ই-পেপার

SITE UNDER CONSTRUCTION
বাংলাদেশ পুলিশের মুখপত্র
অব্যাহত প্রকাশনার ৬৩ বছর

মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম

LSD কি? LSD-এর পূর্ণরূপ হচ্ছে Lysergic Acid Diethylamide। LSD এক ধরনের সাইকোডেলিক ড্রাগ, যা গ্রহণের ফলে মানুষ হ্যালুসিনেট করে এমন দৃশ্য দেখে, যা বাস্তবে নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখে থাকে। এটা তাৎক্ষণিকভাবে এতটাই ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন তৈরি করতে সক্ষম যে কেউ কেউ নিজেকে পাখি মনে করে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে উড়তে শুরু করে। অনেকেই নিজেকে অতি মানবীয় শক্তিধর মনে করে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। এটি Visual Hallucination নামে পরিচিত। সম্প্রতি বাংলাদেশে LSD-এর প্রভাবে এক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় ভয়াবহ এই মাদক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

LSD-এর ইতিহাস :  ১৯৩৮ সালের ১৬ নভেম্বর সুইজারল্যান্ডের রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান সর্বপ্রথম LSD সংশ্লেষণ  করেন। এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন এবং কিছুটা তেতো স্বাদযুক্ত একটি পদার্থ। গবেষকদের কাছে এটি LSD-২৫ নামে পরিচিত। কারণ হফম্যান যখন LSD নিয়ে গবেষণা এবং অধ্যয়ন করছিলেন তখনএটি ছিল ২৫ তম যৌগ। মূলত : মানসিক রোগের চিকিৎসা হিসেবে LSD নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছিল। তবে ১৯৪৩ সালে হফম্যান প্রথম এর হ্যালুসিনেজেটিক/সাইকোডেলিফ বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেন। এই বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে গিয়ে হফম্যান নিজেই ২৫ গ্রাম LSD গ্রহণ করেন। এরপর তার সঙ্গে এমন কিছু ঘটল, যা তিনি LSD গ্রহণের আগে চিন্তা করতে পারেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলেন তিনি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন।

তিনি তার ল্যাব সহকারীকে বললেন তাকে দ্রুত বাসায় পৌঁছে দিতে। তার সহকারী তাকে বাইসাইকেলে করে বাসায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তিনি ওই দিনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেছেন। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন ঘরের সমস্ত যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র দূরে সরে যাচ্ছিল এবং যে কোনো সময় সেগুলো তার দিকে তীব্র গতিতে ছুটে আসবে। একজন মানুষ ভয়ংকর রঙিন মুখোশ পরে তার কাছে দুধ নিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ পর তিনি ধীরে ধীরে দেখতে শুরু করলেন, বিচিত্র জলছবির মত রঙিন বৃত্ত। রঙের ছাপটা যা একবার সংকুচিত হচ্ছে আবার ছড়িয়ে পড়ছে। ওই দিনটি বাইসাইকেল ডে নামে বিখ্যাত হয়ে আছে। কারণ তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল এবং যানবাহন চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১৯৫০ এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমেরিকার সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা CIA ÔMK ULTRAÕ নামে একটি গোপন মিশন শুরু করে, যা ৬০ দশক ধরে চলছিল। এই মিশনের অধীনে তারা  LSDও অন্যান্য পদার্থ কিছু স্বেচ্ছাসেবক এবং কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তির উপরে প্রয়োগ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিল। CIA ভেবেছিল শীতল যুদ্ধে LSD-একটি মনস্তাত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই মিশনটি CIA এর মাইন কন্ট্রোল প্রোগ্রামের অংশ ছিল। আলবার্ট হফম্যান নিম্ন রক্তচাপ ও শ্বাস প্রশ্বাস উন্নত করার ওষুধ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই শক্তিশালী এই মাদক তৈরি করে ফেলেছিলেন হফম্যান বলেন, আমি LSD আবিস্কার করিনি, LSD আমাকে খুঁজে নিয়েছে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে মানসিক রোগ, বিষণœতা, দুশ্চিন্তা ও অবসাদের চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে LSD-এর ব্যবহার শুরু হয়।

LSD-এর উৎস ও ব্যবহার : নানা ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসায় LSD ব্যবহারের জন্য প্রচারণা চালান গবেষকরা। সে সময় এই বিষয়ে বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়। আয়োজিত হয় একাধিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন। ফলে তখন LSD Daily Seed নামে একটি ওষুধ হিসেবে বিক্রয় হয়েছিল। বর্তমানে LSD-এর কোনো অনুমোদিত ব্যবহার নেই। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ চিকিৎসা কাজে LSD ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা দিলে এ বিষয়ে গবেষণায় ভাটা পড়ে। বর্তমানে LSD নেশাজাতীয় দ্রব্য হিসেবে ব্যাপক আকারে ব্যবহার করা হয়। তাই অধিকাংশ দেশে এটি উৎপাদন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা National Institute of Drug Abuse-এর তথ্যানুযায়ী LSD রাসায়নিক সংশ্লেষের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ, যা রাই এবং বিভিন্ন ধরনের শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের শরীরের Lysergic Acid থেকে তৈরি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের National Library of Medicine এর মতে এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল-এর আকারে পাওয়া যায়। সংস্থাটির মতে, এটি মানুষের মস্তিষ্কের Serotonin নামক রাসায়নিক কার্যক্রম প্রভাবিত করে ব্যবহার, অনুভূতি এবং পারিপাশির্^কতা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন করে। তবে ব্যক্তিভেদে এই আসক্তির মাত্রা বা LSD-এর প্রতিক্রিয়া আলাদা হয়। LSD ব্লটার পেপার বা নকশা করা কাগজ, চিনির কিউব বা জিলাটিনে বিক্রি করা হয়। এটি এতই শক্তিশালী যে, মাত্র ২০ থেকে ৩০ মাইক্রোগ্রাম LSD প্রভাব উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট। ইউরোপের বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের বাণিজ্যিক Website Richard gate-এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্যানুযায়ী ১৯৫৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মোট ৬৪ জনের মৃত্যু হয় LSD গ্রহণের পরবর্তী জটিলতায়।

LSD-এর ক্ষতিকর দিক : শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আছে রক্তচাপ, খিঁচুনি, রক্তে শর্করা বৃদ্ধি, উদ্বেগ এবং বিষণœতাসহ আরও কিছু নেতিবাচক প্রভাব। এটি এতই শক্তিশালী যে, এর ডোজগুলো সাধারণত : মাইক্রোগ্রাম হিসেবে নেয়া হয়। LSD-এর Overdose  হলে  Psychosis-এর মতো মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। এক মাইক্রোগ্রাম হল এক গ্রামের ১০ লাখ ভাগের ০১(এক) ভাগ। সাধারণত : LSD-এর একটি ডোজ ৪০ থেকে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে, যা একটি বালুকনার ভরের ১০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। অর্থাৎ এ পরিমাণ LSD গ্রহণ করলে যে কারও নেশা হতে পারে। LSD সেবনের ফলে মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করে। যার ফলে মানুষের শ্রবণ ও দর্শন ইন্দ্রিয় অতি সক্রিয় হয়ে যায়। সেই কারণেই LSD সেবনের পর মানুষ অদ্ভূত রকমের আলো বা রং দেখতে পায়। কেউ আবার অস্বাভাবিক শব্দ শোনে। বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। এই অবস্থাকে বলে LSD Trip. LSD Trip-এ থাকাকালীন সময়ে মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করে। অনেকের মধ্যে আত্মঘাতী প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। এ ধরনের খারাপ অনুভূতিকে বলা হয় Bad Trip, Bad Trip-এর কারণে মানুষ অমূলক ভয় পায়, মুহূর্তের মধ্যেই মারাত্মক দুশ্চিন্তায় ভুগে, আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে, নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা তৈরি হয়। এছাড়া LSD-এর কারণে মানুষের হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা, খিঁচুনি, উদ্বেগ এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। LSD সেবনের ৩০ মিনিটের মধ্যে Trip শুরু হয়ে যায়। ব্যক্তিভেদে তা ছয় থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে। তবে সেবনের মাত্রার উপর ভিত্তি করে কারও আবার ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত LSD কার্যকর হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রেই চরম অনিদ্রা দেখা দেয়। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত ঘুমায়। বিষণ্ণতায় ভোগা ব্যক্তিরা LSD সেবনের পর আরও বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। এছাড়া অনেকে মনে করে LSD এর প্রভাবে তাদের শরীরে অতি মানবীয় শক্তি চলে এসেছে। এমন কল্পনা থেকেও বহু দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ একক মাদক হিসেবে LSD গ্রহণ করে না, অর্থাৎ যারা অন্যান্য মাদকে আসক্ত তাদের ক্ষেত্রেই LSD-এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। হেরোইন বা ইয়াবার তুলনায় LSD তুলনামূলক কম আসক্তিকর। তাই বলে এটি মোটেও নিরাপদ নয়। প্রচলিত যে কোন মাদকের তুলনায় LSD হাজারগুণ শক্তিশালী। LSD-র সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো Flashback. LSD সেবনের কয়েক দিন, কয়েক মাস বা বছরখানেক পরও মাদক গ্রহণ ছাড়াই মস্তিষ্কে হুট করে LSD-র প্রভাব তৈরি হতে পারে। একেই LSD-এর Flash back বলে। Flash back-এর কারণে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যা তৈরি হতে অনেকে বাস্তব আর অবাস্তবের পার্থক্য ভুলে যায়। অর্থাৎ জীবনে মাত্র একবার LSD গ্রহণ করলেও মানুষের মস্তিষ্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মুক্তির উপায় : LSD সেবন থেকে মুক্তি পেতে কাউন্সেলিং কিংবা দলগত কাউন্সেলিং, ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং চাপমুক্ত থাকা উপকারে আসতে পারে। এ ছাড়াও এ ড্রাগের প্রভাবে মানসিক সমস্যা, যেমন- দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে যেগুলোর জন্য আলাদাভাবে চিকিৎসা নেয়া জরুরি।

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার

ডিবি-সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকা।

ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন :)

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published. Required fields are marked *