ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

৩. ১ জড়তা দূর ও সুসম্পর্ক তৈরি

সাক্ষাৎকার শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাক্ষাৎকারের জন্য কত সময় লাগবে, তা বোঝা যাবে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে বুঝতে হবে, যে তিনি সাক্ষাৎকারদাতার কাছ থেকে অনেক কিছুই জানতে চান। অথচ তিনি তার অপরিচিত। তাই তার প্রথম কাজই হবে সাক্ষাৎকারদাতার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত হয়ে তার সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা। এজন্য প্রথমেই তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তার পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরতে হবে। প্রয়োজনবোধে তাকে নিজ পরিচয় পত্র দেখাতে হবে। প্রথমে সাধারণ কিছু কুশল বিনিময়সূচক প্রশ্ন করে সাক্ষীকে সহজ করে নিতে হবে। সাধারণ প্রশ্নের মধ্যে থাকতে পারে, আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়, যাতায়াতের সমস্যা, কিংবা তদন্তকারীর পেশার সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা। এক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারদাতার পছন্দ-অপছন্দ, পড়াশোনা, পেশা, এমনকি পছন্দের সিগারেট নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে আলোচনায় যত মামুলি প্রসঙ্গই আসুক না কেন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সব সময় তার পেশাদারী মনোভাব বজায় রাখতে হবে। সুসম্পর্ক তৈরি পর্ব কতক্ষণ স্থায়ী হবে তা সাক্ষীর মনোভাব, সহযোগিতার মাত্রা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবার আগ্রহ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।

৩.২ বাধাহীন বর্ণনা

তদন্তকারী যখন বুঝতে পারবেন যে সাক্ষাৎকারদাতা এখন অনেকটাই সহজ ও স্বাভাবিক হয়েছেন এবং অপরিচিতির সংকোচ তার মধ্যে আর নেই, তখন তিনি তার কথোপকথন তদন্তের দিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করবেন। এবার তাকে বলতে হবে, ঘটনা সম্পর্কে আপনি যা জানেন বিস্তারিত বলুন। সাক্ষী তার জানা ঘটনা বিস্তারিত বলবেন। এ সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা কেবল শুনে যাবেন, কোনো প্রকার বাধা দিবেন না। তবে তিনি তার মনোযোগ প্রমাণ করার জন্য মাঝে মাঝে মাথা নাড়বেন, ‘হ্যাঁ’ বলবেন। এভাবে ঘটনার বর্ণনা বা ঘটনার সঙ্গে ব্যক্তিবর্গের বর্ণনা অগ্রসর হতে থাকবে।

৩.৩ নোট গ্রহণ-

তদন্তকারী কর্মকর্তা বা সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী অফিসার সাক্ষাৎকারে প্রাপ্ত তথ্যগুলো তার তদন্তে ব্যবহার করবেন কিংবা যথাযথ স্থানে তার রিপোর্ট করতে পারেন, তাই সাক্ষাৎকারের একটা ডকেটিং থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘটনা বর্ণনার সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রুতি লেখন বা নোট নেবেন কি না। এ বিষয়ে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা মুশকিল।  নোট নেয়া, না নেয়া উভয়েরই ভালো-মন্দ দিক আছে। তবে সাক্ষাৎকারের শুরুতেই নোট নেয়া শরু হলে সাক্ষীরা স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। অপর দিকে নোটগ্রহণ না করলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাক্ষীর সব কথা মনে রাখতে পারবেন না। তাই সাক্ষীর সঙ্গে হৃদ্যতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নোট গ্রহণ করা উচিৎ নয়। তাই প্রথম দিকে বাধাহীনভাবে বর্ণনা শ্রবণ করে সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে নোট গ্রহণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে আলোচনা পিছনের দিকে নিয়ে নোটযোগ্য বিষয়গুলো পরিষ্কার করার পর নোটগ্রহণ করা যেতে পারে।

তবে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী কর্মকর্তা নিজেই তদন্তকারী কর্মকর্তা হলে নোট না দেয়াই উত্তম। তদন্তকারী কর্মকর্তা একজন মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে সাক্ষাৎকার শুনতে থাকবেন। তিনি একই সঙ্গে সাক্ষাৎকারদাতার অবাচনিক আচরণ কিংবা দেহ বিন্যাস লক্ষ্য করবেন। আমরা পরবর্তীতে অবাচনিক আচরণ বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষাৎকারদাতার বর্ণনার পরস্পরা বরাবর লক্ষ্য করবেন। তার বর্ণনার কোনো অংশ অস্পষ্ট কিংবা কোথায় কোথায় আরো বেশি তথ্যের প্রয়োজন আছে, তা লক্ষ্য করবেন। বর্ণনাকালে সাক্ষাৎকারদাতার বুদ্ধিমত্তা, কুসংস্কার, নৈতিক ঝোঁক ইত্যাদির সম্পর্কে ধারণা করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্প স্মৃতির সাক্ষাৎকারদাতাগণ বর্ণনার খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাই তদন্তকারী কর্মকর্তা তারপর কি হলো,’হ্যাঁ! হ্যাঁ!, বলতে থাকুন– এমন কথা বলে আলোচনা সামনের দিকে নিয়ে যেতে হবে।

৩. ৪ আসামি/সন্দিগ্ধের সাক্ষাৎকার

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার খুব দ্রুত গ্রহণ করা উচিৎ। তদন্তকারীকে সম্পূর্ণ খোলা মন নিয়ে সাক্ষাৎকার শুনতে হবে। তিনি যদি জেনেই ফেলেন যে, আসামি পুরোপুরি ঘটনার সঙ্গে জড়িত তবে সাক্ষাৎকার হবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিপাদনের একটি উপায় মাত্র। এক্ষেত্রে আসামিকে দোষারোপমূলক কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। অন্যথায় তিনি ভীতু হয়ে তার আত্মরক্ষার কৌশল নির্ধারণ করে নেবেন, যা জিজ্ঞাসাবাদকালে তাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকার কৌশল অবলম্বনে সহায়তা করবেন। তাই তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষাৎকারপর্বে কেবল শ্রোতার দায়িত্ব পালন করবেন এবং আসামির সাক্ষাৎকারের ঘটনা বর্ণনার আকাক্সক্ষাগুলোই লক্ষ করবেন। যদি সন্দিগ্ধ ব্যক্তি গ্রেফতার না হয়ে থাকে এবং তাকে গ্রেফতারের আশু সম্ভাবনা থাকে, তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা অধিকতর মুক্তমনে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবেন এবং সন্দিগ্ধ সম্পর্কে তার যাবতীয় সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করবেন। এই ক্ষেত্রে তদন্তকারীকে মনে রাখতে হবে, যেহেতু তাকে এই মুহূর্তে গ্রেফতার করা হবে না, তাই তাকে এমন ভয় দেখানো যাবে না- যাতে তিনি সাক্ষাৎকারের পরেই গা ঢাকা দেন কিংবা অপরাধের আলামতগুলো নষ্ট করতে উৎসাহী হন।

৩.৫ প্রশ্নোত্তর পর্ব

সাক্ষী তার গল্প বা বর্ণনা পরিপূর্ণভাবে বলা শেষ করলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ঘটনাটির কিছু কিছু অংশ আবার শুনতে চাইবেন। বিশেষ করে, সেসব বিষয়ে সাক্ষী কোন বিবরণ দেননি অথচ তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — এমন সব বিষয়ের প্রতি জোর দিবেন। প্রশ্ন করাকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা সাক্ষীর কাছ থেকে অপরাধের উপাদনগুলো তথা কী, কে, কেন, কোথায়, কখন, কীভাবে– এসব বিষয় পরিষ্কার করে নেবেন।

সব ক্ষেত্রেই প্রশ্নগুলো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তৈরি করতে হবে। এমন কোনো প্রশ্ন করা উচিৎ হবে না যেখানে সাক্ষী অবশ্যম্ভাবীরূপে নেতিবাচক উত্তর দেয় কিংবা তার উত্তরদান সীমিত হয়ে পড়ে। যদি এভাবে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি আসলে এটা বিশ্বাস করেন না। করেন কি’? এ প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হবার কোনো কারণ নেই। সাক্ষী তদন্তকারীর প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘না’-ই বলবেন। অন্যদিকে, প্রশ্নটি যদি এভাবে করা হয়, ‘আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন? এ ক্ষেত্রে সাক্ষী উত্তরদানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা পেয়ে তার মতো করে উত্তর দিতে পারেন।

প্রশ্নের ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল ধরনের পার্থক্যের জন্যই উত্তরের ধরন, এমনকি অর্থও পাল্টে যেতে পারে। এমনকি একই প্রশ্নে একটিমাত্র শব্দের জন্যও উত্তরদাতার উত্তর সম্পূণরূপে ভিন্নরূপ হতে পারে। একটি গবেষণায় একদল ব্যক্তিকে একটি ট্রাফিক দুর্ঘটনার ভিডিও চিত্র দেখানো হয়। এরপর গবেষণাধীন ব্যক্তিদের এক দলকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি দুর্ঘটনায় পতিত গাড়ির ‘ভাঙা হেডলাইটটি’ দেখেছেন? অন্য গ্রুপকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি দুর্ঘটনায় পতিত গাড়ির ‘ভাঙা হেডলাইট’ দেখেছেন? প্রশ্নের উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেল প্রথম প্রশ্নের উত্তরে যত সংখ্যক ব্যক্তি ‘হ্যাঁ’ বলেছেন, দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে তার চেয়ে কমসংখ্যক ব্যক্তি ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম প্রশ্নে ভাঙা হেটলাইটটি’ ইঙ্গিত দেয় যে গাড়ির একটি লাইট ভাঙা ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নে ‘ভাঙা হেডলাইট’ শব্দটি বোঝায় যে গাড়ির হেডলাইট ভাঙা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। এই ভাঙা হেডলাইটের অস্তিত্বের প্রতি ইঙ্গিত থাকায় উত্তরদাতাগণ প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলতে উৎসাহিত হয়েছেন।

একই বাক্যের মাধ্যে ক্রিয়া পদের পার্থক্যের জন্য সাক্ষীর উত্তরে কীরূপ পরিবর্তন আসতে পারে তারও উপর গবেষণা রয়েছে। একটি গবেষণায় একদল ব্যক্তিকে ট্রাফিক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত সাতটি ভিডিও চিত্র দেখানো হয়। এরপর তাদের কার্যত একই প্রশ্ন করে দুর্ঘটনায় পতিত গাড়িগুলোর গতিবেগ কত থাকতে পারে বলে অনুমান করতে বলা হয়। প্রশ্ন করা হয়, গাড়ি দুটো যখন একটি অন্যটিকে ‘আঘাত করল’ তখন গাড়ির গতিবেগ কত ছিল? এবার ‘আঘাত করা’ শব্দের পরিবর্তে ‘ বাড়ি খেল’ শব্দ দুটো ব্যবহার করা হয়। তারপর ব্যবহার করা হলো, সংস্পর্শে আসল’ শব্দগুলো। যদিও ব্যাকরণগতভাবে এ বাক্যে এক জোড়া শব্দের পরিবর্তে অন্য জোড়া শব্দ বসালে বাক্যে যেমন কোনো ভুল হয় না, তেমনি বুঝতেও কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, যতবারই শব্দগুলো পরিবর্তিত হয়েছে গবেষণাধীন ব্যক্তিদের প্রশ্নের উত্তরে ততোবারই গাড়ির গতির অনুমানে পরিবর্তন এসেছে। প্রশ্নে যত বেশি গতি প্রকাশক ক্রিয়া বাচক শব্দ ব্যাবহার করা হযেছে, সাক্ষীর উত্তরেও গতির অনুমান অংক বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ধরনের সমস্যা নিরসনের জন্য সাক্ষীকে তাদের নিজস্ব ভাষায় বাধাহীনভাবে ঘটনার বর্ণনা দিতে উৎসাহিত করতে হবে। তাদের বর্ণনা যতক্ষণ পর্যন্ত না খুব বেশি অপ্রাসঙ্গিক হবে বা অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটির আধিক্য দেখা দেবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত তাদের বর্ণনাকে বাধাহীন রাখতে হবে।

৩.৬ .কথোপকথনকে গাইড করা

অনেক সাক্ষী তাদের বর্ণনায় আসল তথ্য না দিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা করেন। এ ধরনের সাক্ষীর ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কথোপকথন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। প্রয়োজনবোধে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে তা করতে হবে কৌশলে।

৩.৭ তথ্যের সমরূপতা যাচাই.

এক সাক্ষীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অন্য সাক্ষীর কাছ থেকে যাচাই করা সাক্ষীর কাছ থেকে যাচাই করা সাক্ষাৎকাররের অন্যতম উদ্দেশ্য। কোন ঘটনায় এক সাক্ষী বা বলেছেন অন্য এক বা একাধিক সাক্ষী যদি তা-ই বলেন বা একই তথ্য দেন, তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন।

৩. ৮. তথ্যের গরমিল পরিষ্কার করা

সাক্ষ্যদানকালে সাক্ষীর ভাষ্যে অসঙ্গতি, অসততা, কিংবা অযথার্থতা পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠবে। এসব পয়েন্ট বারবার প্রশ্ন করে পরিষ্কার করে নিতে হবে প্রয়োজনবোধে বারবার প্রশ্ন করতে হবে। ইচ্ছাকৃত তথ্য বিচ্যুতি ও সাধারণ ভুলের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। (চলবে–)

লেখক : এআইজি (পিএন্ডআর-২)

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

2 Comments

rpg-76 · December 30, 2021 at 7:55 am

ড. মো: মইনুর রহমান চৌধুরী ব Great blog thank you for publishing it!

rpg maker games · December 30, 2021 at 8:06 am

৩.২ বাধাহীন বর্ণনা Awesome post thanks for posting it.

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *