ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোছাঃ সোহেলী আক্তার

বাংলার নারী জাগরণ তথা সামাজিক রেনেসাঁর অগ্রদূত বেগম রোকেয়া পরাধীন ভারতবর্ষে শিক্ষা, সমাজচিন্তায় যে সাহসী ও যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন তা কাল থেকে কালান্তরে নিরন্তর সমাজকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। অবরুদ্ধ সমাজ আর অভিশপ্ত জীবনের বেদনা নিয়ে তিনি বাঙালি সমাজের বিশেষত নারী সমাজের বেদনার ভার লাঘবে নিজেকে উৎসর্গ করেন। তাঁর সাধনার কর্মপ্রচেষ্টা বাংলার সমাজ মানসে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছে, যার প্রভাব মুসলিম নারী সমাজ জাগরণের মহাকল্লোলে যুক্ত হয়েছে।

আজ আমাদের দেশের নারী সমাজের যে উদ্দীপনা, শিক্ষাচেতনা, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে সংগ্রাম তার উৎসমুখ খুলে দিয়েছেন বেগম রোকেয়া। শুধু শিক্ষা আন্দোলন নয়, সাহিত্য সাধনায় তিনি ধর্ম ও সমাজ সম্পর্কে যে যুক্তিবাদিতা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, নারী-পুরুষ সমঅধিকার চিন্তার ছাপ রেখেছেন, তা তৎকালীন মুসলিম সমাজকে নবজাগৃতির তরঙ্গে দোলায়িত করেছে।

রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারে যে ভূমিকা রেখেছেন, তার সাথে বেগম রোকেয়ার সাহিত্য দর্শন ও সংস্কার চিন্তা তুলনীয়। বেগম রোকেয়া জন্মেছিলেন রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে, সামাজিক প্রতিকূলতার কারণে তাঁর বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি, শিক্ষিত ও সংস্কারমুক্ত বড় ভাইয়ের কাছে তিনি আরবি, উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট স্বামীর সাথে তাঁর বিবাহিত জীবন মাত্র বারো বছরের। স্বামীর মৃত্যুর পরে অকালবৈধব্য নিয়ে রোকেয়া কোলকাতায় এসে গড়ে তোলেন সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল স্কুল। অসম্ভব সামাজিক প্রতিকূলতা, আর্থিক অনটনের মুখেও তিনি থেমে যাননি।

বেগম রোকেয়ার শিক্ষার আলোকে আলোকিত নারীরা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে সমাজ সংস্কার, শিক্ষা আন্দোলন, নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা,  অর্থনৈতিক মুক্তির চেতনায় বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন। বেগম রোকেয়ার সাহিত্য সাধনার মূলে ছিল নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্র সমাজের পরাধীনতা, নারীর অবদমিত জীবন, আর এসব থেকে মুক্ত হবার দুর্মর আকাক্সক্ষা। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘মতীচূর’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড), ‘সুলতানার স্বপ্ন’, ‘পদ্মরাগ’, ‘অবরোধবাসিনী’ এছাড়াও আছে বেশ কিছু অনুবাদগ্রন্থ। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ ইংরেজিতে লেখা। এটির বাংলা অনুবাদও তিনি করেছেন। বিভিন্ন সাময়িকপত্রে তিনি নিয়মিত লিখেছেন। তাঁর রচনায় নারী-পুরুষের যৌথ অবদান এবং তাঁদের সম্পর্কের বিভিন্ন মাত্রিক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।

রোকেয়ার রচিত ‘মতীচূর’ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধে নারী জাগরণের আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে। ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ প্রবন্ধে তৎকালীন সমাজে দীর্ঘদিনের নিষ্পেষিত অধঃপতিত বন্দি নারীর পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি আত্মজাগরণের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধকরণে বলেন, ‘‘বহুকাল হইতে নারী হৃদয়ের উচ্চবৃত্তিগুলি অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায় নারীর অন্তর, বাহির, মস্তিষ্ক, হৃদয় সবই দাসী হইয়া পড়িয়াছে। এখন আর আমাদের হৃদয়ের স্বাধীনতা, ওজোস্বিতা বলিয়া কোনো বস্তু নাই-এবং তাহা লাভ করিবার প্রবৃত্তি পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় না। তাই বলিতে চাই ‘‘অতএব জাগ গো ভগিনি’’।

বাল্যবিয়ে সমাজের জন্য কখনই মঙ্গলজনক নয়, তার ওপর শিক্ষাহীন বালিকা যদি মা হয় তাহলে তো কথাই নেই। অপরিপক্ব মায়ের সন্তান সুযোগ্য নাগরিরক হওয়ার পরিবর্তে অন্তঃসারশূন্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এতে সমাজ নিশ্চয়ই উপকৃত হবে না। এ বিষয়টি সম্পর্কে ‘সুগৃহিনী’ প্রবন্ধটিতে রোকেয়ার জীবন ঘনিষ্ঠ, তাত্ত্বিক পর্যালোচনা প্রশংসনীয়। রোকেয়া মনে করতেন নারী এমন শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন যাতে সে আদর্শ মাতা, আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজ ও দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করতে পারে।

রোকেয়ার মধ্যে দুটি সত্তা সমানভাবে সক্রিয় ছিল। একটি সৃজনশীল প্রতিভা অন্যটি সমাজ সংস্কারের ভূমিকা। হয়তো রোকেয়ার সমাজ সংস্কারের ভূমিকাটি ছিল অন্তরালে। কেননা প্রকাশ্যে কাজ করবার মতো মুসলিম নারীর পরিবেশ তখনো তৈরি হয়নি। রোকেয়ার নিরলস শ্রম ও মেধায় পরবর্তীকালে বাংলার মুসলিম নারী সমাজের অগ্রগতি সাধনের জন্য ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে একটি মুসলিম নারী সমিতি স্থাপন করেন। এ সমিতির কার্যক্রম প্রসঙ্গে মোতাহার হোসেন সূফী তাঁর ‘বেগম রোকেয়া : জীবন ও সাহিত্য’ গ্রন্থে বলেন, ‘‘জাতি গঠনমূলক কাজের জন্য আঞ্জুমান নাম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। আঞ্জুমান অজস্র বিধবা রমণীকে অর্থ সাহায্য করেছে। চরিত্রহীন স্বামীর অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে বহু অসহায় বধূকে রক্ষা করেছে, বয়ঃপ্রাপ্ত দরিদ্র কুমারীকে সৎপাত্রস্থ করেছে, অভাবগ্রস্ত মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণে নানাভাবে সাহায্য করেছে।’’

বেগম রোকেয়া মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন তেমনি সমাজের জড়তা ও কুসংস্কার দূর করার মহৎ লক্ষ্যে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তাই তো বেগম রোকেয়া অবরোধবাসিনী নারী সমাজের করুণ অবস্থা পরিবেশন করলেন তাঁর রচনাবলীতে। আর তা অধিগত করে নারী সমাজের মতো সংবেদনশীল পুরুষ সমাজও উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল।

সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ নারীকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্ভব নয়। বেগম রোকেয়া দূরদর্শী চিন্তা চেতনা নারী মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা সমাজকে তথা দেশকে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে অনুপ্রেরণা জোগাবে অনন্তকাল। আজ একুশ শতকে এসে রোকেয়ার সংস্কারমুক্ত চিন্তা যদি আমাদের নারী সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তবেই তাঁর আকাঙ্ক্ষার যোগ্য মর্যাদায় আমরা প্রতিষ্ঠিত হতে পারি। এটাই হোক এই শতকের অকৃত্রিম চাওয়া। 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *