ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

৭. ৪ অনিচ্ছুক সাক্ষী

তথ্য জানা থাকলেও অনেক মানুষ তা প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক থাকে। এরা সাধারণভাবে সমাজ সম্পর্কে উদাসীন এবং যে কোনো সামাজিক বিষয়ে অসহযোগিতার ভাব প্রদর্শন করে। এসব সাক্ষীকে অনুপ্রাণিত করার ভালো উপায় হচ্ছে তাদের বিভিন্নভাবে তোষামোদ করা। তাদের অহংবোধেও আঘাত করা যায়। এভাবে পুলিশের কাছে তথ্য প্রকাশের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হলে তারা তথ্য দানে উৎসাহিত হবেন।

৭.৫ মাতাল সাক্ষী

অনেক সাক্ষী অভ্যাসগত মাতাল হতে পারে। বাংলাদেশে এসব মানুষের সংখ্যা কম হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অনেক সময় মাতাল সাক্ষীও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। মদের আড্ডায় কিংবা, অসামাজিক কর্মকাণ্ডের স্থলে অপরাধ সংঘটিত হলে ওই আড্ডায় যোগদানকারীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ না করে উপায় থাকে না। নেশার ঘোরে আবিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেও অনেক সময় প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। এ অবস্থা কিছুটা সম্মোহন বা ট্রুথ সিরাম প্রয়োগকালীন অবস্থার মতো হতে পারে। তাই সাক্ষীকে তোষামোদ করলে তারা সব তথ্যই প্রকাশ করতে পারে। তবে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা সমীচীন নয়। প্রথমত, এটা অধিকতর তথ্য উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে, দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎকারে জবানবন্দি রেকর্ড করা যেতে পারে।

৭.৬ বাচাল সাক্ষী

কিছু কিছু ব্যক্তি স্বভাবগতভাবেই বাচাল। তারা ঘটনা সম্পর্কে যেমন বিস্তারিত তথ্য দেয়, তেমনি জবানবন্দি দান কালে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়েরও অবতারণা করে। এদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তবে এদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে নানা কৌশলে তাদের প্রসঙ্গের মধ্যেই ধরে রাখতে হবে। মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করে তাদের আসল প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনতে হবে।

৭.৭ সন্দেহবাদী সাক্ষী

অনেক ব্যক্তি তথ্যদানের ক্ষেত্রে নানা সন্দেহে ভোগেন। অনেক সময় অহেতুক ভয়ে তারা তথ্য দেতে চান না। এক্ষেত্রে তদন্তকারীকে সাক্ষীর মন থেকে প্রথমেই ভয় দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে যে একজন সুনাগরিকের উচিৎ পুলিশকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করা। এরপরও কাজ না হলে তাকে মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। তাকে বলা যেতে পারে, আপনি যা বলতে চাচ্ছেন না পুলিশ সেটা ইতোমধ্যেই জেনে ফেলেছে। আপনার দেয়া তথ্য ছাড়াও আমাদের চলবে। তবে আপনার সাক্ষ্য পেলে আরো ভালো হয়। আপনি তথ্য না দিতে চাইলে আমরা মনে করতে পারি হয়তো আপনিও এতে জড়িত আছেন।

৭.৮ অহংকারী বা আত্মকেন্দ্রীক সাক্ষী

এ ধরনের ব্যক্তি নিজেকে প্রকাশ করতে উদগ্রীব থাকে। তাই ভালমানের সাক্ষী হতে পারে। এদের উদ্বুদ্ধ করতে ধৈর্য ও তোষামোদ দরকার। তবে এরা তাদের ভাষ্যকে রং-চঙ দিয়ে প্রকাশ করতে পারে এবং নিজেরে ভূমিকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই তথ্য গ্রহণের ব্যাপারে তদন্তকারীকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

৭.৯ ভীতু সাক্ষী

গৃহবধু, অশিক্ষিত ব্যক্তিরা, বিদেশি নাগরিক ইত্যাদি ধরনের ব্যক্তি সাধারণভাবে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিতে অত্যধিক ভয় পায়। এসব ব্যক্তির প্রতি পুলিশকে অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। মূল আলোচনা শুরুর আগেই তাদের বেশ কিছু সময় ব্যয় করতে হবে বোঝানোর জন্য যে তারা যে তথ্য দেবেন ,তা গোপন থাকবে ফলে তারা কোনো প্রকার ঝামেলায় পড়বেন না।

৭.১০ মুখে খিল দেয়া সাক্ষী

এক শ্রেণির ব্যক্তি আছে তারা পুলিশের কাছে কোনোভাবেই মুখ খোলেন না। এদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। এ ধরনের সাক্ষী যদি দাগী অপরাধী হয়, সে স্বাভাবিক কারণেই নীরব থাকবে। অন্যান্য শ্রেণির ব্যক্তির ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অত্যন্ত অধ্যবসায়ী হতে হবে। প্রথমে ঘটনা নিরপেক্ষ কোনো বিষয়ে আলোচনা শুরু করে তার মুখ খোলার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এরপর তাদের বোঝাতে হবে যে একজন নাগরিক হিসেবে তার দেশের প্রতি, সমাজ পরিবার ও ভিকটিমের প্রতি অবশ্যই দায়িত্ব আছে। তিনি ঘটনা বা অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সে দায়িত্বের কিছুটা পালন করতে পারেন।

৮. বিশেষ শ্রেণির সাক্ষীর সাক্ষাৎকার

ইতোপূর্বে সাধারণ সাক্ষীদের ধরন ও সাক্ষাৎকার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এবার আলোচনা করা হবে বিশেষ শ্রেণির কিছু সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ সম্পর্কে। এসব সাক্ষী বা ব্যক্তির মুখ থেকে ঘটনা জানা যেমন তদন্তের স্বার্থে অপরিহার্য, তেমনি আইনগত দিক দিয়েও তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদের মধ্যে রয়েছে অভিযোগকারী বা বাদী, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে অর্থাৎ অভিযুক্ত, ভিকটিম বা সরাসরি অপরাধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং ঘটনা সংঘঠনের গোপন তথ্য সরবরাহকারী ব্যক্তি তথা ইনফরম্যান্ট বা গুপ্তচর।

৮.১ বাদী বা অভিযোগকারী

মামলার বাদীদের প্রতি তদন্তকারী কর্মকর্তা অবশ্যই সহানুভূতিশীল আচরণ প্রদর্শন করবেন। অপরাধের খবর পুলিশের নজরে আনার জন্য তিনি বাদীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন। তদন্তকারীর মনে রাখতে হবে, বাদী বা অভেযোগকারীর পূর্ণ সহযোগিতা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন তথা তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বাদীর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে গোপনে বিস্তারিত জানতে হবে। একইভাবে অভিযোগগুলো অপরাধ সংজ্ঞার সবদিকে পূরণ করে-কিনা তাও নির্ধারণ করতে হবে। বাদীর অপরাধ ইতিহাস আছে কিনা এবং তিনি অভ্যাসগত অভিযোগকারী কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগের পেছনে বাদীর মূল প্রেষণা বা মতলব কি, তাও নির্ধারণ করতে হবে। বাদীর মনোভাবে ঈর্ষা, পূর্বসংস্কার, ক্ষোভ ইত্যাদিও জানা দরকার।

৮.২ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার

আমাদের বিচার ব্যবস্থায় এজাহারভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার ভিন্ন সাক্ষাৎকার গ্রহণ সম্ভব নয়। কিন্তু এজাহারের কলামে নাম থাকলেই তিনি ঘটনার সঙ্গে নাও জড়িত থাকতে পারেন। অপরাধের সঙ্গে জড়িত আছে বলে সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই অথচ এজাহারে নাম আছে, এমন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের আগে সাধারণ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা দরকার। অন্যদিকে এজাহারের নাম না থাকলেও আপতত সন্দেহমূলক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা প্রয়োজনীয় হতে পারে। এসব ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে তদন্তকারীকে আইনগত দিক এবং অপরাধের উপাদানগুলো সম্পর্কে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। সন্দিগ্ধকে কোনোভাবেই সরাসরি অভিযুক্ত করা যাবে না।

৮.৩ ভিকটিম বা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি

ভিকটিমের সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ভিকটিম সহিংস আচরণও করতে পারে কিংবা তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগও নিয়ে আসতে পারে। ভিকটিমের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি দেখিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিমকে পুরো ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করতে বলবেন। এর সঙ্গে ভিকটিমের মন্তব্য বা মতামতও নিবেন। তবে কোনোভাবেই নিজের মত জানাবেন না। তিনি ভিকটিমের মতের বিরোধিতাও করবেন না সমর্থন সূচক মন্তব্যও করবেন না। তার পূর্ণ নজর থাকবে কেবল তথ্য গ্রহণের দিকে।

৮.৪ ইনফরম্যান্ট বা গুপ্তচর

অপরাধ সংঘটনের খবর কার মাধ্যমে পাওয়া গেল সে সম্পর্কে পুলিশ অফিসাররা আদালতে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য নয়। তাছাড়া গুপ্তচরদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করাও বাংলাদেশের আইনে বাধ্যবধকতা নেই। তবে গুপ্তচরদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে অপরাধের বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশের সোর্সরা এ ধরনের ইনফরম্যান্টদের শ্রেণিতে পড়ে। এরা সাধারণত বিস্তারিত তথ্য দিতে চায় না। তাই তাদের তোষামোদ করা কিংবা অনেক সময় মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হলে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ সম্ভব।

৯. সাক্ষাৎকারের মূল্যায়ন

সাক্ষাৎকার গ্রহণকালীন সাক্ষীর জবানবন্দির বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তা একটি মোটামুটি সিদ্ধান্ত উপনিত হবেন। সাক্ষীর বাহ্যিক আচরণ, বক্তব্যের খোলামেলা রূপ, আবেগীয় অবস্থা এবং জবানবন্দির বিষয়বস্তু ইত্যাদি হবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি। সন্দিগ্ধের আবাচনিক যোগাযোগ বা দেহভঙ্গি বিশ্লেষণ অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাই সাক্ষাৎকার পর্বে এসব বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

৯.১ বাহ্যিক আচরণ

ভড়কে যাওয়া, মুখ ম-লের লুকানোর ভঙ্গি, কিছু কিছু প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সাক্ষীর বিব্রত হওয়া ইত্যাদি বিষয় সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঈঙ্গিত দিয়ে থাকেন।

৯.২ খোলা মেলা ভাব

সাক্ষী তদন্তকারীর কাছে তার জানা ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিবেন। তিনি যেমন কোনো তথ্য গোপন করবেন না, তেমনি অপ্রাসঙ্গিক বা মিথ্যা তথ্যও দেবেন না।

৯.৩ মানসিক অবস্থা

কোনো প্রশ্নের উত্তরকালে সাক্ষীর বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া বা অস্বাভাবিক কোনো শারীরিক পরিবর্তন হলে তা অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে। অপ্রাসঙ্গিক ঈঙ্গিত বা অত্যধিক প্রতিবাদ করা ইত্যাদি থেকে সন্দিগ্ধের আংশিক সংশ্লিষ্টতা আঁচ করা যায়। তার বর্ণনা বা তথ্য দেওয়ার আবেগীয় পরিবর্তন থেকে কোনো বিষয়ে তার পূর্বসংস্কার, কোনো মানুষের প্রতি ঈর্ষা-বিদ্বেষ বা ক্ষোভ বোঝা যায়।

৯.৪ জবানবন্দীর বিষয়বস্তু

জবানবন্দিতে সাক্ষী যেসব তথ্য দিয়েছে তা ইতোমধ্যে সংগৃহীতি তথ্য কিংবা অন্যান্য সাক্ষী বা সন্দিগ্ধের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। এ ধরনের তুলনা থেকে সাক্ষীর দেওয়া তথ্যের ত্রুটি-বিচ্যূতি স্পষ্ট হবে।

৯.১০ সাক্ষাৎকারোত্তর চেকলিস্ট

সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা বিবেচনা করবেন, সাক্ষীর কাছ থেকে যে সব বিষয় জানার ছিল তার সব কিছুই তিনি পেয়েছেন কিনা। এমন কোন বিষয় কি বাদ পড়েছে, যা জানার ছিল অথচ জানা হয়নি? সুবিধার জন্য তদন্তকারী একটি চেকলিস্ট রেখে তার সঙ্গে সব কিছু মিলিয়ে দেখবেন।

লেখক : এআইজি (পিঅ্যান্ডআর-২)

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *