ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

জহিরুল হক শামীম

॥১॥

গণহত্যা, ইংরেজি প্রতিশব্দ Genocide; একটি শংকর শব্দ। মূল গ্রীক শব্দ génos যার অর্থ জাতি, মানুষ এবং ল্যাটিন -cide যার অর্থ “হত্যাকান্ড” এর সমন্বয়ে গঠিত। গণহত্যা বলতে নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক অংশে একযোগে বা অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হত্যা করাকে বোঝায়। এক কথায়, গণহত্যা হলো জাতিগত, বর্ণগত, ধর্মীয় বা নৃতত্ত্বীয় গোষ্ঠী হিসাবে বিবেচিত মানুষজনকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার ইচ্ছাকৃত কার্য। ‘গণ’-এর অর্থ গোষ্ঠী এবং ‘হত্যা’র অর্থ সংহার। অর্থাৎ গণহত্যা হল কোনো গোষ্ঠীভুক্ত মানুষজনকে মেরে ফেলা। ইংরাজী প্রতিশব্দ জেনোসাইডের উৎসও একই। সেহেতু জেনোসাইডের বা গণহত্যার অর্থ ‘জাতীয়, নৃগোষ্ঠীয়, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে করা কার্য’-কে বোঝায়। ১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইডে গণহত্যার পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা রয়েছে। প্রথমত, কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা; দ্বিতীয়ত, তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিসাধন; তৃতীয়ত, জীবনমানের প্রতি আঘাত ও শারীরিক ক্ষতিসাধন; চতুর্থত, জন্মদান বাধাগ্রস্ত করা এবং পঞ্চমত, শিশুদের অন্য গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া। এই পাঁচটি উপাদানের কোনো একটি থাকলেই কোনো ঘটনা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হবে। ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট যে মৌলনীতির ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গণহত্যার ৪টি সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, যা জেনেভা কনভেশন নামে পরিচিতি। তাতেও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট ও ব্যাপক সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সে নীতি অনুসারেও ২৫ মার্চ বাঙালি হত্যাযজ্ঞ গণহত্যার পর্যায়েই পড়ে। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ আর্জেন্টিনার ইরিনা মাসিমিনো বলেন, গণহত্যা বলতে নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক অংশে একযোগে বা অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হত্যা করাকে বোঝায়। এফবিআই’র মতে গণহত্যা হলো সেই হত্যাকা- যখন কোন একটা ঘটনায় চার বা তার অধিক সংখ্যক মানুষ মারা যায় এবং হত্যাকা-ের মাঝে কোন বিরতি থাকে না। গণহত্যা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে, যেখানে এক বা একাধিক মানুষ অন্যদের মেরে ফেলে।  ইতিহাস ঘাটলে যেখা যায় মানুষের এই নিষ্ঠুরতার ইতিহাস অনেক পুরনো। সভ্যতার আদি থেকেই মানুষ মানুষের ওপর পশুসুলভ আচরণ করে আসছে।

বিশ্বব্যাপী উনিশ শতক থেকে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যার মধ্যে রয়েছে- আর্মেনীয় গণহত্যা, হলোকাস্ট ও ন্যানকিং গণহত্যা, কম্বোডীয় গণহত্যা, একাত্তরের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে বাঙালি গণহত্যা, বসনীয় গণহত্যা, বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ডের গণহত্যা এবং সর্বশেষ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা জঘন্যতম। ওইদিন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এক রাতেই প্রায় ৫০ হাজার বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত হয়েছে বেশ কিছু গণহত্যা। ভিয়েতনাম, গুয়েতেমালা, চিলি, বুরুন্ডিসহ বিভিন্ন দেশে গণহত্যা হয়েছে। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী গণহত্যার সংজ্ঞা কি জেনে নেয়া যাক। ১৯৪৮ সনের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজ্যুলেশন ২৬০ (৩) এর অধীনে গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় যা বিশ্বময় গণহত্যা প্রতিরোধে সকল রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ। এই গণহত্যা বলতে বুঝায় এমন কর্মকা- যার মাধ্যমে একটি জাতি, ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিকগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা কেবল হত্যাকা-ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২৬০ (৩) এ-র অনুচ্ছেদ-২ এর অধীনে যে কর্মকা-কে আইনগতভাবে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা হল –

(ক) পরিকল্পিতভাবে একটি জাতি বা গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য তাদের সদস্যদেরকে হত্যা বা নিশ্চিহ্নকরণ।

(খ) তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করবার জন্য শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিসাধন।

(গ) পরিকল্পিতভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস সাধনকল্পে এমন জীবননাশী অবস্থা সৃষ্টি করা যাতে তারা সম্পূর্ণ অথবা আংশিক নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

(ঘ) এমন কিছু ব্যবস্থা নেয়া যাতে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর জীবন ধারণে শুধু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি নয়, সেই সাথে তাদের জন্ম প্রতিরোধ করে জীবনের চাকাকে থামিয়ে দেয়া হয়।

(ঙ)       একটি জাতি বা গোষ্ঠীর শিশু সদস্যদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তাদের জন্মপরিচয় ও জাতিগত পরিচয়কে মুছে ফেলাকেও গণহত্যা বলা হয়।

‘ঐতিহাসিক কারণে এই গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে দায়বদ্ধ, তার প্রমাণ পাওয়া যায় এটা প্রতিরোধকল্পে প্রণীত আইনগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে। রেজ্যুলেশন ২৬০ (৩) এ-র অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী গণহত্যাসাধন শুধু শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়; গণহত্যা পরিকল্পনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ এ কাজে যারা উদ্বুদ্ধ করবে তারাও এই অপরাধের কারণে বিচারাধীন হবে। এই উদ্বুদ্ধকরণের ব্যাপারটি সরাসরি হোক, নিভৃতে হোক কিংবা জনসমক্ষে উত্তেজক বক্তব্যের মাধ্যমেই হোক তা সমভাবে গুরুতর অপরাধ। গণহত্যা সাধনে ব্যর্থ প্রয়াস বা এ জাতীয় প্রচেষ্টার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী বিচারযোগ্য অপরাধী হবে। (সূত্রঃ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ঃ যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা।/ ডা. এম এ হাসান।)

জেনোসাইডÑ এই ‘টার্ম’ বা শব্দটি প্রায়ই আলোচনায় আসে। কোন ঘটনাকে জেনোসাইড বলা হবে, কোনটিকে নয়, কিসের ভিত্তিতেই বা এর সংজ্ঞায়ন হয়, সেই সব বিষয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন জার্মান ইতিহাসবিদ বরিস বার্থ। ২০০৬ সালে জেনোসাইডের ইতিহাস নিয়ে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বরিস বার্থ এর মতে, পোলিশ-ইহুদি আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন ১৯৪৪ সালে প্রথম ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করেন। আউশভিৎস ক্যাম্পে ইহুদিদের উপর যে ধরণের নির্যাতন চালানো হচ্ছিল তার বর্ণনায় ‘অ্যাট্রোসিটি’ বা ‘নির্মমতা’ শব্দটি পর্যাপ্ত নয় বলে মনে হয়েছিল আর হলোকস্ট ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক অপরাধ, যার জন্য নতুন ‘টার্ম’ বা শব্দের প্রয়োজন ছিল। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের কনভেনশনে ‘জেনোসাইড’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে জেনোসাইড টার্মটি নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে তা বুঝতে গেলে বিভিন্ন ভাষায় জেনোসাইড শব্দের ব্যবহারের বিষয়টি জানতে হবে। জার্মানি ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, যদি ইচ্ছে করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা করা হয় তাহলে সেটি ‘জেনোসাইড’ বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শব্দটি আরও বড় পরিসরে ব্যবহৃত হয়। সেখানে এমন ঘটনাকেও জেনোসাইড বলা হয় যেই ঘটনায় হয়ত কেউ প্রাণ হারায়নি। আবার অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে, সেখানে যখন কর্তৃপক্ষ আদিবাসী শিশুদের তাদের মায়েদের কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছিল তখন বেশ বিতর্ক শুরু হয়েছিল। সেটি অবশ্যই বর্ণবৈষম্যমূলক অপরাধ ছিল। অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজিতে ঐ ঘটনা জেনোসাইড বলে পরিচিত, যদিও তখন কেউ মারা যায়নি। যখন জাতিগত ও ধর্মের কারণে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়। অথবা একটি দেশ যখন ঘোষণা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে চায় তখন সেটি জেনোসাইড বলে বিবেচিত হতে পারে। জাতিসংঘের কনভেনশন তা-ই বলে। এই কনভেনশনে অভিযুক্ত হিসেবে শুধু দেশের কথা বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এথনিক ক্লিনজিং বা জাতিগত নিধন বিষয়টি সংঘাতপূর্ণ নাও হতে পারে। জাতিগত কারণে কোনো দেশে একটি গোষ্ঠীকে অযাচিত মনে করা হতে পারে। অবস্থা সে রকম হলে ঐ গোষ্ঠীকে শান্তিপূর্ণভাবে পুনর্বাসিত করা যেতে পারে। কিংবা সেটি খুবই বর্বরও হতে পারে, যা গণহত্যার পর্যায়ে পড়তে পারে। তবে ইতিহাস বলছে, জাতিগত নিধন অনেক সময় গণহত্যা পর্যন্ত গড়িয়ে থাকে। ইহুদীদের হত্যার সময়ে জেনোসাইড শব্দ প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীকালে, গ্রীক গণহত্যা, আর্মেনীয় গণহত্যা, এশিরিয়ান গণহত্যা, ইউক্রেনীয় গণহত্যা, বাঙালি গণহত্যা, কম্বোডীয় গণহত্যা, গুয়েতেমালা গণহত্যা, কুর্দীয় গণহত্যা, বসনীয় গণহত্যা, ইত্যাদি বিভিন্ন ঘটনা খবরে এসেছে।

॥২॥

দেশে দেশে গণহত্যা, ১৯২২ থেকে ২০১৭

আর্মেনীয় গণহত্যা

আর্মেনিয়া ইউরোপের একটি দেশ। জাতিগত আর্মেনীয়রা নিজেদের ‘হায়’ বলে থাকে। আর্মেনিয়ার ৯০ শতাংশ মানুষ এই ‘হায়’ জাতির। ১৯১১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কিরা আর্মেনীয়দের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। তিন বছর ধরে চলা এই গণহত্যায় সে দেশের ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়। সে সময় আর্মেনিয়ার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪ লাখ।

হলোকাস্ট ও ন্যানকিং গণহত্যা

হলোকাস্ট শব্দটা বাংলা করলে দাঁড়ায় সবকিছু পোড়ানো। তবে শব্দটি এখন জার্মান সেনাদের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ হত্যাকেই বোঝায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের ওপর চালানো এই গণহত্যাকে স্মরণকালের সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা হিসেবে ধরা হয়। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইহুদিদের ওপর জার্মান বাহিনীর খড়গ নেমে এসেছিল। তবে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যা ঘটে, সেই নৃশংসতাকে কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। জার্মান বাহিনী ১৯৪১ সাল নাগাদ ইউরোপের বেশ কিছু দেশ দখলে নেয়। তখন জার্মানিতে ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পার্শ্ববর্তী পোল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নরওয়েতে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ মানুষ। অনেক ইহুদিকে বন্দী করে পাঠানো হয় পোল্যান্ড ও জার্মানির বন্দিশালাগুলোতে। এসব বন্দিশালাতে কখনো গুলি, কখনো গ্যাস কিংবা কখনো রাসায়নিক প্রয়োগে হত্যা করা হয় কয়েক লাখ ইহুদিকে। বন্দিশালায় অত্যধিক পরিশ্রম, খাবারের অভাব আর চিকিৎসার অভাবেও মারা যায় বহু ইহুদি। এই নৃশংসতম গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে প্রতিবছর ২৭ জানুয়ারি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক ‘হলোকাস্ট দিবস।’

একই সময়ে আরেকটি নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে, যা ‘দ্য ন্যানকিং ম্যাসাকার’ কিংবা ‘রেইপ অব ন্যানকিং’ নামে চিহ্নিত। ১৯৩৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৮ সালের জানুয়ারির শেষ ভাগ পর্যন্ত জাপানি সেনাবাহিনী চীনের তৎকালীন রাজধানী ন্যানকিং শহরটিকে একদম গুঁড়িয়ে দেয়। প্রচুর পরিমাণে ধর্ষণ, হত্যাকা- ও লুটতারাজ চলতে থাকে এ সময়। এই অল্প সময়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ। বলা হয়ে থাকে, সেই যুদ্ধে এক তলোয়ারে ১০০ মানুষকে জবাই করা হতো।

২৫ মার্চ ১৯৭১ বাঙালি গণহত্যা

২৫ মার্চ মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে সাধারণ বাঙালির ওপর নেমে আসে ভয়ঙ্কর এক অভিশাপ। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির মুক্তির আকাক্সক্ষাকে শুরুতেই ধ্বংস করে দেওয়া। সেই রাতে হানাদাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসা, পিলখানার ইপিআর সদর দফতর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস্ েএকযোগে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে হত্যা করে অগণিত নিরস্ত্র দেশপ্রেমিককে। এই অপারেশনের আসল লক্ষ্য ছিল দেশের নেতৃত্বস্থানীয় শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিঃশেষ করে দেওয়া।

এ ছাড়াও সেই রাতে একে একে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, জাতীয় প্রেসক্লাবেও অগ্নিসংযোগ, মর্টার শেল ছুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে পাক হানাদাররা। এ হামলায় জীবন দিতে হয় বেশ কয়জন গণমাধ্যম কর্মীকেও। হানাদার বাহিনী ট্যাংক ও মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেতসহ বিশ্ববিদ্যালয়

এলাকা দখলে নেয়। সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলি, ট্যাংক-মর্টারের গোলা ও আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়। পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত। মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চের রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে সাত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হয় আরও তিন হাজার লোককে। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শিয়ালের খাবারে পরিণত হলো।’

কম্বোডীয় গণহত্যা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ক্ষমতায় ছিল খেমাররুজরা। এই চার বছরে খেমাররুজ সরকার নির্মম গণহত্যা ঘটিয়েছিল, যা কম্বোডীয় গণহত্যা নামেই পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন গণহত্যার মধ্যে কম্বোডিয়ার এই হত্যাকা- উল্লেখযোগ্য। বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে এই সময়ে প্রায় ২০ লাখ সাধারণ কম্বোডীয়কে হত্যা করে ক্ষমতাসীন বামপন্থী খেমাররুজ সরকার। যে নৃশংস হত্যার শুরু হয়েছিল আগের সরকারের অধীনে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে। কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই হত্যা করা হতো। একপর্যায়ে এই হত্যাযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়ে খোদ খেমাররুজ সদস্যদের মধ্যেও। বিদেশিদের গুপ্তচর, দেশবিরোধী কর্মকা-ে জড়িত থাকার বায়বীয় অভিযোগে অনেক খেমাররুজ সদস্যকেও তাঁদের জীবন হারাতে হয়। একসময় দেশটিতে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষ আর মহামারিতে আক্রান্ত হয়েও প্রাণ হারাতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। পরে ভিয়েতনামের সরকারি বাহিনীর হাতে খেমাররুজ সরকারের পতন হয়।

চলবে…

সূত্র : উইকিপিডিয়া, বিবিসি, হিষ্ট্রি ডটকম, আল-জাজিরা অনলাইন, আর্মেনিয়ান জেনোসাইড ডটঅর্গ, জাতিসংঘ ওয়েবসাইট।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *