ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

অপরাধীরা কেন অপরাধ স্বীকার করে? বিষয়টি নিয়ে নানাবিধ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এ নিয়ে রচিত হয়েছে ডজন ডজন পুস্তক। তবে সাধারণভাবে মনে করা হয়, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল যথাযথ, ত্রুটিহীন তদন্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করা যায়, তবে পৃথিবীর জঘন্যতম অপরাধী ব্যক্তিটিও দোষ স্বীকারে বাধ্য হয়।

প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, জিজ্ঞাসাবাদকারীর উপস্থাপন ক্ষমতা ও ধরন অভিযুক্তের দোষ স্বীকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ সম্পর্কে আমেরিকার মিয়ামি পুলিশের হোমিসাইড স্কোয়াডের সাবেক প্রধান ও বিখ্যাত জিজ্ঞাসাবাদ বিশেষজ্ঞ ও বেন হোমস্ একটি চমৎকার সূত্র প্রস্তাব করেছেন। সূত্রে বলা হয়েছে, FA+L= C (Force of Assertion plus leverage yields the confession).

এখানে ‘F’ হলো জিজ্ঞাসাবাদকারীর উপস্থাপন ক্ষমতার জোর, ‘L’ হলো জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্তৃক উপস্থাপিত সাক্ষ্যের মূল্য। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে জিজ্ঞাসাবাদকারী আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। ফলশ্রুতিতে, আসামি নিশ্চিতভাবেই স্বীকারোক্তি প্রদান করবে। তবে, জিজ্ঞাসাবাদকারীর নিকট যথেষ্ট  যোগসূত্র বা ক্লু না থাকলেও তিনি কল্পিতভাবে অভিযুক্তের মনের ওপরপ্রভাব খাটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারেন।

অপরাধে জড়িত থাকার সপক্ষে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণগুলো জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্তের সামনে কিভাবে উপস্থাপন করছেন তার ওপরও আসামির স্বীকারোক্তিদানের সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে। সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপনার মধ্যে যদি তদন্তকারীর আত্মবিশ্বাস থাকে, তার উপস্থাপনায় যদি যথেষ্ট জোর থাকে, তবে আসামি স্বীকারোক্তি দেয়ার চিন্তা করবে। অন্যদিকে তার উপস্থাপনা যদি নিতান্তই দুর্বল হয়, তার যদি আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে, তবে আসামি দোষ স্বীকারে টালবাহানা করবে। জিজ্ঞাসাবাদে ব্যবহৃত নিচের দুটো বাক্য বিবেচনা করা যাক-

জিজ্ঞাসাবাদকারী যদি বলেন,

জনাব সেলিম, ‘আমাদের তদন্তে মনে হচ্ছে, আপনি এ হত্যার সাথে জড়িত থাকতে পারেন’।

এ অভিযুক্তকরণ হবে অত্যন্ত দুর্বল। জিজ্ঞাসাবাদকারীর বক্তব্য থেকে জিজ্ঞাসাবাদকারীর আত্মবিশ্বাস ও অভিযুক্তের অপরাধে জড়িত থাকার নিশ্চয়তার ভিতর যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। এ থেকে অভিযুক্ত মনে করতে পারবে, তার অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্তকারীরা এখনও ধরতে পারেননি।

অপরপক্ষে তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি বলেন, ‘সেলিম সাহেব, আমাদের প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তে এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে আপনি এঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন’।

এ বাক্য থেকে অভিযুক্ত বুঝতে পারবে, যে তার জড়িত থাকার বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদকারী পুরোপুরি জেনে গেছে। তাই তথ্য গোপন করে তিনি আর নিস্তার পাবেন না।

অভিযোগের জোর বা Leverage আসবে তখনই যখন তদন্তকারীগণ ফরেনসিক পরীক্ষার  রিপোর্ট, আলামত উদ্ধার, চাক্ষুষ সাক্ষ্য ইত্যাদি সংগ্রহ করে অপরাধের ঘটনাটির একটি বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তব বর্ণনা তৈরি করতে পারবেন। FA ও L অত্যন্ত শক্তিশালী হলে জিজ্ঞাসাবাদ দোষ স্বীকারোক্তির মাধ্যমেই শেষ হবে বলে আশা করা যায়।

অভিযুক্তের অন্তর্নিহিত অপরাধবোধ তাকে স্বীকারোক্তিদানে উৎসাহিত করে। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অভিযুক্তের এ অন্তর্নিহিত ইচ্ছাকেই কাজে লাগাতে হবে। অপরাধের ভয়ের চেয়েও সামাজিকভাবে এক ঘরে হবার ভয়, পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের কাছে বিব্রত হবার ভয় অপরাধীকে দোষস্বীকারে নিরুৎসাহিত করে। সাধারণভাবে অভিযুক্তের শাস্তি পাবার বা বিব্রত হবার ভয় তার স্বীকারোক্তিদান বা অপরাধবোধের চেয়ে বেশি প্রবল হয়ে থাকে। জিজ্ঞাসাবাদকারী যদি তার চেষ্টার মাধ্যমে অপরাধীর শাস্তির ভয়কে হ্রাস ও স্বীকারোক্তিদানের ইচ্ছাকে বৃদ্ধি করতে পারে, তবেই একজন আসামি দোষ স্বীকার করবে।

ধরা যাক, এক অভিযুক্তের শাস্তি পাবার ভয় হল ৭০% এবং তার স্বীকারোক্তিদানের ইচ্ছা হল ৩০%। এখানে স্পষ্টত জিজ্ঞাসাবাদকারী অনেক কাজ করতে পারেন। যদি অভিযুক্তের স্বীকারোক্তিদানের ইচ্ছাকে ৩০% থেকে বাড়িয়ে ৬০% পর্যন্ত করা সম্ভব হয়, তার শাস্তি পাবার ভয় ৭০% থেকে হ্রাস পেয়ে ৩০% হবে। অর্থাৎ তার স্বীকারোক্তিদানের ইচ্ছা শাস্তির ভয়কে অতিক্রম করে তাকে স্বীকারোক্তির দিকেই ঠেলে দিবে।

সমন্বিত জিজ্ঞাসাবাদ কৌশল উপরিউক্ত বিবেচনাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। প্রকৃত অপরাধী আসামির ওপর নিম্নলিখিত ১০টি কৌশল বা প্রক্রিয়া বারংবার ব্যবহার করা হলে অপরাধীর শাস্তির ভয় হ্রাস পেয়ে তার স্বীকারোক্তিদানের ইচ্ছা বৃদ্ধি পাবে।

১. অভিযুক্তকে জোরালোভাবে সরাসরি অভিযুক্তকরণ

জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতেই তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্দিগ্ধের প্রতি আত্মবিশ্বাসের সাথে সরাসরি অভিযোগ আনবেন যে সন্দিগ্ধ অবশ্যই এ অপরাধের সাথে জড়িত। জিজ্ঞাসাবাদকারী  বলতে পারেন, আমাদের তদন্ত থেকে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, আপনি এ অপরাধের সাথে সরাসরি জড়িত। এ পর্বে জিজ্ঞাসাবাদকারী সামান্য বিরতি বা দম নিতে পারেন। নির্দোষ ব্যক্তি সাধারণভাবে জিজ্ঞাসাবাদকারীকে বাধা দিবেন এবং তার সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন। কিন্তু দোষী ব্যক্তি কিছুটা শান্ত থাকবেন। একটু অপেক্ষা করে বোঝার চেষ্টা করবেন যে তার দোষ প্রমাণের জন্য জিজ্ঞাসাবাদকারীর কাছে অতিরিক্ত কিছু প্রমাণ আছে কিনা।

জিজ্ঞাসাবাদকারী এরপর আবার তার অভিযোগপূর্ণ বক্তব্য অন্য কোনো ফর্মে শুরু করবেন। সন্দিগ্ধকে সরাসরি অভিযুক্ত করবেন। তিনি শুরু করতে পারেন, হ্যাঁ, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আপনি এ অপরাধটি করেছেন, তাই নয় কি? হ্যাঁ, আপনি অবশ্যই অপরাধটি করেছেন, করেন নি? এক্ষেত্রে দোষী সন্দিগ্ধ সত্যবাদী হলে সাধারণভাবে মাথা নাড়বে। আর এতেই প্রত্যক্ষ অভিযোগ পর্বের সমাপ্তি ঘটবে। সাধারণভাবে ১০% ক্ষেত্রে এমনটি ঘটতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্তকারীকে পর্বটিতে কোনো রকম টিকে থেকে পরের পর্বে যেতে হবে।

২. অস্বীকৃতি প্রতিরোধকরণ

শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে সন্দিগ্ধরা অপরাধের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে তাদের অস্বীকার করার সুযোগ প্রদান করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, একবার যদি কোনো সন্দিগ্ধ ‘না’ করে বসে তবে তার মুখ থেকে ‘হ্যাঁ’ শব্দ বের করা অত্যন্ত কঠিন। সে যত বেশি বার ‘না’ বলবে, তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা ততো বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। অথচ তদন্তকারীর মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তার স্বীকারোক্তি আদায় করা।

তাই তাকে ‘না’ বলার সুযোগই দেয়া যাবে না। যদি কেউ ‘না’ করে বসে তবে তাকে যে কোনো উপায়েই হোক ‘না’ করা থামিয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে তার কণ্ঠস্বরের ওপর জিজ্ঞাসাবাদকারীর কণ্ঠস্বর চড়া করা যেতে পারে, তাকে দুই হাত তুলে থামতে বলা যেতে পারে। বলা যেতে পারে, আপনি একটু আমার কথা শুনুন। আপনার কথা শোনার সময় দেয়া হবে।

৩.  অপরাধের সাথে জড়িত থাকার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা

সন্দিগ্ধ কেন অপরাধটি করেছেন সে সম্পর্কে এ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদকারী সম্ভাব্য কারণ বা অবস্থাগুলো তুলে ধরবেন। এক্ষেত্রে কোনো কারণ বা পরিস্থিতিটি অপরাধীর জন্য প্রযোজ্য তা সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য একাধিক কারণ বা অবস্থার বর্ণনা তুলে ধরা যেতে পারে। এসব কারণ অপরাধীর কৃতকর্মের দায়-দায়িত্ব কমিয়ে এনে তাকে অপেক্ষাকৃত কম জঘন্য বা খারাপ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হবে যাতে অপরাধী তার মুখ রক্ষার জন্য কিছু কারণ খুঁজে পায়। উদাহরণস্বরূপ, সেলিম সাহেব, এমন ঘটনা কেন ঘটে তার হাজারও কারণ থাকতে পারে। আমার এক বন্ধুর ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। একটি মেয়ে এমনভাবে তার পিছনে লেগেছিল যে সে আর না করতে পারেনি। এভাবে বেশ কিছু দিন চলার পর কি যেন হল, মেয়েটি তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে এল। এখন দেখেন, আমার বন্ধুর কি সেখানে দোষ ছিল?

(এ ক্ষেত্রে সন্দিগ্ধ যদি কোনো আগ্রহ না দেখায় বা অস্বীকৃতি জানাতে থাকে তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ভিন্ন কারণ বা পরিস্থিতি তুলে ধরতে হবে।) সেলিম সাহেব, দেখেন, এমন পরিস্থিতি কেবল আপনার ক্ষেত্রেই ঘটেনি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছে। কিন্তু তাদের কয়জনই বা আপনার মতো অবস্থায় পড়েছেন? সে তুলনায় আপনি অবশ্যই একজন ভাল মানুষ। ভালো মানুষরাও মাঝে মাঝে ভুল করে, তাদেরও পা ফসকে যায় যেমনটি আপনার ক্ষেত্রে ঘটেছে। (সন্দিগ্ধ যদি আগ্রহ দেখায়, তাহলে চালিয়ে যান) অন্যথায় ভিন্নরূপ যুক্তি বা পরিস্থিতির কথা তুলে ধরুন। এখানে মনে রাখতে হবে ঘটনার আদ্যপান্ত ও সন্দিগ্ধ সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য না জানলে তদন্তকারী কর্মকর্তার যুক্তি প্রাসঙ্গিক হবে না। সেক্ষেত্রে সন্দিগ্ধ জেনে যাবে যে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসলে বিষয়টি সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না এবং তাকে আসলে শনাক্ত করা যায়নি। তখন সন্দিগ্ধ অস্বীকার করার মাত্রা বাড়িয়ে দিবে।

৪. সন্দিগ্ধের আত্মবিশ্বাস হ্রাস করা

অপরাধীমাত্রই ঘটনাস্থলে ফেলে আসা আলামত সম্পর্কে ভীতির মধ্যে থাকে। কারণ ঐ আলামতই তাকে ঘটনার সাথে অকাট্যভাবে সংযুক্ত করে। তাই ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত আলামত দিয়ে সন্দিগ্ধকে কাবু করা যেতে পারে। বিষয়টি অন্যদের সাথে তার সম্পর্ক কিংবা তার সহযোগীদের ঘটনা ফাঁস করে দেয়ার ভয়ও হতে পারে। এসব বিষয়ের উল্লেখ করা হলে তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরবে এবং সে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়বে। তবে কোনোভাবেই ফাঁকা বুলির মাধ্যমে অপরাধীকে বোকা বানানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। যেমন ধরা যাক, তদন্তকারী কর্মকর্তা বলল, সেলিম সাহেব, ঘটনাস্থলে তো আপনার আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে কিংবা ভিকটিমের কাপড়ে আপনার বীর্যের দাগ থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এমন হতে পারে যে অপরাধী ঐ সময় হাতে মোজা পরেছিল। কিংবা সে ধর্ষণের কাজে অংশগ্রহণই করেনি, শুধু অন্যদের সুযোগ করে দিয়েছিল। অপরাধী যদি বুঝতে পারে যে তদন্তকারী যা বলছে তার সত্যতা নেই, তখন তার আত্মবিশ্বাস হ্রাস না পেয়ে বরং বেড়ে যাবে। তাই বিষয়টিকে এমনভাবে বলা যেতে পারে, সেলিম সাহেব, ধরুন আমরা যদি ঘটনাস্থলে আপনার আঙুলের ছাপ পেয়ে থাকি। আমরা যদি ডিএনএ টেস্টে আপনার প্রোফাইল পেয়ে যাই এবং এগুলো যদি আপনার সাথে মিলে যায়? এভাবে অনেক সম্ভাবনার কথাই বলা যায় যেগুলোকে সে মিথ্যা মনে করতে পারবে না; বরং অপরাধী সম্ভাবনাগুলো নিয়ে চিন্তা করবে যা তার আত্মবিশ্বাস হ্রাসে সহায়ক হবে।

৫. অভিযুক্তকে তোষামোদ করা

তদন্তকারী কর্মকর্তা সব সময় সন্দিগ্ধের সত্য প্রকাশের ইচ্ছা ও শাস্তির ভয়ের মধ্যকার পাল্লায় সত্য প্রকাশের ইচ্ছাকে শাস্তির ভয়ের উপরে রাখার চেষ্টা করবেন। তিনি অপরাধীকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে যুক্তি প্রদর্শন করবেন যে, তিনি এখন অত্যন্ত চাপের মধ্যে আছেন। কিন্তু সত্য প্রকাশে তিনি মানসিক চাপ মুক্ত হবেন। এখন তার সামনে সময় এসেছে যে তিনি তার ভুল সংশোধন করতে পারেন, অনুশোচনার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ হতে পারেন।

যেমন হতে পারে, সেলিম সাহেব, আমরা যে জগতে বাস করি সেটা আসলে মানসিক জগৎ। পার্থিব জগতে কি ঘটল না ঘটল তার চেয়েও বড় কথা হল, আমাদের মনোজগতে আসলে কি ঘটছে। একই ঘটনায় সমাজ ও আদালত মানুষকে দুভাবে দেখে। যারা ভুল করে ভুল স্বীকার করে, ক্ষমা চায়, পরিশুদ্ধ হতে চায় তাদের অবস্থান সব সময় উপরে। যারা ভুল করে কিন্তু তা স্বীকার করে না বরং তা অস্বীকার করে, তাদের সমাজ শুধু ঘৃণাই করে।

অবশ্য জঘন্য অপরাধে অভ্যস্ত সোসিওপ্যাথদের ক্ষেত্রে এ ধরনের যুক্তি তেমন কাজে আসবে না। সেক্ষেত্রে ভিন্ন রকম যুক্তি, এমন কি অপরাধকে মহিমান্বিত করে অপরাধীর বুদ্ধির প্রশংসা করার মতো যুক্তিও কাজে আসতে পারে।

৬. শাস্তির ভয় দূর ও সমাধান নির্দেশ

যেসব কারণে সন্দিগ্ধ দোষ স্বীকারে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন তা দূর করার চেষ্টা করা এ পর্বের কাজ। সন্দিগ্ধের মানসিক বিষাদ থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রের সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব পর্যন্ত এখানে আলোচিত হতে পারে। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে মনে রাখতে হবে, তিনি এমন কোনো প্রতিশ্রুতি সন্দিগ্ধকে দিবেন না যা তার পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। উদাহরণস্বরূপ, একজন আসামি বলতে পারেন, তিনি তো দোষ স্বীকার করতে চান। কিন্তু এতে তিনি তো তার চাকরি হারাবেন। এখানে তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি তদন্তকারী দিতে পারেন না। তবে বিষয়টি অন্যভাবে সমাধা করা যেতে পারে।

সেলিম সাহেব, আপনি তো আপনার চাকরি হারানোর চিন্তা করছেন। কিন্তু আপনার এ চাকরি আপনাকে কি দিয়েছে? তারা যদি সঠিক হারে বেতন দিত, আপনাকে তো টাকা সরানোর অপবাদ নিতে হত না। একটি পরিশুদ্ধ মন ও কর্মক্ষমতা থাকলে চাকরির অভাব হবে না, কোনো মানুষই না খেয়ে মরে না। ক্ষুধার জ্বালায় কেউ কি আত্মহত্যা করে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, আপনি নিজেকে পরিশুদ্ধ করুন। সত্যের পক্ষে থাকুন।

৭.  সন্দিগ্ধের সদগুণের প্রশংসা করা

জিজ্ঞাসাবাদকারী প্রত্যাশা করে অপরাধী তার কাছে মুখ খুলবে, তার দোষের কথা স্বীকার করবে। কিন্তু দোষস্বীকার করা মানেই হল, তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে কথা বলা। কিন্তু কোনো মানুষই তার জীবনের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে সহজে মুখ খুলতে চায়না। কারণ এতে তিনি অন্য মানুষের কাছে আরো বেশি জঘন্যরূপে প্রকাশিত হওয়ার ভয় করেন। তাই জিজ্ঞাসাবাদকারী এ পর্যায়ে তাকে এমন কিছু বলবেন যাতে তিনি জঘন্য নয় বরং একজন বিবেকবান ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করতে পারেন।

কোনো মানুষই নিজেকে খারাপ ভাবেন না। তার কৃত কর্মের পক্ষে সে যেমন যুক্তি খোঁজে তেমনি সান্ত¡নাও খোঁজে। জিজ্ঞাসাবাদকারী তাই সন্দিগ্ধকে একজন ভালো মানুষ রূপে প্রচার করার চেষ্টা করবেন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে জোয়েল স্টিলবার্গ নামে এক ব্যক্তি ১৯৮৭ সালে তার স্ত্রী ও নাবালিকা সৎ কন্যাকে হত্যা করে। বিচারে তাকে পরিকল্পিত হত্যার জন্য সাজা প্রদান করা হয়। পিপল ম্যাগাজিনের সাথে এক সাক্ষাৎকারে স্টিলবার্গ দাবি করেছিলেন যে কেউ তাকে বুঝতে পারে না। তিনি নিজেকে একজন ভালো মানুষই মনে করেন যিনি একটা পরিস্থিতির শিকার মাত্র। শুধু স্টিলবার্গই নয়, পৃথিবীর সব মানুষই এমনটি দাবি করে এবং এর সাথে আইনের সংঘর্ষ থাকলেও এর সত্যতা রয়েছে।

তাই জিজ্ঞাসাবাদকারী অপরাধীর বুদ্ধিমত্তা, বিবেক, সাহস তথা তাদের সহজাত সামর্থ্যকে প্রশংসা করলে অপরাধী নিজেকে সমাজের জন্য উপযুক্ত একজন ভালো মানুষরূপে ভাবতে শুরু করবে এবং তার ভুল স্বীকার করতে উৎসাহিত হবেন।

৮. বিকল্প ও নির্দেশক প্রশ্ন ব্যবহার

জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সন্দিগ্ধ যখন জিজ্ঞাসাবাদকারীর দেয়া যুক্তিগুলো মেনে নিয়ে নিজেকে একজন ভালোমানুষরূপে ভাবতে শুরু করে তখন তিনি স্বীকারোক্তির অনেক কাছাকাছি চলে আসেন। তবে সরাসরি স্বীকার করতে ইতস্ততবোধ করেন। এ মুহূর্তে জিজ্ঞাসাবাদকারী তাকে কিছু দ্বৈত উত্তর সম্পন্ন প্রশ্ন করে তাকে স্বীকারোক্তির গ্রোতে টেনে আনতে পারেন। বিকল্প প্রশ্ন হল এমন ধরনের প্রশ্ন যার দুটো অংশ থাকে এবং প্রত্যেকটি অংশের উত্তরই অপরাধ স্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে। তবে এর একটি অংশ সরাসরি স্বীকার করা ও অন্যটি পরোক্ষভাবে স্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে।

যেমন, ছাদ থেকে স্ত্রীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে হত্যার ঘটনায় সন্দিগ্ধকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, আপনি কি আপনার স্ত্রীকে ঠেলা মেরেছিলেন, না, সে পা ফসকে পড়ে গিয়েছিল। ঠেলা দিয়ে ফেলে দেয়াটা অপরাধীকে বেশি অপরাধবোধে ফেলবে। সে তুলনায় পা ফসকে পড়ে যাওয়ার জন্য তার দায় দায়িত্ব কম হবে বলে সে মনে করবে। কিন্তু সে উত্তর যাই দিক না কেন সেটা স্বীকার করে নেয়া হবে যে তার স্ত্রী মূলত ছাদ থেকে পড়েই নিহত হয়েছিল। এক্ষেত্রে অপরাধী হয়তো পা ফসকে পড়ে যাওয়ার কথাই স্বীকার করবে। আর সেটাও হবে এক ধরনের স্বীকারোক্তি।

একইভাবে নির্দেশক প্রশ্ন সন্দিগ্ধকে একটি ফাঁদে ফেলার মতো অবস্থায় নিয়ে যায়। তাকে এতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ একটা উত্তর দিতে হয়। যেসব সন্দিগ্ধ পূর্ণ বাক্যের সাহায্যে তার অপরাধের কথা স্বীকার করতে সংকোচবোধ করে তারা এক্ষেত্রে মাথা নেড়ে বা ‘হ্যাঁ’ কিংবা না বলেই উত্তর শেষ করতে পারেন। তবে এ ধরনের প্রশ্ন তখনই করতে হবে যখন জিজ্ঞাসাবাদকারী নিঃসন্দেহ নিশ্চিত হবেন যে অপরাধী দোষ স্বীকার করতে প্রস্তুত  হলেও সংকোচে তা করতে পারছে না।

উদাহরণ হতে পারে, আপনি কাজটি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে করেননি, তাই নয় কি? কিংবা আপনি আসলে কাজটি করতে চাননি, বন্ধুদের পাল্লায় পড়েই এটা করেছেন, তাই না? এটাই আপনার প্রথম ভুল, তাই না?

৯. টোপ গেলার লক্ষণ পর্যবেক্ষণ

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা হাটে বাজারে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করি। ক্রেতা বিক্রেতার সম্মতিক্রমে একটি নির্দিষ্ট দামে পণ্য ক্রয় বিক্রয় চলে। এখানে বিক্রেতা তার পণ্যের গুণাগুণ বর্ণনা করে ক্রেতার কাছে তা আকর্ষণীয় করে তোলে। বিক্রেতার পছন্দ হলে তিনি তা ক্রয় করতে সম্মত হন। কিন্তু এ দরকষাকষিতে বিক্রেতা ক্রেতার মনোভাব বুঝতে পেরে তার পণ্যের সর্বোচ্চ দামটি আদায় করেন। দরকষাকষির এক পর্যায়ে যখন বিক্রেতা লক্ষ করেন যে তার ক্রেতার চেহারায় স্বস্তির ভাব ফুটে উঠেছে, তখন তিনি তার পণ্যের সঠিক দাম পেয়েছেন বলে আশ্বস্ত হন।

স্বীকারোক্তি আদায় করার কাজটি বাজারে পণ্য বেচাকেনা করার মতোই। এখানে জিজ্ঞাসাবাদকারী হল বিক্রেতা ও সন্দিগ্ধ হল ক্রেতা। পুরো পদ্ধতিতে সত্যকে বেচাকেনা করা হয়। সন্দিগ্ধ যে জিজ্ঞাসাবাদকারীর যুক্তিগুলো গ্রহণ করেছেন, তার তোষামোদে বিগলিত হয়েছেন তথা তাকে বিশ্বাস করেছেন এ ধরনের ভাব সন্দিগ্ধের চোখে মুখে ফুটে উঠবে। চিহ্নগুলো হতে পারে, সন্দিগ্ধ হঠাৎ নীরব হয়ে যাবেন, তিনি জিজ্ঞাসাবাদকারীকে আরো বেশি মনোযোগসহ শুনবেন, তিনি তার হাত পা আরো বেশি করে ছেড়ে দিয়ে বসবেন; মাথা উপরে-নিচে নাড়াচাড়া করে সম্মতি দিবেন। এমনও হতে পারে, অপরাধী নিজে স্বীকার করছেন না কিন্তু প্রশ্ন করবে, কেউ যদি এ কাজটি (অপরাধটি) করে তার কি সাজা হবে? বিষয়টি কেনাকাটার ক্ষেত্রে এমন প্রশ্নের সমার্থক হবে, আচ্ছা আপনারা কি কিস্তিতে বিক্রয় করেন? কেউ যদি সময় মতো কিস্তি শোধ করতে না পারে, তখন?

দক্ষ বিক্রেতারা যেমন ক্রেতার ভাবভঙ্গি দেখে আন্দাজ করতে পারেন যে তিনি মালটি আসলেই কিনতে প্রস্তুত, তখন বিক্রেতা তার সুবিধাজনক দামেই ক্রেতাকে আটকে দিয়ে মালটি বিক্রয় করে থাকেন  ভালো ঘরে তোলেন। কিন্তু অনভিজ্ঞ বিক্রেতাগণ ক্রেতাকে আকর্ষণ করতে পারেন না। একই প্রক্রিয়ায় স্বীকারোক্তি দানের পূর্ব প্রস্তুতির চিহ্নগুলো দক্ষ জিজ্ঞাসাবাদকারী বুঝতে পেরে সন্দিগ্ধকে একটি সফল স্বীকারোক্তি দানে রাজি করাতে পারেন।

১০. অব্যাহত চাপ ও অভিযুক্তের একান্ত এলাকায় প্রবেশ

জিজ্ঞাসাবাদকারী যখন সন্দিগ্ধের মধ্যে টোপ গেলার লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে সমর্থ্য সক্ষম হবেন তখন তাকে সন্দিগ্ধের আরো কাছাকাছি চলে আসতে হবে এবং স্বীকারোক্তি দানের জন্য তাকে পীড়াপীড়ি করতে হবে। একজন দক্ষ বিক্রেতা যেমন তার ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ের জন্য নাছোড়বান্দার মতো সাধাসাধি করতে থাকে তেমনি জিজ্ঞাসাবাদকারীকেও সন্দিগ্ধকে সত্য প্রকাশের জন্য সাধাসাধি করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি সন্দিগ্ধকে স্পর্শ করার মতো কাছাকাছি চলে আসবেন এবং সন্দিগ্ধের লিঙ্গভেদ বিবেচনায় নিয়ে তার গায়ে হাত দিয়ে তার উদ্বেগ নিরসনের চেষ্টা করবেন।

এ সময় জিজ্ঞাসাবাদকারী তার বিকল্প প্রশ্ন ও নির্দেশক প্রশ্ন অব্যহত রাখবেন। তবে তার গলার স্বর হবে অত্যন্ত নরম, ভদ্র ও সান্ত¡নাদায়ক। যেমন, সেলিম, আপনি টাকাটা কোনোভাবেই সরিয়ে ফেলতে চাননি, ঠিক না? আপনি শুধু ধার করার চিন্তা করেই সেটা নিয়েছিলেন, ঠিক না? আর এটা অবশ্যই ছিল আপনার প্রথম ভুল, তাই তো?

এ পর্যায়ে এসে প্রায় সময় জিজ্ঞাসাবাদকারী তার প্রশ্নের ভান্ডার নিঃশেষ করে ফেলেন। তারা আর কথা চালিয়ে যেতে পারেন না। অনেকে নীরব হয়ে যান। এতে সন্দিগ্ধ আবার পূর্বের অবস্থায় ফেরত চলে যায়। তাই জিজ্ঞাসাবাদকারীকে তার কথা অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। সন্দিগ্ধের মনে যেসব দ্বন্দ্ব আছে সেগুলো নিরসন করতে হবে।

জিজ্ঞাসাবাদ পরিচালনাকালে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এটা কোনো সাক্ষাৎকার নয়  যা শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ কোনো পদ্ধতি নয় যেখানে কেবল প্রশ্ন করে তার উত্তর প্রত্যাশা করা হয়। এটা হল উপরে বর্ণিত দশটি কৌশলের পৌনঃপুনিক প্রয়োগ যেখানে বারংবার একই আইডিয়ার পুনরুক্তি করা হয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদকারীকে প্রতিনিয়তই বিকল্প বা নির্দেশক প্রশ্নগুলোর বিষয়বস্তু পরিবর্তন করা হয়। কারণ জিজ্ঞাসাবাদকারী পুরো প্রক্রিয়ায় ‘কিভাবে’ ও ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যা অভিযুক্তের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

উপরিউক্ত কৌশলগুলো প্রয়োগের সময় জিজ্ঞাসাবাদকারীকে মনে রাখতে হবে অভিযুক্তও তার মতোই একজন মানুষ। তারও ভাললাগা, ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ ও ক্ষোভ রয়েছে। মানুষ হিসেবে তারও রয়েছে আত্মসম্মানবোধ। তাই  জিজ্ঞাসাবাদকারীকে কাজ করার সময় একজন মানুষ সম্পর্কে নিম্নলিখিত সাধারণ সত্যকে মনে রাখতে হবে।

১.  কোনো মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ভয় হল, সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্ত  হওয়া,

২.  মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল, সমাজ কর্তৃক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করা,

৩.  কার্যকরভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে জিজ্ঞাসাবাদকর্ম এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে মানুষের আত্মসম্মানবোধ অক্ষুণ্ন থাকে,

৪.  মানুষ যেকোনো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার সময় নিজের লাভের কথা চিন্তা করে,

৫.        নিজের কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তাই নিয়ে কথা বলতেই বেশি পছন্দ করে,

৬.        কোনো বিষয় বুঝলেই কেবল মানুষ তা শুনতে ও অন্তরে ধারণ করে,

৭.         একজন মানুষ তার সমজাতীয় পছন্দ-অপছন্দ, বিশ্বাস বা বোধের অধিকারী মানুষকেই  পছন্দ করে, বিশ্বাস করে ও তার ওপর নির্ভর করে,

৮.        মানুষ  আপাতদৃষ্ট কারণের চেয়ে বাহ্যিক কারণের চেয়ে ভিন্ন কারণে কাজ করে,

৯.        উচ্চ স্তরের ও আদর্শিক স্থানের মানুষরাও বাস্তবে অতি সাধারণ,

১০.       প্রত্যেক মানুষই  এক একটি সামাজিক মুখোশ পরে থাকে। জিজ্ঞাসাবাদকারীর কাজ হল সেই মুখোশের আড়ালের ব্যক্তিকে আবিষ্কার করা।

জিজ্ঞাসাবাদকারী দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে যদি আসামিকে অভিযুক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করে  যে তিনি নিশ্চিত যে আসামি এ অপরাধটি করেছে এবং তাকে যথাযথ টোপ দিতে পারে, তাহলে সত্য গোপনকারী জনগোষ্ঠীর ১০%ই কৃত অপরাধ স্বীকার করবে। বাকি ৯০% জনগোষ্ঠীর জিজ্ঞাসাবাদকারীর জন্য উপরিউক্ত দশটি কৌশল স্বীকারোক্তি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাবে।

নির্দোষ আসামির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ অভিযোগ এনে জিজ্ঞাসাবাদকারী কোনো পাত্তাই পাবেন না। নির্দোষ সন্দিগ্ধরা প্রতিটি ধাপেই জিজ্ঞাসাবাদকারীকে প্রতিরোধ করবে। কেন’ ও ‘কিভাবে’ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নির্দোষ ব্যক্তির কোনো আগ্রহই থাকবে না। তাই এ ধরনের ব্যাখ্যা প্রদান জিজ্ঞাসাবাদকারীর পক্ষে অসম্ভব হবে। যেহেতু সে অপরাধটি করেনি তাই মুখ রক্ষার কোনো সমাধানই সে গ্রহণ করবে না।

কিভাবে ও ‘কেন’ সমাধান কোনো দোষী আসামিকে অপেক্ষাকৃত কম জঘন্য অপরাধটি স্বীকার করতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে তারা ভিকটিমকে দোষারোপ, অপরাধ ও এর উদ্দেশ্যকে ছোট করে দেখান। এর মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্তকে তার প্রারম্ভিক অনড় অবস্থা থেকে সরিয়ে স্বীকারোক্তির দ্বার প্রান্তে নিয়ে যান। একটি নগণ্য ধরনের স্বীকারোক্তি আদায়ের পর জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্তের কাছ থেকে তার নতুন অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিবৃতি আদায় করে উপরিউক্ত দশটি কৌশল তার উপর পুনরায় প্রয়োগ করতে থাকবেন। এর অর্থ হল, জিজ্ঞাসাবাদকারী যদি তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তের পূর্ণ দোষ স্বীকারোক্তি আদায়ে সমর্থ না হয় তবে তাকে একটি আংশিক স্বীকারোক্তিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে এবং সেই আংশিক স্বীকারোক্তিকে ভিত্তি করে পুনরায় অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ায় জিজ্ঞাসাবাদকারী হল সত্য বলার পরামর্শদাতা। একজন ভালো পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি অভিযুক্তকে বোঝাবেন যেন সত্য প্রকাশ করা অভিযুক্তের মঙ্গলের জন্যই প্রয়োজন। তাকে বোঝাতে হবে যে অভিযুক্ত যে সত্য প্রকাশ করবেন সেটা তদন্তকারীদের উপকারের জন্য নয়, বরং অভিযুক্তের উপকারের জন্যই জরুরি। মানুষ সর্বদাই তার নিজ স্বার্থের চিন্তাই করে। তাই জিজ্ঞাসাবাদকারীকে অভিযুক্তের স্বার্থের অনুকূলে আলোচনাটি প্রবাহিত করতে হবে।

একজন দক্ষ জিজ্ঞাসাবাদকারী অভিযুক্ত ও তার নিজের মধ্যকার মানসিক প্রতিযোগিতাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপভোগ করে। তাকে অবশ্যই একই সময়ে জীবনে ঘটে যাওয়া অন্যান্য বিষয়গুলোকে এক পাশে সরিয়ে রেখে কেবল তার জিজ্ঞাসাবাদের কাজটির ওপরই সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করবেন। জিজ্ঞাসাবাদে মূল উদ্দেশ্য দোষ স্বীকারোক্তি আদায় করা হলেও এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে সব অভিযুক্তই দোষ স্বীকার করবে বা জিজ্ঞাসাবাদকারী তা করাতে সমর্থ হবেন। এমনকি তিনি যদি  প্রত্যয়ী, পেশাদার ও সত্যান্বেষী কোনো অফিসার হন, যদি উপরিউক্ত দশটি কৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগও করেন তারপরও তিনি যে সফল হবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে তাকে অত্যন্ত আশাবাদী হয়ে তার কৌশল চালিয়ে যেতে হবে। তাকে আশা রাখতে হবে, এ আসামী দোষ স্বীকার করল না, তবে পরের আসামী সেটা করবে। তিনি বর্তমান জিজ্ঞাসাবাদে ব্যর্থ হলেও পরেরটিতে সফল হবেন। কোনো জিজ্ঞাসাবাদকারীর যদি এমন বিশ্বাস ও অধ্যবসায় না থাকে, তাহলে তিনি আর যাই হোন জিজ্ঞাসাবাদে সফল হতে পারবেন না।

লেখক : এআইজি (পিঅ্যান্ডআর-২), পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *