ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদ দুটো আলাদা শব্দ হলেও প্রায় ক্ষেত্রে এ শব্দদ্বয় একই অর্থে ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষণীয়। অনেক ক্ষেত্রে একটিকে অন্যটির বিকল্প শব্দ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। বাংলা ভাষায় ÔInterviewÕ ও ÔInterrogationÕ এর জন্য আলাদা আলাদা পরিভাষা থাকলেও পুলিশ বিভাগে ইন্টারভিউ এর প্রতিশব্দ হিসেবে সাক্ষাৎকারের  ব্যবহার নেই বললেই চলে। Interrogation এর বাংলা প্রতিশব্দ জিজ্ঞাসাবাদই উভয়ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। পুলিশ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একই সাথে ব্যবহারিক অর্থে তারা সাক্ষী কিংবা বাদীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে বলে দাবি করে। যাহোক, নিবন্ধে যেহেতু আমরা সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদ দুটো বিষয়কেই বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো, তাই সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদকে তাদের নিজস্ব অর্থেই ব্যবহার করব।

১ সাক্ষাৎকার কী

রোনাল্ড এফ. বেকারের মতে, ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য সাক্ষী বা ভিকটিমের মধ্যে কথোপকথনই হল সাক্ষাৎকার’। চালর্স ই ও’ হারার মতে, ‘সাক্ষাৎকার হল এমন কোনো ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা তদন্তের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য যার জানা আছে বলে বিশ্বাস করা হয়’। বেকারের সংজ্ঞায় আসামিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের বিষয়টি অনুপস্থিত। তবে আধুনিক অপরাধ তদন্তে আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদের পূর্বে আসামি বা সন্দিগ্ধ ব্যক্তিরও সাধারণ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এ সময় আসামিকে কোনোভাবেই অভিযুক্ত করা হয় না। ও’হারার সংজ্ঞায় সাক্ষী ও তদন্তকারী কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্নোত্তরকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক সাক্ষাৎকারে তদন্তকারী কর্তৃক প্রশ্ন করার বিষয়টি খুবই নগণ্য। এখানে সাক্ষাৎকারদাতা তার ঘটনা বাধাহীনভাবে বলতে থাকেন। যাহোক, সাক্ষাৎকারকালে যে ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি তার নিজের ভাষায় নিজের মতো করে তদন্তাধীন ঘটনা বা ব্যক্তির বর্ণনা দিয়ে থাকেন। সাক্ষাৎকারের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ,

ক্স সাক্ষাৎকার একটি অভিযোগহীন মিথস্ক্রিয়া,

ক্স সাক্ষাৎকারের মূল উদ্দেশ্য তথ্য সংগ্রহ করা,

ক্স তদন্তের শুরুতেই সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু হয়,

ক্স বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা যায়,

ক্স সাক্ষাৎকার অবাধ ও কাঠামোহীন হতে পারে,

ক্স আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের সময় তদন্তকারী অনুলিখন নিতে পারেন।

২. জিজ্ঞাসাবাদ কী

ও, হারার মতে, ‘অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত সন্দিগ্ধ বা অন্য কোনো ব্যক্তি যার কাছে তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক সেই ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তথ্য উদ্ঘাটন ও স্বীকারোক্তি আদায় করার পদ্ধতিই হল জিজ্ঞাসাবাদ’। ডোনাল্ড এফ, বেকারের মতো, ‘সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে কোনো সন্দিগ্ধকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অভিযোগমূলক প্রশ্ন করার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকেই জিজ্ঞাসাবাদ বলে’। জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ-

অপরাধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি উদ্ঘাটন করা,

ক্স সন্দিগ্ধকে অপরাধ স্বীকার তথা দায় গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা,

ক্স অপরাধ সংশ্লিষ্ট অবস্থা ও অপরাধ সম্পর্কিত সত্য উদ্ঘাটন,

ক্স অপরাধের সহযোগীদের পরিচয় উদ্ঘাটন,

ক্স  অপরাধ প্রমাণের আলামত উদ্ধারের জন্য তথ্য উদ্ঘাটন,

ক্স সন্দিগ্ধ অন্যকোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তার বিস্তারিত জানার চেষ্টা,

ক্স অপরাধ সম্পর্কে স্বীকারোক্তি আদায়

অভিযুক্তের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করার প্রাথমিক উদ্দেশ্য দিয়ে শুরু হলেও জিজ্ঞাসাবাদের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থাকে অভিযুক্তের দোষ-স্বীকারোক্তি আদায় করা। নিম্নে চিত্রে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হল-

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায়

সাক্ষাৎকারের সাথে জিজ্ঞাসাবাদের পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম। কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদ উভয় ক্ষেত্রেই একই। অনেকে মনে করেন সাক্ষীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় আর আসামিকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু আদর্শ মত হল, সাক্ষী বা আসামি উভয়ের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ সাক্ষাৎকার দিয়েই শুরু হয়। কিন্তু তথ্য সংগ্রহের বাইরে গিয়ে তথ্যদাতাকে যখন অভিযুক্ত করা হয় এবং আদালতে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা স্বীকারোক্তি আদায়ের দরকার পড়ে তখনই পুরু বিষয়টি সাক্ষাৎকারের স্তর থেকে জিজ্ঞাসাবাদের দিকে মোড় নেয়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদ দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি। দুই পদ্ধতির সংমিশ্রণ ঘটলে তদন্তকারীর উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। নিম্নে সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে সাদৃশ্য ও পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হল।

কোন পদ্ধতিতে বা কোন কৌশলে সাক্ষাৎকার বা জিজ্ঞাসাবাদ পরিচালনা করা হবে তা নির্ভর করবে ঘটনার সাথে সাক্ষাৎকারদাতা কিংবা অভিযুক্তের সংশ্লিষ্টতা বা সম্পর্কের ওপর। তদন্তকারী সাধারণ আচরণ মামলা বা ঘটনা দিকগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। সাক্ষাৎকারদাতা, ঘটনা, সময়, স্থান কিংবা তদন্তকারীর ব্যক্তিত্বের ওপর সাক্ষাৎকারের ধরন বা স্টাইল নির্ভর করে। জিজ্ঞাসাবাদের ধরন, কৌশল ও পদ্ধতিসমূহ নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এ নিবন্ধে সাক্ষাৎকার ও জিজ্ঞাসাবাদ সংক্রান্ত সাধারণ নির্দেশনামমূহ নিয়ে আলোচনা করা হল।

৩. প্রস্তুতি গ্রহণ

প্রচলিত প্রবাদ, ÔWell begun, half doneÕ অন্যান্য কাজের মতো সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রেও সত্য। একটি সফল সাক্ষাৎকারের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে খুঁটিনাটি সকল বিষয়েই পূর্ব প্রস্তুতি রাখতে হবে। কয়েক ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকার বা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাত্র দুই মিনিটের প্রস্তুতি নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে। পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষী, ভিকটিম বা সন্দিগ্ধের কাছে অনভিজ্ঞ, অদক্ষ বলে প্রমাণিত হবেন। এ অবস্থা তার সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ার নেতৃত্বকে দুর্বল করে দিবে। হয়তো কোনো পরিকল্পনা অসফল হতে পারে, কিন্তু তাই বলে পরিকল্পনা তৈরিতে অসফল হওয়া যাবে না। সাক্ষাৎকার পর্ব শুরুর পূর্বে একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা কী কী বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

৪. সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা

শুরুতেই তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্ধারণ করতে হবে ঘটনা সম্পর্কে তিনি সাক্ষাৎকারদাতার কাছ থেকে কী কী তথ্য প্রত্যাশা করেন এবং সাক্ষাৎকারদাতারই বা এ সম্পর্কে কতটুকু জানাশোনা আছে। কোনো তথ্য কতটুকু তার উদ্দেশ্য সফল করবে এবং তা সাক্ষ্য আইনের কোনো কোন ধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অপরাধের যদি একাধিক অভিযুক্ত থাকে তবে সাক্ষী বা সন্দিগ্ধের কাছ থেকে মূল ঘটনার সাথে সাথে তার সহযোগীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার মাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে পূর্ব থেকেই এসব বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

প্রয়োজনবোধে তাকে সাক্ষাৎকারদাতার অতীত জীবন বা কর্মকা- সম্পর্কে পূর্বেই জেনে নিতে হবে। এর ফলে তিনি সাক্ষাৎকারদাতার অনুভূতিতে সঠিকভাবে নাড়া দিতে পারবেন। মোটকথা, তদন্তকারী তার সম্ভাব্য সাক্ষাৎকারদাতার সম্পর্কে এক ভালো প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এজন্য তিনি একটি চেকলিস্ট তৈরি করবেন এবং সাক্ষাৎকার শুরুর পূর্বে তা মিলিয়ে দেখবেন যে কোনো বিষয়ের ঘাটতি আছে কি না। অনেক ক্ষেত্রে অসাধারণ কোনো প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই সাক্ষাৎকার শুরু করেন। এতে অনেক কথার মধ্যে হয়তো আসল কথাটিই বলা হয় না।    কথায় বলে, A plan may fail, but we must not fail to plan.

৫. চেকলিস্ট তৈরি

সাক্ষাৎকার শুরুর পূর্বে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তার প্রয়োজনীয় বস্তু বা জানার বিষয়গুলো নিয়ে একটি চেকলিস্ট তৈরি করতে হবে। এ চেকলিস্ট মিলিয়ে দেখে তিনি তার প্রস্তুতি যেমন সম্পন্ন করতে পারবেন, তেমনি একটি পদ্ধতিগত উপায়ে তিনি প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাপ্তির চেষ্টাও করতে পারবেন। পরবর্তী অধ্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যে চেকলিস্ট রয়েছে তা সাক্ষাৎকারের জন্যও প্রয়োজনীয় হতে পারে।

৬. ঘটনার আদ্যোপান্ত জানা

সাক্ষাৎকার শুরুর পূর্বেই সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী আলোচ্য ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিবেন। যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী কর্মকর্তা হন তবে তার হয়তো অনেক কিছুই প্রথম থেকে জানা হয়ে যাবে। কিন্তু তদন্তকারী ভিন্ন অন্য কোনো কর্মকর্তা এমনকি মামলার তদন্তের ভার গ্রহণকারী নতুন কর্মকর্তাকেও মামলার যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। বলাবাহুল্য আমাদের দেশের অধিকাংশ মামলাই থানায় বাদীর এজাহার দেওয়ার মাধ্যমেই রুজু হয়। এজাহারে সম্পূর্ণ সঠিক না হলেও ঘটনার পুরো বর্ণনা দেওয়া হয়। সাক্ষী, ভিকটিম বা সন্দিগ্ধ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণের উদ্দেশ্য তাই যতটা না নতুন তথ্য সংগ্রহ করা, তার চেয়েও অনেক বেশি ইতোমধ্যে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই বা তথ্য গ্যাপ পূরণ করা, সাক্ষাৎকার শুরুর পূর্বে তাই ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি না জানতে যা প্রায় ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না।

৭. সাক্ষী/সন্দিগ্ধের অতীত জানা

সাক্ষাৎকার দুজন মানুষের সামনাসামনি বসে কিংবা বাহ্যিক সংযোগের মাধ্যমে গৃহীত কার্যক্রম হলেও এটা একটি মানসিক প্রক্রিয়া। সাক্ষাৎকারদাতা, সে সাক্ষী হোক বা অভিযুক্ত ব্যক্তিই হোক তার সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব বিস্তারিত জানা থাকলে তার কাছ থেকে তথ্য প্রাপ্তি যেমন সুবিধা হয়, তেমনি প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়। অধিকন্তু সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী যদি সাক্ষাৎকারদাতা সম্পর্কে সম্যকভারে জ্ঞাত থাকেন তবে তার সাক্ষাৎকার পদ্ধতি নির্বাচনেও সুবিধা হয়। তাই সাক্ষাৎকার শুরুর পূর্বেই সাক্ষীর ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ, শিক্ষা, বেড়ে ওঠা, পূর্ববর্তী কর্মকা- ইত্যাদি সম্পর্কে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তথা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানার চেষ্টা করতে হবে। নিবন্ধের শেষ পর্যায়ে সাক্ষীর শ্রেণিবিভাগ আলোচিত হয়েছে। এ থেকেও সাক্ষীর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞানলাভ করা যেতে পারে।

৮. সাক্ষাৎকারের স্থান

সাক্ষাৎকারের স্থান বিভিন্ন স্থানে হতে পারে। কোনো কোনো সময় ঘটনা ঘটার সাথে সাথে বা ও অব্যবহিত পরেই সাক্ষীদের বা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। তাই সে সাক্ষাৎকার ঘটনাস্থলে কিংবা তার সন্নিকটে হতে পারে। ঘটনা ঘটার অনেক পরে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হলে সেটা তদন্তকারী ও সাক্ষাৎকারদাতার সুবিধাজনক স্থানে হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ প্রায়ই ক্ষেত্রে সাক্ষীদের থানায় পুলিশ অফিসে ডেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সময় বাঁচানোর জন্য এ পদ্ধতি সঠিক হলেও এতে সাক্ষাৎকারদাতারা শারীরিক মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে। এতে সাক্ষাৎকারে তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না। তাই ঘটনা-পরবর্তী সাক্ষাৎকার যতদূর সম্ভব ঘটনাস্থলের কাছাকাছি কিংবা সাক্ষাৎকারদাতার নিজ পছন্দমতো স্থানে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

৯. সাক্ষাৎকারের গোপনীয়তা

সাক্ষাৎকারের স্থান নির্জন হওয়া বাঞ্ছনীয়। খোলা স্থানে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হলে তাও জনতার সমাগম থেকে নিরাপদ দূরত্বে হতে হবে। আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ অনেক সময় ঘটনাস্থলের কাছে খোলাস্থানে বাদী-সাক্ষীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। পরিশেষে নির্জন বা কোলাহলমুক্ত কিংবা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর দৃষ্টি তদন্তকারীর ওপর নিবন্ধ রাখার মতো অবস্থা তৈরি করতে পারলে দোষের কিছু নেই। ঘটনাস্থলে সাক্ষাৎকারকালীন সাক্ষীকে আলাদা করতে হবে। ঘটনাস্থলে অনেক সময় অধিক সংখ্যক মানুষের মাঝেও বাদী, সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে হয়। এক্ষেত্রে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু দূরে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা করে একবারে একজন সাক্ষীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে হবে। কোনো সময়ই একই সাথে একাধিক ব্যক্তিকে কিংবা অনেক ব্যক্তির মাঝে কোনো সাক্ষীকে প্রশ্ন করা উচিত নয়।

১০. সাক্ষাৎ প্রদানকারী সাক্ষী থেকে অপেক্ষমাণ সাক্ষীদের পৃথকীকরণ

ঘটনাস্থলে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হলে একই সাথে অনেক সাক্ষী সাক্ষাৎকার দিতে আসেন। অনেক সময় তদন্তকারী কর্মকর্তার অনুরোধে বাদীপক্ষ একই স্থানে একই দিনে একাধিক সাক্ষীকে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হাজির করেন। থানায় বসেও একই দিনে একাধিক সাক্ষী থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার অনুশীলন রয়েছে। তদন্তকারীকে মনে রাখতে হবে যে সাক্ষীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে তাকে অপেক্ষমাণ সাক্ষীদের সাথে মিশতে দেওয়া উচিত নয়। কারণ সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া ব্যক্তি অপেক্ষমাণদের নিকট তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করবেন। এতে তদন্তকারী সাক্ষীকে কী কী প্রশ্ন করছেন, এর উত্তরে তিনি কী কী বলেছেন, এসব বিষয় আলোচিত হয়। এতে পরবর্তী সাক্ষী পূর্ববর্তী সাক্ষীদের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং তথ্য বিকৃতির সম্ভাবনা থাকে।

১১. থানায় বসে সাক্ষাৎকার

থানা কিংবা পুলিশ ব্যবস্থাপনায় সাক্ষাৎকার গ্রহণের কিছু কিছু সুবিধা

থাকলেও এর অসুবিধা অনেক বেশি। সুবিধা হল, তদন্তকারী কর্মকর্তা অল্প সময়ে অনেক বেশি ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে পারেন। থানার বা পুলিশ ব্যবস্থাপনার পুরো পরিবেশ তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়ন্ত্রণ থাকে। অনেক সময় সাক্ষীর জবানবন্দি অডিও ভিডিও ধারণ করার ব্যবস্থাও হতে পারে। এখানে সাক্ষাৎকারদাতাকে আপ্যায়ন করার সুযোগ তৈরি হয়। এতে সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার ওপর খুশি হতে পারেন। কিন্তু থানায় বসে সাক্ষাৎকারের প্রধান অসুবিধা হল এতে বাদী বা সাক্ষীর গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হয়। অনেক ব্যক্তি পুলিশকে অনেক তথ্য দিতে চান। কিন্তু তারা তা গোপনে দিতে চান। কিন্তু তাকে থানায় ডেকে পাঠানো হলে তা আর গোপনে থাকে না। অনেক সময় মানুষ থানায় আসতে উৎসাহিত বোধও করেন না। কিন্তু পুলিশ ডেকে পাঠালে তাদের আর করার কিছু থাকে না। এতে তারা স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে ফেলেন এবং মিথ্যা সাক্ষী না দিলেও অনেক তথ্য গোপন করে থাকেন। থানায় ডেকে পাঠানো হলে মানুষের যাতায়াতে এবং বাহিরে আসার ফলে খাবার-দাবারে অর্থ খরচ হয়। তদন্তকারীগণ তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারেন না। অনেক সময় সাক্ষীরা এসে থানায় তদন্তকারী কর্মকর্তার জন্য বসে থাকেন। কিন্তু নানা কাজের চাপে তারা সাক্ষী থেকে সময় মতো সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে পারেন না। এতে সাক্ষীরা বিরক্ত হন যার প্রতিফলন তার জবানবন্দিতে পড়ে। তিনি এখন ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা না দিয়ে তা কোনো রকম শেষ করতে ব্যস্ত থাকেন।

১২. সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ

ঘটনার অব্যবহিত পরেই সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান করা উচিত। কারণ সময় যত গড়াবে মানুষের স্মৃতি ততোই ঝাপসা হয়ে আসবে। মানুষের মন থেকে আবেগ প্রশমিত হবে। প্রত্যক্ষদর্শীগণ নানা সমীকরণে পড়ে তথ্য গোপন বা তথ্য বিচ্যুতির সুযোগ পাবে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অনেক মানুষ ঘটনা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে চান না। তাই এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা উচিত। ঘটনার সাথে কালের ব্যবধানের বাইরেও তদন্তকারীকে সাক্ষাৎকারদাতার কাছে সকাল-দুপুর-রাত বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কোনো সাক্ষীকে রাতের বেলা সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা কিংবা তার বাড়িতে যাওয়া কোনো ক্রমেই উচিত নয়। দিনের বেলা উভয়েরই সুবিধাজনক সময়ে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান বাঞ্ছনীয়। (চলবে)

  লেখক : এআইজি (পিঅ্যান্ডআর-২),

  পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *