ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

আল আসাদ মো: মাজফুজুল ইসলাম

আগামীদিনের অর্থনীতি আসলে কেমন হবে? মানুষের কাজের ধরনই বা কেমন হবে? ‘কি করিলে কি হইবে’-ধরনের ধারণাপ্রসূত চিন্তা থেকে আমার কন্যাদ্বয়, যারা আমার কাছে রূপকথার মতো, তাদের বলি, মা তোমরা শার্লক হোমস হয়ে উঠো।

Gig Economoy ধেয়ে আসছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে। ঘরে সহায়তা করার মানুষ পাওয়া যাবেনা, এসি ফ্রিজ নষ্ট হয়ে গেলে লোক নেই ঠিক করার, গাড়ির চাকা বদলানোর জন্য হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে, অবসর সময়ে একাকী ঘরে, কিন্তু কথা বলার মানুষ নেই। সময়ের সঙ্গে এরকম পরিস্থিতিতে ধাতস্থ হতে হবে আমাদের সন্তানদের।

দেখুন শার্লক হোমস বা ম্যাকগাইভার কোনো কাজেরই কাজি ছিলেন না, কিন্তু যে কোনো পরিস্থিতিতে, যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেন নির্ভয়ে এবং কোথাও ঠেকে থাকেননি।

David Epstein এর বই ‘Why Generalists Triumph in a Specialized World’ এ থরে বিথরে উদাহরণ দিয়ে এরকম কিছু কথাই বলেছেন।

আগামীর অর্থনীতিতে টিকে থাকতে আমাদের সন্তানদের কিছু Life Saving Skill কে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে inbuilt করে দিতে হবে, এখনই-ধেয়ে আসা আগামীর জন্য :

এক. সুইমিং প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যাপীঠে অবশ্য-শিক্ষণীয় পাঠ হওয়া উচিত। জলবায়ুর নির্মম পরিবর্তন বা দুর্যোগ মোকাবিলায় এই জীবনমুখী দক্ষতা মানুষকে অধিকতর সাহসী ও উজ্জীবিত করে তুলবে।

দুই. ড্রাইভিং কলেজ লেভেলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক পাঠ করা বাঞ্চনীয়। বড় বড় অফিসার হয়ে নিজের জীবনের ভার একজন ড্রাইভারকে দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক-তা আলোচনার দাবি রাখে। উপমহাদেশের এই ড্রাইভার কালচার উন্নত বিশ্বে কতটুকু আছে সেটিও বিবেচ্য হওয়া উচিত।

তিন. কোডিং এখন আর কোনো বিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং মানবিকী ও বিজ্ঞানের সমন্বিত বিষয়। মাধ্যমিক পর্যায়েই এই বিষয়ে সকলের হাতেখড়ি অতীব জরুরি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে আগামীতে আমাদের নেতৃত্ব দিতে এখনই প্রস্তুতি দরকার। আমাদের যতসংখ্যক সম্মানিত কৃষক আছে, তারও অধিকসংখ্যক মানুষ হোক কোডিং ও কম্পিউটিং জানলেওয়ালা।

চার. গেমিং ও স্টোরিটেলিং-এর পাঠ স্কুলে স্কুলে থাকবে- এটি কোনো অলীক চিন্তা নয়। একসময়ের ভিডিও গেমস বা মাসুদ রানার গল্পগুলোই আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা। গেমিং ও স্টোরিটেলিং বাচ্চাদের করে তুলবে স্বাপ্নিক। নতুন নতুন অকল্পনীয় দুঃসাহসী সব ভাবনা নিয়ে চিন্তা করবে, যা সত্যি সত্যিই বাস্তবায়িত হবে অনাগত সময়ে-আমাদেরই সন্তানদের দ্বারা। হয়তো দেখা যাবে নীলফামারীর অজপাড়াগায়ের কোনো এক সন্তান ইলন মাস্কের মতোই ইন্টারপ্লানেটারিয়াম ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম চালাচ্ছে।

পাচ. ক্লিনিং একটি আবশ্যক পাঠ। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যচর্চা বিষয়গুলো প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সর্বক্ষেত্রের পাঠ হওয়া দরকার। সীমিত শক্তির এই ধরিত্রীর টেকসই এর জন্য 3R বা Recycle, Reuse and Reduce এর মাধ্যমে মিনিমাল জীবনাচরণের পাঠ তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক উভয় মাধ্যমে অন্তভুক্তি একান্ত আবশ্যক।

ছয়. একাকীত্বের শিক্ষা আগামীর এক অনিবার্য বিষয়। নিজের কাজ নিজেই করতে হবে, কোনো সহযোগী নয়, কোন মেইড নয়, একাই এসেছি, একাই যাব, একাই কাজ করে যাব, যেমনটি রবী ঠাকুর বলেছেন, ‘বিশ্ব যদি চলে যায় কাঁদিতে কাঁদিতে, একা আমি পরে রব নিজ কর্তব্য সাধিতে’- এরকম দুর্বার দুর্দমনীয় মানসিকতার পাঠ ক্লাসে কক্ষে ঘরে ঘরে দিতে হবে। পুতুপুতু লুতুপুতু করে গড়ে উঠা সন্তানদের আগামীর চ্যালেঞ্জিং পৃথিবীতে উপযোগিতা থাকবে কিনা- তা সময়ে বলে দেবে।

সাত. সেল্ফ ডিফেন্স ও এক্সার্সাইজের পাঠ ব্যক্তিমানুষের প্রাথমিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অতি আবশ্যক। পৃথিবীতে নতুন নতুন রোগ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ের উদ্ভব ঘটবে, এই যেমন ধরুন, কোভিড-এসব মোকাবিলার জন্য সেল্ফ ডিফেন্স ও এক্সার্সাইজ মানুষকে করতে পারে অদম্য।

আট. ল্যাংগুয়েজ লার্নিংবিশ্বায়িত পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে, এই সময়ে শুধু মাতৃভাষার শিক্ষণই যথেষ্ট নয়, ইংরেজির পাশাপাশি আরো একটি ভাষা হতে পারে সেটি ম্যান্ডারিন, ফ্রান্স, জাপানিজ কোরিয়ান বা আরবিশিক্ষণে জরুরি। ভাষা শিক্ষার সঠিক সময় বিশ^বিদ্যালয় পর্যায় নয়, বরং বিদ্যালয় পর্যায়।

নয়. কর্মময় এ এক অস্থির ধরণী। অস্থিরতার মধ্যেও দরকার স্বস্থিরতা। আইনস্টাইন সব সময় সঙ্গে একটি ছোট বক্স নিয়ে ঘুরতেন, যেটা প্যানডোরা’স বক্স নয়, সেটি ছিল পিয়ানো বক্স। তাই সব শিশু প্রাথমিক থেকেই ইচ্ছা আনুযায়ী এক একটি শখের চর্চার বিকাশ ঘটাতে পারে, যেমন হতে পারে ফটোগ্রাফি, পেইন্টিং, গান করা, একাকী ঘুরতে যাওয়া, নাচ করা-একান্তই নিজের জন্য। সবসময় অন্যের জন্য নয়, নিজের মতো করে নিজের জন্যও বাচতে হয়। মনে রাখা জরুরি প্রচলিত এই প্রবাদটি ‘Do what you love, and youÕll never work a day in your life.’

পাদটীকা

আজ থেকে ৩০ বছর আগেও শুনেছি, বাপ-দাদাদের কাছ থেকে, এই জেনারেশন শেষ, মূল্যবোধ বলে কিছুই নেই এদের!! এখনো অনেকের কাছে শুনছি বর্তমান প্রজন্ম নিয়ে, কি সব ছেলে-মেয়েরা বাবা, এদের দ্বারা কিছুই হবে না।… এ যেন কালের প্রবাদ বাক্য।

আমি রূপকথাই বিশ্বাসী। কন্যাদ্বয়ের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস। They are more than OK. Today they are preparing for the business of tomorrow. Yellow Heart!!! Gen X!!! LetÕs believe in miracle!

দুই :

ছোট ছোট ভালোবাসা

শ্যাসীকে বললাম, ‘লাভ ইন ওকিনাওয়া’ মুভিটা দেখেছ? না। আসলে আমিও দেখিনি। কিন্তু ওকিনাওয়ার প্রতি এক অসাধারন প্রেম আছে আমার। পৃথিবীর সেরা সুখী আর দীর্ঘজীবী মানুষেরা নাকি এখানে থাকে। কিন্তু কেন :

১. জীবনের মানে নাকি কি তারা আবিষ্কার করে ছোট ছোট কাজে। ‘IKIGAI’ জাপানিজ এই দর্শন হচ্ছে ছোট ছোট কাজে নিরন্তন ছুটে চলা। আইনস্টাইন পদার্থ বিজ্ঞানী না হলে, হতেন গায়ক, এবং মৃত্যুর আগমুহূর্তেও পিয়ানো বাজিয়ে গেছেন। ছোট পিয়ানোতেই হয়তো বড় সুখ পেতেন। বিল গেটস রাতে প্লেট ধোয়াতেই এখনো সুখ পান। জাপানিজ নাগরিকেরা ‘KAIZEN’ উপায়ে ছোট ছোট কাজে নিরন্তন ছুটে চলাতেই সুখ, শান্তি, সিদ্ধি ও সুদীর্ঘ জীবন পায়। ‘IKIGAI: The Secret to a Long and Happy Life’ বইয়ে এরকম ছোট ছোট অনেক ভালোবাসার কথায় ভরপুর জীবনের কথা বলা আছে।

২. কখনো কি গাছ, মাছ, পাখি ও পতঙ্গ এর সঙ্গে কথা বলেছি, কান পেতে কি শুনেছি। নৈশব্দে ঝি ঝি পোকার গান, অন্ধকারে জোনাকির আয়োজন, মাছরাঙা বা বকের ধ্যান, বটের শিকড়, বৈদিক আগুন, পারিজাত কুসুম, রাঙাবালিয়ার সন্দিগ্ধপুকুর, মৌপিপাসার নদ, নীল কৈবর্ত্য, ভাঁটফুল বা জলাজ্ঞীর খাল। Neil Pasricha এর বই The Book of Awesome এ ক্ষণে অনুক্ষনে পরতে পরতে 1000awesome things এর উদাহরণ দিয়েছেন। নগরায়িত বুর্জ দুবাইয়ের কৃত্রিম ফায়ারপ্লেসের চেয়েও গ্রামবাংলার অকৃত্রিম খড়ের আগুনের আলোয় যে জীবন, তা অধিকতর আলোকময় হতে পারে।

৩. হুগো, বস, ক্যালভিন কেইনের ৫০ আইটেমের পোশাক না থাকলেও, জামাহীন ছোট বেলার গনিমিয়া শুধু সুখী মানুষই নন, ধরিত্রী রক্ষার এক নির্ভীক সৈনিকও বটে। ছোট ছোট জীবনাচরণ শুধু আপনাকেই সুখের সাগরে ভাসাবে না, বাঁচাবে ধরত্রীকেও। 6R (Recycle, Reduce, Repair, Refill, Retrofit, Recalibrate) জীবন, প্রকৃতি ও পৃথিবীর জন্য খুবই দরকার। দামি ব্রান্ডের অধিক জিনিস দিয়ে সময় নিয়ে সাজবেন, নাকি সূর্যের হাসিতে আপনিও হাসবেন, সেটি আপনার বিষয়, কিন্ত মৃন্ময়ী মৃত্তিকার ক্ষতি করবেন না। গার্মেন্টস ও জুতার কারখানা থেকে পৃথিবীর ৮% গ্রিনহাউজ গ্যাস বের হচ্ছে। প্রয়োজনের অধিক যাই কিনেন না, এই পৃথিবী আমাদের কাছ থেকে এর পাই পাই হিসাব নেবে। গড়ে একজন মানুষ ২৫ পাউন্ড কাপড় ব্যবহার করে, যার জন্য প্রায় ১৫০০ কিমি গাড়ি ব্যবহার করার মতো গ্যাস বের করে। টেকসই পৃথিবীর জন্য মিনিমালিস্ট গনিমিয়া হবেন নাকি হুট করে এসে লুট করে চেটেপুটে সব খেয়ে যাবেন, সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার।

৪. অন্ধকার থেকে আলোর যাত্রাই জীবন যাত্রা। জীবনের নিবির নিলয়ের জন্য পুলিশ, প্রশাসক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে, তা নয়। কালের এই ক্ষণিকালয়ে ফটোগ্রাফি, মাউন্টেনিয়ারিং, স্কেটিং, বার্ডিং, সাইক্লিং, সুইমিং, প্লাম্বিং, হাইকিং, ক্লিনিং, ভ্লগিং, ব্লগিং সহ নানাবিধ ছোট ছোট কাজ করেও শান্তি পাওয়া যেতে পারে।

৫. তাহলে জীবিকার কি হবে? দুমুঠো অন্য জুটবে কীভাবে? দুটো মোটা কাপড়ের সংস্থান হবে কি? অবশ্যই হবে। মহান স্রষ্টা হিউমান প্লানেটের সবার জন্যই আয়োজন রেখেছেন, কিন্তু শয়তান সর্বদাই আমাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, কি হবে কি না হবে- এসব ভয় দেখায়। গান্ধীজীর কথাটি হয়তো গনিমিয়া তার জীবনাচরণে ধাতস্থ করেছেন “The World has enough for everyone’s needs, but not ceveryone’s greed”

৬. এই লেখাটি অস্থির সময়ের অশান্ত মনের অতিরিক্ত কর্মমুখর পৃথিবীর বিপরীতে একটি কাউন্টার ন্যারেটিভ। কর্মহীনতা নয়, বরং ছোট ছোট সব কাজেই ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া। ছোট ছোট ভালোবাসাই গড়ে উঠে প্রশান্ত আত্মার সুদীর্ঘ মহৎ জীবন।

আমার বন্ধু শ্যাসীকে নিয়ে নিভৃত কোনো এক পাড়াগাঁয়ে নদীর পারে জ্যোস্নাত রাতে বসে শব্দহীন কথামালার ফুলঝুরিতে অজস্র নির্ঘুমরাত কাটিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখি।

শ্যাসীকে এই স্বপ্নের কথা বলতেই, বললো, চল পালাই, আবার অরণ্যে, কোনো এক দারুচিনি দ্বীপে।

লেখক : পুলিশ সুপার, র‌্যাব-৬, খুলনা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *