর্কও। ম্যারাথন যুদ্ধ হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ অব্দে। ম্যারাথন এথেন্স শহর থেকে ৪২.২ কিমি দূরের এজিয়ান সাগরপাড়ের ছোট্ট শহর। এখানে পারস্য রাজা দারিউসের আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অর্ধেক সংখ্যার এথেন্স বাহিনী হপলাইট কৌশলে হারিয়ে দিয়েছিল। ম্যারাথন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যুদ্ধ জয়ের সংবাদ এথেন্সবাসীকে পৌঁছে দিতে ফিডিপিডিস নামের এক ব্যক্তি দৌড়ে এক্রোপলিসের দেবী এথিনার মন্দিরের সামনে এসে এথেন্সের জিতে যাবার কথা জানিয়ে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়েছিলেন। ফিডিপিডিস পারস্যের হঠাৎ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এথেন্সকে সাহায্যের আশায় এথেন্সর বাণী নিয়ে দৌড়ে স্পার্টা নগরীতে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্পার্টার সাহায্য লাভে ব্যর্থ হয়ে তিনি পুনরায় দৌড়ে ম্যারাথন যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছান। তিনি যখন ম্যারাথনে পৌঁছান তখন এথেন্স বাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। এক পর্যায়ে পারস্যবাহিনী পিছু হটে গেলে তিনি যুদ্ধ জয়ের সংবাদ নিয়ে পুনরায় এথেন্স অভিমুখে দৌড় শুরু করেন। মাত্র দু’দিনে কয়েকশ’ কিলোমিটার দৌড়ে ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন ফিডিপিডিস এক্রোপলিস পৌঁছে বিজয়ের খবর ঘোষণা করেই মৃত্যুমৃখে পতিত হন। আজ ম্যারাথন থেকে এথেন্সের দূরত্বের ৪২.২ কিলোমিটার দৌড়ানোকে ম্যারাথন দৌড় হিসেবে গণ্য করা হয়।

তখনকার দিনে এতসব তথ্য জানার সুযোগ যেমন ছিল না, তেমনি ইচ্ছেও তেমন ছিল না। তাই এত কিছু না জেনেই এক্রোপলিস ও ডায়োনিসাস থিয়েটারসহ আশেপাশের এলাকা ঘুরে ফিরে বেড়ালাম। পিলারের খুব কাছে যাবার নিষেধাজ্ঞা থাকায় পার্থেনন মন্দিরের পিলারের মাথার ভাস্কর্যগুলোর সৌন্দর্য দেখার সুযোগ হয়নি। তাই শুধু ইট পাথর দেখে সারা দুপুর পার করে দিলাম। এক্রোপলিসে একটা যাদুঘর থাকলেও আলাদা করে টিকিট কেটে নতুন করে ভাঙা মূর্তি দেখতে ইচ্ছে হয়নি বলে দেখাও হয়নি। পিনিক্স পাহাড়ে গিয়েছিলাম কিনা আজ আর স্মরণে নেই। আগস্টের কড়া রোদে পাথরের মধ্যে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তাই কাছে পিঠে কোথাও লাঞ্চ সেরে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। উদ্দেশ্য কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বের হব।

(চলবে)

  লেখক : অতি. ডিআইজি, সিআইডি

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *