ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মাহমুদা আফরোজ লাকী

৩০ মার্চ একটা টেক্সট আসে মোবাইলে, “…..”।

টেক্সটি খুব চিন্তায় ফেলে দেয়। আমার থানা এলাকায় না হওয়ায় আমি আমাদের মিরপুরের ডিভিশনের হোয়াটস অ্যাপ পেজে মেসেজটা শেয়ার করি। মেসেজ দেখে ডিসি স্যার তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন সেখানে খাবার পাঠাতে। ২ ঘন্টা পরে ফিরতি মেসেজে ধন্যবাদ সূচক বক্তব্য দেখে মনটা সাময়িকভাবে ভালো হয়ে যায়। ছোট্ট একটা ডিজিটাল চিরকুট থেকে ভাবনাটা মাথায় আসে তখনি, কিছু করতে হবে এই শ্রেণীর জন্য।

সাহায্য চাই ফেসবুকে, মোবাইলে। সবার আগে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ কর্পোরেট ফোরাম। এরপর এগিয়ে আসে আমার দুই বোন। তাদের ফেসবুক গ্রুপ ‘সময়ের প্রয়োজনে’ নিয়ে। হটলাইন নাম্বার তৈরি করে যারা চেয়ে খেতে বা হাত পাততে পারে না তাদের সাহায্যে নাম ঠিকানা গোপন রেখে খাবার পৌঁছে দেব আমরা তাদের বাসায়।

ডিসি মিরপুর স্যারকে বলতেই স্যার অবিলম্বে সম্মতি দিলেন। হ্যাঁ আমরা মিরপুর ডিভিশন সাহায্য করবো এমনসব পরিবারকে। ফেসবুকে একটা পেইজ তৈরি করলাম। ‘খোঁজ নিয়েছেন?’ নামে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই আমরা খোঁজ নিতে শুরু করলাম আপনার- আমার -সবার আপনজনের। এগিয়ে এলো সিডনি সান বলে আরেকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু সপ্তাহ না যেতেই নতুন সমস্যা এলো সামনে। এবার টেক্সটে চাল, ডাল নয়, শিশু খাদ্য ফর্মূলা মিল্কের জন্য আবেদন। সকাল থেকে দুধের জন্য কাঁদছে নয় মাসের শিশু। দুপুরে খেতে বসে খাওয়া হলো না। দোকান তখন সব বন্ধ হতে চলেছে। পেট্রোল টিম দিয়ে দ্রুত একটি দোকান থেকে নিজের বেতনের টাকায় কিনে আনলাম দুই প্যাকেট দুধ যাতে অন্তত ১০ দিন খেতে পারে বাচ্চাটা। নিজে বাসায় গিয়ে তুলে দিলাম বাবার হাতে সন্তানের জন্য কয়েক দিনের খাদ্য। অনেক শিশুই জন্মের পর নানা জটিলতার জন্য মায়ের দুধ পায় না যথেষ্ট পরিমানে। আবার বাইরে কাজ করে যে মায়েরা তাদেরও ৬ মাসের পর কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে উঠতে হয় ফর্মূলা মিল্কের উপর।

এরপর আবার কয়েকদিন পর কল পেলাম অন্য আরেকটি এলাকা থেকে। আবার নিজেই কিনে পাঠালাম দুধ। এরই মধ্যে প্রথম ঘটনাটি নিয়ে নিউজ করে দিলো একটি বহুল প্রকাশিত দৈনিক। তা দেখে আগ্রহী হয়ে কল করেছিলেন আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাস্পদ ডিসি ফিন্যান্স, শ্যামল কুমার মুখার্জী স্যার।

পরবর্তীতে পুরান ঢাকা থেকে দুধের আরেকটি চাহিদা এলে জানাই স্যারকে। সাথে সাথে বিকাশে টাকা পাঠান স্যার। দুধ আর সিরিয়াল কিনে পাঠিয়ে দেই সেই মাকে। আবার একটা ডিজিটাল চিরকূট ধন্যবাদ জানিয়ে। ভিষণ ভালো লাগে ব্যাপারটি। এরপর ‘সময়ের প্রয়োজনের পক্ষ থেকে পর পর তিনটি শিশুর ১০দিন করে দুধের ব্যবস্থা করে দিলো আমার দু’বোন। কিন্তু চিন্তা বাড়তে থাকে। লক ডাউনের সময় বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে এই চাহিদার পরিমান। প্রতিদিন নতুন নতুন শিশু খাদ্যের অনুরোধ আসছে। এদিকে ডায়েটিশিয়ান বোনের সাথে কথা বলে জানতে পারি ২বছরের নিচে শিশুদের ফুলক্রিম মিল্ক দেওয়া যাবে না। ১বছর হয়ে গেলে ২:১ অনুপাতে গরুর দুধ আর ফুটানো পানি দেওয়া যেতে পারে এলার্জি না দেখা দিলে। কিন্তু ১বছরের নিচে শিশুদের চাহিদা এলে কি করা যাবে এটাই ভাবছি। কোনো সংস্থা বা অবস্থাপন্ন ব্যক্তি এগিয়ে এলে আমরা সেতুবন্ধনের কাজটা করতে পারি। চাহিদা অনুযায়ি যুগিয়ে দেওয়া সম্ভব আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের এই ছোট্ট শিশুগুলোকে। এ শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ, আগামীর বাংলাদেশ। তাই তাদের সুস্থ্যভাবে বেড়ে ওঠাটা যে পুরো জাতির জন্যই বড় প্রয়োযজন।

এই উদ্যোগটা নেওয়া সম্ভব হোতো না যদি না ডিসি মিরপুর স্যার তার আন্তরিকতা, ঔদার্য্য নিয়ে পাশে দাড়াতেন। ধন্যবাদ, এডিসি শ্যামপুর, খিলগাঁও, দক্ষিণখান, ধানমন্ডি, এডিসি এডমিন ওয়ারি, এসি বাড্ডা, মতিঝিলসহ ডিএমপির বিভিন্ন

থানার ওসিদের প্রতি। সবাই এতো আগ্রহ নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

দিন রাত পুলিশের সদস্যরা বাইরে কাজ করছে, কখনো কনভয় পেট্রোলিং আবার কখনো বাসায় বাসায় গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌছে দেওয়া। এছাড়াও কোভিড ১৯ আক্রান্ত কাউকে পাওয়া গেলে বাসায় গিয়ে লকডাউন করে দিয়ে আসা, আরো কত কি! পাশাপাশি আইন শৃংখলা রক্ষাসহ মামলা তদন্তের কাজ তো আছেই। এসময় তাই ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি পুলিশের কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি যার জের ধরে বলা যায় সারা বাংলাদেশ ৬৫ জন পুলিশ সদস্য কোভিড ১৯ আক্রান্ত হয়েছেন অদ্যাবধি।

এসময় পুলিশের নিরাপত্তার কথা ভেবে এগিয়ে এসেছে আমারই এসএসসি ৯৮ এইচএসসি ২কে গ্রুপের কিছু সমমনা ভালো বন্ধুদের আরেকটি গ্রুপ # fun_of_friends। তাদের সৌহার্দ্যে মন ভরে গেছে। এই ভালোবাসাগুলো দায়িত্বশীলতা আরো বাড়িয়ে দেয়।

আমরা করবো জয়! আমাদের মানবতার জয় হবেই!

করোনা যুদ্ধে প্রাণ বিনাশসহ আরো নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে এবং এই যুদ্ধে জয় লাভ করার পরও বেশকিছু দিন সময় লাগবে আমাদের এসব থেকে পরিত্রাণ পেতে। এসব সমস্যার মধ্যে আর্থিক সংকট অন্যতম। সেদিন ৯মাসের শিশুটির দুধ শেষ বাবার কাছে দুধ কেনার টাকা নেই শুনে আমি যেমন কষ্ট পেয়েছিলাম, রাতে অফিসে ডিসি স্যারকে জানানো মাত্র একই অনুভূতি দেখতে পেলাম স্যারের। ডিসি মিরপুর স্যার বল্লেন, তিনি আছেন এমন শিশুদের পাশে। শিশুটির আরো দুধ লাগলে জানাতে স্যারকে। খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেখলাম আমাদের মতো আরো অনেকেই কষ্ট পাচ্ছেন! আমি চিনি না, একজন আনিস ভাই, একজন রবিউল ভাই কল করলেন দিনের বিভিন্ন সময়ে। তাদের বক্তব্য একই ভিষণ কষ্ট পেয়েছেন তারা এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরা। আজ দেখলাম দুজন আমাকে মেসেঞ্জারে ইনবক্স করেছেন তাদেরকেও আমি চিনি না।

এমন ভালোবাসা যে দেশের মানুষের মাঝে, সে দেশ জিতে যাবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের জয় হবেই।

লেখক : এডিসি, দারুস সালাম জোন, ডিএমপি।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *