ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

ড. অনুপম সেন

স্বাধীনতাই মানুষকে তার জৈবসত্তাকে অতিক্রম করে মানবিকসত্তায় পৌঁছে দেয়। স্বাধীনতাবিহীন মানুষ মানুষ নয়, জীব। মানুষ যখন পরাধীন, কোনো না কোনো অর্থে নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছে মতো পরিচালনায় অসমর্থ, তখন সে তার মানব-সত্তাকে রূপ দিতে পারে না। পরাধীন দেশ, পরাধীন সমাজে ব্যক্তি কখনোই মানুষে পরিণত হয় না। একটি গাছের বীজ উর্বর ভূমি বা পরিবেশ না  পেলে যেমন যথার্থ মহিরুহে মূর্ত হতে পারে না, মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। তবে একটি অঙ্কুরের গাছে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটি প্রকৃতির বস্তুগত অন্ধ তাড়নারই ফল। এর মধ্যে কোনো সচেতন প্রয়াস নেই। কিন্তু মানুষ সচেতনভাবে প্রকৃতি ও ইতিহাসের মধ্য দিয়ে, যুক্তির মাধ্যমে নিজের সব সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দেয়, বিকশিত করে। নিজের সব সম্ভাবনাকে যৌক্তিক পরিণতি দেওয়ার জন্য ইতিহাসের সচেতন বিষয় হিসেবে মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। প্রসিদ্ধ দার্শনিক ফ্রেডারিক হেগেল বলেছেন, ‘বিশ্ব ইতিহাস হলো ‘স্বাধীনতার চৈতন্য’ উন্মোচনেরই ইতিহাস’। মার্কসের মতে, শোষিত নিরন্ন-বিত্তহীন মানুষ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও সে কখনোই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অসাধারণ ভাষণে বাঙালি জনগণের স্বাধীনতার এই চরম ও পরম আকাক্সক্ষাকে মূর্ত করেছিলেন এক মহাকাব্যিক উচ্চারণে- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথা বলেননি, অর্থনৈতিক মুক্তির কথাও বলেছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহাকাব্যিক ভাষণটি দেওয়া হয়েছিল ১০ লক্ষ মানুষের সমাবেশে।

এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে নানা রাজ্যসত্তা বা রাজত্বের উল্লেখ আমরা পাই- পাল, সেন, সুলতানি এবং মোঘল আমলের শেষভাগে স্বাধীন নবাব (প্রকৃতপক্ষে সুবেদার) মুর্শিদ কুলি, আলিবর্দী, সিরাজ-উদ-দৌলা প্রমুখের। এসব তথাকথিত স্বাধীন রাজ্যের রাজা বা রাজন্যবর্গ স্বাধীন হলেও ব্যক্তি ছিল পরাধীন। এমনকি ব্যক্তির প্রাণও চলে যেত রাজন্যবর্গের মুহূর্তের হুকুমে, বিনা বিচারে।

ব্যক্তির পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য, প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনতার জন্য বাঙালি এক মরণপণ সংগ্রামে নেমেছিল ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ, বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে। ৩০ লক্ষ লোক আত্মাহুতি দিয়েই পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বন্ধন-পাশ ছিন্ন করে ছিনিয়ে এনেছিল বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র, জনগণের রাষ্ট্র, প্রজাদের রাষ্ট্র, বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ১০ মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু বাঙালির জন্য রচনা করেছিলেন অসাধারণ এক সংবিধান। সেই সংবিধানে বাঙালির সার্বিক- সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক – মুক্তির জন্য চারটি পন্থা বেছে নেওয়া হয়েছিল। সেগুলো  হলো: জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই সংবিধান ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর গ্রহণ করার সময় বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণের মতো আরেকটি অসাধারণ ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, “বাংলার ইতিহাসে বোধ হয় এই প্রথম বাঙালিরা তাদের নিজেদের শাসনতন্ত্র প্রদান করছে। বোধ হয় নয়, সত্যিই প্রথম বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিরা জনগণের ভোটের মারফতে গণপরিষদে এসে তাদের দেশের শাসনতন্ত্র প্রদান করছেন।”(গণপরিষদে প্রদত্ত ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বরের ভাষণ)। ১৯৭২ এর সংবিধানে জনগণের সম্ভাব্য সব অধিকারকেই সন্নিবেশিত করা হয়েছিল। বিশ্বের মহৎ সব সংবিধান বিশ্লেষণ করে তাদের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্যগুলোকে চয়ন করা হয়েছিল এই সংবিধানে। এই সংবিধানে অঙ্গীকার করা হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার। ঘোষণা করা হয়েছিল, “উৎপাদন যন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বন্টন প্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ।” আরও বলা হয়েছিল, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন,…”

আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জানে না ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল সে সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বলতে কিছুই ছিল না। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পশ্চাদপদসরণ করার সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা অসংখ্য সেতু, রাস্তা ও রেলপথ বিনষ্ট করে। এমনকি ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের সংযোগ রক্ষাকারী দীর্ঘ ভৈরব সেতুটিও ধ্বংস করেছিল। তারা অনুসরণ করেছিল ‘পোড়ামাটি’ নীতি। উদ্দেশ্য ছিল, তাদের শাসন-অবসানে বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন যেন অসাধ্য হয়। ’৭১ এর ১০ মাসের ধ্বংসযজ্ঞে অর্থনীতির সবক্ষেত্রেই- যোগাযোগ ব্যবস্থায়,

কৃষি ও শিল্পে- অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছিল। এতে শঙ্কিত হয়ে বিদেশি অনেক পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছিল, বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ লোক অনাহারে মারা যাবে। তবে অনাহারে একজন লোকও মারা যায়নি। ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি উদ্বাস্তুকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। হাজার হাজার কালভার্ট ও ব্রিজ পুনর্নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হয়। ১৯৮৬-’৮৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক জরিপ থেকে দেখা যায়, ১৯৭২-’৭৩ সালে বাংলাদেশে ২৮৯.৫ কোটি টাকার শিল্পসামগ্রী উৎপাদিত হয়েছিল, ১৯৭৪-’৭৫ সালে তা উন্নীত হয় ৫৪৮.১ কোটি টাকায় (’৭২-’৭৩ এর স্থিরীকৃত মূল্যে), আর ১৯৮৫-’৮৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২৮.২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর সময়ে দুবছরে উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল (বৃদ্ধি ২৫৮.৬ কোটি টাকা), সেখানে প্রায় সমপরিমাণ বৃদ্ধি (২৮০.১ কোটি টাকা) হতে সময় লেগেছিল পরবর্তী দীর্ঘ ১১ বছর। এর থেকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু পরিকল্পিত পন্থায় কী বিপুল উদ্যোগ নিয়েছিলেন অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে। কৃষিকেও দেওয়া হয়েছিল অগ্রাধিকার।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেমে এসেছিল এক অচিন্তনীয় বন্ধ্যা। ‘Money is no problem’ বলে মিলিটারি শাসক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোর কোষাগার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রের আনুকূল্য-পাওয়া কিছু তথাকথিত শিল্পউদ্যোক্তার জন্য। ফল হয়েছিল এই, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল ঋণখেলাপি ঐতিহ্যের সৃষ্টি।

বঙ্গবন্ধু বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে, অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নকে জীবনবাজি রেখে আদায় করার জন্য যে-অবিরাম সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা বড়ো হয়েছিলেন তারই মধ্য দিয়ে। তিনি যখন ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন সেই সময় বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতি ছিল মুখ্যত এর আগের দুদশক ধরে ক্ষমতাসীন এবং ঐ ক্ষমতাসীনদের সমর্থক ও তাদের আশীর্বাদপুষ্ট একটি নব্য ধনিক লুটেরা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল একটি নবোত্থিত রেঁনেসাস উদ্দীপ্ত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও মধ্যজীবী শ্রেণির নেতৃত্বে। স্বাধীনতা-উত্তর দীর্ঘ আড়াই দশকে বাঙালির মধ্যবিত্তের আকার অনেক বড়ো হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের নেতৃত্বে তারা আর ছিল না। তা চলে গিয়েছিল লুটেরা ও নব্য ধনিক শ্রেণির হাতে। ’৯০ দশকের মাঝামাঝি স্বাধীনতা-উত্তর আড়াই দশকে তৎকালীন পাকিস্তানের ২২ পরিবারের পরিবর্তে কেবল বাংলাদেশেই সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার পরিবার যাদের হাতে সঞ্চয় হয় বিশাল অর্থবিত্তের; এঁদের অনেকেই ছিলেন প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক লুণ্ঠনকারী ঋণখেলাপি। এ সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণের বোঝাও কম ছিল না। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কিছুই ছিল না। কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনার কোনো চেষ্টাই হয়নি। প্রতিবছর খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ২০-৩০ লক্ষ টন। ১৯৯৮ সালে দেশজুড়ে যে ভয়াবহ বন্যা হয় তার ফলে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমি জলমগ্ন ছিল তিন মাসেরও বেশি সময়। কোনো কোনো অঞ্চল থেকে ৭-৮ মাসেও বন্যার পানি নামেনি। আশংকা করা হয়েছিল অসংখ্য মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যাবে; তা হয়নি। সব মানুষের কাছে রাষ্ট্র খাদ্য পৌঁছে দিয়েছিল। প্রায় এক কোটি মানুষকে সাত মাস ধরে ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছিল। এর পরের বছর থেকেই বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য হাসিনা সরকার যে অমিত প্রয়াস নিয়েছিল, যেভাবে কৃষকদের কাছে সার, বীজ ও জ্বালানি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, কৃষিঋণ ও ভর্তুকি নিশ্চিত করা হয়েছিল তার ফলে ১৯৯৯-২০০০ ও ২০০০-২০০১ অর্থবছরে বাংলাদেশ তার স্বাধীন অস্তিত্বের ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ম্ভর হতে সক্ষম হয়।

হাসিনা সরকার জনকল্যাণে এই সময়ে আরো দু’টি বৃহৎ কর্মসূচি নেয়- একটি হলো বৃদ্ধদের জন্য বয়স্কভাতা প্রবর্তন, অন্যটি হলো বাস্তুহীন মানুষের জন্য ‘আশ্রয়ন’ বা ‘ঘরে ফেরা’ কর্মসূচি। আরো একটি উল্লেখযোগ্য কর্মোদ্যোগ ছিল প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন। পরিতাপের বিষয়, মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য আবশ্যক এই উদ্যোগটি পরবর্তী সরকার চালু রাখেনি, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার নতুন করে ১২,২৪০টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করে সেখানে ডাক্তারসহ ৬০ হাজার জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সরকারের এসব অচিন্তনীয় কর্মোদ্যোগের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু পৌঁছে গেছে ৬৯ বছরে, যা পার্শ্ববর্তী অধিকতর সমৃদ্ধিশালী দেশ ভারত ও পাকিস্তান থেকে বেশি, উন্নত দেশগুলোর প্রায় কাছাকাছি। বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও নেমে এসেছে ১.৩৭ শতাংশে যা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য একটি খুবই কাম্য বিষয়। সরকারের এসব উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২৫ কোটিতে স্থিরীকৃত হবে।

এই সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগে ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করা হবে। এই ঘোষণা যে আজ কী বিরাট সত্যে পরিণত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত ৫ বছরে মোবাইল ফোনের গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি থেকে ১১ কোটিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোটিপতি থেকে দিনমজুর সবার হাতে আজ মোবাইল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার দুদশক আগে বিশ্বের বহু জায়গায় যখন মোবাইল ফোন ছিল সুলভ, বাংলাদেশে ছিল তা দুর্লভ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার মাত্র একটি কোম্পানিকে মোবাইল ফোন পরিচালনার অনুমতি দিয়েছিল। কোম্পানিটি এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে সংযোগ দিত। পরে তা কমালেও কখনোই ২০ হাজার টাকার নিচে নামেনি। ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী সরকার বেশ কয়েকটি কোম্পানিকে মোবাইল ফোন পরিচালনার অনুমতি দিয়ে সংযোগ প্রতি ব্যয় এমনভাবে হ্রাস করে যার ফলে তা হয় বহুজনলভ্য। এখন মোবাইল ফোন হাতে হাতে, মোবাইল সিম মাত্র ১০০ টাকায় পাওয়া যায়; কল প্রতি চার্জও এক টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

ইন্টারনেটও আজ বহু ঘরে; এর ডেনসিটি বা ঘনত্ব গত ৫ বছরে ৩ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে কম্পিউটার স্থাপন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এখন প্রতিটি জেলা-উপজেলা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন গ্রাম এমনকি প্রাইমারি স্কুল অর্থাৎ তৃণমূলেও পৌঁছে গেছে। তথ্য-প্রযুক্তি হয়েছে উন্নয়নের এক বিরাট সোপান। কম্পিউটার প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সম্ভবত বাংলাদেশ আজ ভারত থেকেও এগিয়ে।

বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিষ্ময়। বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু বার্ষিক আয় ২০৬৪ মার্কিন ডলার যা অল্প কিছুদিন আগেও ছিল ৬০০ ডলার। আইএমএম-এর হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বের ৪৪তম বৃহৎ অর্থনীতি। গোল্ডম্যান স্যাক্স বাংলাদেশকে ব্রিকস (BRICS) দেশগুলোর পরের ১১টি উদীয়মান অর্থনীতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারা মনে করে, বাংলাদেশ যেভাবে এগোচ্ছে তাতে ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। বিশ্বব্যাংকেরও তা-ই মত। ইংল্যান্ডের দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকার হিসেবে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে, যদি বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার বজায় থাকে। এখনই বাংলাদেশ মানব উন্নয়ন সূচকে (Human Development Index) ভারতের চেয়েও এগিয়ে। মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো, নারী-শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান এমনকি ভারত থেকেও অনেক এগিয়ে। 

বাংলাদেশ আজ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বিদেশি সাহায্য যেখানে ১৯৯৫ সালেও ছিল জিডিপির ৬ শতাংশ, তা বর্তমানে নগণ্য, মাত্র এক শতাংশ, বিদেশিদের ভ্রুকুটিতে বাংলাদেশের শংকিত হওয়ার দিনও তাই ফুরিয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও প্রায় ৪২.০৯ বিলিয়ন ডলার, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম। এ বছর (২০১৩-১৪) বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ও ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, যা আমদানি ব্যয় থেকে বেশি। বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব অর্জনগুলোর পেছনে মহাজোট সরকারের ভূমিকা বিরাট। কৃষি বা খাদ্যের জন্য বাংলাদেশ আর কারো মুখাপেক্ষি নয়। কৃষি-উৎপাদন ১৯৭২-’৭৩ সালে যেখানে ছিল মাত্র ১ কোটি মেট্রিক টন ২০১২-’১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৭২ লক্ষ মেট্রিক টনে। এর সবই সম্ভব হয়েছে সার, জ্বালানি ও সেচে বিশাল সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়ায়। কৃষিঋণ কৃষকের হাতে সরাসরি পৌঁছানোর জন্য মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ‘কৃষি-উপকরণ সহায়তা কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লক্ষ কৃষককে।

ভৌতিক অবকাঠামো বিনির্মাণের ক্ষেত্রেও সরকার বহু অসাধ্য সাধন করেছে, বিশেষত বিদ্যুতের অভাবে বাংলাদেশের সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়তো যদি এই সরকার নতুন ৫৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ৫৩২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত না করত। এই নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হয়তো সরকারকে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি দিতে হয়েছে কিন্তু এর ফলে শিল্প ও সেবা খাতে প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকার নতুন সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচ বছর আগে প্রায় প্রতিটি শহর প্রতিদিন অন্তত ৪-৫ ঘন্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকত আজ আর মানুষকে সেই বিদ্যুৎ ঘাটতির ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে না। শিল্পক্ষেত্রে আজ বাংলাদেশ বিরাটভাবে এগিয়েছে; বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব শিল্পসামগ্রীই বাংলাদেশে তৈরি হয়। তৈরি-পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। এই শিল্পে ভাবতে অবাক লাগে, ৪০ লক্ষ নারী-শ্রমিক কর্মরত। কিছুদিন আগেও জি.ডি.পিতে শিল্পখাতের অবদান ছিল ১০ শতাংশেরও নিচে, আজ যা ২৮ শতাংশ। বিদ্যুৎ না-থাকলে, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুতের জন্য চার পাঁচ বছর অপেক্ষা করলে, সবই থেমে যেত। প্রতি রাতে প্রতি ঘরে নেমে আসত অন্ধকার।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই সরকারের অর্জন অকল্পনীয়। ২০১০-’১৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ১৩ কোটি শিক্ষার্থীর কাছে প্রায় ৯১ কোটি ৪২ লক্ষ পাঠ্যবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। আরো ৪ কোটি বই এ-বছর (২০১৪) দেওয়া হয়েছে। ৯৭ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। গরিব পরিবারের শিশুদের জন্য অনেক স্কুলেই সরকারি উদ্যোগে পুষ্টিপূর্ণ বিস্কুট ইত্যাদি দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধান জনগণের সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তার যে অঙ্গীকার করেছে তা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সরকার ’৯০ এর দশকে যে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল তা আজ বহুগুণ বাড়িয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও অপুষ্টি দূর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অভূতপূর্ব ও অচিন্তনীয় সাফল্য অর্জন করেছে তার জন্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বাংলাদেশকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেছে। এই সরকার পাঁচ বছরে ১৫ লক্ষ ১৭ হাজার টন খাদ্য ওএমএস-এর মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বিতরণ করেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় টি.আর, কাবিখা, ভিজিএফ, ভিজিডি খাতে ৫৪ লক্ষ টন খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়েছে। আজ আর উত্তরবঙ্গে ‘মঙ্গার’ কোনো অস্তিত্ব নেই। দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (MDG) ২০১৫ সালের পরিবর্তে ২০১৩ সালেই অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর লোকের সংখ্যা ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

বস্তুত যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন, শ্রম ও কর্মসংস্থান ইত্যাদি খাতে এই সরকারের উন্নয়ন প্রয়াস ও অর্জন অসাধারণ। এই বিশাল কর্মোদ্যোগ অব্যাহত রাখতে পারলেই ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্য আয়ের এবং ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে উঠে আসবে। তখনই সম্ভব হবে আমাদের সংবিধানে ‘প্রতিটি মানুষকে মানুষের মর্যাদা’ দেওয়ার যে অসাধারণ অঙ্গীকার করা হয়েছে তার বাস্তবায়ন। 

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *