ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

অজানাকে জানার ইচ্ছা ও মানুষের বিনোদনের চাহিদা মেটানোর সব উপকরণ নিয়ে গড়ে উঠেছে পর্যটন শিল্প। পর্যটন এখন শুধু আনন্দের খোরাক নয়, এটা একটি শিল্প। যেকোন স্থানের পর্যটন বিকাশের জন্য পূর্ব শর্ত হচ্ছে সে স্থানের নিরাপত্তা। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে পর্যটন এখন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার খাত। নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা পর্যটন বিকাশের পূর্বশর্ত। পর্যটন বান্ধব পরিবেশ পর্যটকের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি ঘটায়। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের আগমন নিশ্চিত করতে নিরাপত্তার দিকটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। 

বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশ দেশের পর্যটন স্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এখানে বলা বাহুল্য, ট্যুরিস্ট পুলিশদের সার্বিক সহযোগিতায় আগের তুলনায় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে অপরাধের অভিযোগ অনেকাংশে কমেছে এবং রাতের বীচ এখন আগের তুলনায় বেশ নিরাপদ। ট্যুরিস্ট পুলিশদের আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে এবং অপরাধকে কঠোর হাতে নির্মূল করতে হবে।

প্রতি বছর বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (ইউএনডব্লিউটিও) পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সর্বাধিক ধনী দেশের তালিকা তৈরি করে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে ২০১৮ সালে ১০টি শীর্ষ পর্যটকদের দেশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইতালি, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, জার্মানি ও থাইল্যান্ড। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ভ্রমণ ও পর্যটন প্রতিযোগী সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৭’ অনুযায়ী ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ২৫ মিলিয়ন ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ২৩৫ মিলিয়নে। ধারণা করা হচ্ছে এ বছর প্রায় ১৩৯ কোটি ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পর্যটক সারাবিশ্বে ভ্রমণ করবেন। অর্থাৎ বিগত ৬৭ বছরের পর্যটক সংখ্যা প্রায় ৫০ গুণ বেড়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি ব্যাপকতা লাভ করেছে।

বাংলাদেশ সরকার পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নকে গতিশীল করতে বহুবিধ প্র্কল্প হাতে নিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে তিন হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। করোনা পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি সরকার পর্যটন শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ও বিকাশের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের লক্ষ্যে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এটি সম্পন্ন হবে। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যটন উন্নয়ন কাজ পরিচালিত হবে। ২০১৬-২০২১ সালকে পর্যটন বর্ষ হিসেবে উদ্যাপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে ২০১৫-২০১৮ তিন অর্থবছরে আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিদ্যমান ও সম্ভাব্য স্থানগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।

২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটন শিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পুরো দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম বারের মতো সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজারে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোতে প্রায় প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে এক লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া  সরকারের প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে: কক্সবাজার বিমান বন্দর উন্নয়ন, আধুনিক হোটেল-মোটেল নির্মাণ, মহেশখালীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, সোনাদিয়াকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা, ইনানি সৈকতের উন্নয়ন, টেকনাফের সাবরায়েং ইকো ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণ, শ্যামলাপুর সৈকতের উন্নয়ন, ঝিলংঝা সৈকতের উন্নয়ন, চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, কুতুবদিয়ায় বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণ, চকোরিয়ায় মিনি সুন্দরবনে পর্যটকদের গমনের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ডুলাহাজরা সাফারি পার্কের আধুনিকায়ন  ইত্যাদি। এছাড়া আরও চারটি নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। এসব বাস্তবায়িত হলে আগামীতে দেশের পর্যটন খাত আরও চাঙা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হবে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কক্সবাজারে যাতায়াত করার জন্য রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে।

ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চাঁদপুরের মেঘনার চরে গড়ে তোলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র।  নির্মাণ শুরু হতে যাওয়া এ পর্যটন প্রকল্পে থাকবে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের জাদুঘর, পানির ওপর ভাসমান কটেজ, চার কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যাবল কার, ট্র্যাডিশনাল কটেজ, স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট, পাঁচ তারকা হোটেল, থিমপার্ক, রিভারক্রুজ, স্পিডবোট, হেলিকপ্টার, কনভেনশন হল, থিয়েটার, মিউজিয়াম, ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো সেন্টার, মার্কেট, জিমনেসিয়াম, ইনডোর এবং আউটডোর গেমস, ক্রিকেট অ্যারোনা, সুইমিং ক্লাব, ওয়াটার রাইড, হসপিটাল, পার্টিসেন্টার, হলিকর্নার, রিসার্চ ইনস্টিটিউট, স্টাফ রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, এগ্রিট্যুরিজম, গ্রিনএনার্জি, পর্যটন ডিপ্লোমা কোর্স স্কুল প্রভৃতি। ব্লুরিভার আইল্যান্ড রিসোর্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যটন কেন্দ্রে প্রতিদিন লক্ষাধিক লোকের ভ্রমণের ব্যবস্থা ও ২০ হাজার পর্যটকের রাত যাপনের সুবিধা থাকবে। প্রায় পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।

বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ বিশেষ করে নাফ ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা পর্যটন বিকাশকে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। কারণ এতে বিনিয়োগ করছে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত কোম্পানি সিয়ামসিয়াম ইন্টারন্যাশনাল। প্রাথমিক ভাবে কোম্পানিটি ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। ২৭১ একর জায়গাজুড়ে প্রায় চার হাজার ২০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি ১২ হাজারের বেশি লোকের কর্মসংস্থান জোগাবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) নাফ ট্যুরিজম পার্কের উন্নয়ন কাজ হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ এভিয়েশন খাত নতুন ভাবে সাজানো হচ্ছে। নতুন নতুন বিমানবন্দর স্থাপনের অনুমোদন, বিমান সংস্থা গুলোর সাথে সংযোগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বৃদ্ধি, বিমানবন্দর আধুনিকায়নে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বাংলাদেশ পর্যটনকে আধুনিকায়নে ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সেবা দেওয়ার জন্য নিরালসভাবে কাজ করছে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা।

পর্যটন শিল্প বিকাশে অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। বিদেশি পর্যটক নির্ভরতা ছাড়াও দেশের পর্যটক নিরাপত্তা, যোগাযোগের সুবিধা, আকর্ষণীয় অফার এবং পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে থাকলে দেশের মানুষের আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। এক হিসেবে বলা হয়, ১৬ কোটির বেশি মানুষ গড়ে প্রতি বছর ১০ ভাগও যদি দেশ ঘুরে দেখে, তাহলে বিশাল অংকের অর্থনৈতিক তৎপরতার সৃষ্টি হবে। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন করেছে পর্যটন শিল্প বিকাশের ফলে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল গত আট বছরে ছয় হাজার ৬৯৯.১৬ কোটি টাকা পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে আয় হয়েছে। বিভিন্ন উৎসব কালীন মানুষ ঘুরে বেড়ানো যে প্রবণতা তা এই অর্থনৈতিক বিকাশকে আরো বাড়িয়ে দেবে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার পক্ষ অনুযায়ী পুরো বিশ্বে ২০২০ সাল নাগাদ পর্যটন থেকে প্রতিবছর দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৫১টি দেশের পর্যটক আমাদের দেশে আসবে। বাংলাদেশের জিডিপির ১০ শতাংশ পর্যটন খাত থেকে আয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশের সৌন্দর্যে যুগে যুগে বহু পরিব্রাজক ও ভ্রমণকারী মুগ্ধ হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন সম্ভাবনা অপরিসীম। আমাদের রয়েছে সুবিশাল সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, জলপ্রপাত, প্রত্নতত্ত্বের প্রাচুর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ নানান ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের দেশকে পরিণত করেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণ সমৃদ্ধ অনন্য পর্যটন গন্তব্যে, বাংলাদেশকে গড়ে তুলছে পর্যটকদের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে।

সময় উপযোগী ও পরিকল্পনা মাফিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে এসব পর্যটন স্পট যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প নব দিগন্তের সূচনা হবে। তবে পর্যটন বলতে শুধু ঘোরাফেরার ধারণা পরিবর্তন করে একে বহুমুখী করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটনের বহু শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিনোদন পর্যটন, শ্রান্তি বিনোদন পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ইভেন্ট পর্যট, সাংস্কৃতিক ভিত্তিক পর্যটন, ক্রিয়া পর্যটন, নৌ পর্যটন, হাওর পর্যটন, ধর্মভিত্তিক পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব দিতে হবে। এত সম্ভাবনা থাকার পরেও আমরা পর্যটক আকৃষ্ট করার মতো কোনো পন্থায় এখনো নির্ধারণ করে উঠতে পারছি না। আমরা একটু সচেতন হলেই নিজেদের পর্যটন সব ক্ষমতা বাড়িয়ে বিপুল সংখ্যক বিদেশি দর্শনার্থীকে নিজের দেশে আনতে পারি আধুনিক জীবনে চাওয়া মাথায় রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেকে ব্যবহার করে আমাদের পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধনের সচেষ্ট হতে পারি।

লেখক: প্রভোস্ট, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *