ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

চৌধুরী মোঃ তানভীর

মুদ্রা পাচারের জন্য বাংলাদেশে যে কয়টি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে মুদ্রা পাচার এবং হুন্ডির মাধ্যমে মুদ্রা পাচার অন্যতম। মুদ্রা পাচারের অপ্রাতিষ্ঠানিক সবচেয়ে বড় মাধ্যম হল হুন্ডি বা হাওলা (বিশ্বে এই নামে পরিচিত)। মোঘল আমলে মূলত হুন্ডির উৎপত্তি হয় বলে জানা যায়। মোঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব কর্মকর্তারা এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে অর্থ প্রেরণের জন্য হুন্ডির ব্যবহার করতেন। সে সময় মোঘল সাম্রাজ্যের সর্বত্রই এই ব্যবসা প্রচলিত ছিল।

সাংবাদিক মেহেদি হাসান কামরুল একটি প্রতিবেদনে লিখেছেন, হুন্ডি ব্যবসায়ে বাংলাদেশের অত্যন্ত সক্রিয় এলাকা হল বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের রাজধানী এবং অত্র বিভাগের অধিকাংশ প্রবাসী হওয়াতে, এই অঞ্চলে হুন্ডির খুবই রমরমা অবস্থা। এছাড়াও বাংলাদেশের একদম প্রান্তিক কোণেও হুণ্ডি ব্যবসা সক্রিয় বলে ধারণা করা হয়। বিভিন্ন কলা-কৌশলের আর আড়ালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের (Shadow business organization) মাধ্যমে কিছু সংঘবদ্ধ চক্র হুন্ডি ব্যবসা করে থাকে।

চিত্র-১

ধরি সৌদি আরব বা ফ্রান্সে করিমের এক ছোট ভাই থাকে। ওনার ৫ লাখ টাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথে বা ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার উক্ত টাকা বিদেশে পাঠানোর কোনো নিয়ম বা আইন নেই। এই অবস্থায় করিম কোনো হুন্ডি ব্যবসায়ীর ধারস্থ হলে তারা সৌদি আরব বা ফ্রান্সে করিমের ছোট ভাইকে ৫ লাখ টাকা তাদের উক্ত দেশে অবস্থিত এজেন্টকে দিয়ে দিতে বলবে। করিমের ভাই উক্ত টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এজেন্ট থেকে বুঝে পেলে এই দেশীয় হুন্ডি ব্যবসায়ী করিম থেকে ৫ লাখ টাকা নিবে। এটি গোপন প্রক্রিয়া ফোন আলাপের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। এইভাবে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন থাকে যে অর্থ বিদেশি এজেন্ট পরিশোধ করেছে তা কিভাবে তার হাতে পৌঁছাবে। এখানে বিদেশি হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ব্যালেন্সিং পদ্ধতি অথবা সোনা চোরাচালান, মাদকের চালানের অর্থ বিদেশে লেনদেন করা হয়। ব্যালেন্সিং বলতে বিদেশ থেকে যারা বাংলাদেশে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠায় সে বৈদেশিক মুদ্রা তাদের হাতেই জমা থাকে। আবার যারা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠায় তা বাংলাদেশি হুন্ডি ব্যবসায়ীদের হাতেই জমা থাকে। দুই পক্ষ দেনা পাওনার একটা জের বা ব্যালেন্স করে থাকে। অতিরিক্ত অর্থ অবৈধ আন্তঃসীমান্ত (cross border) লেনদেন করতে ব্যবহৃত হয়।

চিত্র-২

ধরি জনাব করিম একজন প্রবাসী যিনি কোনো একসময় অবৈধভাবে বিদেশে গিয়েছেন এবং বা দ্রুত দেশে অর্থপ্রেরণ করতে চান। করিম যদি ৫ লাখ টাকা দেশে পাঠাতে চান তিনি অবৈধ হলে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ করতে পারবেন না। তাহলে দ্রুত অর্থ প্রেরণের জন্য করিম হুন্ডি ব্যবসায়ীদের ধারস্থ হবেন। উক্ত হুন্ডি ব্যবসায়ী হতে পারেন বাংলাদেশি, বিদেশি অথবা ওই দেশের নাগরিক। উক্ত হুন্ডি ব্যবসায়ী বাংলাদেশে তার এজেন্ট বা পরিচিত অন্য হুন্ডি ব্যবসায়ীকে ফোন করে করিমের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে দিতে বলবেন। বাংলাদেশি হুন্ডি ব্যবসায়ী করিমের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে দিলে তার পরিবার তথ্যটি করিমকে জানাবে (confirm)। করিম তখন বিদেশে অবস্থিত হুন্ডি ব্যবসায়ীকে ৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে দিবেন। লেনদেনটি প্রাথমিকভাবে এখানেই শেষ হবে।

কিন্তু অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এভাবে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয় যা অর্থনীতিতে বিশেষ করে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে সাহায্য করে। দেখা যায় এভাবে এসব মুদ্রা একদেশ থেকে অন্যদেশে পাচার হয় কারণ এই মুদ্রার কোনো হিসাব ব্যাংকিং চ্যানেলে থাকে না।

চিত্র-৩

দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো মূলত হুন্ডি ব্যবসার রমরমা অবস্থা। সীমান্তের অবৈধ ব্যবসা বা ভ্রমণকারীরা ঘুরতে যাওয়ার সময় অনেক পরিমাণ টাকা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বা বৈদেশিক মুদ্রা থেকে টাকায় রূপান্তর করে। এই প্রক্রিয়াটি একটি অবৈধ প্রক্রিয়া যার কোনো হিসেব থাকে না। এইভাবে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায় এবং সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

হুন্ডির মাধ্যমে সঞ্চিত অর্থ বড় পরিসরে দেশের বাইরে বিভিন্ন চক্রের হস্তগত হয়। দেশের বাইরে সেকেন্ড হোম তৈরিতেও হুন্ডি একটি বড় ভূমিকা পালন করে। দেশের বাইরে অবৈধ বিনিয়োগ করা হয় হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের মাধ্যমে। এই পাচারকৃত অর্থের হিসাব সরকার পায় না। এইভাবে দেশের অর্থনীতি থেকে প্রচুর পরিমাণ দেশি মুদ্রা বা বৈদেশিক মুদ্রা হারিয়ে যায়। এসব অর্থ সন্ত্রাসী অর্থায়ন, চোরাচালান অথবা স্মাগলিং এ সাহায্য করে। সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় নির্দিষ্ট ব্যবসার আড়ালে (Shadow Organization) বিশাল হুন্ডি ব্যবসা জড়িত থাকে। উদাহরণ দিয়ে বললে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ধরা যাক করিম মানিচেঞ্জার (ছন্মনাম) লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করে। উক্ত প্রতিষ্ঠানের মানিচেঞ্জিং ব্যবসায় সাধারণ কাজ হল বৈধ ভিসাযুক্ত পাসপোর্টধারীর কাছে বিভিন্ন রকমের বৈদেশিক মুদ্রা (প্রধানত চার রকমের) ক্রয়-বিক্রয় করা আর ক্ষেত্র বিশেষে পাসপোর্ট এনডোর্স করা। এখন যদি করিম মানিচেঞ্জার তার সাধারণ ব্যবসায়ের আড়ালে হুন্ডি ব্যবসা করে সেটা হবে নির্দিষ্ট ব্যবসার আড়ালে (Shadow Organization) অন্য ব্যবসা। বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে বিশেষ করে মতিঝিল, পল্টন, গুলশান, মিরপুর, উত্তরা, আগ্রাবাদ ও খাতুনগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় এরা বেশি সক্রিয়। কোনো ব্যাংকিং জটিলতা ছাড়া এবং দ্রুত অর্থ পাঠানো যায় বলে সাধারণ প্রবাসীরা হুন্ডি ব্যবসায়ীদের শরণাপন্ন হন। আর বৃহৎ পাচারকারীরা হুন্ডি ব্যবহার করেন কারণ দেশীয় আইনকে ফাঁকি দিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের কোন রেকর্ড বা দলিল থাকে না। একবার অর্থ পাচার হয়ে গেলে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারকারী এইসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, চোরাচালানসহ অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্থায়ন এবং অর্থ স্থানান্তর হুন্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে হয়ে থাকে। তাই হুন্ডি ব্যবসায় শুধু দেশের অর্থনীতি নয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক করে তোলে। ২০৪১ সালে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে, হুন্ডি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদারককারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের সকল নাগরিককে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে।

  লেখক : শিক্ষানবিস এএসপি

  (বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলায় সংযুক্ত)

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *