ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

এ,এইচ,এম একরাম আহমেদ

আধুনিক সমাজে তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কল্যাণে মানুষের জীবন যেমন সহজ থেকে সহজতর হয়েছে অন্যদিকে সাইবার দুনিয়ায় অপরাধের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান কোভিড-১৯ অতিমারির কারণে মানুষ কর্মবিমুখ হওয়ার ফলে সাইবার দুনিয়ায় মানুষের পদচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য হওয়ায় অপরাধীরা সহজে তাদের অপরাধের জাল বিস্তৃত করতে পারছে।

সাইবার অপরাধ কি : সাধারণত দেশের প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ কাজ করাই অপরাধ, আর এ অপরাধমূলক কার্যক্রম যখন কম্পিউটার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে বা তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হয় তখন তাকে সাইবার অপরাধ বলে।

১৯৯৯ সালে তাইওয়ানের চেনইং হাওয়ের তৈরি CIH ভাইরাস দ্বারা বিশ্বব্যাপী আক্রমণের মধ্য দিয়ে সাইবার আক্রমণের সূচনা ঘটে। সময়ের পরিক্রমায় সাইবার দুনিয়ায় এ ধরনের অপরাধ বিস্তার লাভ করে চলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে যে সব সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে-

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ২০১৯-২০ সালের এক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধের মধ্যে অনলাইনে হ্যাকিংয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি, ২৮.৩১ শতাংশ। অনলাইনে যৌন হয়রানিমূলক বিষয়বস্তু ব্যবহার করে হয়রানির মাত্রা বেড়েছে হয়েছে ৭.৬৯ শতাংশ। অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার মাত্রা বেড়ে হয়েছে ১১.০৮ শতাংশ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের ঘটনা ১৬.৩১ শতাংশে। সাইবার অপরাধে আক্রান্তদের মধ্যে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকির শিকার হচ্ছে ৬.৫১ শতাংশ। কপিরাইট লঙ্ঘনের ঘটনা ৫.৫৮ শতাংশ। অনলাইনে কাজ করিয়ে নিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে ১.৪০ শতাংশ। পর্নোগ্রাফি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.০৫ শতাংশে। একইভাবে থেমে নেই অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকির ঘটনা, বেড়ে হয়েছে ১৭.৬৭ শতাংশ, অন্যান্য ৩.৬৯ শতাংশ।

বাংলাদেশের সাইবার অপরাধ বৃদ্ধির কারণ :- সাইবার অপরাধের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকা এবং এ ধরনের অপরাধের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য শুধু প্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞান আর অনলাইনভিত্তিক টুলস প্রয়োজন হওয়ায় এ অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধির পাচ্ছে। সাইবার অপরাধীদের কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কিত জ্ঞান সাধারণ নাগরিকের তুলনায় বেশি থাকায় তাদের অপরাধ প্রমাণ করে আইনের আওতায় আনা কঠিন বলে এ অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়াও যেসব কারণ দায়ী তা নিম্নরূপ-

* তথ্য-প্রযুক্তির সহজ লভ্যতা ও অপব্যবহারের কারণে সাইবার অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

* সুরক্ষিত অবস্থানে থেকে সহজেই অপরাধ সংঘটিত করা যায়।

* সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা অনেক সময় সাপেক্ষ হাওয়াই এ অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

* সাইবার দুনিয়ায় অপরাধের নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন হওয়া।

* গতানুগতিক পদ্ধতিতে অপরাধ সংগঠনের সুযোগ কমে যাওয়ায় এবং সাইবার অপরাধের ক্ষেত্র বিস্তৃত হওয়া।

*              দৈনন্দিন জীবনে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া।

*              সাইবার অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞান ও আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা।

বাংলাদেশ পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস)-এর তথ্য অনুযায়ী সাইবার মামলার সংখ্যা পর্যালোচনা করলে সাইবার অপরাধ বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়-

সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা : বাংলাদেশ পুলিশ তার জন্মলগ্ন থেকে বিভিন্ন অপরাধ দমনে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে, এমনকি করোনা মহামারির সময়ে বাংলাদেশ পুলিশ তার নিজ দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মানব সেবায় নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে সাইবার অপরাধ দমনে তাদের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ সদর দফতরের ল’ফুল ইন্টারসেপশন সেল (এলআইসি), ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর ইউমেন’ (PCSW), কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল (সিসিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাইবার অপরাধ তদন্ত বিষয়ক সেল।

সাইবার বুলিং রোধে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্তৃক ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অধীনে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ (PCSW) নামে একটি সাইবার সেবামূলক সার্ভিস চালু হয়। (PCSW)-এর মাধ্যমে যেকোনো নারী ভিকটিম দ্রুত ও কার্যকর উপায়ে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত পরামর্শ ও আইনগত সমাধান পেতে পারেন। চালু হওয়ার পর থেকে জুন/২০২১ পর্যন্ত (PCSW) মোট ১৫ হাজার সাইবার বুলিং সংক্রান্ত অভিযোগ পেয়েছে বলে জানা গেছে, যা সমাধানে অনেক সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে।

কোনো ব্যক্তি সাইবার অপরাধের শিকার হলে প্রথমে থানায় জিডি কিংবা অভিযোগ করার পর সেই জিডি/অভিযোগের অনুলিপি নিয়ে ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের শরণাপন্ন হলে সেখানে একটা অভিযোগ নিয়ে তারা তার প্রতিকার দিয়ে থাকে। পুলিশের তদন্ত বিভাগ সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার তাদের ফেসবুক পেজ কিংবা হট লাইনের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের সূত্রমতে, তারা দিনে ৫০ থেকে ৬০টিরও বেশি সাইবার অভিযোগ পেয়ে থাকেন এবং সেটা নিষ্পত্তির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এবং সফল হচ্ছেন।

সর্বোপরি বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ‘সচেতন হই সাইবার স্মার্ট হই’ এ প্রতিপাদ্যকে বুকে লালন করে নিজেরা সচেতন হবো এবং অপরকে সচেতন করে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করবো।

লেখক : উপ-পুলিশ পরিদর্শক

সাইবার ইন্টেলিজেন্স শাখা,

স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *