ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মুফতী মোঃ আব্দুল্লাহ

রোজা

পবিত্র মাহে রামাদান এর রোজা পালন করা ইসলাম ধর্মের তৃতীয় ফরজ। কেউ যদি এ ফরজ অস্বীকার বা অবিশ্বাস করে সে মুসলমান থাকে না। আর কেউ যদি তা পালন না করে তা হলে সে কঠোর পাপী বা ‘ফাসিক’ বলে গণ্য হয়।

রোজার নিয়ত : নিয়ত মানে মনের ইচ্ছা; মুখে কিছু বলুক বা না বলুক। মনের ইচ্ছার পাশাপাশি মুখেও তা বলে নেয়া ভালো; কিন্তু মুখে কিছু না বললেও নিয়ত হয়ে যায়। রোজার বেলায় নিয়ত থাকা শর্ত। যদি মনে মনে রোজার নিয়ত না থাকে অথচ সারাদিন উপবাস থাকে; তাতে রোজা হবে না।

মাহে রামাদান এর রোজার নিয়ত রাতের মধ্যেই করে নেওয়া উত্তম; যদি রাতে না করে থাকে, সেক্ষেত্রে দিনের বেলায়ও যদি সূর্য ঢলে পড়ার দেড় ঘণ্টা পূর্বের যে-কোনো সময় করে নেয়; তাতেও রোজা শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হল, কোনো কিছু যেন পানাহার না করে।

যেসব কারণে রোজা নষ্ট হয়ে যায়

(১) কানে ও নাকে ওষুধ ঢেলে দেওয়া। (২) ইচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি করা। (৩) কুল্লি করার সময় গলার ভেতরে পানি চলে যাওয়া। (৪) কোনো নারীর সঙ্গে মাখামাখিতে বীর্যপাত হয়ে যাওয়া। (৫) এমন কোনো বস্তু গিলে ফেলা যা সাধারণত খাওয়া হয় না। যেমন কাঠ, লোহা, কাঁচা গম ইত্যাদি। (৬) লোবান বা উদ কাষ্ঠ ইত্যাদির ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাক দিয়ে বা কণ্ঠনালীর ভেতরে টেনে নেওয়া; বিড়ি, সিগারেট ও হোক্কা পান করারও একই বিধান। (৭) ভুলে পানাহার করার পর এমনটি ধারণা করে যে, আমার রোজা নষ্ট হয়ে গেছে ; পুন পানাহার করে নিল। (৮) রাত বাকি আছে মনে করে সুবহে সাদেকের পর পানাহার করে নিল। (৯) সূর্য ডুবে গেছে মনে করে সূর্যাস্তের পূর্বে ইফতার করে নিল। উল্লেখ্য, এসব ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যায় এবং শুধু রোজা কাজা করতে হয়; কাফফারা আবশ্যক হয় না। (১০) ভুলে নয়, জেনে-বুঝে সুস্থ-সবল অবস্থায়, কোনো ওজর-সমস্যা ব্যতীত দিনের বেলায় পানাহার করলে অথবা স্ত্রী-সঙ্গম করলে, সেই রোজার কাজাও করতে হয় এবং কাফফারাও প্রদান করতে হয়। ‘কাফফারা’ হল, একটি ক্রীতদাস মুক্তকরণ; অথবা একাধারে ৬০টি রোজা পালন করা। আর যদি রোজা রাখার শক্তি-সামর্থ না থাকে, সেক্ষেত্রে ৬০জন মিসকিনকে দু’বেলা পেটপুরে খাবার খাওয়াতে হবে। এ যুগে যেহেতু শরীয়তসম্মত গোলাম বা ক্রীতদাস বাস্তবে নেই, সে কারণে কাফফারা’র ক্ষেত্রে শেষোক্ত দুটির যে-কোনো একটি পালন করতে হবে।

যেসব কারণে রোজা মাকরূহ হয়

(১) রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় অপ্রয়োজনে কোনো বস্তু চিবানো অথবা লবণ ইত্যাদি জিহ্বায় দিয়ে থু থু ফেলে দেওয়া; টুথপেস্ট বা মাজন বা কয়লা দ্বারা দাঁত মাজা বা পরিস্কার করা। (২) সারাদিন গোসল ফরজ অবস্থায় অপবিত্র কাটিয়ে দেয়া। (৩) একান্ত প্রয়োজন ছাড়া সিংগা লাগানো এবং দূর্বল হয়ে পড়ার ভয় থাকলে নিজ শরীর থেকে অন্যের জন্য রক্তদান করা মাকরূহ; কিন্তু তাতে রোজা নষ্ট হয় না। (৪) রোজা অবস্থায় গিবত করা তথা কারও অবর্তমানে তার দোষ বর্ণনা করা রোজার ক্ষেত্রে মাকরূহ বটে; কিন্তু এ গীবত কর্মটি অন্যতম একটি হারাম কাজ ও কবিরা গুনাহ বটে। মাহে রামাদানে এর পাপ আরও অনেক গুণ বেড়ে যায়। (৫) রোজা অবস্থায় ঝগড়া-বিবাদ, গালি-গালাজ করা; হোক তা কোন মানুষের সঙ্গে বা কোনো জীবজন্তুকে বা কোন প্রাণহীন জড় বস্তুকে; এসব কারণেও রোজা মাকরূহ হয়ে যায়।

যেসব কারণে রোজা নষ্টও হয় না মাকরূহও হয় না

(১) মিসওয়া করা। (২) মাথায় বা মোচ-দাড়িতে তেল ব্যবহার করা। (৩) চোখে ঔষধ বা সুরমা দেওয়া। (৪) আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা। (৫) গরম ও পিপাসার কারণে গোসল করা। (৬) যে-কোনো রকম ইনজেকশন বা টিকা দেওয়া। (৭) ভুলবশত পানাহার করা। (৮) অনিচ্ছাবশত গলায় ধোঁয়া বা ধুলোবালি বা মাছি ইত্যাদি প্রবেশ করা। (৯) কানে পানি দেওয়া (২/১ ফোঁটা) অথবা অনিচ্ছাকৃত প্রবেশ করা। (১০) অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়া। (১১) শোয়া অবস্থায় স্বপ্নদোষ হয়ে যাওয়া। (১২) দাঁত হতে রক্ত বের হওয়া এবং তা গলা অতিক্রম না করা। (১৩) ঘুমের মধ্যে বা সহবাসের কারণে রাতে গোসল ফরজ হয়েছিল; অথচ সুবহে সাদেকের পূর্বে গোসল করা হয়নি; আর এমতাবস্থায় রোজার নিয়ত করে নেয়া হয়েছে; তাতেও রোজার কোনো ক্ষতি নেই।

যেসব কারণে রামাদানে রোজা না রাখার অনুমতি আছে

(১) রোগের কারণে রোজা পালনের শক্তি না থাকলে, অথবা রোগ বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা হলে রোজা না রাখা জায়েয; তবে পরবর্তিতে কাজা করা জরুরি হবে। (২) যে নারী গর্ভধারণ অবস্থায় আছে এবং রোজা রাখতে গেলে গর্ভস্থিত শিশুর বা নিজের প্রাণের ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকে; সেক্ষেত্রে রোজা না রেখে পরবর্তিতে কাজা করে নিতে পারবে। (৩) যে নারী নিজের বা অন্য কারও শিশুকে দুধ পান করায় ; এমতাবস্থায় যদি রোজার কারণে শিশু দুধ না পায়, কষ্ট হয়; তা হলে সেক্ষেত্রে রোজা না রেখে পরে কাজা করে নিবে। (৪) শরীয়তসম্মত মুসাফির যিনি নূন্যতম ৮৮ (সাতাশি কিলোমিটার, সাতশত বিরাশি মিটার ও চল্লিশ সেন্টিমিটার সমপরিমাণ : সূত্র: জাদীদ ফিকহি মাসায়েল : খ-১, পৃ-১৪২) কিলোমিটার দূরত্ব সফরের নিয়তে বের হবেন তাঁর জন্যও রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। তারপরও, সফর যদি কষ্টের না হয় তা হলে সেক্ষেত্রে রোজা রাখাই তাঁর জন্য উত্তম। কিন্তু যেক্ষেত্রে নিজের বা সফরসঙ্গীদের কষ্ট হতে পারে, সেক্ষেত্রে রোজা না রাখাই উত্তম। (৫) রোজা রেখে সফর শুরু করলে, সেক্ষেত্রে রোজাটি পূর্ণ করাই জরুরী। সফররত অবস্থায় পানাহার করে দিনের বেলায় বাড়িতে বা নিজ ঠিকানায় পৌঁছলে, দিনের অবশিষ্ট সময় পানাহার না করাই সমীচীন। যদি এমন হয় যে, এখনও কোন কিছু পানাহার করা হয়নি; আর এমতাবস্থায় বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে যে, তখনও রোজার নিয়তের সময় বাকী থাকে; সেক্ষেত্রে তাঁর জন্য রোজার নিয়ত করে নেয়া জরুরি। (৬) কাউকে যদি হত্যা করার হুমকি দিয়ে রোজা ভাঙতে বাধ্য করা হয়; তার পক্ষে রোজা ভেঙে ফেলা জায়েজ তবে পরে তা কাজা করে নেবে। (৭) কোন রোগের কারণে বা ক্ষুৎ-পিপাসার প্রাধান্য যদি এমন পর্যায়ের হয় যে, একজন বিজ্ঞ ও ধার্মিক মুসলমান চিকিৎসকের মতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রাণের আশঙ্কা দেখা দেয়; সেক্ষেত্রে রোজা ভেঙে ফেলা জায়েজ; এমনকি জরুরিও বটে। অবশ্য পরে তা কাজা করে নেবে। (৮) নারীদের জন্য মাসিক ঋতুস্রাব চলাকালীন এবং সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর প্রসূতি অবস্থায় রোজা রাখা জায়েজ নয়; পরবর্তিতে তা কাজা করে নিতে হবে। রোগী, মুসাফির, হায়েয ও নেফাসগ্রস্ত নারী, যাদের জন্য রামাদানে রোজা না রাখা ও পানাহার করা জায়েয; তাদের পক্ষেও মাহে রামাদানের সম্মান বজায় রাখা আবশ্যক। যে কারণে তাঁরাও প্রকাশ্যে সবার সামনে পানাহার করতে যাবেন না।

রোজার কাজা

(১) কোনো ওযরবশত রোজা কাজা হয়ে গেলে, যখন ওযর দফা হয়ে যায় তখন আর বিলম্ব না করে ওই রোজা কাজা করে নেওয়া চাই। জীবনের যেমন কোন ভরসা নেই, তেমনি শক্তি-সামর্থ্য ও সুস্থতারও কোনো বিশ্বাস নেই। কাজা রোজার ক্ষেত্রে যেমন একাধারে তা পালনের এখতিয়ার থাকে, তেমনি ২/১টি করে পৃথক পৃথকও রাখার এখতিয়ার আছে। (২) মুসাফির সফর থেকে ফিরে আসার পর অথবা অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পর যদি এটুকু সময় না পায়, যাতে কাজা রোজাগুলো আদায় করতে পারে; সেক্ষেত্রে ওই রোজার কাজা তার ওপর আবশ্যক হয় না। অর্থাৎ ফিদিয়া আদায় জরুরি হয় না। তবে সফর থেকে ফিরে আসার পর অথবা সুস্থ হওয়ার পর যে কয়দিন সুযোগ পেয়েছিলেন অথচ কাজা আদায় করেননি, সে কয়দিনের কাজা তাঁর ওপর আবশ্যক হিসেবে বর্তাবে এবং ইতোমধ্যে মারা গেলে ওই কয়দিনের ফিদিয়াও তাঁর ওপর আবশ্যক হবে।

সাহরী

রোজা পালনকারীর জন্য শেষরাতে সুবহে সাদেকের পূর্বে সাহরী খাওয়া একটি সুন্নাত আমল, সওয়াব প্রাপ্তির উপায় ও বরকতপূর্ণ কাজ। অর্ধ-রাতের পরে যখনই কিছু খেয়ে নিবে, সাহরীর সুন্নাত পালিত হয়ে যাবে। তবে একেবারে শেষরাতের দিকে সাহরী খাওয়া অধিক উত্তম। মুয়াযযিন যদি ভুলবশত সাহরির শেষ সময়ের পূর্বে আজান দিয়ে বসেন, তাতে সাহরী খাওয়া নিষেধ হয়ে যায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত সুবহে সাদেক না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাহরী খেয়ে মনে মনে রোজার নিয়ত করে নিলেই, রোজা সহীহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। আর তার পাশাপাশি মুখেও যদি এমন কোনো বাক্য উচ্চারণ করে যাতে রোজার নিয়ত বোঝা যায় ; তা-ও ভালো। যেমন- (উচ্চারণ- “বিসাওমি গাদিন্ নাওয়াইতু মিন্ শাহ্রি রামাদন”) অর্থাৎ ‘আমি আগামী দিনের রোজার নিয়ত করলাম’।

ইফতারি

সূর্য ডুবে গেছে মর্মে নিশ্চিতভাবে জানার পরও ইফতার করতে বিলম্ব করা মাকরূহ। তবে হ্যাঁ, মেঘ-বৃষ্টি ইত্যাদির  দরুন যদি সংশয় জাগে, সেক্ষেত্রে ২/৪ মিনিট বিলম্ব করাই উত্তম। তা ছাড়া, সাহরী, ইফতার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিন মিনিটের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ সর্বক্ষেত্রেই থাকা চাই (মুফতী মুহাম্মদ শফী‘ র.: জাওয়াহিরুল ফিকহ্, ১ম খ-, পৃ-৩৮১)।

খেজুর ও খোরমা দ্বারা ইফতার করা উত্তম। অন্য কিছু দ্বারা ইফতার করলে তাতেও কোন ক্ষতি বা মাকরূহ হওয়ার কিছু নেই। ইফতারকালীন এই দু‘আ পাঠ করা সুন্নাত- (উচ্চারণ- “আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া ‘আলা রিযক্বিকা আফতারতু”) অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্ আপনারই জন্যে রোজা পালন করেছি এবং আপনারই প্রদত্ত রিযিক দ্বারা ইফতার করছি’ ; এবং ইফতার শেষে এই দু‘আ পড়া ভালো- (উচ্চারণ- “যাহাবায্-যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরূক্বু ওয়া-ছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ্”। অর্থাৎ  ‘বিদূরিত হল পিপাসা, রগ-রেশা সব সজীব-সতেজ হল এবং ইনশাআল্লাহ্ আজর-সওয়াব নিশ্চিত হল’।

তা ছাড়া, ইফতার পূর্ববর্তী সময়ে যখন একাকী বা যৌথ দু‘আ, দুরূদ ও ইস্তেগফার ইত্যাদি পাঠ করা হয় তখন এই দু’টি দুআও বেশি বেশি পাঠ করা যেতে পারেÑ (উচ্চারণ 🙂 “ইয়া ওয়াছিয়াল-ফাদলি ইগফির লী” অর্থাৎ ‘হে বিশাল অনুগ্রহ-দয়া’র মালিক! আমায় ক্ষমা করে দিন!’ অথবা এটিও পাঠ করা যেতে পারে- (উচ্চারণ 🙂 “আল্লাহুম্মা মাগফিরাতুকা আওছাউ‘ মিন্ যাম্বী ওয়া-রাহ্মাতুকা আরজা ইন্দী মিন্ ‘আমালী” ‘অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমার পাপের পরিধির  চেয়ে আপনার ক্ষমার পরিধি অনেক বেশি প্রশস্ত-সীমাহীন এবং আমার আমলের চেয়ে আমি আপনার রহমতের অনেক বেশি প্রত্যাশী’।

তারাবীহ

(১) মাহে রামাদানে এশা’র সালাতের ফরয ও দু’রাকাত সুন্নাতের পর বিশ (২০) রাকাত তারাবীহ নামায আদায় করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা’। (২) জামা‘আতের সঙ্গে তারাবীহ নামাজ আদায় করা ‘সুন্নাতে কিফায়া’। পাড়া- মহল্লার মসজিদে যদি জামাতের সঙ্গে তারাবীর জামাত হয় আর কোনো ব্যক্তি নিজগৃহে একাকী তারাবীহ পড়ে নেয়, তাতেও তার তরাবরি সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে; তবে সে জামাতে পড়ার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু যদি মহল্লায় জামাত না হয় তা হলে সকলেই সুন্নাত পরিহারের পাপে পাপী বলে গণ্য হবেন। (৩) তারাবীর মধ্যে পুরো ত্রিশ পারা কুরআন পাঠ করাও আরেকটি পৃথক সুন্নাত। কোনো পাড়া-মহল্লায় যদি হাফেয পাওয়া না যায়; অথবা পাওয়া গেলেও সেই হাফেয শর্ত-সাপেক্ষে ও সুনির্দিষ্ট পারিশ্রমিক ব্যতীত তারাবীহ পড়াতে সম্মত না হলে, সেক্ষেত্রে ছোট ছোট সূরা দ্বারাই তারাবীহ নামাজ আদায় করে নিতে হবে। খতমে তারাবীহ প্রশ্নে পারিশ্রমিক বা হাদিয়া ইত্যাদি বিতর্কের বাড়াবাড়িমুক্ত সমাধানকেন্দ্রিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের  মুফতির পৃথক গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনে সেটি দেখা যেতে পারে। (৪) কোনো হাফেজ যদি এক মসজিদে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়িয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে একই রাতে অন্য মসজিদে আবার তারাবীহ পড়ানো জায়েজ নেই। (৫) কারও যদি ২/৪ রাকাত তারাবীহ ছুটে যায়, সেক্ষেত্রে ইমাম যখন বিতির এর জামাত পড়ান তখন ওই ব্যক্তিরও ইমামের সঙ্গে বিতির পড়া চাই। নিজের বকেয়া ওই কয় রাকাত পরে পড়ে নিতে পারবেন। (৬) পবিত্র কুরআনকে এত দ্রুত পাঠ করা, যে কারণে কোন শব্দ বা হরফ বাদ পড়ে যায় Ñতা পাপের মধ্যে গণ্য। সেক্ষেত্রে ইমাম ও মুক্তাদি উভয়েই সওয়াব হতে বঞ্চিত হবেন। (৭) জুমহুর আলেমগণের গবেষণামূলক চূড়ান্ত ফাতওয়া হল, নাবালককে তারাবীর জামাতের ইমাম বানানো জায়েয নয় (শামী ইত্যাদি দ্র.)।

ই‘তিকাফ

(১) ই‘তিকাফ মানে অবস্থান করা। ইবাদতের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করাকেই ‘ই‘তিকাফ’ বলা হয়। ই‘তিকাফরত অবস্থায় এমন সব প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদ থেকে বাইরে বের হওয়া জায়েজ নয়, যা মসজিদে সম্পাদন করা যায় না। যেমন মল-মূত্র ত্যাগ করার প্রয়োজন বা ওয়াজিব গোসলের প্রয়োজন বা উযূ ইত্যাদির প্রয়োজনে। অর্থাৎ কেবল এসব প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বাইরে বের হওয়া যাবে এবং প্রয়োজন শেষ করে তাৎক্ষণিক মসজিদে প্রবেশ করবে (২) মাহে রামাদানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কিফায়া’। অর্থাৎ শহরের পাড়া-মহল্লার বা গ্রামের কোনো একজনও যদি ই‘তিকাফ না করে তা হলে সকলেই সুন্নাত পরিহারের পাপে গোনাহগার হবে। আর যদি কোনো একজনে ই‘তিকাফ করে নেয় তা হলে সকলের পক্ষ থেকেই সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। (৩) ই‘তিকাফ অবস্থায় একেবারে চুপচাপ থাকা জরুরি নয় বরং তেমনটি মাকরূহ। অবশ্য বিভিন্ন নেক আমলের পাশাপাশি অবসর সময়ে ভালো কথা, সওয়াবের আলোচনা করা, নবী-রাসূল ও ওলী-আউলিয়াদের জীবনী বিষয়ে পরস্পর আলোচনা এবং তা‘লীমের মাধ্যমে সময় পার করা উচিত। তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ ও অনর্থক বাক্যালাপ থেকে বেঁচে থাকা চাই। (৪) ই‘তিকাফ অবস্থায় বিশেষ কোনো ইবাদত করা শর্ত নয়; নামাজ, তিলাওয়াত বা ধর্মীয় বই-পুস্তক পাঠ, পড়ানো অথবা মনের চাহিদা মোতাবেক যে কোনো ইবাদতই করা যেতে পারে। (৫) যে মসজিদে ই‘তিকাফ করা হচ্ছে, তাতে যদি জুমু‘আর সালাত না হয়, তা হলে পার্শ্ববর্তী জামে মসজিদে জুমু‘আর উদ্দেশ্যে এমনভাবে অনুমান করে বের হবে যেন সেখানে গিয়ে সুন্নাত পড়া শেষ করে খোৎবা শোনা যায়। অবশ্য সেই জামে মসজিদে যদি কিছুটা বেশি সময় কেটে যায়, তাতেও ই‘তিকাফের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু পথিমধ্যে বা মসজিদের বাইরে যদি অনুমেদিত প্রয়োজন ছাড়া সামান্য সময়ও বিলম্ব করে তা হলে ই‘তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। (৬) স্বভাবজাত প্রয়োজন ও শরীয়তসম্মত কোনো প্রয়োজন ব্যতীত যদি সামান্য সময়ের জন্যও মসজিদ থেকে বাইরে চলে যায় অথবা প্রয়োজনে গিয়ে অপ্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করে; তা হলে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে; হোক তা ভুলবশত বা ইচ্ছাকৃত। তেমনটি করলে ওই ই‘তিকাফ পরবর্তিতে কাজা করতে হবে। (৭) মাহে রামাদান এর শেষ দশকের ই‘তিকাফ করতে চাইলে, সেক্ষেত্রে বিশ রামাদান দিনের শেষে সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বেই মসজিদে ঢুকে পড়বে এবং যখন ঈদের চাঁদ দেখে নিবে বা বিধি মোতাবেক চাঁদ দেখার সংবাদ শুনবে, তখন ই‘তিকাফ থেকে বের হয়ে যাবে। (৮) মূল বিধান মতে, জুমু‘আর গোসলের জন্য অথবা কেবল শীতলতা অর্জনের জন্য গোসল করলেও ই‘তিকাফ নষ্ট হয়ে যায়; তবে ব্যতিক্রম হিসাবে যদি গোসল না করলে, স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায় বা অস্বস্থি লাগে সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ আলেমগণের মতে, হয়তো মহান আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন। সুতরাং যথাসাধ্য সতর্কতা অবলম্বন করা চাই।

শবে কদর

এ উম্মতের প্রাপ্ত গড় বয়স যেহেতু অন্যান্য উম্মতের লোকজনের তুলনায় স্বল্প হয়ে থাকে, সে কারণে মহান আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে একটি রাত এমন নির্ধারিত করে দিয়েছেন, যাতে ইবাদত করা একহাজার মাসের চেয়েও অধিক সময়কাল ব্যাপী ইবাদতের নামান্তর হয়ে যায়। কিন্তু সেটিকে গোপন রেখেছেন যেন মানুষ তা অনুসন্ধানে লিপ্ত হয় এবং এই সুযোগে অসীম সওয়াবের ভাগিদার হয়ে যায়। এই লায়লাতুল-কদর রাতটি মাহে রামাদানের শেষ দশকের বেজোড় রাতেই হওয়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। অর্থাৎ ২১তম, ২৩তম, ২৫তম, ২৭তম ও ২৯তম রাত্রিতে এবং বিশেষ করে ২৭তম রাতেই তা হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। এ সব রাতে অনেক পরিশ্রম করে ইবাদত, তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা এবং দু‘আ-মুনাজাতে কাটানো উচিত হবে। একান্ত পুরো রাত যদি সজাগ থাকা শক্তিতে না কুলায় বা অবসর পাওয়া না যায়, সেক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব হয় জাগতে সচেষ্ট হবে এবং নফল নামাজ বা কুরআন তিলাওয়াত বা যিকির, তাসবীহ ও দুরূদ পাঠে ব্যস্ত থাকবে। একেবারে কিছুই করতে না পারলে, সেক্ষেত্রেও অবশ্যই এশা’র নামাজ ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা চাই। হাদিস শরীফে এসেছে, এতেও রাত জাগরণের সওয়াব দেওয়া হয়। এসব রাতে কেবল অনুষ্ঠান ও ওয়ায-নসীহতে সময় কাটিয়ে ঘুমিয়ে পড়া অনেক বড় বঞ্চনার নামান্তর। ওয়ায-বক্তব্য তো অন্য সব রাতেও হতে পারে; কিন্তু ইবাদতের এই সুযোগ-সময় তো আর পাওয়া যাবে না।

অবশ্য যারা সারা রাত জাগার সাহস, শক্তি ও ইচ্ছা রাখেন তারা যদি শুরুতে কিছু ওয়াজও শুনে নেন,তার পর নফল ইবাদত ও দু‘আ-দুরূদে আত্মনিয়োগ করেন, তাতেও কোনো সমস্যা নেই।

বরকতময় শবে-কদরের রাতে অধিক হারে এ দু‘আটি পাঠ করার কথা বর্ণিত হয়েছে, যথা- (উচ্চারণ 🙂 “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউন্ তুহিব্বুল-‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী” ; অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্! নিশ্চিত আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন,  সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন!’।

রোজা ও চিকিৎসা বিষয়ক কয়েকটি আধুনিক বিধান ও প্রসঙ্গ

শরীয়তের ব্যবহারিক বিধি-বিধান মূলত কুরআন ও সুন্নাহ্র দলীল-প্রমাণনির্ভর প্রামাণ্য হতে হয়; কেবল যুক্তিনির্ভর হলেই চলে না। আবার এই কুরআন-সুন্নাহ্রই ভাষ্য থেকে আরও দুটি বিষয় অর্থাৎ ‘ইজমা’ ও ‘কিয়াস’ বিধি-বিধানের উৎস হিসাবে পাওয়া যায়। আর এই শেষোক্ত ‘কিয়াস’ বিষয়টির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় ‘ইজতিহাদ’ তথা গবেষণা-অনুসন্ধান কর্মের; যার অনিবার্য অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে পারস্পরিক তুলনা ও যৌক্তিক বিবেচনা। সুতরাং এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, শরীয়তের বিধান খুঁজে বের করার ভিত্তি যে উৎস চতুষ্টয়ের ওপর তাতে ‘যুক্তি’ এর ক্রম অনুপস্থিত; তবে চতুর্থ নম্বরে যে উৎসটি রয়েছে সেই ‘কিয়াস’ বা ‘ইজতিহাদ’ এর ক্ষেত্রে যুক্তি বিষয়টি কাজে লাগে তথা সহায়ক হয়ে থাকে অবশ্যই; কিন্তু এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই কেবল শরীয়তের বিধান নির্ণীত বা চিহ্নিত বা স্থিরীকৃত হয় না।

সুতরাং রোজা অবস্থায় অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগের প্রকোপ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ‘ইনহেলার ব্যবহারের বৈধতা’র প্রশ্নে কোনো কোনো দৈনিক পত্রিকার মাসায়েল আলোচনায় কেবল এমন যুক্তি যে, “এতে খাদ্যের অভাব পূরণ হয় না; পানির অভাব পূরণ হয় না। এটি পাকস্থলীতে যায় না; ফুসফুস পর্যন্ত পৌঁছে। এটি গ্যাস বা বাতাস মাত্র”- যথেষ্ট নয়। তার কারণ, এমন যুক্তিতে বা এটুকু যুক্তিতে যদি এক্ষেত্রে রোজা না ভাঙে তা হলে ধূমপানে এবং অনুরূপ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রেও রোজা ভাঙবে না। কেননা তা দ্বারাও খাদ্যের অভাব পূরণ হয় না; তা বেশি পৌঁছলে, ফুসফুস পর্যন্তই পৌঁছে এবং তা-ও গ্যাস বা বাতাস মাত্র। অথচ মুফতিদের কাছে প্রামাণ্য হিসাবে ধর্তব্য এমন অনেক গ্রন্থেই যুগ যুগ ধরে লিখিত হয়ে আসছে যে, “ইনহেলার ব্যবহারে (অক্সিজেন-বাতাসের কারণে নয়, তার মধ্যে ওষুধ/গ্যাস থাকার কারণে এবং ইচ্ছার সংযোগ থাকার কারণে) রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তা সুবিধা মতো সময়ে কাজা করতে হবে” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল, আহসানুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া, ইমদাদুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া ও মাসাইল-ইফা ইত্যাদি দেখা যেতে পারে)।

রোজা ভঙ্গ হওয়া প্রশ্নে সাধারণ ও ব্যাপকহারে আকরগ্রন্থগুলোতে (‘আ -ম্মা’, ‘জায়েফা’ ও মূল ‘মানফায’) মস্তিষ্কে ও পাকস্থলীতে স্বাভাবিক পথে ও সরাসরি মুখের মাধ্যমে পৌঁছার কথা যেমন বলা হয়েছে; ঠিক তেমনি অস্বাভাবিক পথে যেমন কান, নাকের মাধ্যমেও যদি কোনো ঔষধ, তেল ইত্যাদি মস্তিষ্কে পৌঁছে বা গলা অতিক্রম করে বা পাকস্থলীতে পৌঁছে Ñ তাতেও রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। সুতরাং এমন যুক্তি বা সীমীতকরণ যে, ‘পানাহারের কাজ না দিলে, তাতে রোজা ভাঙবে না’; কিংবা ‘ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করলে’; কিংবা ‘পানাহারের স্বাভাবিক পথে (মুখে) না হলে রোজা ভাঙবে না’- এমন কোনো ‘শেষকথা’ বা ‘যুক্তি’ বাস্তবে বা সর্বক্ষেত্রে সঠিক নয়। বরং সঠিক হল, সেসব নীতি, মূলনীতি ও সুনির্দিষ্ট সমাধান যা সার্বিক বিবেচনান্তে গৃহীত হয়ে হাজার বছর ধরে বর্ণিত ও পালিত হয়ে আসছে এবং তাতে ‘ইজমা’-ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। যেমন:

(১) “অ্যাজমা ও হাঁপানি রোগীদের অক্সিজেন বা ইনহেলার ব্যবহারের ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সমস্যা ……তার সঙ্গে যদি ওষুধের সংমিশ্রণ থাকে, তা হলে সেক্ষেত্রে আবার তাতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।

(২) “ইউনানী ও আয়ূর্বেদিক বিভিন্ন ওষুধ মুখ দিয়েও খেতে হয় না; কেবল জাল দেওয়া বা গরমকৃত ভাঁপ বা বাষ্প নাক দ্বারা নিতে হয়; যা তাৎক্ষণিক নাক দিয়ে গলা অতিক্রম করে বক্ষদেশ (ফুসফুস) পর্যন্ত পৌঁছে থাকে; তাতেও রোজা ভেঙে যাবে” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।- অথচ উক্ত আলোচিত লেখকের যুক্তি মতে তো এক্ষেত্রেও রোজা না ভাঙার কথা (?) যেহেতেু পানাহারের কাজও দিচ্ছে না; আবার পাকস্থলীতেও যাচ্ছে না?

(৩) “নারীর লজ্জাস্থানে কোনো কিছু (ওষুধ ইত্যাদি) রাখলে বা ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (প্রাগুক্ত: পৃ-১৮১)।- এক্ষেত্রেও তো উক্ত লেখকের যুক্তি মতে, রোজা ভঙ্গ হওয়ার কথা নয় (?) কারণ, এতেও পানাহারের কল্যাণ বা পাকস্থলিতে সরাসরি দেয়া হচ্ছে না ?

(৪) “নাক , কান ও মলদ্বারের পথে পাকস্থলীতে বা মস্তিষ্কে পৌঁছতে পারে – এমন ওষুধ এ সব স্থানে ব্যবহারেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়” (প্রাগুক্ত)।- অথচ উক্ত লেখকের বক্তব্য মতে, যেহেতু সরাসরি পাকস্থলীতে দেয়া বা নেওয়া হচ্ছে না, তাই রোজা ভাঙার কথা নয়?

(৫) “পায়খানা বন্ধ হওয়া অবস্থায় ‘অনিমা’ (বা ‘সাপোজিটর’) নেয়া হয় সেক্ষেত্রে ওষুধস্বরূপ তা অভ্যন্তর ভাগে লাগানো হয়। এতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তার ওপর কাজা করা ওয়াজিব হবে” (মাসায়েলে রোজা : রফয়ত কাসেমী, পৃ-১৩২, দেওবন্দ)।- অথচ উক্ত লেখকের বক্তব্য মতে, এক্ষেত্রেও রোজা ভঙ্গ হবে না? কেননা তা তো পাকস্থলীতে নেওয়া হয়নি?

(৬) “হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যা কেবল ঘ্রাণ নিলেই মুখদ্বারা সেবনের অনুরূপ ফলদায়ক, উপকারী হয়” +“ইনজেকশন দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয় না; কিন্তু তার মাধ্যমে যদি পাকস্থলীতে ওষুধ পৌঁছানো হয় তা হলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: খ-১৭, পৃ-১৬৬-১৬৭)।- অথচ উক্ত লেখকের বক্তব্য মতে, রোজা ভঙ্গ হবে না? কেননা, তা তো পাকস্থলীতে নেওয়া হয়নি (?)

(৭) “ডুশ ব্যবহার বা হাঁপানির প্রকোপ নিরসনে গ্যাস জাতীয় ওষুধ ব্যবহারের দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে” (ফাতাওয়া ও মাসাইল : খ-৪, পৃ-৪১, ইফা)।- অথচ উক্ত লেখকের বক্তব্য মতে, ডুশ-গ্যাস এ সবে রোজা ভাঙে না!

(৮) “নাকে ওষুধ দিলে রোজা ভেঙে যাবে। কেননা নাকের দিক থেকে গলা’র দিকে স্বাভাবিক পথ বিদ্যমান”(খানিয়া + হিন্দিয়া : ১/২১০)- অথচ উক্ত লেখকের মতে, তাতে রোজা ভঙ্গ হবে না । তার কারণ, তা তো পাকস্থলীতে নেওয়া হয়নি এবং পানাহারের কাজও তা দ্বারা পূর্ণ হয়নি!

মোটকথা, সহীহ বিধানটি হল, ‘ইনহেলার ব্যবহারে রোজা ভেঙে যাবে। তবে রোজা অবস্থায় অসহনীয় মাত্রায় হাঁপানির প্রকোপ দেখা দিলে ইনহেলার অবশ্যই ব্যবহার করতে পারবেন; কিন্তু ওই রোজাটি পরবর্তিতে সুবিধা মতে কাজা করে নিতে হবে।’

কোন্ কোন্ চিকিৎসায় বা ওষুধ সেবনে রোজা ভাঙবে না:

 “শুধু অক্সিজেন গ্রহণের কারণে রোজা নষ্ট হবে না; কারণ তা সাধারণ বাতাস গ্রহণেরই নামান্তর। কিন্তু তার সঙ্গে ওষুধ থাকলে রোজা নষ্ট হবে” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮+ ইমদাদুল মুফতীন: পৃ-৪৮৮-৪৯২; দারুল ইশা‘আত, করাচি)।

  “ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে মহিলাদের মাসিক ¯্রাব বন্ধ রেখে ত্রিশ রোজা পূর্ণ করে নেওয়া বৈধ। এতে কোনো পাপ হবে না। তবে মাসিকের সাধারণ গতি বন্ধ রাখায় স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হলে, সেটা ভিন্ন ব্যাপার; যা বিজ্ঞ চিকিৎসকগণই ভালো বলতে পারেন”(জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।

  “রোজা রেখে শরীরে থেকে রক্ত দিলে বা শরীরে রক্ত নিলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, বিধি মোতাবেক যেসব পথে (মানফায) কোনো কিছু প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হয়; সেসব পথে রক্ত প্রবেশ বা বের করা হয় না” (ইমদাদুল মুফতীন: পৃ-৪৮৮-৪৯২; দারুল ইশা‘আত, করাচী /জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।

  “একইভাবে চিকিৎসাস্বরূপ স্যালাইন গ্রহণেও রোজা নষ্ট হয় না। কারণ, তা সেই সুনির্দিষ্ট পথ বা ছিদ্রের বাইরে রগের মাধ্যমে বা গোশতে গ্রহণ করা হয়” (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮ ইমদাদুল মুফতীন: পৃ-৪৮৮-৪৯২; দারুল ইশা‘আত, করাচি)।

  “রোজা অবস্থায় ডায়াবেটিস রোগীর ইনসুলিন ব্যবহারেও রোজা নষ্ট হয় না। কারণ, তা-ও সেই ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্ত গ্রহণের অনুরূপ। তবে এই ইনসুলিনই যদি মুখে সেবনযোগ্য ওষুধ/টেবলেট আকারে (তেমনটি আবিষ্কৃত হলে) মুখ দ্বারা গ্রহণ করা হয়; সেক্ষেত্রে আবার রোজা ভেঙে যাবে (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮; ইমদাদুল মুফতীন: পৃ-৪৮৮-৪৯২; দারুল ইশা‘আত, করাচি)।

   “রোজা অবস্থায় চোখে  ওষুধ বা ড্রপ সুরমা বা মলম ব্যবহারে রোজা নষ্ট হয় না; যদিও এসবের স্বাদ গলায় অনুভূত হয়। মাথায় তৈল ব্যবহারে এবং আতর-সুগন্ধি ব্যবহারে রোজা নষ্ট হবে না। কারণ, এসব ক্ষেত্রে রোজা না ভাঙার বিষয়টি সরাসরি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত” (মারাকিউল-ফালাহ: পৃ-৩৬১/জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।

 “রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় তাজা ডাল বা শিকড় দ্বারা মিসওয়াক করাতে, রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। যদিও ওই ডাল বা শিকড়ের স্বাদ মুখে বা গলায় বোঝা যায়”। এটিও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত  (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।

“রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় স্বপ্নদোষ হওয়াতেও রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। তবে যথাসাধ্য ফরয গোসল করে পবিত্র হয়ে যাওয়া উত্তম (জাদীদ ফিকহি মাসাইল: ১/১৮৮)।

“রোজা অবস্থায় টিভি, নাটক, সিনেমা ও নাচ-গান দেখা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। তার কারণ, রমযানের উদ্দেশ্য হল তাকওয়া অর্জন ও আত্মশুদ্ধি; অথচ ২/১টি ব্যতিক্রম ব্যতীত এগুলোর অধিকাংশই রোজার উদ্দেশ্য ও শিক্ষা পরিপন্থী। এ সব দ্বারা সিয়াম সাধনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণের পরিবর্তে বরং সরাসরি তা ব্যহত হয়।  তারপরও তেমন অবৈধ ও অশালীন গান-বাজনা, সিনেমা, নাটক ও টিভি ইত্যাদি দেখা বা শোনার কারণে ফরজ রোজা নষ্ট হবে না; যদিও শক্ত গুনাহ হবে বটে (রাদ্দুল মুহতার)। 

 এসব টিভি, নাটক ও সিনেমা ইত্যাদির বিধান হল, যা কিছু সাধারণভাবে খোলা চোখে দেখা ও শোনা জায়েজ হয় তা এসব মাধ্যমেও দেখা ও শোনা জায়েজ হয়ে থাকে; আর যা কিছু এমনিতেও দেখা ও শোনা বৈধ হয় না, সেসব এসব মাধ্যমের সাহায্যেও দেখা ও শোনা বৈধ হয় না (সূরা লোকমান এর ৬নং আয়াতের তরজমা ও তাফসীরসহ আরও অনেক হাদিস দ্রষ্টব্য)।

   আর গানের বিধান হল, তা শরীয়তবিরোধী না হওয়া, ভাষা ও ভাব মার্জিত হওয়া, ফিতনাসৃষ্টিকারী না হওয়া , দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের স্বার্থ পরিপন্থী না হওয়া; এবং তার সঙ্গে নাচ ও বাজনার সংযুক্তি না থাকা (প্রাগুক্ত)।

   “ভুলে পানাহার করলে যেমন রোজা নষ্ট হয় না, তেমনি ভুলবশত দিনের বেলায় ওষুধ সেবন করে নিলে তাতেও রোজা নষ্ট হবে না।”

  “সাহরী খাওয়াকালীন পানাহাররত অবস্থাতেই সুবহে-সাদেক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানা গেল বা কেউ সংবাদ দিল; সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পানাহার বন্ধ করে দিলে সেই রোজা সহীহ হয়ে যাবে; সেটি আর কাজা করতে হবে না। কিন্তু তেমনটি জানার পরেও, কিংবা নির্ভরযোগ্য কারও মাধ্যমে অবহিত হওয়ার পরও তাৎক্ষণিক পানাহার বন্ধ না করে মুখের লোকমা খেয়ে নিলে বা আরও ২/১ লোকমা খেয়ে নিলে কিংবা কমবেশী পানি ইত্যাদি পান করে থাকলে, সেই রোজাটিও পূর্ণ করতে হবে এবং রমযান পরবর্তীতে সেটি কাজাও করে নিতে হবে” (আযীযুল ফাতাওয়া: পৃ-৩৮৬, দারুল-ইশা‘আত, করাচি)।

   “রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় স্ত্রীর সঙ্গে কোলাকুলি, চুমু খাওয়া ও মাখামাখিতে রোজা ভঙ্গ হয় না; তবে তাতে যদি বীর্যপাত হয়ে যায় (সঙ্গম ব্যতীত) তা হলে ওই রোজাটি কাজা করতে হবে; কাফফারা আদায় জরুরি হবে না। কিন্তু ওই অবস্থাতে যদি সঙ্গমও করা হয়; সেক্ষেত্রে কাজা ও কাফফারা উভয়টি ফরয হয়ে যাবে” (আযীযুল ফাতাওয়া: পৃ-৩৮৫, দারুল-ইশা‘আত, করাচি)।

   “মাহে রমজানে রোজা রাখা অবস্থায় তাশ খেলা, পাশা খেলা, দাবা ইত্যাদি অনুমোদিত নয় Ñএমন সব খেলার কারণে রোজা নষ্ট হবে না বটে; কিন্তু তাতে রোজার সওয়াব কমে যাবে। অবশ্য ব্যায়াম হয় ও শারীরিক শক্তি, সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়; অথচ তাতে আবার নামাজ-রোজা ও জরুরি কোনে কাজেরও বিঘ্ন না ঘটে; সেক্ষেত্রে তেমন কোনো খেলার দরুন রোজা নষ্টও হবে না, সওয়াবও হ্রাস পাবে না; বরং নেক নিয়তের দরুন অতিরিক্ত সওয়াবও পাওয়া যেতে পারে” (আযীযুল ফাতাওয়া: পৃ-৩৮৯, দারুল-ইশা‘আত, করাচি, ইত্যাদি)।

“রোজা অবস্থায় হোক্কা পান ও তামাকপাতা (নিসওয়ার) সেবনে রোজা ভঙ্গের কারণ হল: যদিও কোনো বস্তু কেবল মুখের ভেতরে প্রবেশ করলেই রোজা ভেঙে যায় না বরং তা  মস্তিষ্কে বা পাকস্থলীতে পৌঁছতে হয়; যে-কোনোভাবেই হোক; তা গিলে ফেলার দ¦ারাই হোক বা অন্য কোনোভাবেই হোক; কেবল গিলে ফেলার দ্বারাই হতে হবে -তেমনটি জরুরি নয়। যে কারণে ওষুধ সেবন প্রশ্নে নাক দ্বারা নস্যি টানা এবং হোক্কাপানে সর্বসম্মতিক্রমে রোজা ভেঙে যায়; যদিও তা গলা’র মাধ্যমে গিলে ফেলার মাধ্যমে হচ্ছে না। যেহেতু মূল ভিত্তি বা বিবেচ্য বিষয়,  রোজা ভেঙে যায় এমন কিছু যেখানে মস্তিষ্কে বা পাকস্থলীতে পৌঁছবে, নিঃসন্দেহে রোজা ভেঙ্গে যাবে। সুতরাং হোক্কা, নিসওয়ার ইত্যাদি সেবনের দ্বারাও অবশ্যই রোজা নষ্ট হবে (ইমদাদুল মুফতীন: পৃ-৪৯৩-৪৯৪; দারুল ইশা‘আত, করাচি : সূত্র: আলমগীরী ও খোলাসাতুল ফাতাওয়া ইত্যাদি)।

“ভুলে পানাহারের অনুরূপ ভুলবশত যদি স্বামী-স্ত্রী সহবাস করে ফেলে, তাতেও রোজা ভঙ্গ হয় না। এমনকি ভুলে একাধিকবার পানাহার করলেও রোজা ভাঙে না” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া : খ-১, পৃ- ১৩০)।

“মাহে রমজানে কোনো রোজাদারকে ভুলে পানাহার করতে দেখলে, কী করণীয়? যদি লোকটিকে এমন শক্তিশালী বা সুস্থ-সবল বলে মনে হয় যে, তার মতো লোকের রোজা পালনে তেমন কষ্ট হবার কথা নয়; তা হলে সেক্ষেত্রে তাকে রোজার কথা মনে করিয়ে দেয়া ওয়াজিব। আর যদি এমন হয় যে, দেখতেই মনে হচ্ছে লোকটি  রোগা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বা অসমর্থ; তা হলে কিছু বলতে বা সতর্ক করতে যাবে না” (আল-বাহরুর রায়িক : খ-১, পৃ-২৭১+ ফাতাওয়া হিন্দিয়া : খ-১, পৃ- ১৩০)।

“গলার ভেতরে মশা বা মাছি প্রবেশ করলো, অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে ধোঁয়া ঢুকে পড়লো, অথবা ধুলো-বালি ঢুকে পড়লো; তাতেও রোজা ভাঙবে না। কিন্তু এসব প্রবেশের ক্ষেত্রে যদি নিজের ইচ্ছার দখল থাকে, তা হলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে” (শরহুত তানভীর: খ-২, পৃ-১৫৬)।

“আগরবাতি বা লোবান ইত্যাদি জ্বালিয়ে যদি তার ধোঁয়া/ঘ্রাণ নেওয়া বা গ্রহণ করা হয়, তা হলে রোজা ভেঙে যাবে; কিন্তু ধোঁয়া নেই কেবল ঘ্রাণ আছে যেমন গোলাপ ফুল / গোলাপজল ইত্যাদির ঘ্রাণ নেওয়াতে রোজার কোনো ক্ষতি নেই” (প্রাগুক্ত)।

“মুখের মধ্যে পান রেখে শুয়ে পড়লো, তারপর সুবহে-সাদেক হয়ে যাওয়ার পর ওই অবস্থায় জাগ্রত হল; তা হলে ওই রোজার কাজা করতে হবে” (শরহুত তানভীর +রাদ্দুল মুহতার: খ-২, পৃ-১৬২)।

“নিজের ইচ্ছা ব্যতীত এমনিতেই বমি হল, তাতে রোজা নষ্ট হবে না; হোক তা কম বা বেশি” (শরহুত তানভীর: খ-২, পৃ-১৭৮)।

“কেউ কোনো নুড়িপাথর বা লোহার টুকরো ইত্যাদি কোনো এমন বস্তু খেয়ে ফেলল, যা খাদ্য হিসাবে খাওয়া হয় না অথবা কেউ তা ঔষধরূপেও সেবন করে না; তাতেও তার রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। অবশ্য তার ওপর কাফফারার জরুরি হবে না; কেবল কাজা রাখতে হবে। আর যদি এমন কিছু খায় যা লোকজন সাধারণত খায় না; তবে প্রয়োজনে ওষুধরূপে খেয়ে থাকে বা পান করে থাকে -তেমন কিছু খেলে, তাতেও রোজা ভেঙ্গে যাবে এবং কাজা ও কাফফারা উভয়টি ওয়াজিব হবে” (শরহুল-বিদায়াহ্: খ-১, পৃ-২০১)।

ঈদের নামাজের নিয়ম

প্রথমে মুখে বা মনে মনে নিয়ত করে নেবে, ঈদুল-ফিতর এর দু’রাকাত ওয়াজিব নামাজ অতিরিক্ত ছয় তাকবীরসহ ইমামের সঙ্গে পড়ছি। তাপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বেঁধে নেবে এবং সানা পড়বে। তারপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তাকবীরে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে ছেড়ে দেবে এবং চতুর্থ তাকবীরে হাত উঠিয়ে বেঁধে নেবে। তারপর স্বাভাবিক নিয়মে প্রথম রাকাত শেষ করবে। দ্বিতীয় রাকাতে ফাতিহা ও সূরা পাঠ শেষে ইমাম যখন তাকবীর বলবেন, তাঁর সঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তাকবীরে হাত কান পর্যন্ত উঠাতে হবে এবং ছেড়ে দিতে হবে। আর চতুর্থবার তাকবীর বলে হাত না উঠিয়ে সোজা রুকুতে চলে যেতে হবে। বাকিটুকু যথা নিয়মে শেষ করে খোৎবা শুনে, দু‘আ-মুনাজাত করে বাসা-বাড়িতে ফিরে যেতে হবে।

মহান আল্লাহ্ মাহে রামাদানের উক্তসব আমল-ইবাদতে

যথাসাধ্য আমাদের অংশগ্রহণের এবং সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো মেনে

চলার তাওফীক দিন, আমীন!

লেখক : মুফতী/লেখক/গবেষক/অনুবাদক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *