ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

জহিরুল হক শামীম

পদ্মা সেতু আজ আর স্বপ্ন নয়। বাস্তব। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ। তিনি পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট সপরিবারে শাহাদাত বরণ করায় সেই সেতু তিনি দেখে যেতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের জুন মাসে জনগণের রায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে যমুনার ওপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ দ্রুত গতিতে শেষ করে ১৯৯৮ সালের জুন মাসে উদ্বোধন করেন। নিজ কন্যার হাতেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়।

দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার জনগণের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দাবি ছিল পদ্মা সেতুর। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেন। ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে বিশেষজ্ঞ দল দ্বারা সেতুর সম্ভাব্যতা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি করান। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু নির্মাণে বাস্তব ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় সেতুর নকশা তৈরি করলেও। নির্মাণ কাজ শুরু করতে সক্ষম হয়নি।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয় লাভ করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইস্তেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। সরকার গঠন করেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেন। তিনি ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে পদ্মা সেতুতে রেলপথ সংযোজনের নির্দেশনা দেন। তাঁর নির্দেশ মতো সেতুর নতুন ডিজাইন করা হয়। ওপরে মোটরযান সড়ক এবং নিচে রেলপথ অর্থাৎ দোতলা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। ওপরে চার লেনের মোটরযান সড়ক এবং নিচে রেলপথের ব্যবস্থা রেখে নকশা তৈরি হয়।

সেতুর নকশা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও সময়ক্ষেপণের জন্য সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের প্রাক্কলনও বৃদ্ধি পায়। ২০১১ সালে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে এ ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে মূল সেতু, নদীশাসন, জমি অধিগ্রহণ, দুই পারে সংযোগ সড়ক নির্মাণ, পুনর্বাসন, কর্মীদের বেতন সব মিলিয়ে তৃতীয়বারের মতো পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। প্রকল্পে ৪০০০ কর্মী কাজ করছে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে মার্কিন ডলার ও টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৮.৬৫ টাকা। অর্থাৎ এক মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল ৬৮.৬৫ টাকা। ২০১৮ সালে এ হার হয় ৮৪.৮০ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি পেলে প্রকল্প ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। কাজেই ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে এ কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত না করাই শ্রেয়। প্রয়োজনেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাই বাস্তবতা।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত উন্নয়ন সহযোগী ও দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীরা বুঝতে পেরেছে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে এসে ভুল করেছে। এখন উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। মেট্রোরেল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে জাপান। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ সরকার, বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলীদের মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। বর্তমানে দেশে ১০-১২টি মেগা প্রকল্প চলছে যার পথিকৃৎ পদ্মা সেতু প্রকল্প।

গর্বের পদ্মা সেতু আজ খড়স্রোতা পদ্মার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাহসী সিদ্ধান্ত তাঁকে একজন আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক

স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই সেতুর জন্য প্রধানমন্ত্রী, তাঁর পরিবারের সদস্য, অভিযুক্ত মন্ত্রী, সচিবসহ উপদেষ্টারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা ইতিহাসে অমর অক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।

ষড়যন্ত্রের কবলে পদ্মা সেতু

আতুর ঘরেই পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি বাতিল করে। এ সময় ষড়যন্ত্রের নতুন নতুন ডাল-পালা মেলতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি জাইকা, এডিবিসহ দাতাসংস্থাগুলোও সরে দাঁড়ায়। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সচিবসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। অথচ মন্ত্রীসহ কারোর বিরুদ্ধেই কোনও অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। পরে কানাডার এক আদালতে মামলা হয়। বিশ্বব্যাংক সেখানেও কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। মূলতঃ এসব করা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের ইমেজকে কলঙ্কিত করতে। বিএনপিসহ দেশের সুশীল সমাজ সরকারের সমালোচনায় মেতে ওঠে। ২০১২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির জন্য বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। বিএনপির নেতারাসহ অনেক বিশিষ্ট (!) ব্যক্তিবর্গ সরকারের সমালোচনা করে। আসল কথা হলো ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৫ বছরে পদ্মা সেতুর কাজ এতটুকুও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। বরং সে সময় দুর্নীতির অভিযোগে যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতের ৬টি প্রকল্প থেকে বিশ^ব্যাংক অর্থ প্রত্যাহার করে নেয়।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বিশ্বব্যাংক এ অভিযোগ এনেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। সবাই জানে, বিশ্বব্যাংক শুধু অর্থনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে না। বিশ্বব্যাংক সর্বদা পুঁজিবাদী দেশের মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। সরকারবিরোধী দুটি রাজনৈতিক দল সরকারকে বহির্বিশ্বে বিতর্কিত ও অপ্রিয় করার জন্য আমেরিকা ও ব্রিটেনে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল বলে অভিযোগ উঠে। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেরও বিরোধিতা করেছিল।

বিতর্ক ও গুজব

ষড়যন্ত্রকারীরা পদ্মা সেতু নির্মাণ বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সেতু সম্বন্ধে নানা রকম মিথ্যা, ভিত্তিহীন তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। পদ্ম সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে এ গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেককে ছেলে ধরার অভিযোগ দিয়ে আহত-নিহত করা হয়েছে। ঢাকার বাড্ডায় গৃহবধু তাসলিমা স্কুল থেকে মেয়েকে আনার জন্য গেলে তাকে ছেলে ধরার অভিযোগ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অপহরণকারী ধারণা করে অনেক মানসিক ভারসাম্যহীনকে মারধর ও পুলিশে হস্তান্তর করার ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনাকে গুজব ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে ৯ জুলাই ২০১৯ তারিখে সেতু নির্মাণ কর্তৃপক্ষকে গণমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞপ্তি পাঠাতে হয়।

বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্রের শুরু

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের দরপত্রে প্রাক্-যোগ্যতার ক্ষেত্রে অংশ নিয়েছিল ১১ প্রতিষ্ঠান। ২০১০ সালের ২০ জুলাই প্রাক্-যোগ্য বিবেচনায় পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তালিকা বিশ্বব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছিল সেতু বিভাগ। অনুমোদন না দিয়ে বিশ্বব্যাংক তিন মাস পর আবার প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ের পরামর্শ দেয়।

দ্বিতীয় দফা প্রাক-যোগ্যতার জন্য আবেদন আহ্বান করা দরপত্রে অংশ নেয় ১০টি প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় দফায়ও প্রথমবারে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ করা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই যোগ্য বিবেচিত হয়। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ওই তালিকা বিশ্বব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক একই বছরের ২৯ মার্চ বিশেষজ্ঞদের যাচাই-বাছাইয়ে অযোগ্য বিবেচিত চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি-সিআরসিসিকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করার সুপারিশ করে।

কাগজপত্র পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা যায় না উল্লেখ করে ২০১১ সালের ৩০ মার্চ প্রতিবেদন দাখিল করে সেতু বিভাগ। ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বিশ্বব্যাংক মনোনীত প্রতিষ্ঠানের রেকিং পাইলের অভিজ্ঞতার প্রমাণপত্র পর্যালোচনায় দেখতে পায়, অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ করা সেতুর ছবি পরিবর্তন করে সিআরসিসি নিজের নামে জমা দিয়েছে।

২০১১ সালের ৭ মে ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সিআরসিসি মিথ্যা তথ্য দাখিল করেছে। এ অবস্থায় ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের ইকোনমিক কাউন্সেলরকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অফিসে ডেকে নিয়ে সিআরসিসির চিঠি দেখানো হলে তিনি জানান, চিঠিতে উল্লিখিত স্বাক্ষর চীনা ভাষায় নকল করা। ২০১১ সালের ৯ মে বিশ্ব ব্যাংকের সুপারিশকৃত সিআরসিসি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে মূল সেতুর প্রস্তাব প্রত্যাহার করে।

এর পরপর-ই অর্থাৎ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ, কানাডার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এসএনসি লেভালিন (SNC Lavalin) কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের মন্ত্রী, সেতু সচিব, সেতু প্রকল্পের পিডি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছে। তারা জোর দাবি করে তাদের কাছে দুর্নীতির যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে।

বিশ্বব্যাংকের চাপ

বিশ্বব্যাংক তাদের ভাষায় কথিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি  দমন কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিতে থাকে। তারা মন্ত্রী, সচিব, পিডি ও অন্যদের সেতুর কাজ থেকে অব্যাহতিও চান। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে বিশেষ প্রতিনিধি দল পাঠায় সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা সরেজমিনে দেখার জন্য। তারা দুদকের সঙ্গে সভা করে। ২০১৭ সালে বিশ^ব্যাংক আন্তর্জাতিক আদালতের সাবেক প্রসিকিউটর আর্জেন্টিনার আইনজীবী লুইস গেব্রিয়েল মরেনো ওকামপোকে বাংলাদেশে পাঠায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা দেখার জন্য। এভাবে বিশ্বব্যাংক অনৈতিক কাজ ও বাড়াবাড়ি করেই যাচ্ছিল। শেখ হাসিনার সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিল।

বিশ্বব্যাংকের অব্যাহত চাপ, মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের কিছু লোকের বক্তৃতা-বিবৃতি এবং কোনো কোনো গবেষণা সংস্থার কর্মকর্তাদের কথায় এমন আবহ তৈরি করা হয়েছিল যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে সত্যি সত্যি দুর্নীতি হয়েছে। সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে মনে হবে সরকার দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে চাচ্ছে। বাধ্য হয়ে সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের স্বার্থে প্রমাণ ছাড়াই কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। মন্ত্রী জনাব আবুল হোসেনকে ইস্তফা দিতে বললে তিনি ইস্তফা দেন। সচিব মোশারফ হোসেন ভুঁইয়াকে বদলি করা হয়। প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান টিম গঠন করে। পরে সাতজনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হয়। সেই মামলায় সচিব মোশারফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি জেলও খাটেন। তাদের একটার পর একটা আবদার রক্ষার চেষ্টা করেও বিশ্বব্যাংককে ফেরানো যায়নি পদ্মায়। এরপর জানা যায়, বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে ড. ইউনূসকে সরিয়ে দেয়ায় অর্থায়ন থেকে সরে যায় বিশ্বব্যাংক। সে সময় পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতি নিয়ে বেশ সরব হয়ে ওঠে দেশের শীর্ষ দুটি গণমাধ্যম।

বাংলাদেশ সরকার এত সব ব্যবস্থা নিলেও বিশ্বব্যাংক সন্তুষ্ট হয়নি। তারা ২০১২ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ঋণচুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। বিশ্বব্যাংককে অনুসরণ করে জাইকা, এডিবি ও আইডিবি ঋণচুক্তি বাতিল করে। বিশ্বব্যাংক SNC LAVALIN কে ১০ বছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাজে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। উপরন্তু, কানাডার একটি আদালত SNC LAVALIN এর দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে মামলা করা হয়।

মাথা নত করবে না বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: প্রধানমন্ত্রী

বিশ্বব্যাংক সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সাহস সম্বন্ধে আঁচ করতে পারেনি। শেখ হাসিনা কারও কাছে মাথা নত করার ব্যক্তি নন। তাঁর ধমনীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত প্রবাহিত। বিশ্বব্যাংক বুঝতে ভুল করেছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। তার কন্যা সেই কথা প্রমাণ করেছেন।

নানা অভিযোগ ষড়যন্ত্র চাপ উপেক্ষা করে ২০১২-এর ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ জুলাই ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হবে। তখন নির্মাণ ব্যয়ের প্রাক্কলন ছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা। ওই টাকা কীভাবে আসবে তার রুপরেখাও তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা সংস্থার ঋণচুক্তি বাতিলের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে তাদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেই এবং আমরা তা সুদে আসলে ফেরত দিই। আমরা তাদের কাছে ভিক্ষা চাই না। বাংলাদেশ যাতে দরিদ্র থাকে সে লক্ষ্যে তারা নানা রকম পরামর্শ দেয়।

কৃষিতে ভর্তুকি দিতে নিষেধ করে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিতে নিষেধ করে। তাদের পরামর্শ মোতাবেক কাজ করলে দেশ কখনো অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দেন পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নেই নির্মিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দেন, প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নেই হবে পদ্মা সেতু। তিনি এও বলেন, কোনও দুর্নীতি করা হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেকথা কেউ কানে তুলেনি। বারবার দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করার পরও বিদেশি কিছু এজেন্ট ও বিএনপি মানুষকে ভুল বোঝাতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগের সামনে মাথা নত করবে না বাংলাদেশ।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী একজন বাংলাদেশি বিশ্বব্যাংককে ঋণ সহায়তা প্রদানে বাধা দেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পদ্মা সেতুতে টাকা দিতে বিশ্বব্যাংক সব সময় রাজি ছিল। বিশ্বব্যাংক যেন টাকা না দেয়, সে জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে সংস্থাটিকে চাপ দিয়েছিলেন। বহির্বিশ্বে সরকারের বিরুদ্ধে তিনি অনবরত অভিযোগ করে যাওয়ায় অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৫-এর ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। যখন সরকার নিজম্ব অর্থায়নে কাজ শুরু করে দিল, তখন বিশ্বব্যাংক বলে, এত বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অর্থ প্রত্যাহার উচিত কাজ হয়নি। সেতুটি হচ্ছে বাংলাদেশের স্টিল লাইফ লাইন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে মোনাজাত করছেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষের দিকে ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়ায় সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১২ সালের ২৫ জুলাই লন্ডনে এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, যখন (পদ্মা সেতুতে) পরামর্শ নিয়োগের বিষয় এলো, তখন একটা কোম্পানির জন্য তারা (বিশ্বব্যাংক) বার বার চাপ দিচ্ছিল সরকারকে এবং যোগাযোগমন্ত্রীকে। যেন ওই কোম্পানিকে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হয়। এখন যদি আমি প্রশ্ন করি, বিশ্বব্যাংক কত পার্সেন্ট টাকা খেয়ে ওই কোম্পানির জন্য তদবির করেছে?

টেন্ডার আহ্বান

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে Pre-qualification টেন্ডার আহ্বান করে। পরিকল্পনা ছিল ২০১১ সালের প্রথম দিকে সেতুর কাজ শুরু হবে এবং ২০১৩ সালের মধ্যে মূল সেতুর কাজ শেষ হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের অভিযোগে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। চায়না BOT (Build own transfer)  ভিত্তিতে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সরকার সেদিকে যায়নি। আন্তর্জাতিক টেন্ডারে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড কাজ পায়। ১৭ জুন ২০১৪ তারিখে সেতু কর্তৃপক্ষ চায়না ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ার কোম্পানিকে সেতু নির্মাণের জন্য ঠিকাদার হিসাবে নির্বাচন করে। তারা ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে কাজ শুরু করে। সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয় ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টম্বর। সর্বশেষ স্প্যান অর্থাৎ ৪১তম স্প্যান বসে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর।

বিশ্ব ব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ কানাডার আদালতে খারিজ

যে দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা ঋণ বাতিল করেছিল বিশ্বব্যাংক, সেই দুর্নীতির মামলাকে ‘অনুমানভিত্তিক’ বলে উল্লেখ করেছে কানাডার একটি আদালত। কানাডার সংবাদমাধ্যম টরোন্টো স্টার সূত্রে এই তথ্য জানা যায়।

পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাংকের সব উন্নয়ন প্রকল্পে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকেও মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ওই রায়ে এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ ও বাংলাদেশ-কানাডার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ব্যবসায়ী জুলফিকার ভূইয়া এই মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে পাঁচ কোটি ডলারের কাজ পেতে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা ২০১০ ও ২০১১ সালে বাংলাদেশের সেতু কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রমাণ হিসেবে ফোনে আড়ি পাতা তথ্য (অয়্যার ট্যাপস) ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ২০১১ সালে তিনটি আবেদন করে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি)। অন্য এক আদালত ওই অনুমতি দিয়েছিল।

তবে কানাডার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ইয়ান নরডেইমার ওই অনুমতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। প্রথম এবং তৃতীয় আড়িপাতা তথ্য আদালত আগেই খারিজ করে দেন। দ্বিতীয় আড়িপাতা তথ্যের মধ্যে যেসব তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলোকে বিচারক ‘অনুমানভিত্তিক ও গুজব’ বলে উল্লেখ করেন।

আদালতের রায়ে বিচারক ইয়ান নরডেইমার জানান, আদালতে ওই গুজব বা অনুমানকে সমর্থন করার মতো কোনও তথ্য-প্রমাণ হাজির করা হয়নি। বরং যেসব তথ্য-প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাও ‘ধারণা নির্ভর’। নরডেইমার আরও বলেন, ‘আমার মতে, যেসব আড়িপাতা তথ্য সুপ্রিম কোর্টে হাজির করা হয়েছে, তা হাস্যকর। আর এর ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘কানাডার একটি আদালত পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের হওয়া মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন। এর মধ্যে দিয়ে ফের প্রমাণিত হলো যে দুর্নীতির কথা বলা হয়েছিলো, তা কেবলই গালগল্প ও গুজব ছিল।’

আদালতের রায়

কানাডায় দায়ের করা ওই মামলার প্রমাণ হিসেবে রয়্যাল কানাডীয় মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) অভিযুক্ত ব্যক্তিদের টেলিফোনে আড়ি পাতার রেকর্ড আদালতে জমা দিয়েছিল। কানাডার টরন্টো স্টার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে বলা হয়েছে, কানাডার আদালত আদেশ দেওয়ার সময় টেলিফোনে আড়ি পেতে পাওয়া যেসব প্রমাণ দাখিল করা হয়েছিল, সেগুলো নাকচ করে দেন আদালত। সেই সঙ্গে এভাবে প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত কার্যক্রমের সমালোচনা করা হয়। কানাডার সুপিরিয়র কোর্টের বিচারক ইয়ান নর্দেইমার এ রায় দেন। টরন্টো স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী রায়ের আদেশে বিচারক লেখেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা জল্পনা, গুজব আর জনশ্রুতি ছাড়া কিছুই না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক অভ্যন্তরীণ চারজন গোপন সংবাদদাতার খবরের ভিত্তিতে এই অভিযোগ এনেছে বলে আদালতে জমা দেওয়া আবেদনে আরসিএমপি উল্লেখ করেছে। এই চারজনের মধ্যে মূলত আরসিএমপি একজনের বক্তব্যকেই আমলে নিয়েছে। বাকি তিনজনের সঙ্গে তারা কখনো কথাও বলেনি, এমনকি কোনো ধরনের তদন্তও করেনি। আর এই একজনের সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলেছে। আদালতের ভাষ্য, উপস্থাপিত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সব না হলেও অধিকাংশ তথ্যই ‘২ নম্বর তথ্যদাতা’র কাছ থেকে সংগৃহীত। কিন্তু পুলিশ কখনোই এই তথ্যদাতাদের সঙ্গে কথা বলেনি কিংবা তাঁদের ব্যাপারে খোঁজখবর করেনি। আবার ২ নম্বর তথ্যদাতা আসলে এই প্রকল্পের একজন ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ। তিনি নিজেও পদ্মা সেতু প্রকল্পের উল্লিখিত কাজের দরপত্রে অংশ নিয়েছিলেন এবং কাজ পাওয়ার জন্য দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন।

টরন্টো স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাডার ওই আদালতের রায়ে আরসিএমপির তদন্ত কার্যক্রমে এভাবে আড়ি পেতে ব্যক্তিগত আলাপন রেকর্ডটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার সমালোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া আরসিএমপি কর্তৃপক্ষ আদালতে বলেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ পেতে কেভিন ওয়ালেসসহ তিনজন দুবাইয়ে বৈঠক করেছেন এবং তাঁরা কানাডার পিয়ারসন বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফিরেছেন। কিন্তু কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ) বলেছে, ওই সময় কেভিন ওয়ালেস দুবাই যাননি। কানাডার আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রমাণ হলো, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি।

আর্থ সামাজিক উন্নয়ন

পদ্মা বহুমুখী সেতু শুধু যোগাযোগ নেটওয়ার্ক-এ বিপ্লব ঘটাবে না এ সেতু সতেরো কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষ অল্প সময় ব্যয় করে সহজে রাজধানী শহর ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে পারবে। তাদের সময় বাঁচবে, কষ্টের লাঘব হবে, জীবন সহজ হবে। শরীয়তপুরের জাজিরা এবং মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার লোকজন ইচ্ছা করলে প্রতিদিন ঢাকায় এসে অফিস বা অন্য কাজ করে বাড়িতে ফিরতে পারবে।

ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ না

থাকায় ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত শরীয়তপুর লোকজন ঢাকায় আসতে অনেক কষ্ট করতে হতো। দুঘণ্টা হেঁটে সুরেশ্বরের ওয়াপদা ঘাটে এসে লঞ্চ ধরতে হতো। একতলা ছোট লঞ্চ। সেই লঞ্চেই পদ্মা পাড়ি দিতে হতো। পদ্মার প্রচ- ঢেউয়ের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা আসতে হতো। সারা দিন চলে যেত। সদরঘাটে আবার কুলি ও টাউটের খপ্পরে পড়ে হয়রানির ও প্রতারণার শিকার হতে হতো। মাদারীপুরের অধিবাসীদেরও ঢাকা আসতে অনেক কষ্ট করতে হতো।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উৎপাদিত কৃষি ও শিল্পজাত পণ্য সহজে ও দ্রুত সময়ে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে। এ অঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার যাবে। ফলে নতুন নতুন শিল্প কারখানা তৈরি হবে। বাণিজ্য কেন্দ্র বৃদ্ধি পাবে। মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। মোংলা বন্দর ও পায়রা বন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হবে। বন্দরকেন্দ্রিক শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্র তৈরি হবে। অর্থনীতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। দেশের জিডিপি ১.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বিশাল এবং প্রমত্তা নদীগুলোর একটি পদ্মার দুই তীরকে সেতু দিয়ে বাঁধতে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় প্রকৌশলীদের:

১. পদ্মা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বিশাল এবং প্রমত্তা নদীগুলোর একটি। এই নদীর যে জায়গায় সেতুটি নির্মিত হয়, সেখানে নদী প্রায় ছয় কিলোমিটার প্রশস্ত। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হয় ছয় দশমিক পনের কিলোমিটার। এটি দক্ষিণ এশিয়ার কোন নদীর ওপর নির্মিত দীর্ঘতম সেতু।

২. পদ্মা সেতু শুধু মাত্র সড়ক সেতু নয়। একই সঙ্গে এই সেতুর ওপর দিয়ে যাবে ট্রেন। এছাড়াও যাবে গ্যাস পাইপ লাইন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। দুই তলা ব্রীজের ওপর দিয়ে যাবে গাড়ী, আর সেতুর নীচের লেভেলে থাকবে ট্রেন লাইন।

৩. বর্ষাকালে পদ্মা নদীতে স্রোতের বেগ এত বেশি থাকে যে, সেতুর নকশা করার সময় প্রকৌশলীদের কাছে এটি এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে গঙ্গা, আরেকদিকে ব্রহ্মপুত্র- দক্ষিণ এশিয়ার এই দুটি বিশাল এবং দীর্ঘ নদীর অববাহিকার পানি এই পদ্মা দিয়েই বঙ্গোপসাগরে নামছে। উজান থেকে নেমে আসা এই স্রোতের ধাক্কা সামলাতে হবে ব্রীজটিকে। সেই সঙ্গে নদীর দুই তীরে নদীশাসনে প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়।

৪. বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পলি বহন করে এই দুই নদী। বলা যেতে পারে এই দুই নদীর পলি জমেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের অনেকখানি অঞ্চল। এই সেতুর নকশা করার ক্ষেত্রে এই নদী বাহিত পলির বিষয়টিকে বিবেচনায় নিতে হয়েছে প্রকৌশলীদের।

৫. পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে এমন এক অঞ্চলে যেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকিও আছে। এ নিয়ে সেতুর নকশা তৈরির আগে বিস্তর সমীক্ষা করা হয়েছে। কিছু সমীক্ষা করেছে বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। সেতুর নকশাটিকে এজন্যে ভূমিকম্প সহনীয় করতে হয়েছে।

৬. পদ্মা সেতুর ভিত্তির জন্য পাইলিং এর কাজ করতে হয়েছে নদীর অনেক গভীরে। বিশ্বে কোন নদীর এতটা গভীরে গিয়ে সেতুর জন্য পাইলিং এর নজির খুব কম। প্রকৌশলীদের জন্য এটাও এক বড় চ্যালেঞ্জ।

৭. এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প। এতে ব্যায় হবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।

পানি প্রবাহ ও ইলিশ

দেশের মানুষের নিজস্ব অর্থায়নে উদ্বোধনের প্রস্তুতিতে থাকা পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সামনে ছিল যমুনার ওপর থাকা বঙ্গবন্ধু সেতুর অভিজ্ঞতা। যমুনা সেতুর দৈর্ঘ্য সাড়ে ৪ কিলোমিটার হলেও এতে রয়েছে ৫০টি পিলার। এই পিলারগুলো সেতুটিকে পোক্ত করলেও নদীর ওপর পড়েছে এর বিরূপ প্রভাব। বিশেষত বর্ষা মৌসুমে এর স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে সেতু এলাকায় পড়েছে একের পর এক চর।

পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা পর্যায় থেকে শুরু করে পুরো নির্মাণকাল ইলিশ মাছের বিষয়টি বিশেষভাবে মাথায় রাখা হয়েছে। ইলিশ যেন পদ্মাবিমুখ না হয়, সে জন্য ছিল সর্বোচ্চ সতর্কতা। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী একক ফসল হিসেবে ইলিশ থেকেই আসে মোট দেশজ উৎপাদনের ১ শতাংশ। ফলে স্বাদ তো বটেই, অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করেও ইলিশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পানিপ্রবাহ সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রায় নির্বাধ রাখার চেষ্টা এ কারণেও করা হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক স্রোতকে যতটা সম্ভব অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

পদ্মা সেতুতে যে কারণে ৪২ পিলার বসানো হয়েছে

পদ্মা সেতু নির্মাণে কেবলমাত্র যোগাযোগের বিষয়টি মাথায় রাখা হয়নি, সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়েছে আরও অনেক কিছু। এসবের মধ্যে ছিল-প্রমত্তা পদ্মার স্রোতকে যথাসম্ভব বাধাগ্রস্ত না করা, সেতু এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং বিশেষত ইলিশ মাছের অবাধ চলাচল। আর এই কারণেই এত দীর্ঘ একটি সেতুকে মাত্র ৪২টি পিলার বা পিয়ারের ওপর দাঁড় করাতে হয়েছে।

দেশের মানুষের নিজস্ব অর্থায়নে উদ্বোধনের প্রস্তুতিতে থাকা পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সামনে ছিল যমুনার ওপর থাকা বঙ্গবন্ধু সেতুর অভিজ্ঞতা। যমুনা সেতুর দৈর্ঘ্য সাড়ে ৪ কিলোমিটার হলেও এতে রয়েছে ৫০টি পিলার। এই পিলারগুলো সেতুটিকে পোক্ত করলেও নদীর ওপর পড়েছে এর বিরূপ প্রভাব। বিশেষত বর্ষা মৌসুমে এর স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে সেতু এলাকায় পড়েছে একের পর এক চর।

নদীর স্বাভাবিক স্রোতকে যতটা সম্ভব অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিষয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সাবেক প্রধান প্রয়াত অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলিত স্রোত পদ্মায় প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। এত পানির প্রবাহ দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর পর বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম। সেতুর বয়সকাল ১০০ বছর ধরা হলেও আরও দীর্ঘ সময় এটি টিকে থাকবে- এমনটাই প্রত্যাশা। সেতুর নিচে ভরা মৌসুমে ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রতি সেকেন্ডে প্রবাহিত হয়। এই প্রবাহ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই ছিল প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। আর সে কারণেই একেকটি পিলারের মাঝখানে গড়ে ১৫০ মিটার দূরত্ব রাখা হয়েছে।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর ভাষ্যমতে, যমুনা সেতুতে নদীর পানির প্রবাহ যতটা আটকে দেওয়া হয়েছে, পদ্মা সেতুতে প্রবাহ তার চেয়ে অনেক কম বাধাগ্রস্ত হবে। যমুনায় ভরা মৌসুমে নদী বিস্তৃত হতো ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত, যা আটকে দিয়ে সাড়ে ৪ কিলোমিটার সেতু দিয়ে বন্ধন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পদ্মার যে এলাকা দিয়ে সেতু তৈরি হচ্ছে, সেখানে ভরা মৌসুমে নদীর বিস্তৃতি ১০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। পানির প্রবাহ যাতে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে জন্য এই সেতু টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত।

বদলে যাবে অর্থনীতি

বাড়বে প্রবৃদ্ধি

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, দেশের জিডিপি বছরে ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় জিডিপি ২.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।

সেতুটি দেশের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে। ঢাকা থেকে খুলনা, মংলা, বরিশাল, কুয়াকাটা অর্থনৈতিক করিডোর খুলে যাবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হবে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুবিধা হবে।

নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক স্থাপনের ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে। পর্যটন শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হবে এবং মাওয়া ও জাজিরায় গড়ে উঠবে নতুন রিসোর্ট ও হোটেল, শপিংমল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। মংলা ও পায়রা বন্দর চালু থাকবে, যা ব্যবহার করতে পারবে কটি প্রতিবেশী দেশ।

২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী, পদ্মা নদীর যেখান দিয়ে প্রতিদিন ১২ হাজার যানবাহন চলাচল করে সেখানে সেতুটি চালু হলে যান চলাচল দ্বিগুণ হতে পারে এবং প্রতি বছর যানবাহনের সংখ্যা ৬-৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৬ হাজার যানবাহন চলাচল করবে। প্রতিদিন চলাচলের এই সংখ্যা বাড়তে পারে।

এটি রাজধানী এবং ২১টি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলার মধ্যে একটি সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে, যা এই জেলার ক্ষুদ্র অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি বিশাল উৎসাহ দেবে। এটি এমন কিছু জেলার সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করবে যেখানে বর্তমানে কোনো রেল যোগাযোগ নেই। এটি সেসব জায়গায় অর্থনৈতিক কর্মকা- তৈরি করবে, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ উন্মুক্ত করবে মানুষ ও দেশকে সাহায্য করবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ সেতু বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতিতে সরাসরি এর সুফল আসবে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি তিন ধরনের সুবিধা রয়েছে।

প্রথমত, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। এতে ওই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার লাভ করবে। বিনিয়োগ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সরাসরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে পারবেন। এতে পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত, এ সেতুর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার হবে। বিশেষ করে ভারতের বাণিজ্য বাড়াতে মোংলা বন্দর ব্যবহার করা যাবে।

পদ্মা সেতুটি চালু হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশ দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের সাথে যুক্ত হবে। এই সেতু যোগাযোগ, বাণিজ্য, শিল্প, পর্যটন এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। বিশেষত এটি ভুটান, ভারত এবং নেপালের সাথে বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য আরও দ্রুত সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা সেতু চালু হলে বার্ষিক জিডিপিতে এটি প্রায় ১.২ শতাংশ অবদান রাখবে, দারিদ্র্য হ্রাস করবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়াবে। এটি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগের দরজা খুলে দিবে এবং চট্রগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে সরাসরি বাংলাদেশের প্রধানতম স্থলবন্দর বেনাপোলের সাথে সংযুক্ত করবে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলটি দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ জুড়ে এবং এ অঞ্চলে বাংলাদেশের ১৬৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ রয়েছে। ২০১১ সালের এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সমীক্ষায় দেখা গেছে, মূলত দেশের অন্যান্য অংশের সাথে যোগাযোগের অভাবে এই অঞ্চলটি স্বল্পোন্নত রয়ে গেছে। এ অঞ্চলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় পাঁচ শতাংশ বেশি রয়েছে।

জাইকা, বিসিআইএম ও বিমসটেক

জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সমীক্ষায় দেখা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিলাগুলোর সাথে ঢাকার যাতায়াত সময় ১০ শতাংশ হ্রাস পেলে অর্থনৈতিক আয় ৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প মূল্যায়ণ দলিল অনুসারে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জিডিপির বার্ষিক বৃদ্ধি ১.৭ শতাংশ হবে এবং এতে করে জাতীয় জিডিপির বার্ষিক বৃদ্ধি হবে .০৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ বিবিআইএন মোটর যানবাহন চুক্তি, বিসিআইএম করিডোর এবং বিমসটেক জোটের মতো উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করে এবং দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সক্ষম পরিবেশ তৈরি করে। বাণিজ্য প্রসারের জন্য, বাংলাদেশকে ইউএন কাস্টমস কনভেনশন অব আন্তর্জাতিক ট্রান্সপোর্টাল গুডস অফ টিআইআর কারনেটস (টিআইআর কনভেনশন, ১৯৭৫) এর অধীনে যোগদান করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ টিআইআর কনভেনশনে যোগদান করেছে, পদ্মা সেতুর কাজ সমাপ্তির সাথে সাথে টিআইআর সিস্টেম দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকারকে সহায়তা করবে।

পরিবহন ও কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রত্যাশা

পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর পুরো অঞ্চল জুড়ে কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ব্যাপক পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে। সেতুর উদ্বোধন সামনে রেখে বছর খানেক থেকেই অনুযায়ী নানা ধরণের কাজ শুরু করেছিলেন কৃষির সাথে জড়িত কৃষক, ব্যবসায়ী ও খামারিরা। বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছেন পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা।

যশোর খুলনাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় উদ্যোক্তারা আগে থেকেই বিনিয়োগ বাড়িয়েছিলেন যাতে করে সেতু উদ্বোধনের পরপরই এর সুফল পাওয়া যায়। পদ্মা সেতুর এক প্রান্ত মাওয়া আর অপর প্রান্ত শরিয়তপুরের জাজিরা। শরিয়তপুর এই প্রথম ঢাকার সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ পাচ্ছে। এখানে সবার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রের মানুষ যে কোন ধরনের প্রয়োজনে ঢাকায় আসা যাওয়া করতে পারবে। এখানকার মাছ কখনো ঢাকার বাজারে যেতে পারেনি। অথচ হাজার হাজার টন মাছ উৎপন্ন হয় এখানে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন শরীয়তপুরের পরিবহন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৫ জুন থেকে সরাসরি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ রুটে বাস চলাচল শুরু হবে। ফলে নতুন বাস তৈরির ধুম পড়েছে পরিবহন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে।

ঢাকার বাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় শরীয়তপুরের কৃষিপণ্য

২৫ জুন পদ্মা সেতু চালু হলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ঢাকার বাজারে নিয়ে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারবেন, এমনটাই আশা করছেন শরীয়তপুরের কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, পদ্মা সেতু খুলে দিলে উৎপাদিত ফসল ঢাকার বিভিন্ন বাজারে সরাসরি বিক্রি করা যাবে। এতে যেমন ন্যায্যমূল্য নিয়ে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরবেন, তেমনি পণ্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

জানা যায়, শরীয়তপুরে পদ্মা-মেঘনা নদীবেষ্টিত মাটি বেশ উর্বর। ফসলের ফলন ভালো হয় এ জেলায়। এই অঞ্চলের কৃষিপণ্য ঢাকা থেকে পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যান। পাশাপাশি অনেকে বাজার ছাড়া ফড়িয়াদের কাছে তাদের পণ্য বিক্রি করে দেন। এতে যেমন তাদের পণ্যের দামও কম পাচ্ছে, তেমনই লোকসানে পড়তে হচ্ছে। ফড়িয়াদের হাত থেকে হয়রানি ও গ্রামে ক্রেতা কম থাকায় বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাজার হওয়ায় ক্রেতা কম, তাই দাম পান না কৃষকরা। ঢাকার খুব কাছাকাছি হয়েও পদ্মা নদী পারাপারের বিড়ম্বনার জন্য নিজেদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ঢাকার বাজারে নিতে পারেন না। স্থানীয় বাজারের ওপর ভরসা করে চাষাবাদ করতে হয় তাদের। কখনো ভালো দাম পান, আবার কখনো লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হয়। কেবল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এ অঞ্চলের কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতেন। পদ্মা সেতু চালু হলে এ অঞ্চলের কৃষকের ভাগ্য খুলে যাবে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী অথবা শ্যামবাজারে যেতে সময় লাগবে ঘণ্টা দেড়েক।

শরীয়তপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বছরে পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে ১৫ হাজার মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়। ২ হাজার হেক্টর জমিতে ৫৪ হাজার মেট্রিক টন আলু, ৩ হাজার ৩৬ হেক্টর জমিতে সাড়ে ৩৯ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ, ৩ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে ২৫ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন রসুন, ৬ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে ৯ হাজার ২১২ মেট্রিক টন মরিচ, ২৩০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ৫১০ মেট্রিক টন পেঁপে উৎপাদিত হয়। এসব পণ্য স্থানীয় হাটবাজারে খুচরা ক্রেতা ও ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করেন কৃষকরা। এ কারণে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

জেলার সেনেচর এলাকার কৃষক আব্দুল হাকিম সরদার বলেন, শীতকালীন সবজির জন্য এ অঞ্চল বিখ্যাত। এখান থেকে নদী পারাপার হওয়ার কারণে আমরা ঢাকার বাজারসহ কোনো বাজারি সময়মতো গিয়ে কৃষিপণ্য নিয়ে পৌঁছাতে পারতাম না। তাই স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হতো। পদ্মা সেতু খুলে দিলে আমরা গাড়ি ভাড়া করে সবজি ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে পারব। এ ছাড়া ঢাকা থেকে সবজি ক্রেতারাও এখানে এসে কিনতে পারবে।

ভেদরগঞ্জের কাচিকাটা ইউনিয়নের

কৃষক সাব্বির হোসেন বলেন, এখানকার চরগুলো আলু উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। জেলায় আলু রাখার মতো কোনো হিমাগার নেই। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে আমরা ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ অথবা অন্য কোথাও হিমাগারে আলু রাখতে পারব। এ ছাড়া আগে আলু ঢাকা পাঠাতে হলে ফেরি করে নদী পার হতে অনেক সময় লাগত। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। এতে

কৃষকদের লাভ বেড়ে যাবে।

গত বছর ১৩ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হলেও এবার হয়েছে ২১ হাজার ৬৮২ হেক্টর জমিতে। দিন দিন তরমুজ চাষে কৃষকরা ঝুঁকছেন। এতে তারা সচ্ছলতা ফেরাচ্ছেন। কিন্তু ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।

কৃষকদের কাছ থেকে পাইকাররা সরাসরি তরমুজ সংগ্রহ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু পদ্মার ফেরি জটিলতার কারণে সময় বেশি লাগছে। এতে পাইকাররা কৃষকদের তরমুজের সঠিক দাম দিচ্ছেন না। এখন পদ্মা সেতু চালু হলে যেমন কৃষকরা বেশি লাভবান হবেন, তেমনি ব্যবসায়ীদেরও মুনাফা বেশি হবে। আবার চাইলে কৃষকরা নিজেরাই তরমুজ নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে পারবেন।

দিনমজুর ইব্রাহিম বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য আরও ভালোভাবে হবে। আমাদের এই এলাকার মানুষ বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবে। বিশেষ করে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আগে তো আমাদের এই অঞ্চল ছিল অবহেলিত। আস্তে আস্তে সবকিছুই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহর এখন আর আমাদের কাছে দূরে মনে হবে না। সকালবেলা ঢাকা গেলে বিকেলের মধ্যে কাজ শেষ করে বাসায় আসতে পারব।

‘অপেক্ষা’র চির অবসান

৪০ বছর ধরে গাড়ি চালাই। দিনের পর দিন এই ঘাটে বসে থাকি, রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি; তীব্র শীতের মধ্যেও অপেক্ষা করি। কখনো ৪/৫ ঘন্টার আগে ঘাট পার হতে পারি না। আজ রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঘাটে এসেছি। দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে, এখনো ফেরির সিরিয়াল পাইনি। নিজের বয়সের প্রায় অর্ধেক সময় ঘাটেই কেটে গেছে অপেক্ষায়।

অপেক্ষা। পদ্মা নদীর ওপারের মানুষের কাছে শত বছরের বড় আক্ষেপের নাম কিংবা বড় দুঃখের নাম। এক জীবনে তারা যত অপেক্ষা করেছে পদ্মার দুই তীরে তা হয়তো সময় দিয়ে মাপাও যাবে না। তবে এটা ঠিক, জীবনের অন্য কোনো কাজে কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য সাধনে কিংবা অন্য কোথাও অন্য কোনো পথে তাদের এতটা গুনতে হয়নি অপেক্ষার প্রহর।

কয়েক দিন আগে পদ্মা সেতুর মুন্সীগঞ্জ প্রান্তের মাওয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায় ফেরির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে শত শত যানবাহন। ঘাটে আছেন পায়ে হাঁটা মানুষ, মোটরসাইকেল আরোহী, ব্যক্তিগত যানের যাত্রী, বাসযাত্রী আর ট্রাকের চালক ও সহকারীরা। সেখানে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে অপেক্ষায় ছিলেন প্রায় ৭০ বছর বয়সী পিকআপ চালক তোফাজ্জল হোসেনও। তিনি বলেন, এই ঘাটে ৮/১০ ঘন্টা অপেক্ষা যেন স্বাভাবিক ঘটনা। কখনো কখনো ২০ ঘন্টা এমনকি দুদিনও কেটে গেছে ঘাটে।

পদ্মা সেতু চালুর পর আর ভোগান্তি

থাকবে না বলে বিশ্বাস করেন তোফাজ্জল- ‘সেতু চালু মানে সবার সুবিধা। নদী পার হওয়ার জন্য বসে

থাকতে হবে না। দুই-চারশ’ টাকা লাগুক বেশি, আপত্তি নেই তাতে।’

ঘাটে ফেরি পারাপারে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা আর নানা ভোগান্তির চির অবসান ঘটাবে পদ্মা সেতু- এমন আশায় বয়োজ্যেষ্ঠ তোফাজ্জলের মুখে কিছুক্ষণ লেগে থাকে সুখের হাসি।

নিজের জীবনের দীর্ঘ সময়ের ‘অপেক্ষা’ আর ভোগান্তির কথা জানানোর পাশাপাশি ষাটোর্ধ্ব তোফাজ্জল হোসেন জানান পদ্মা সেতু চালুর জন্য এখন তার তর সইছে না- বলেন, ‘কবে চালু হবে সেতু?’

কেবল তোফাজ্জল হোসেন নয়, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে এখন পদ্মা সেতুর গল্প। তাদের মুখে সেতু চালুর অপেক্ষার গল্প আর জয়গান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

কোটি মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে

অপেক্ষা আর ভোগান্তিই ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য। সেখান থেকে শেখ হাসিনার যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্তে ষড়যন্ত্রের শিকল ছিঁড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে পদ্মা সেতু। খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা; বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ীর মতো ২১টি জেলার মানুষের ভাগ্য বদলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে পদ্মা সেতু।

এখন এই সেতু ঘিরেই সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন এই অঞ্চলের মানুষ। পদ্মা সেতু চালু হলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। দিনে দিনে ঢাকায় যাতায়াতের সুবিধা আর ভোগান্তির অবসানের উচ্ছ্বাস এখন এই অঞ্চলের সবার মুখে।

‘সেতু চালু হইতাছে, আলহামদুলিল্লাহ’

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার গ্রামের বাড়িতে পরিবার নিয়ে ফিরছিলেন রুমানা আক্তার। মাওয়া ঘাটে তপ্ত রোদে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় তাকে।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতু চালু হইতাছে, আলহামদুলিল্লাহ। ফেরি-লঞ্চের জন্য আর ঘণ্টার পার ঘণ্টা অপেক্ষা করা লাগবে না। এখানে দেখেন, খাওয়া-দাওয়ার সুযোগ নাই, গরমে বাচ্চাটা অসুস্থ হইয়া পড়ছে। সেই সকাল আটটায় আইছি। এখন বাজে সাড়ে ১২টা। কিন্তু ফেরির খবর নাই।

করিম বেপারী নামে বরিশালগামী এক পিকআপযাত্রী বলেন, সকাল ৯টায় এসেছি। বসে আছি তো আছিই। ফেরিতে ওঠার সুযোগ পাইনি এখনো। সেতুটা চালু হলে সময়ও বাঁইচা যায়, ভোগান্তিও থাকে না। টাকা বেশি লাগলে লাগুক।

‘এক বাসেই ঢাকা যাইতে পারমু’

গোপালগঞ্জগামী এক যাত্রী জানান, ৪/৫টা গাড়ি পাল্টিয়ে তবে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসতে হয়। তিনি বলেন, বাসে করে টেকেরহাটে আসি, সেখানে বাস পাল্টাই। এরপর লঞ্চে উঠি, ঘাটে নেমে আবার বাসে উঠি। এরপর ঢাকায় পৌঁছাই। তিনি বলেন, এখন সেতু চালু হইলে এক বাসেই ঢাকায় যাইতে পারমু। দিনে দিনে যাওয়া-আসা করা যাবে, ভাবতেই ভালো লাগছে। খরচ বাড়লেও সরকার সেটা দেখুক। মানুষের অর্থনৈতিক সুবিধাটাও দেখতে হবে।

উচ্ছ্বসিত বাসমালিকরা

সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় যাতায়াতকারী জনৈক পরিবহন মালিক বলেন, সাতক্ষীরা থেকে আমাদের জেলার অধিকাংশ বাসই চলাচল করে আরিচা ঘাট হয়ে। তবে পদ্মা সেতু চালু হলে আমরা এর সুবিধা পাব। এখন ঢাকায় পৌঁছাতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা। ফেরির টোল দিতে হয় দুই হাজার টাকা। তবে পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচলে সময় বাঁচবে কমপক্ষে ৪ ঘন্টা। মাত্র ৬ ঘন্টায় আমরা ঢাকায় পৌঁছে যাব। বড় বাস হিসেবে পদ্মার টোলসহ অন্যান্য টোল দিতে হবে বেশি। কিন্তু ঘাটে ঘাটে অপেক্ষার যে ভোগান্তি সেটা আর থাকবে না। মানুষও উপকৃত হবে।

হকাররাও আনন্দিত

বাংলাবাজার ঘাটের একাধিক হকারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিকল্প পেশা নিয়ে সেতু নির্মাণের শুরু থেকেই তাদের অনেকের ভাবনা চলছিল। অনেকে বাড়ির কাছাকাছি ছোট্ট দোকানও দিয়েছেন বলে জানান। নিয়মিত চাসহ খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করছেন পরিবারের অন্য কেউ। ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে ওই ব্যবসায় নিজে সময় দেবেন। কেউ কেউ কৃষিকাজে নিয়মিত হবেন। পাশাপাশি পদ্মায় মাছ শিকার তো আছেই। এছাড়া অনেকেই শহরমুখী হবেন। সেতুকে ঘিরে পদ্মার পাড়ে একাধিক গ্রামীণ বাজার তৈরি হওয়াসহ বাজারের অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। পদ্মার পাড়ের নদী শাসন বাঁধসহ সেতু এলাকার অনেকটাই পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। বিকেলের দিকে অসংখ্য মানুষ আসেন ঘুরতে। সেক্ষেত্রে জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু না কিছুর ব্যবস্থা হয়ে যাবে বলে তাদের বিশ্বাস।

ঘাটে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে হকারি করেন স্বপন। কাঁঠালবাড়ী এলাকায় তার বাড়ি। ঘাটকে ঘিরেই তার বেড়ে ওঠা। সেতু চালু হবে, এ নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই তার।

পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন। যা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে প্রমত্তা পদ্মার বুকে। এখন ওপর দিয়ে যাওয়ার দিন গুনছেন যাত্রীরা। ঘাট এলাকার যুগ যুগ ধরে চলা ভোগান্তি থেকে বাঁচবে যাত্রীরা। বাঁচবে সময়ও। তাই সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। ঢাকা যেন এখন হাতে মুঠোয়!

ভাগ্য ফিরছে ক্ষতিগ্রস্তদেরও

পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও শ্রীনগর, মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার ১৭ হাজার ৩২৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এসব এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৪২ হেক্টর। এসব জমি অধিগ্রহণে ভূমি মালিকদের ২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া অতিরিক্ত সহায়তা হিসাবে দেয়া হয়েছে ৬৮৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এছাড়া ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৭৯৩টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আর হস্তান্তর করা হয়েছে ২ হাজার ৬০২টি প্লট। এছাড়া তাদের জন্য চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাজার, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ১ হাজার ৫৮৭ জনকে কম্পিউটার, গরু-ছাগল পালন ও হাঁস-মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুতে জমি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের একজন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাসিন্দা নুর ইসলাম মাদবর। সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, পৈতৃক ভিটা, কৃষি জমিসহ অনেক জমিজমা হারিয়েছি। তবে আবাসন প্রকল্পে প্লট পেয়েছি। কিন্তু পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞে আমার পরিবার খুশি। আমরা মনে করছি, এ সেতুর মধ্যমে সারা দেশের যে উপকার হবে তাতেও ভাগীদার হতে পারলাম।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আলাদা প্রকল্প

পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকার স্থাপনা তৈরির কারণে ১ হাজার ৩০০ একর এলাকায় জলজ ও জলাভূমিতে বাস করা প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতু এলাকায় ৬ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি জীববৈচিত্র্যের ইতিহাস সংরক্ষণে একটি জাদুঘর স্থাপনের কাজও চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও নেয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি ছাত্রদলের এক সভায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, পদ্মা সেতু এই আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। জোড়াতালি দিয়ে বানানো সেতুতে, কেউ উঠবেও না।

এরপর একের পর এক পদ্মা সেতু বিরোধী মন্তব্য আসতে থাকে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক বিরোধিতার সুরে তাল মিলিয়ে ‘কান নিয়ে গেছে চিলে’ এমন রব তোলেন কয়েকজন সুশীলও।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার পদ্মা সেতু নিয়ে বলেছিলেন, দুর্নীতি আমাদের কীভাবে পেছনে নিয়ে যাচ্ছে তার আরেকটি উদাহরণ এটি (পদ্মা সেতু)। জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

সরকার সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করায় দুঃখ পান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছিলেন, প্রথম অভিযোগ পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের মনোভাব হলো অভিযোগ অস্বীকার করে যাওয়া। অর্থমন্ত্রী বলেছেন যে কিছু কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে দাতাগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

অপরদিকে, দুদকের বিচার করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন, দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল কোনো প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু কানাডার পুলিশ এসে এ দুর্নীতির প্রমাণ দিয়ে গেছে। এ ঘটনা নিয়ে তদন্ত করার সামর্থ্য আছে কিনা দুদকের, সেটি নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। এ ঘটনার তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা তাদের আছে কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পদ্মা সেতু ঘিরে তৈরি হয়েছে যত অবকাঠামো

পদ্মা সেতুর মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায়। এজন্য সেতুটিকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত মহাসড়ক (এক্সপ্রেস)। গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন ব্রড গেজ রেললাইন। সেতুর সংযোগ সড়কের পাশাপাশি সার্ভিস এলাকায় তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো। সেতুতে রাখা হয়েছে গ্যাস সঞ্চালন লাইন, ফাইবার অপটিক্যাল ও টেলিফোন ডাক্ট। সেতুর ভাটিতে তৈরি হচ্ছে হাই ভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন।

৪২টি পিয়ারের ওপর ৪১টি স্প্যান বসিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। দ্বিতল সেতুর আপার ডেকে চার লেনের সড়ক, যার প্রস্থ ২২ মিটার। লোয়ার ডেকে থাকবে ব্রড গেজ সিঙ্গেল লাইন রেলপথ। মাওয়া প্রান্তে সেতুর সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে ১ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার উড়ালপথ (ভায়াডাক্ট)। জাজিরা প্রান্তে তৈরি করা উড়ালপথের দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার। দুই পাশের ভায়াডাক্টসহ পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে নয় কিলোমিটার। সেতুতে রেলপথের জন্যও তৈরি করা হয়েছে ৫৩২ মিটার উড়ালপথ।

পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে তৈরি করা হয়েছে ২ দশমিক ১৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। টোল প্লাজা, পুলিশ স্টেশন, সার্ভিস এরিয়া-১, ওজন স্টেশন, জরুরি সহায়তা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো রয়েছে মাওয়া প্রান্তে।

অন্যদিকে জাজিরা প্রান্তে তৈরি করা হয়েছে সাড়ে ১০ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। এ সড়কের জন্য পাঁচটি সেতু, ২০টি বক্স কালভার্ট ও ১২টি আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে। মাওয়া প্রান্তের মতো জাজিরা প্রান্তেও টোলপ্লাজা, পুলিশ স্টেশন, সার্ভিস এরিয়া-১, ওজন স্টেশন, জরুরি সহায়তা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

দ্বিতল পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। নিচে স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। এজন্য ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে ১৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রড গেজ রেলপথ। এতে খরচ হচ্ছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে। ২০২০ সালের মার্চে উদ্বোধন করা হয় এ মহাসড়ক, যেটি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।

পদ্মা সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে তৈরি করা হয়েছে সার্ভিস এরিয়া-১ ও ৩। এর বাইরে শরীয়তপুরের নাওডোবা এলাকায় তৈরি করা হয়েছে সার্ভিস এরিয়া-২। এখানে অফিস, ল্যাবরেটরি, মসজিদ, মোটেল, মেস, রিসোর্ট, ৩০টি ডুপ্লেক্স বাড়ি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, ফায়ার ডিটেকশন ও ফায়ার ফাইটিং সিস্টেমসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

পদ্মা সেতুর স্প্যানের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৭৬০ মিলিমিটারের গ্যাস সঞ্চালন লাইন। ১৫০ মিলিমিটার অপটিক্যাল ও টেলিফোন ডাক্ট নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর বাইরে পদ্মা সেতুর দুই কিলোমিটার ভাটিতে হাই ভোল্টেজ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন তৈরি করা হয়েছে। এজন্য নদীতে সাতটি বিদ্যুতের খুঁটি তৈরি করা হয়েছে।

পদ্মা সেতুকে ঘিরে বাস্তবায়নাধীন অবকাঠামোগুলোর সিংহভাগই প্রস্তুত হয়ে আসার কথা জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা অবকাঠামো তৈরির কাজগুলো শেষ করে এনেছি। এখন সেতু উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

পদ্মা সেতুর কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগে বিদেশিদের আস্থা বাড়বে : জাপানি রাষ্ট্রদূত

পদ্মা সেতুর কারণে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগে আরও আস্থা বাড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। ৭ জুন ২০২২ খ্রি. রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ডিকাব টক’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ মন্তব্য করেন রাষ্ট্রদূত।

রাষ্ট্রদূত বলেন, পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামো নির্মাণে সাহস দেখিয়েছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামোর কারণে জাপানের বিনিয়োগকারীদের ৬০ শতাংশ এ দেশে বিনিয়োগ করতে চায়। এ সেতুর ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে। ইতো নাওকি বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী। কারণ এখানকার সরকারের আরও সুসংগত নীতি রয়েছে যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে এবং এর অর্থনীতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশে ব্যবসা করা জাপানের প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানি আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের ব্যবসা কার্যক্রম বাড়াবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইতো নাওকি।

টোকিওর সঙ্গে ঢাকার চাওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফিজিবিলিটি সমীক্ষা করার জন্য অনুরোধ করেছে। বিষয়টি জাপানের বিবেচনাধীন আছে। আশা করি, এ বছরের মধ্যে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে পারব।

রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জাপান। এর মধ্যে মেট্রোরেল একটি। ডিসেম্বরে এর প্রথম ফেস চালু হবে। মেট্রোরেল চালু হলে এ শহরের মানুষ স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবে।

এক নজরে পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য

পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য (পানির অংশের উপর) ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তবে ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৯কিলোমিটার।

পদ্মা সেতুর নকশা

বাংলাদেশের প্রথম বৃহৎ সেতু প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল তৈরি করা হয়। সুবিশাল এই পদ্মা সেতুর সম্পূর্ণ নকশা তৈরি করে এইসিওএমের (AECOM) নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরামর্শকদের নিয়ে গঠিত একটি দল।

পদ্মা সেতুর মূল কাজ শুরু

২০১৭ সালের অক্টোবরে মূল সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার দেড় বছরেরও বেশি সময় পরে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর, ৪২ টির মধ্যে ৪২ টি পিলারের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সেতুর চূড়ান্ত (৪১ তম) স্প্যানটি বসানো হয় ১০ ই ডিসেম্বর ২০২০। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু এবং সারা বিশ্বের মধ্যে ১২২ তম।

পদ্মা সেতু নির্মাণকারী

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান

২০১৪ সালের ১৭ই জুন পদ্মা সেতু নির্মাণে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বাংলাদেশ সরকার ও চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি’। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চীনের এই কোম্পানিটি পদ্মাসেতুর কার্যাদেশ পায়।

উল্লেখ্য, পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১০ সালে প্রথম দরপত্র আহবান করা হলে সেখানে প্রি কোয়ালিফিকেশনের জন্য ৪০ টিরও বেশি কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেয়।

বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও এডিবির তত্বাবধানে এদের মধ্য থেকে ৫ টি কোম্পানিকে বাছাই করা হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির কারণে একটি কোম্পানি বাদ পড়ে যায়। কিন্তু আর্থিক প্রস্তাব আহ্বান করলে শুধুমাত্র চীনের এই কোম্পানিটি আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়।

অতঃপর সেতুটি তৈরির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড এর আওতাধীন চায়না মেজর ব্রীজ নামক একটি কোম্পানি। সেতুর কাজ শুরু হয় ৭ ডিসেম্বর ২০১৪।

ব্যবহার হয়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার টন লোহা

পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৬৮ টন লোহা বা স্টিল প্লেট। এ প্রকল্পে শুধু ইট লেগেছে ১ কোটি ২০ লাখ ৯৭ হাজার ৯১৪টি। পাথর লেগেছে ৩২ লাখ ৩৭ হাজার ১৩০ ঘনমিটার। স্টিল প্লেট ও ডিফরমড বার ব্যবহার করা হয়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৬৮ টন।

সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৮১৯ টন। সাধারণত সিমেন্ট ব্যাগ হিসাবে পরিবহণ করা হয়। এ সেতুতে অনেক পরিমাণে সিমেন্ট ব্যবহার হওয়ায় তা টনে হিসাব করা হয়েছে।

বিশেষ ধরনের মাইক্রোফাইন সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে দুই হাজার ১১৪ টন। প্রকল্পে ইট লেগেছে ১ কোটি ২০ লাখ ৯৭ হাজার ৯১৪ পিস। নদীশাসনে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার ৫২১টি। আর কনক্রিট ব্লক ফেলা হয়েছে ৮০ লাখ পিস। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে-মূল সেতু, নদীশাসন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে ৩২ লাখ ৩৭ হাজার ১৩০ টন। মূল পদ্মা সেতু, নদী শাসন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে এসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। 

পদ্মা সেতুর নির্মাণব্যায়

পদ্মা সেতুর নির্মাণে ২০০৭ সালে বাজেটে ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করা হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সেতু প্রকল্পে রেলপথ সংযুক্ত করায় ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি সেতুর ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বর্তমান পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট খরচ করা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩.৩৯ কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তিতে বলা হয়েছে সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সরকার। মোট বাজেটের ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে রেল ও গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে এ সেতুতে।

নির্মাণে মোট ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

চুক্তিবদ্ধ সংস্থা

২০১৪ সালের ১৭ জুন পদ্মা সেতু নির্মাণে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বাংলাদেশ সরকার ও চীনা চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চীনের কোম্পানি পদ্মাসেতুর কার্যাদেশ পায়। পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১০ সালে প্রথম দরপত্র আহবান করা হলে সেখানে প্রি কোয়ালিফিকেশনের জন্য ৪০ টি কোম্পানি অংশ নেয়। বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও এডিবির তত্বাবধানে এদের মধ্যে ৫ টি কোম্পানিকে বাছাই করা হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির কারণে একটি কোম্পানি বাদ পড়ে যায়। আর্থিক প্রস্তাব আহ্বান করলে শুধুমাত্র চীনের এই কোম্পানিটি আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়। সেতুটি তৈরির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড এর আওতাধীন চায়না মেজর ব্রীজ নামক একটি কোম্পানি। কাজ শুরু হয় ৭ ডিসেম্বর ২০১৪।

নির্মাণের সময়ক্রম

২০১৭

  • ৩০ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পদ্মা সেতুতে পিলারের ওপর বসানো হয় প্রথম স্প্যান। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে এই স্প্যান বসানো হয়।
  • ১১ মার্চ ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারের ওপর বসে তৃতীয় স্প্যান।
  • ১৩ মে ৪০ ও ৪১ নম্বর পিলারের ওপর চতুর্থ স্প্যান বসানো হয়।
  • ২৯ জুন সেতুর পঞ্চম স্প্যান বসানো হয়েছে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায়।

২০১৮

  • জানুয়ারি মাসে জাজিরা প্রান্তের তীরের দিকের ষষ্ঠ শেষ স্প্যান বসে।
  • ২৮ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিলারের ওপর দ্বিতীয় স্প্যান ৭বি সুপার স্ট্রাকচার বসানো হয়। প্রথম স্প্যান বসানোর প্রায় চার মাস পর জাজিরার নাওডোবা প্রান্তে তিন হাজার ১৫০ টন ধারণ ক্ষমতার এ স্প্যান বসানো হয়।
  • মাওয়া প্রান্তে ৪ ও ৫ নম্বর পিলারের ওপর বসে সপ্তম স্প্যান।

২০১৯

  • ২০ ফেব্রুয়ারি জাজিরা প্রান্তে ৩৬ ও ৩৫ নম্বর পিলারের ওপর অষ্টম স্প্যান বসানো হয়।
  • ২২ মার্চ সেতুর ৩৫ ও ৩৪ নম্বর পিলারের ওপর বসে নবম স্প্যানটি।
  • ১০ এপ্রিল মাওয়া প্রান্তে ১৩ ও ১৪ নম্বর পিলারের ওপর দশম স্প্যান।
  • ২৩ এপ্রিল শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৩৩ ও ৩৪ নম্বর পিলারের ওপর ১১তম স্প্যান বসে।
  • ১৭ মে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝামাঝি স্থানে ২০ ও ২১ নম্বর পিলারের ওপর ১২তম স্প্যান বসানো হয়েছিল।
  • ২৫ মে ১৪ ও ১৫ নম্বর পিলারের ওপর ১৩তম স্প্যান ৩বি বসানো হয়।
  • ২৯ জুন ১৪তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ২২ অক্টোবর জাজিরা প্রান্তে ২৪ ও ২৫ নম্বর পিলারের ওপর পদ্মা সেতুর ১৫তম স্প্যান বসানো হয়েছিল।
  • ২৭ নভেম্বর মাওয়া প্রান্তে ১৬ ও ১৭ নম্বর পিলারের ওপর ১৬তম স্পানটি বসানো হয়।
  • ২০১৯ সালেল ৫ ডিসেম্বর পিলার ২২ ও ২৩-এর ওপর মূল সেতুর ১৭তম স্প্যানটি বসানো হয়।
  • ১১ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ১৮তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ১৮ ডিসেম্বর বসানো হয় ১৯তম স্প্যান।
  • ৩১ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে ১৮ ও ১৯ নম্বর পিলারের উপরে বসানো হয় পদ্মা সেতুর ২০তম স্প্যান। ধূসর রঙের ‘৩-এফ’ নম্বরের স্প্যানটি খুঁটির উপরে বসানো হয়।     

২০২০

  • ১৪ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে ৩২ ও ৩৩ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় ২১তম স্প্যান।
  • ২৩ জানুয়ারি মাওয়া প্রান্তের ৫ ও ৬ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় ২২তম স্প্যান।
  • ২ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৩তম স্প্যান।
  • ১১ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৪তম স্প্যান।
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২৫তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ১০ মার্চ পদ্মা সেতুর ২৬তম স্প্যান বসানো হয়। শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ২৮ ও ২৯ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় এই স্প্যান।
  • ২০ এপ্রিল ২৭তম স্প্যানটি পিলার-২৭ ও ২৮-এর ওপর বসানো হয়।
  • ১১ এপ্রিল জাজিরা প্রান্তে বসানো হয় ২৮তম স্প্যান।
  • ৪ মে মাওয়া প্রান্তে সেতুর ১৯ ও ২০তম পিলারের ওপর ‘৪এ’ আইডি নম্বরে সেতুর ২৯তম স্প্যান বসানো হয়।
  • ৩০ মে জাজিরা প্রান্তে সেতুর ২৬ ও ২৭ নম্বর পিলারের (খুঁটি) ওপর বসানো হয় ৩০তম স্প্যান।
  • ১০ জুন পদ্মা সেতুর ৩১তম স্প্যান বসানো হয়। সেতুর ২৫ ও ২৬ নম্বর পিয়ারে শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৫-এ স্প্যান বসানো হয়।
  • ১১ অক্টোবর পদ্মা সেতুর ৩২তম স্প্যানটি বসানো হয়। পদ্মায় তীব্র স্রোতের কারণে প্রথম দিন বসানো সম্ভব না হলেও প্রকৌশলীদের প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় দিনে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সেতুর ৪ ও ৫ নম্বর পিলারের ওপর স্প্যানটি বসানো হয়। বন্যা ও পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতের কারণে স্প্যানটি বসানো হয় চার মাস পর।
  • ২০ অক্টোবর বসানো হয় সেতুর ৩৩তম স্প্যান।
  • ২৫ অক্টোবর ৩৪তম স্প্যান বসানো হয় সেতুর মাওয়া প্রান্তে ৭ ও ৮ নম্বর পিলারের ওপর স্প্যান ২-এ।
  • ৩১ অক্টোবর ৩৫তম স্প্যান বসানো হয় মাওয়া প্রান্তে ৮ ও ৯ নম্বর পিলারের ওপর স্প্যান ২-বিতে।
  • ৬ নভেম্বর পদ্মা সেতুর ৩৬তম স্প্যান বসানো হয় সেতুর মাওয়া প্রান্তের ২ ও ৩ নম্বর পিলারের ওপর।
  • ১৩ নভেম্বর ৩৭তম স্প্যান ‘২-সি’ মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে ৯ ও ১০নং পিলারের ওপর বসানো হয়।
  • ২১ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের ১ ও ২ নম্বর খুঁটির ওপর ৩৮তম স্প্যানটি সফলভাবে বসানো হয়।
  • ২৭ নভেম্বর ৩৯ তম স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়। স্প্যানটি মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের ১০ ও ১১ নম্বর পিলারের ওপর ‘টু-ডি’ স্প্যানটি বসানো হয়।
  • ৪ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ৪০তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় সেতুর ছয় হাজার মিটার।
  • ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর ১২ ও ১৩ তম পিলারে ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পুরো পদ্মা সেতু।

২০২১

২৩ আগস্ট সর্বশেষ সড়ক স্ল্যাব বসানো হয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *